04/07/2023
পশ্চিমবঙ্গ দশম পঞ্চায়েত নির্বাচন - ২০২৩
সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পক্ষ থেকে বাংলার গ্রামীন জনগনের প্রতি আবেদনপত্র
শাসকদল তৃণমূলের দুর্নীতি, স্বজন পোষণ, রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং বিজেপি- আরএসএসের ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে
জনগনের হাতে পঞ্চায়েতি ব্যবস্থা পরিচালনার অধিকার ফিরিয়ে দিতে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন- ১৯৭৩ অনুযায়ী প্রথমবারের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কায়েম হয়। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সরকার হিসাবে এই ত্রিস্তর বিশিষ্ট বিকেন্দ্রীত ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি ছিল উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন ও রূপায়নে গ্রামীন জনগনের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা। এই ক্ষমতায়নের ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে রোজগার,খাদ্য, আবাস, শিক্ষা ও সুস্বাস্থ্য পরিষেবার নিশ্চয়তা প্রাপ্তির ভিতের ওপর। নারীর স্বাধীকার ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং ধর্ম ও জাতপাতের বিভাজনের বেড়াজাল ভেঙে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে এক কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসাবে একে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ছিল শুরুর দিনগুলিতে। ৮০র দশকের শেষ দিক থেকে শাসকদলের একাধিপত্য ও স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বের ক্ষমতাকেন্দ্রে পর্যবসিত হতে থাকে নির্বাচিত পঞ্চায়েতগুলি। ক্রমে গ্রামীনক্ষেত্রে এক দাপুটে অংশের সুবিধাভোগী সম্পন্নতা অর্জনে ব্যবহৃত থাকে এই ব্যবস্থা। ৯০- দশকের মধ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনগুলি হয়ে উঠলো শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে সন্ত্রাসের প্রতিযোগিতা। রাজনৈতিক হিংসা বহুকাল যাবত বাংলার পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরিচিত অভিজ্ঞান হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।
২০১১ সালে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস শাসকদল হিসাবে ক্ষমতায় বসে । এরপর ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়কালের মধ্যেই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পর্যুদস্ত করতে দলীয় বাহুবল ও পুলিশী সন্ত্রাসকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী বামেদের হাতে থাকা পঞ্চায়েতগুলিকে অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভেঙে দিয়ে এক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করে শাসকদল। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের আসর তৃণমূলের পরিকল্পিত সন্ত্রাসের নজীরবিহীন উন্মত্ততায় রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল। জনগণের হাতে যে ছিঁটেফোঁটা ক্ষমতার অবশেষ ছিল, তাও পার্টির দাদাদের কুক্ষিগত হয়ে পড়লো। স্বশাসিত সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন ও জনতার প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সেই পরিকল্পনাগুলি রূপায়ন করে গ্রামীণ জনতার ক্ষমতায়নের কাঠামোটিকে অকেজো করে তোলা হ'ল। উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ টাকার পুকুরচুরি, সংগঠিত দুর্নীতি ও লুঠপাটের আখড়া করে তোলা হয়েছে প্রতিটি পঞ্চায়েতকে। প্রতিটি পঞ্চায়েত সংসদে বছরে দুটি গ্রাম সংসদ ও সেইসূত্রে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে গ্রামসভার মাধ্যমে জনতার অংশীদারিত্বের আইনসম্মত অধিকার আজ ভূলুন্ঠিত। দুর্নীতিতন্ত্র কায়েম করে বুভুক্ষাপীড়িত গ্রাম সমাজের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে ১০০ দিনের কাজ, ফসলের ন্যায্য দাম, আবাস যোজনার সুবিধা; কৃষি সমবায়গুলিকে করা হয়েছে অকেজো, গ্রামীণ শ্রমিকেরা জীবিকার অভাবে ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হ'তে বাধ্য হচ্ছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের ন্যূনতম সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। অন্যদিকে, পঞ্চায়েত প্রধান, বিডিও ও স্থানীয় তৃণমূল বাহুবলী নেতৃত্বের সম্মিলনে এক গ্রামীন 'মোড়লতন্ত্র' কায়েম করা হয়েছে - যার মাধ্যমে সরকারী টাকা আত্মসাতের এক মোলায়েম ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে।
এই বিরোধীশূন্য লুঠতন্ত্রের বিরুদ্ধে গ্রামীণ সমাজ ক্রমশ: ক্ষিপ্ত ও আন্দোলনমুখি হয়ে ওঠায় ১২ বছর একাধিপত্যে আসীন সরকার ও ক্ষমতাশালী দলপতিরা শঙ্কিত হয়ে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে 'দুয়ারে সরকার' কর্মসূচীকে নামিয়ে এনেছে রাজ্য সরকার, যা অধিকারের প্রশ্নটিকে মান্যতা না দিয়ে প্রকল্প সুবিধাগুলিকে সহজলভ্য করে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে । পাশাপাশি তৃণমূলের যুব নেতৃত্ব জনগনের অসন্তোষকে প্রশমিত করতে ও দুর্নীতিপরস্ত কর্মীবাহিনীকে আশ্বস্ত করতে 'নবজোয়ার' অভিযান সংঘটিত করেছে। এই কর্মসূচী তৃণমূলের সংগঠনের ভেতরে এক অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করেছে। সেইসঙ্গে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা বাড়িয়েছে, এমনকি মহিলারাও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কিছু অঞ্চলে রাজ্য শাসকদলের পক্ষে পূর্বকার সমর্থন আলগা হতে দেখা যাচ্ছে। বাংলার মানুষ আজ ক্রমশ:ই হতাশ ও আস্থাহীন হয়ে পড়ছে শাসকদল পরিচালিত পঞ্চায়েতগুলি সম্পর্কে। বিদ্রোহী অংশটিকে শায়েস্তা করতে মিথ্যা মামলা, পুলিশী সন্ত্রাস ইত্যাদি আজ শাসকের একমাত্র অস্ত্র। ২০২৩র দশম পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন পেশ ও প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের প্রথমপর্বে ইতিমধ্যেই দলীয় সন্ত্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন ৮জন। সন্ত্রাস একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠায় নির্বাচন সম্পন্ন না হ'তেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কিছু পঞ্চায়েত হাতে এসে গেছে শাসকদলের। এমনকি রাজ্য নির্বাচনী কমিশনারকে নিরপেক্ষতা বর্জন করে শাসকদলের প্রায় আজ্ঞাবহের ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছি।
তৃণমূল সরকারের এই নিবিড় দুর্নীতি ও উদগ্র অপশাসনের বিরুদ্ধে জনরোষকে কাজে লাগাতে তৎপরতা বাড়িয়েছে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি। দুর্নীতির অভিযোগকে ব্যবহার করে বিজেপি সরকার ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এই খাতে কেন্দ্রীয় বাজেট বরাদ্দ ৩৩% কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। দিনে দু'বার ডিজিটাল হাজিরা, আধার সংযোগ ইত্যাদি বিধিনিয়মের ফাঁদে ফেলে গ্রামীণ শ্রমিকদের বঞ্চনার এক পরিকল্পিত আইনী ব্যবস্থা তৈরী করা হয়েছে। ভোটপর্বে সন্ত্রাস, প্রাণহানির প্রেক্ষিতে শক্তিশালী বিরোধীপক্ষের প্রতিরোধ না থাকায় বিজেপির ক্রীড়নক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের আদালতি সিদ্ধান্ত জনমানসে একমাত্র প্রতিকার হিসাবে মান্যতা পেয়ে যাচ্ছে। বিগত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে কোচবিহারের শীতলকুচিতে পাঁচজন নিরীহ, দরিদ্র গ্রামবাসীর নির্মম হত্যালীলা আজ ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদিবাসী ও দলিত দরিদ্র অধ্যুষিত গ্রামবাংলায় তাদের শাখার সংখ্যাবৃদ্ধি করে আরএসএস একদিকে বিজেপির পক্ষে মান্যতা আদায়ে তৎপর, অন্যদিকে হিন্দুত্বের ভুয়ো মতাদর্শকে কাজে লাগিয়ে ধর্মীয় বিভাজন বাড়িয়ে দাঙ্গাসঙ্কুল অরাজক পরিস্থিতি তৈরী করতে সদা সচেষ্ট। রাজ্যে নবনিযুক্ত রাজ্যপালের মাধ্যমে কেন্দ্র- রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে ধ্বস্ত করতে রাজভবনে 'পীস রুম' সংরচনা ও নির্বাচনী ব্যবস্থাকে বাধাদান সমানে চলছে। রাজভবনের এই অতিসক্রিয়তা ২০২১র বিধানসভা নির্বাচনের পর তুলনামূলকভাবে দুর্বল বিজেপিকে অক্সিজেন যুগিয়ে চাঙ্গা করার অপচেষ্টা মাত্র। প্রতিপক্ষ হিসাবে তৃণমূল সরকারের অবিজেপি রাজ্যগুলি থেকে পুলিশ মোতায়েনের বাগাড়ম্বর কেন্দ্র-রাজ্যের শাসকদলের নিরন্তর কাজিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটদানের অধিকারকে প্রহসনে পরিণত করতে উদ্যত।
যুযুধান শাসকদলগুলি শুধুমাত্র পঞ্চায়েত স্তরে দুর্নীতির আখড়াগুলিকে বাঁচিয়ে রেখে ক্ষমতা দখলের লড়াই চালিয়ে যাবে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় জনগনের অধিকার ফিরিয়ে এনে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত জনগনের স্বশাসন ফেরানোর কোন দায় এদের নেই। বুভুক্ষা ও অধিকারচ্যূতির প্রসারিত মানচিত্র বদলাতে, জনগণের অসন্তোষকে জনবিদ্রোহে পাল্টে দিতে আজ তাই প্রকৃত বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ ও নির্ভয় প্রতিরোধ গড়ে তুলে জনগনের হাতে এক স্বচ্ছ, স্বাধীকারযুক্ত কার্যকরী পঞ্চায়েত ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিতে হবে। শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রচার শানানোর সাথে সাথে বৃহত্তর জনশত্রু বিজেপি-আরএসএসের গ্রামবাংলা দখলের সমস্ত অপকৌশলকে প্রতিহত করতে হবে।
এই লক্ষ্যে সিপিআই (এম এল) দলীয় মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থনে মাটি আঁকড়ে লড়াই করে তৃণমূল-বিজেপিকে পরাস্ত করে রাজনৈতিক মেরুকরণের মোড় ঘোরাতে সচেষ্ট থাকবে। আবারও একবার বাংলার যুব-ছাত্র ব্রিগেডকে শহর ছেড়ে গ্রামভিত্তিক প্রচারের মাধ্যমে সাম্য, স্বাধীনতা ও স্বাধীকারের উজ্জ্বল মতাদর্শের ব্যারিকেড গড়ার নিবিড় কাজে ব্রতী হতে হবে। যে সমস্ত কেন্দ্রে আমাদের প্রার্থী নেই সেখানে বাম গণতান্ত্রিক প্রার্থীদের পক্ষে আমাদের নি:শর্ত সমর্থন থাকবে।
আসুন আমরা এই অঙ্গীকার মুক্তকন্ঠে ঘোষনা করি, 'গ্রামবাংলার প্রতিটি পঞ্চায়েত বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিসরে জনতার হাতে ফিরিয়ে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবো'। কোন হুমকি, প্রতারণা, সন্ত্রাসের কাছে আমরা মাথা নোয়াবো না। ভুয়ো মতাদর্শ ও গদী মিডিয়ার মিথ্যা প্রচারকে খন্ডন করে আমরা কঠিন, সঙ্কটদীর্ণ পথে হেঁটে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলে বাংলার সংগ্রামী বামপন্থী ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবো।
আসুন আমরা দাবি জানাই, সন্ত্রাসমুুক্ত শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার দায় রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে একশ শতাংশ সুনিশ্চিত করতে হবে।
বাংলার গ্রামীন জনগনের প্রতি আমাদের আবেদন সন্ত্রাসকে সাহসী প্রত্যয়ে রুখে দিন, নির্ভয়ে নিজের ভোট নিজে দিন।
সিপিআই(এমএল) লিবারেশন
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি