23/12/2025
পথ চলার আনন্দ তখনই, যখন পথ হয় নিরাপদ।
হাওড়া জেলার আমতার কাছে ছোট্ট একটি গ্রাম—ফতেপুর। গাছগাছালি আর পানাপুকুরে ঘেরা এই গ্রামে বহু মানুষের বাস। কিন্তু যাতায়াতের জন্য আছে মাত্র একটি সরু মাটির রাস্তা। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে কখনো মোরাম, কখনো সিমেন্ট দিয়ে রাস্তাটি মেরামত করা হয় ঠিকই, কিন্তু বর্ষা এলেই সব ভেস্তে যায়। বৃষ্টির তোড়ে মোরাম সরে যায়, কংক্রিটে ফাটল ধরে, রাস্তা আরও বেহাল হয়ে পড়ে। তখন এই রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করা একেবারেই দুঃসহ হয়ে ওঠে।
এই অবস্থায় গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবন ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অসুস্থ মানুষ বা গর্ভবতী মহিলাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছনো হয়ে ওঠে বড় সমস্যা।
গ্রামের স্কুলছাত্রী মন্দিরা একদিন পাশের বাড়ির রণিতা বৌদিকে আক্ষেপ করে বলেছিল— “জান বৌদি, এই রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে আমার খুব ভয় করে। খানাখন্দে চাকা ঢুকে গেলে এই বুঝি সাইকেল উল্টে পাশের পুকুরটায় পড়ে যাই!”
আবার একদিন অন্য এক বাড়ির কাকিমা বাজার করে টোটোতে ফিরছিলেন। ভাঙা রাস্তায় পড়তেই টোটোটা এমনভাবে লাফাল যে বাজারের ব্যাগ উল্টে আটা ময়দা সব রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল। কাকিমা ভয় পেয়ে বলছিলেন— “এই রাস্তায় চলতে গিয়েই একদিন বড় দুর্ঘটনা ঘটবে!”
এই গ্রামেই বিয়ে হয়ে এসেছে রণিতা। সে এখন ছয় মাসের গর্ভবতী। সাধারণ গরিব ঘরের মেয়ে রণিতা চিকিৎসার জন্য পুরোপুরি নির্ভর করে সরকারি ব্যবস্থার উপর। মাসে এক-দু’বার তাকে আমতা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল-এ গিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয়।
রণিতার স্বামী সুনীলের একটি সেকেন্ড হ্যান্ড মোটরবাইক আছে। সেই বাইকেই রণিতাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় সে। কিন্তু ভাঙাচোরা রাস্তায় বাইকটা খুব লাফায়। রণিতার কষ্ট হয়, মাঝেমাঝেই পেটে ব্যথা শুরু হয়। ডাক্তার দিদিমণি স্পষ্ট করে বলেছেন—"এভাবে যাতায়াত করলে মা এবং গর্ভের সন্তানের জন্য ক্ষতিকারক।" কিন্তু উপায় কী!
রণিতা উচ্চমাধ্যমিক পাশ। স্কুলে পড়াশোনার সময় সে কন্যাশ্রী প্রকল্পের আওতায় পড়েছিল, বিয়ের সময় পেয়েছিল রূপশ্রী অনুদান। তাই সে সরকারি প্রকল্পগুলোর খোঁজখবরও কিছুটা রাখে। সে শুনেছে রাজ্য সরকারের পথশ্রী–রাস্তাশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ রাস্তা সংস্কার বা নির্মাণ আবার পুনঃনির্মাণ করা হয়।
একদিন সে সুনীলকে বলল— “তুমি তো পঞ্চায়েতে যাতায়াত করো। মেম্বারদের সঙ্গেও পরিচয় আছে। ওদের বলো না, পথশ্রীর মাধ্যমে আমাদের গ্রামের রাস্তাটা সারানোর ব্যবস্থা করতে। এই অবস্থায় বাইকে বসে যেতে আমার খুব কষ্ট হয়।”
সুনীল কথাটা মন দিয়ে শুনল। বলল— “তুমি ঠিকই বলেছ। এই রাস্তার জন্য আমার বাইকও বারবার খারাপ হয়, সারাই করতে অনেক খরচ পড়ে। কালই আমি অঞ্চল অফিসে গিয়ে প্রধান আর মেম্বারদের সঙ্গে কথা বলব। তবে তুমি একটা কাজ করো—গ্রামের লোকজনের হয়ে একটা আবেদনপত্র লিখে দাও। তুমি তো লেখাপড়া জানো।”
রণিতা উৎসাহভরে গোটাগোটা অক্ষরে আবেদনপত্র লিখল। নিজের সই করল। তারপর মন্দিরাকে ডেকে এনে তাকে দিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে সবার সই সংগ্রহ করল। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই সেই আবেদনপত্রে সই বা টিপছাপ দিল।
পরদিন সুনীল আবেদনপত্রটি উদং–১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে জমা দিল। পঞ্চায়েতের নির্মাণ সহায়ক আবেদনটি পড়ে জানালেন—এটা অনেক বড় কাজ। এত বড় রাস্তার কাজ পঞ্চায়েত একা করতে পারবে না। তুমি "সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী" তে ফোন করে সমস্যাটা জানাও আর এই আবেদনপত্রটি ওদের পাঠাও।
সুনীল তাই করল। কিছুদিনের মধ্যেই আমতা ১ন ব্লক থেকে ইঞ্জীনীয়ার সাহেব এসে রাস্তাটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জেলা পরিষদে পাঠালেন। সেখান থেকে তা জেলা পরিষদের মাধ্যমে WBSRDA-র কাছে পৌঁছল।
কয়েক দিনের মধ্যেই রাস্তা পুনর্নির্মাণের কাজের শিলান্যাস হল। স্থানীয় বিধায়ক মহাশয় এসে কাজের সূচনা করলেন। প্রায় দেড় মাসের মাথায় রাস্তার কাজ শেষ হল। পরে আবার বিধায়ক মহাশয় এসে নতুন রাস্তাটির শুভ উদ্বোধন করলেন।
এদিকে রণিতার প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে। এখন আর তার ভয় নেই। সে জানে, নতুন রাস্তা দিয়ে সরকারি মাতৃযান অ্যাম্বুলেন্স সহজেই তার বাড়িতে পৌঁছতে পারবে।
ক’দিন পর ঠিক তাই হল। প্রসব যন্ত্রণা শুরু হতেই গ্রামের মেয়েরা ফোন করল মাতৃযানে। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স এসে গেল। পনেরো মিনিটের মধ্যেই রণিতাকে আমতা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া হল।
সেদিন বিকেলেই সুনীল আর রণিতার কোল আলো করে এল এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান। রণিতা আদর করে মেয়ের নাম রাখল—প্রিয়াশ্রী।
অর্থাৎ—যে পথ চলার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পায়।
বাস্তবিকতা অবলম্বনে পথশ্রী সফলতার একটি গল্প
চিত্রঃ কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সৃষ্ট