04/02/2026
`বিবৃতি` | সিপিআই(এমএল) লিবারেশন | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
*আমেরিকা-ভারত বাণিজ্য চুক্তি: মোদী সরকার ট্রাম্পের 'মাগা' (MAGA) এজেন্ডার কাছে ভারতের জাতীয় স্বার্থ বন্ধক রেখেছে*
আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে তথাকথিত এই "বাণিজ্য চুক্তি" নিয়ে যে হইচই হচ্ছে, তা আসলে দেশের মানুষের সঙ্গে এক গভীর প্রতারণা। প্রথমে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় জানালেন, আর তারপর প্রধানমন্ত্রী মোদী 'X'-এ (টুইটার) আধখেঁচড়া তথ্য দিলেন। দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা এই বিষয়টি নিয়ে এমন লুকোছাপা আসলে মানুষকে ধোঁকা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
ট্রাম্প-মোদী বোঝাপড়ার আসল শর্তগুলো কী? প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতীয় পণ্যের ওপর ১৮% শুল্কের (ট্যারিফ) কথা ভাসা-ভাসা ভাবে বলছেন, কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন এর গোপন মূল্য ভারতকে কীভাবে চোকাতে হবে। ট্রাম্পের কথা অনুযায়ী, ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে হবে এবং তার বদলে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলা থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। উল্লেখ্য, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর দখলদারি কায়েম করতে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন যে ভারত আমেরিকান পণ্যের জন্য—যার মধ্যে কৃষিপণ্যও রয়েছে—নিজের বাজার সম্পূর্ণ খুলে দিতে রাজি হয়েছে, তাও আবার ‘শূন্য শুল্ক’ বা জিরো ট্যারিফে। আমেরিকার কৃষিসচিব ব্রুক রলিন্স প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি আমেরিকান কৃষকদের জন্য এক বিশাল জয়। এতেই স্পষ্ট, এই চুক্তিতে কাদের লাভ হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—মোদী সরকার কেন ট্রাম্পের ‘মাগা’ এজেন্ডার স্বার্থে ভারতের জাতীয় স্বার্থ, বিশেষ করে ভারতীয় কৃষকদের স্বার্থকে এভাবে জলাঞ্জলি দিল?
যদি আমেরিকার বিশাল ভর্তুকি পাওয়া ভুট্টা, ইথানল, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার অবাধে ভারতে ঢুকতে দেওয়া হয়, তবে তা ভারতীয় কৃষির ওপর ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলবে। এমনিতেই সারের দাম, সেচ ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং সরকারি সহায়তার অভাবে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি ধুঁকছেন; এই সিদ্ধান্ত তাঁদের আরও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যগুলিকে এই তথাকথিত পারস্পরিক শুল্ক ছাড়ের বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ভারতীয় রপ্তানিকারকদের এই ক্ষেত্রগুলোতে সেই চড়া শুল্কই দিতে হবে। ট্রাম্পের এই আগ্রাসী শুল্ক নীতির আগে আমেরিকায় গড় শুল্ক ছিল মাত্র ২.৫%, যা পরে বেড়ে ৫০% পর্যন্ত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ১৮% শুল্কের এই "চুক্তি" ভারতের জন্য কোনোভাবেই লাভজনক নয়। এটি একটি খারাপ চুক্তি, যেখানে ভারত যা পেয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হারিয়েছে।
অশুল্ক বাধা (non-tariff barriers) শূন্যে নামিয়ে আনার যে খবর শোনা যাচ্ছে, তার ফলাফল আরও ভয়ানক হতে পারে। এটা কার্যকর হলে ভারতের ছোট উৎপাদনকারী, এমএসএমই (MSME) এবং লক্ষ লক্ষ চাকরির বলিদান দেওয়া হবে। এর ফলে আমেরিকার কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্পের পণ্যে ভারতের বাজার ছেয়ে যাবে এবং আমাদের দেশীয় উৎপাদকদের আমেরিকার বিশাল ভর্তুকিপ্রাপ্ত দুগ্ধ, শস্য, মাংস ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সঙ্গে এক অসম ও নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করা হবে।
মোদী সরকার যাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে, বাস্তবে তা গ্রামীণ ভারতের ওপর—যেখানে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ বাস করেন—চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। এমএসএমইগুলোকে আমেরিকার বিশাল কর্পোরেশনগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে বাধ্য করা হবে, যা আদতে মোদীর "মেক ইন ইন্ডিয়া" স্লোগানের ওপরই কুঠারাঘাত।
এই চুক্তি আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে ভারতের মাথানত করারই ইঙ্গিত দেয়। গত এক বছরে ভারতের তেল আমদানিতে আমেরিকার অংশ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, আমেরিকার নির্দেশে ভারত রাশিয়া বা ইরান থেকে তেল কেনা বন্ধ করবে অথবা ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে। ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনা বা অন্য দেশ থেকে না কেনা—এটা সম্পূর্ণ দুটি সার্বভৌম দেশের দ্বিপাক্ষিক বিষয়, এটি ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মার্কিন সরকারের মর্জির ওপর নির্ভর করতে পারে না।
সরকারকে অবিলম্বে এই চুক্তির এবং প্রস্তাবিত ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাণিজ্য চুক্তির সমস্ত খুঁটিনাটি জনগণের সামনে পেশ করতে হবে যাতে এর ওপর পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ও গণতান্ত্রিক যাচাই করা যায়। ভারতীয় কৃষক, শ্রমজীবী জনতা এবং দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে।
— কেন্দ্রীয় কমিটি, *সিপিআই(এমএল) লিবারেশন*