22/01/2022
" ...মেয়েদের স্কুল ডুমুরের ফুল
সে ফুলের টানে বাতাস আকুল… "
ফাতিমা শেখ, সাবিত্রীবাই ফুলে থেকে বেগম রোকেয়া ও কত নাম না জানা মেয়েরা শিক্ষার অধিকারের জন্য ধর্ম, পিতৃতন্ত্র ও জাতের বৈষম্যর তোলা প্রাচীরে বারবার বিরুদ্ধতার আঘাত হেনেছেন । আজ ঘরে ও বাইরের যাবতীয় শিকল ভেঙ্গে, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য সত্ত্বেও মেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে আসলেও শিক্ষাক্ষেত্রে হামেশাই হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন ও জাতের বৈষম্যর শিকার হন । এমনই একটি ঘটনায় কর্নাটকের উদুপি জেলার একটি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজে ক্লাস ইলেভেন ও টুয়েলভ এর বিজ্ঞান ও বাণিজ্য শাখার 6 ছাত্রীকে হিজাব পড়ার জন্য গত 31 শে ডিসেম্বর থেকে নিজেদের ক্লাসে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না । তারা রোজ ক্লাস করতে গেলেও তাদেরকে অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে চলেছে । দেশের অনেকেই তাদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চারও হয়েছেন বটে কিন্তু অনেকেই হিজাব পোশাকের বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষের আপত্তিকে সাধুবাদ জানিয়ে নারী স্বাধীনতার কথাও বলেছেন। কিন্তু যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, রাষ্ট্র ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের বাধ্য হতে শেখায়, পোশাকের মাধ্যমে তাকে, তার যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সেই সমাজই যদি 'নারী স্বাধীনতার' কথা বলে নির্দিষ্ট একটি পোশাকের জন্য তাকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সেই পদক্ষেপ আর যাই হোক কখনোই নারী মুক্তির লক্ষ্যে হতে পারে না । যে সমাজ এখনো মেয়েদের বিরুদ্ধে যৌন হিংসা মূলক ঘটনার ব্যাখ্যা দেয় একটি মেয়ের পোশাকের দৈর্ঘ্য মেপে , তারাই তার পোশাকের শর্ত তৈরি করে নারী মুক্তির পথ দেখাবে সেটা ভাবাটাই অমূলক ।
6 ছাত্রীর একজন একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে গেলে এক শিক্ষক তাকে বেরিয়ে যেতে বলেন তা না হলে তিনি জানান তাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া হবে । এই ঘটনা দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বাড়তে থাকা ঘৃণার রাজনীতির অংশ ছাড়া যে আর কিছুই নয় তা বলতে বাকি রাখে না । আর যে বিজেপি সরকার মুসলিম পরিবারের রক্ষণশীলতার প্রতি প্রশ্ন তুলছে, সেই সরকাররের ঘৃণ্য রাজনীতিই মুসলিম মেয়েদের অধিকার, স্বনির্ভরতার দাবি ও রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধকে ভয় পেয়ে তাদের পথ অবরুদ্ধ করে দাঁড়াতে চাইছে।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, ফ্রান্সের সমুদ্র সৈকতে মুসলিম মহিলাদের জোর করে তাদের পোশাক পরিত্যাগ করতে বাধ্য করলে লেখিকা অরুন্ধতী রায় সে ঘটনার প্রতি প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছিলেন : "It's not about the burqa. It's about the coercion. Coercing a woman out of a burqa is as bad as coercing her into one. "
6 জন ছাত্রী ও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন । বারংবার প্রশাসন ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কোনো কাজ হয়নি । আজ নিও -নিব্যারাল অর্থনীতির চোখধাঁধানো প্রচার এর যুগে যখন শিক্ষাও একটি পণ্য হয়ে উঠেছে, নারী স্বাধীনতাকে যখন পুঁজিবাদিরা নিজেদের পোশাক, ব্যাগ, ঘড়ি বিপণনের জন্য নিজেদের মতো সংজ্ঞয়িত ও শর্ত তৈরী করে চলেছে, তখন শিক্ষার অধিকারের দাবিতে এই লড়াইয়ের পাশে থাকা আমাদের কর্তব্য , এবং নারী মুক্তির প্রশ্নের মৌলিক দিক গুলি মনে করিয়ে দেওয়া অবশ্যই জরুরি । পারিবারিক কাঠামো ও সমাজের জাত- ধর্ম ও পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যর বিরুদ্ধে এতদিনকার মেয়েদের সংগ্রাম, হাজারো মেয়েদের সঠিক শ্রম ঘন্টার দাবিতে, সঠিক বেতনের দাবিতে, যৌন হেনস্থা মুক্ত কর্মক্ষেত্রের দাবিতে ও শ্রেণি শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের স্পৃহা, সমগ্র সমাজের সাথে নারী মুক্তির লড়াই কে যে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং যাবে তা আমরা যেন ভুলতে না বসি ।
এই সময়ে কর্ণাটকের এই ছাত্রীদের নিজেদের শিক্ষার দাবিতে ও সমাজের ধর্মান্ধ ও বিভেদকামী রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশে সমাজের সর্বস্তরের মুক্তিকামী মানুষের থাকাটা অবশ্যই জরুরি ।