29/04/2024
:অসমাপ্ত:
বাসে উঠলেই শরীর ঝিমিয়ে যায় ফারহাদের। তাই সে বুদ্ধি করে অনেক কটা চকলেট কিনে আনে রাকেশের দোকান থেকে।। ২১ বছর বয়সেও বাসে উঠলে শরীর খারাপ হয় এটা ভাবতে বা প্রকাশ করতে তার লজ্জা হয়। সাথে মা আছে। ফারহাদ বাঁশের মাঝের দিকে উইন্ডো সিটে বসে আছে। তার ঠোঁট নড়ছে হয়তো গান করছে। সে একটা পা তার অন্য পায়ের উপর তুলে মাথাটা শীটেরর নরম জায়গায় লাগিয়ে অর্ধ নিদ্রায় মগ্ন।।
তার যাত্রাপথ প্রায় ঘন্টা চারেকের। চোখের ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছে ফরহাদ। মা বলে উঠলো, " বাবা একটু ঘুমিয়ে নে।" সেই কথায় প্রায় পাত্তা না দিয়েই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো ফারহাদ। তার হয়েছে এক অদ্ভুত অস্বাভাবিক রোগ। বাম চোখটা মাঝে মাঝে জ্বালা করে। জন্ম থেকেই ফারহাদ এর বাম চোখ দিয়ে জল পড়ে না । গত চার মাস আগে তার দাদু মারা যায়, অনেক কেঁদেছে তবুও তার বা চোখটা অদ্ভুত ভাবে স্তব্ধ হয়েছিল এক ফোঁটা অশ্রু গড়ায়নি সেই চোখ দিয়ে।।
ফারহাদ এর চোখটা হয়তো লেগে এসেছিল তবে সে তার অর্ধেক বুঝে রাখা চোখে অপূর্ব এক দৃশ্য দেখল। বাস প্রায় ৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই একটা লাল গোলাপের বাগান। ফরহাদ অস্পষ্টভাবে দেখল একটা তরুণী দাঁড়িয়ে আছে গোলাপ বাগানের মাঝে। তরুণ টি হালকা ঝুঁকে হয়তোবা গোলাপের ঘ্রাণ নিচ্ছে। ফরহাদ অসস্তিবোধ করে ভালোভাবে মেয়েদের মুখটা দেখার চেষ্টা করল কিন্তু মেয়েটা ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির পরনে ছিল একটা নীল রঙের ঢিল ঢিলে চুড়িদার সাথে কালার ম্যাচিং একটা প্লাজো। চুল খোলা, বেশ লম্বা চুল। প্রায় কোমর পর্যন্ত তো হবেই। বাগান থেকে একটা গোলাপ তুলে কানে গুজেছে কতক্ষণ। হাতে সম্ভবত কাঁচের চুড়ি, তাতেই সৌন্দর্য বেড়েছে দ্বিগুণ। অনেক চেষ্টা করেও ফারহাদ মেয়েটির মুখটা দেখতে পেলোনা। কিন্তু এই মেয়েটা আছে তার পিছনের সিটে বসেছিল এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই ফারহাদের। ফরহাদ একটু কৌতুহল হয়ে পিছনে ঘুরে দেখল মেয়েটির ফোনটি রাখা ছিল সিটের উপর। ওকি ফোনটা নিয়ে দেখবে একবার?? না এটা বেয়াদবি হবে।।
এতক্ষণে ফারহাদ বুঝে গেল মেয়েটি তার ফোনটি ফেলে গেছে। বাস ছাড়লো, মেয়েটি এলো না ফোনটি নিতে। কৌতুহলী ফারহাদ ফোনটা হাতে নিয়ে ফোন আসার অপেক্ষা করতে লাগলো। ফোনটির লক স্ক্রিনের ওয়ালপেপার এ থাকা মেয়েটির ছবি দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেল। একজন মানুষ এতটা রূপবতী হতে পারে? এই কি সেই মেয়ে? না না প্রশ্নের সম্মুখীন হল ফরহাদ। এতক্ষণ পিছন থেকে দেখা মেয়েটিকে যেরকমটা কল্পনা করেছিল ফারহাদ তার পুরোটাই স্পষ্ট হলো তার কাছে। এদিকে মা বারবার ডেকে চলেছে, " ফারহাদ ফারহাদ, কিরে কি করছিস? কতক্ষণ দেখে যাচ্ছি!" বাড়ি থেকে বেদে আনা লুচি আর আলু ভাজা খেয়ে বাঁশের কন্ট্রাক্টর কে বলল, " দাদা একটু থামবেন? জল নিয়ে আসে।"
- "তাড়াতাড়ি আসবেন"
বাস থেকে নেমে একটা সরকারি সরাইখানা দেখলেও ফারহাদ এখান থেকেই এক বোতল জল নিয়ে হাঁটছে বাসের দিকে।। ঠিক তখনই মেয়েটির ফোনে একটা কল বেজে উঠলো।। তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করে কানে লাগাতেই ফরহাদ হারিয়ে গেল এক অপূর্ব স্নিগ্ধ কোমল কন্ঠে! বিপরীত দিক থেকে ভেসে আসছে মায়াতে পরিপূর্ণ উত্তেজিত কন্ঠ।
- "শুনতে পাচ্ছেন, হ্যালো, হ্যালো,, শুনতে পাচ্ছেন"
- হ্যাঁ বলুন বলুন।
- বলছি দাদা আমি আমার ফোনটা বাসে ফেলে চলে এসেছি। প্লিজ দাদা ফোনটা যদি দিয়ে যেতেন। সাহেবনগর মোড় থেকে ২০৭ নম্বর বাড়িটা আমার। প্লিজ দাদা দিয়ে যান।
- দেখুন এ মুহূর্তে আমি অনেক দূরে আছি, আচ্ছা আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন ফেরার পথে দিয়ে যাব।
- সত্যি আসবেন তো? নাকি সবার মত আপনিও কথা দিয়ে চলে যাবেন??
- আরে না না, আপনি কোন চিন্তা করবেন না।
- উফ! বাঁচালেন!
২১ বছরের জীবনে আজ প্রথম কোন মেয়ের সাথে এতক্ষণ কথা বলল ফারহাদ। ফরহাদের মনে সে মেয়েটিকে দেখার তীব্র একটা ইচ্ছা বাসা বাঁধলো। সে বাসে উঠে মাকে বলল -
- মা ফেরার সময় তুমি একাই চলে যেতে পারবে সাহেবনগর থেকে??
- কেন তুই কি করবি??
- হঠাৎ কাজ পড়ে গেল তুমি চলে যেও,চিন্তা করো না, আমি চলে আসবো।।
- আচ্ছা এখন চল আগে।
ডাক্তার ফারহাদের চোখ দেখে সেরকম কিছু না বুঝতে পেরে বলল " আচ্ছা কোনদিন চোখে কিছু পড়েছিল কি?"
- কি জানি অতটা তো মনে নেই!
- আচ্ছা দেখুন আপনার চোখে খুব একটা সমস্যা নেই বললেই চলে তবে রোদ্রে সানগ্লাস টা ব্যবহার করবেন।।
- আচ্ছা আচ্ছা।।
সবকিছুই কেমন রহস্য হয়ে থেকে গেল ফারহাদের মনে। শান্তি পাচ্ছে না সে, তার মাথায় শুধুমাত্র সেই মেয়েটি কথায় ঘুরছে সারাক্ষণ। মেয়েটির মুখ না দেখে কি তাহলে ফারহাদ মেয়েটির প্রেমে পড়লো? ফেরার পথে বাসে উঠলো না আর ফারহাদ। ট্রেনে করে বাড়ি যাবে, হয়তো একটু ঘুরতে হবে তবে সুবিধা।
তিরলডাঙ্গা থেকে ট্রেন ধরে সাহেবনগর পৌঁছাতে লাগল প্রায় তিন ঘন্টা। ফারহাদের মা চাকরি করে C.H.O POST এ। তাই কাজের সূত্রে হামেশাই আসতে হয় এদিকে। ফলে তার বাড়ি যেতে সমস্যা হলো না।। ফারহাদ ট্রেন থেকে নেমে ঘড়ি দেখল তখন সন্ধ্যা ছয়টা বেজে গেছে প্রায়। স্টেশনে ভিড় ভেঙে পাশের টোটোর লাইনের দিকে গেল সে। এখানে খোঁজ নিয়ে দেখল সাহেবনগর মোড় এখান থেকে প্রায় 5 কিলোমিটার। বলতে বলতেই হঠাৎ সে তরুণীর ফোনটি বেজে উঠলো।। ফোনটা রিসিভ করতেই তীব্র কোন্ঠে বিপরীত দিক থেকে আওয়াজ এল -
-দাদা কোথায় আপনি?
- সাহেবনগর স্টেশনে নামলাম।
ফারহাদ নিজের অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও মেয়েটিকে বলে উঠলো -" আচ্ছা লক স্ক্রিনের ওয়ালপেপারের ছবিটা কি আপনার?"
- হ্যাঁ আমারই। কিন্তু কেন বলুন তো??
- না না এমনি।
- আচ্ছা আপনি ওখান থেকে টোটো করে সাহেবনগর মোড় চলে আসেন। আমি দাঁড়িয়ে থাকছি।।
মেয়েটি ফোনটা কেটে দিলো। একটা অস্বাভাবিক খুশি ফারহাদকে চেপে ধরল। টোটো করে সাহেবনগর মোড়ে এসে অনেক লোকের ভিড়ে ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না কোথায় সেই তরুণী। একটা সাইকেল গ্যারেজে এসে কথা জিজ্ঞেস করল -" আচ্ছা দাদা ২০৭ নম্বর বাড়িতে কোন কোন দিকে বলতে পারবেন?"
লোকটির নির্দেশনা অনুযায়ী ফরহাদ হাঁটতে হাঁটতে দেখল একটা পুরনো ভিলা। দরজার উপরে পুরনো মার্বেলের পাথরে খোদাই করে লেখা আছে 'সরকার আবাস'। সে ওদিকে তাকিয়ে ছিল হঠাৎ একটা চেনা পরিচিত কন্ঠ ভেসে এলো যার কানে
- "চলে এসেছেন দাদা?, আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ জানাবো!"
ফারহাদ তার মস্তক ভাগ ঘোরাতেই অজানা এক চাহনির স্রোত তার ঠিক বুকের বাঁ দিক দিয়ে বয়ে গেল।। লক স্ক্রিনের ওয়ালপেপার এর ছবির চেয়েও যেন মায়াবী। ফরহাদ মেয়েটিকে তার ফোনটি ফেরত দিয়ে চলে যেতে লাগলো।
- চলে যাচ্ছেন যে, ভিতরে চলুন কিছু খেয়ে যাবেন।
ফারহাদ নির্বোধ বাচ্চার মত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।।
মেয়েটি ফারহাদকে নিজের ঘরে বসিয়ে নিজের হাতের চা বানিয়ে ফারহাদকে দিল।।
-আচ্ছা, মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতাম?
- আরে না না, বলুন না!
- আপনার নামটা বলা যেতে পারে?
- মধু ,, মধু আমার নাম,, মধু সরকার।।
ফারহাদ কি বলবে মেয়েটিকে তার ভারী পছন্দ? পরক্ষণে সে মনকে বুঝিয়ে মেয়েটিকে বলল - আচ্ছা আজ আমি উঠি??
- দাঁড়ান বাবা আসুক,, দেখা করে যাবেন!
- না পরে একদিন আসবো তখন দেখা করব
- আপনি কিন্তু আমার ভারী উপকার করলেন। আচ্ছা আপনার কন্টাক্ট নম্বর টা দিন পরে কথা হবে।।
ফারহাদ এক ঝলক খুশির ছটায় অন্ধ হয়ে গেল। নম্বরটা দিয়ে সে বেরিয়ে গেল।।
সে ঘটনার প্রায় ২৫ দিন হয়ে গেছে, হয়তো মধু দৈনন্দিন জীবনে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও ফারহাদের মনে সব সময় মেয়েটির কথাই ঘুরছে। সে অপেক্ষা করছে মেয়েটির কলের অথবা একটা টেক্সটের আশায়। আরো দিন পাঁচেক পর হঠাৎ একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন এলো ফরহাদের কাছে। ফোনটা রিসিভ করতেই রীতিমতো চমকে উঠল ফারহাদ। সেই চেনা কন্ঠ।
- হ্যালো ফারহাদ, একবার দেখা করতে পারবে?
-কোথায় আছেন আপনি?
- সামশের গঞ্জের পাশেই আছি।।
- আচ্ছা জায়গা টেক্সট করে দিয়ে টাইমটা লিখে দিবেন।
এরপরেও বেশ কয়েকবার দেখা করছে ওরা।। হয়তো মেয়েটিও ফারহাদকে মনে মনে অনেক পছন্দ করে।। তারা আস্তে আস্তে ভালো বন্ধুতে পরিণত হয়।। মাঝে মাঝে দেখা করতে যাই, প্রত্যেকদিন কথা হয় ফোনে।।
ঠিক টাইমে ফরহাদ বসে আছে মেয়েটির অপেক্ষায়।। টাইম পেরিয়ে দু'ঘণ্টা হয়ে গেল তবুও মধু আসছে না কেন? কলটাও রিসিভ করছে না। উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। রীতিমতো রেগে যায় ফরহাদ আবার ভয়ও হয়। কোন বিপদ হলো না তো? হাজার চিন্তা মাথায় রেখে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন না এলো ফরহাদ বাড়ি চলে আসে।। তারপরেও দুই তিন দিন কেটে যায় কোন খবর নেই মধুর। ফরহাদ খুব ভয় পেয়ে যায়, একটা অস্বস্তি জনক অনুভূতি কাজ করে তার মনে।। সে সিদ্ধান্ত নেই সাহেবনগর যাওয়ার।। এখনো সে বলতে পারেনি মধু কে, হয়তো সে বুঝে গেছে তার কথার মধ্যে দিয়ে, তার আচরণের মধ্যে দিয়ে। মধু হয়তো জানে ফরহাদ খুব মারাত্মক ভাবে আটকে পড়েছে তার অকৃত্রিম ভালোবাসায়। হয়তো মধুও খুব ভালোবাসে ফারহাদ কে। তবে কেউ কাউকে কোনদিন মুখ ফুটে বলেনি তাদের মনের কথা।। সে তার মনের মধ্যে চেপে রাখা সমস্ত অনুভূতি, ভালোবাসা, মায়া নিয়ে সাহেবনগরে পৌছলো। সাহেবনগর মোড়ে পৌঁছে ঠিক সাইকেল গ্যারেজের লোকটার পথ অনুসরণ করে 'সরকার আবাস' এ পৌঁছে দেখল বাড়ির দরজা খোলা। অনেক মানুষজন ডুকছে দরজা দিয়ে আবার অনেক জন বেরিয়েও যাচ্ছে। ফারহাদ তাড়াতাড়ি বাড়ির ভিতর ঢুকে দেখল পাশের বারান্দায় অনেক গরিব অসহায় মানুষ বসে খাচ্ছে। এক পাশে খাটের উপর বসে আছে এক বয়স পঞ্চাশের ব্যক্তি। সম্ভবত মধুর বাবা।। ফারহাদ সে ব্যক্তিকে বলল আচ্ছা আপনি মধুর বাবা?
- হ্যাঁ।
- আচ্ছা মধু কে দেখতে পাচ্ছি না, ডাকবেন একটু ??
কথাটা শুনে একটু ইতস্তুত বোধ করলেন তিনি,, তার চোখের কোনা দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক দু'ফোঁটা জল।
- কাকাবাবু আপনি কাঁদছেন কেন? কিছু কি হয়েছে?
অতঃপর একটা ঠান্ডা বাতাস ফারহাদের বুক ভেদ করে পার হয়ে গেল।
তার আর বুঝতে বাকি থাকলো না।
গত ১৬ তারিখ রাতে প্রচন্ড জ্বরে মধু হেরে গেছে তার জীবন যুদ্ধে। ফারহাদ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। এক অজানা দৃঢ় যন্ত্রণা তার বুকটাকে চিরে ফেলছে। মধুর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। ফারহাদ ফুপুরে কেঁদে উঠলো। তার বুক ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। অজানা এক যন্ত্রণাই। তার বাঁ চোখ দিয়ে গল গল করে জল গড়িয়ে তার বুকের জামাটা ভিজে যাচ্ছে রীতিমতো ।। এই প্রথমবার অজানা কারো জন্য ফারহাদ এর বাঁ চোখ খুলে গেল। তার বাচোখ দিয়ে ঝরে পড়ছে অজস্র কষ্ট আর যন্ত্রণা। ফারহাদ রীতিমতো কান্নায় ফেটে পড়েছে। অনেক স্বপ্ন দেখেছিল সে মধুকে নিয়ে। সবকিছু এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে সে কল্পনা করতে পারে নি। হয়তো এটাই ছিল তার ভাগ্যে। কিছু সময়ের জন্য ফরহাদ তার ভাগ্য কে বিশ্বাস করতে পারেনি।।।......🙃
Own creation(ashif)