08/08/2021
গতকাল কালবৈশাখীর পর শান্তিনিকেতনে বিকেলের গরম আজ অনেকটাই কম। অতিথিশালার দোতলার তিনটি ঘরের মাঝখানের ঘরটিতে ফরাসে বসে নীচু টেবিলে কবি প্রতিমা দেবীর খাতায় বাংলা বানান সংশোধন করে দিতে দিতে ণত্ব বিধান আর ষত্ব বিধান প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
কয়েক মাস হল রথীন্দ্র-প্রতিমার বিয়ে হয়েছে। ওরা দুজনেই এখন শান্তিনিকেতনে আছেন। কবি তাঁর একমাত্র বউমার রূপে ও স্বভাবে খুবই খুশি, শুধু একটাই চিন্তা, রথীন্দ্র ও ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত শিক্ষায় তাকে শিক্ষিত করে তোলা। ঠাকুরবাড়িতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পরিবারে মেয়েরা যেমন শিক্ষিত হয়ে উঠত, গিরিন্দ্রনাথের পরিবারে তেমনটি ছিল না, মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে বালিকা বয়েসে বিয়ে দেওয়া হত। প্রতিমা মামাবাড়িতে মানুষ হওয়ায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ওইরকমই ছিল। অজিতকুমার আর হেমলতার ওপর বউমার ইংরেজি ও বাংলা শিক্ষার ভার দিয়েছেন কবি, নিজেও প্রতিদিন শত ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু সময় তাঁকে পড়ান।
কবি খাতাটি ফেরত দিয়ে বলেন, এ কদিনেই তোমার লেখাপড়ার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে, হাতের লেখাটিও ভালো হয়ে উঠেছে, তবে আরও লেখা অভ্যাস করতে হবে।
প্রতিমার মুখে সলজ্জ হাসি।
বউমা, একটা কথা-- রথী আর তুমি, তোমাদের দু-জনের মধ্যেই অনেক ভালো জিনিস আছে, সে-সব সম্পূর্ণ বিকশিত করে তোলার দায়িত্ব তোমাদের দুজনেরই, রথীর কি সেদিকে মন আছে? তুমি নিঃসংকোচে বলতে পার।
প্রতিমা ঘাড় নেড়ে জানান, আছে।
যাক, শুনে ভালো লাগল। আমার চোখে কি আর সব ধরা পড়ে? এই সময়টাই পরস্পরকে চিনেজেনে মহৎ জীবন গড়ে তোলার উপযুক্ত সময়, এরপর সংসারের দায়দায়িত্ব আরও বাড়বে, সুতরাং এখনই সেই তপস্যার সময়।
চেষ্টা করব আমরা, আপনার আশীর্বাদই আমাদের সহায়, প্রতিমা শান্ত মৃদু স্বরে বলেন।
তুমি যদি বলতেও যে রথীর সেদিকে মন নেই, তাতেও বা কী করার ছিল আমার? করতে চেষ্টা করাও উচিত হবে না, কেননা স্বাতন্ত্র্য সকলেরই আছে--নিজের সংসারের সমস্যা অন্য কেউ পূরণ করে দিতে পারে না। আমাদের ঠাকুর পরিবারের মেয়েমহলে সকলেই যে প্রকৃত সংস্কৃতিমান বা পরিশীলিত রুচির তা নয়, তার কিছু পরিচয় হয়তো বা ইতোমধ্যেই পেয়েছ! ক্রমে আরও পাবে। তোমাদের বিয়ে নিয়ে, বিধবাবিবাহ নিয়ে, নানা কথা আড়ালে শুনতে পাচ্ছ হয়তো, ও সবে কান দিয়ো না।
প্রতিমা এবার ঘাড় তুলে বলেন, বাবামশাই, আপনার আশীর্বাদ যখন আমাদের সঙ্গে আছে,কোনো নিন্দাকেই ডরাই না আমি।
কবি কিছুক্ষণ চুপ, ফের বলেন, তোমার ছিল সনাতন হিন্দুর আচার-অভ্যাস, এখানে ব্রাহ্ম আচার-অনুষ্ঠানে প্রথমে অসুবিধা হলেও,ধীরে ধীরে দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।এ বাড়িতে আসতেই জ্যাঠাইমা আদর করে মধু মুখে দিয়ে লোহা পরিয়ে ঠাকুর দালানে নিয়ে গিয়েছিলেন,আমাদের আশীর্বাদ করে আপনার দুই পাশে পাতা দুটি আসনে আমরা বসলুম।আপনি 'পিতা নোহসি' মন্ত্রপাঠের পর যে উপদেশ দিয়েছিলেন,তা আমি সারাজীবন মাথায় করে রাখব।
কী বলেছিলুম, মনে রেখেছ তুমি? কবির স্বরে একটু বিস্ময়ের সুর।
প্রতিমা ঘাড় হেলিয়ে বলেন, হ্যাঁ, মনের মধ্যে গেঁথে আছে।
কী বলেছিলুম?
প্রতিমা কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজে থাকেন,ফের চোখ খুলে বলেন,আপনি বলেছিলেন,তোমরা দুজনে যে নতুন জীবনের মধ্যে প্রবেশ করছ,তার গভীরতা বিস্তীর্ণতা যেন তোমরা অনুভব কর।গৃহ যেন কেবল তোমাদের আরামে বিলাসিতায় আবদ্ধ না হয়, যেন তার দ্বার সকলের মঙ্গলার্থে খোলা থাকে।
কবির চোখেমুখে যুগপৎ আনন্দ-বিস্ময়ের ছায়া, হাত দুটো উঠে আসতেই, প্রতিমা এগিয়ে এসে প্রণাম করেন, কবি মাথায় হাত রেখে বলেন, কল্যাণ হোক, সংসার মাঝে আপনাতে আপনি বিরাজ!
বাবামশাই, আজ তাহলে--
হ্যাঁ, এসো। আমিও একটু ছাতিমতলায় গিয়ে বসি।
দোতলা থেকে নেমে কবি ধীর পায়ে এগিয়ে যান বাঁধানো ছাতিমতলার দিকে। বাড়ির উত্তরে লাল কাঁকরের পথের দু-দিকে দু-সারি আমলকি গাছ, আমলকি বীথি শেষ হতেই কপাটহীন ফটক।এরই পুব দিকে উপাসনা মন্দির, তার শ্বেতপাথরের মেঝে, টালির ছাদ, লোহার ফ্রেমে নানা রঙের কাচের চৌকো দেওয়াল, চারপাশে টগর-কৃষ্ণচূড়ার গাছ।
পশ্চিমমুখী ছাতিমতলার বেদি, শ্বেতপাথরে বাঁধানো, কবি পা ঝুলিয়ে বসলেন। মন আজ খুশিতে পূর্ণ, বউমাটি যেমন রূপসি তেমনই মিষ্টি স্বভাব এবং বুদ্ধিমতীও। মুখে সর্বদাই একটা শান্ত ধীর সুপ্রসন্নভাব লেগে রয়েছে, যে কেউই তাকে দেখে আকৃষ্ট হবে।
শুধু ছুটি দেখে যেতে পারল না তার বউমাকে, তারই তো পছন্দ ছিল, তখন প্রতিমা তো শিশু।
বিকেল ফুরিয়ে আসছে। গরমের ছুটিতে বিদ্যালয় এখন ফাঁকা, কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক আছেন।নিরিবিলি শান্ত পরিবেশ।এক ঝলক বাতাসের সঙ্গে একটি কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাপড়ি উড়ে এল, কবি দেখলেন পাপড়ি নয়, যেন ছুটি এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর সামনে।
ছুটি! তোমার বউমাকে সকলের ভালো লেগেছে!
আমি জানতাম, এমনই হওয়ার কথা।
আমি এখন নিশ্চিন্তে ওর হাতে সংসারের ভার ছেড়ে দিতে পারি।
হ্যাঁ।
যেমন রূপ,তেমন শান্ত মিষ্টি স্বভাব। বিয়ের দিন সবাই বলছিল, ও-রূপের ছটায় বেলাও নিষ্প্রভ হয়ে গেছে।
যাক, সুখে থাক, ভালো হোক।
জানো, ওকে আমি সংসার খরচের জন্য বিয়ের পর থেকে প্রতি মাসে পঞ্চাশ টাকা করে দিচ্ছি।
দেবেই তো, একমাত্র বউমা, দেওয়াই তো উচিত।
কবি কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঘোর ভাঙে দাদা দ্বিজেন্দ্রর ডাকে, রবি, রবি--
..........
সুকান্তি দত্তের
"দুঃখরাতের আনন্দগাথা" থেকে কয়েক পৃষ্ঠা।
২২ শ্রাবণ, ১৪২৮
#অভিযানের_বই