12/01/2026
শিরোনাম: রাজনীতির স্বামীজি বনাম আসল বিবেকানন্দ: জন্মদিনে এক গভীর অনুসন্ধান:
আজ স্বামী বিবেকানন্দের জন্মতিথি। প্রতি বছর এই দিনটি আসে, আর আমরা দেখি ওনাকে নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের টানাটানি। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ওনাকে যেভাবে উগ্র হিন্দুত্ববাদের একজন 'আইকন' বা প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়, তা আমাকে ভীষণ ভাবায়।
একজন বাঙালি হিসেবে, একজন গর্বিত হিন্দু হিসেবে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল—যে মানুষটি শিকাগোর মঞ্চে দাঁড়িয়ে হিন্দু ধর্মকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়েছিলেন, তার দর্শন কি সত্যিই আজকের এই বিভাজনের রাজনীতির সাথে মেলে? নাকি ওনাকে আমরা ভুল বুঝছি?
আজকের দিনটা আমি একটু অন্যভাবে কাটাতে চেয়েছিলাম। হুজুগে না মেতে, আমি চেষ্টা করেছি ওনার নিজের লেখা, চিঠি এবং বক্তৃতাগুলোর গভীরে গিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার। আমার এই ক্ষুদ্র গবেষণায় যা উঠে এলো, তা তথ্য-প্রমাণ সহ আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। কারণ, সত্যটা জানা আমাদের সবার খুব প্রয়োজন।
আমি প্রশ্ন-উত্তরের আকারে বিষয়গুলো সাজিয়েছি।
👇👇👇
প্রশ্ন ১: স্বামীজি যে হিন্দু ধর্মের কথা বলতেন, আর আজকের রাজনৈতিক 'উগ্র হিন্দুত্ব'—এই দুটো কি এক?
আমার উত্তর: একদমই না। আকাশ-পাতাল তফাত। স্বামীজি নিজেকে গর্বিত হিন্দু বলতেন ঠিকই, কিন্তু তার হিন্দুত্বের ভিত্তি ছিল 'বেদান্ত' বা সার্বজনীনতা। আজকের রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ যেখানে 'অপর'কে (ভিন্ন ধর্মাবলম্বী) শত্রু মনে করে বা বর্জন করতে চায়, স্বামীজি সেখানে সবাইকে আপন করে নেওয়ার কথা বলতেন।
🔹 প্রমাণ: ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্মমহাসভায় তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, "আমরা যে কেবল সব ধর্মকে সহ্য করি তাই নয়, আমরা সব ধর্মকে সত্য বলে বিশ্বাস করি।"
তিনি আরও বলেছিলেন, "বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।" আজকের উগ্রতা বা বিভাজনের রাজনীতির সাথে এই বচনের কোনো মিল আছে কি?
প্রশ্ন ২: আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ভিন্ন ধর্ম, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের প্রতি ওনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল?
আমার উত্তর: এটা আজকের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। আজকের অনেক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যেখানে ইসলাম বা মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব পোষণ করে, স্বামীজি সেখানে ভারতের অগ্রগতির জন্য হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের মিলনকে অপরিহার্য মনে করতেন।
🔹 প্রমাণ: ১৮৯৮ সালে মোহাম্মাদ সরফরাজ হোসেনকে লেখা একটি চিঠিতে স্বামীজি স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন:
"আমাদের এই মাতৃভূমির পক্ষে হিন্দু ও ইসলাম—এই দুই মহান মতের সমন্বয়ই একমাত্র আশা।... আমি মানসচক্ষে দেখছি, ভবিষ্যৎ ভারত এই বিশৃঙ্খলা ও দ্বন্দ্বের ভেতর থেকে খাড়া হয়ে উঠছে—তার দেহতন্ত্রটি হবে ইসলামের, আর হৃদয়টি হবে বেদান্তের (Vedanta brain and Islam body)।"
তিনি মনে করতেন ইসলামের সাম্য এবং হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক গভীরতা—এই দুইয়ের মিলনই ভারতকে পথ দেখাবে। এটা কোনোভাবেই অন্য ধর্মকে দমিয়ে রাখার দর্শন নয়।
প্রশ্ন ৩: আজকের গোরক্ষা আন্দোলনের মতো বিষয়গুলোতে, যা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির হাতিয়ার, সেখানে ওনার অবস্থান কী ছিল?
আমার উত্তর: তিনি মানুষের সেবাকে পশুর সেবার উপরে রাখতেন। উগ্রতা তো দূরের কথা, তিনি এই ধরণের ভণ্ডামির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
🔹 প্রমাণ: একবার দুর্ভিক্ষের সময় এক গো-রক্ষা প্রচারক স্বামীজির কাছে চাঁদা চাইতে আসেন। স্বামীজি তাকে বলেন যে, মানুষ না খেয়ে মরছে, তাই তার কাছে যা অর্থ আসবে তা তিনি মানুষের সেবায় খরচ করবেন। প্রচারকটি যখন বলেন যে, গরুরা আমাদের মা, তাই তাদের রক্ষা করা উচিত। তখন স্বামীজি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, "গরুরা যে আপনাদের মা, তা আপনাদের দেখলেই বোঝা যায়, নইলে এমন সুসন্তান আর কে প্রসব করবে?"
স্বামীজি নিজেও শিবজ্ঞানে সব জীবের কথা বলতেন কিন্তু, যে ধর্ম মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারে না, অথচ একটি নির্দিষ্ট পশুকে নিয়ে ধর্মীয় মাতামাতি করে । সে ধর্মে তিনি বিশ্বাস করেন না। তার কাছে সেটি ছিল ভন্ডামি।
প্রশ্ন ৪: তিনি কি ভারতকে একটা সংকীর্ণ 'হিন্দু রাষ্ট্র' হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন?
আমার উত্তর: তিনি ভারতকে বিশ্বের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো গোঁড়া রাজনৈতিক ধর্মরাষ্ট্র (Theocratic State) হিসেবে নয়। তার কাছে 'ভারত'-এর অর্থ ছিল ভারতের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ—চাষা, মুচি, মেথর।
🔹 প্রমাণ: তিনি তৎকালীন হিন্দু সমাজের গোঁড়ামি ও জাতপাতের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, "আমাদের ধর্ম এখন ভাতের হাড়িতে আর ছোঁয়াছুঁড়িতে সীমাবদ্ধ। 'আমায় ছুঁঁয়ো না'—এটাই এখন আমাদের ধর্ম।" তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ভারত যেখানে জাতপাতের ভেদাভেদ থাকবে না, যা আজকের অনেক রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেন না।
🔴 সিদ্ধান্ত:
আমার সীমিত সাধ্যের এই অন্বেষণের পর আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি—স্বামী বিবেকানন্দ নিঃসন্দেহে হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু তার সেই জাগরণ ছিল আত্মশক্তির জাগরণ, অন্যকে ঘৃণা করার শিক্ষা নয়। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক হিন্দু ধর্ম যা সমুদ্রের মতো বিশাল—যেখানে সব নদী এসে মিশতে পারে।
আজ যারা তাকে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বা 'আইকন' হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তারা স্বামীজির শিক্ষার খণ্ডিত অংশই ব্যবহার করেন।
আসুন, আজকের এই পবিত্র দিনে আমরা প্রতিজ্ঞা করি:
আমরা ওনার ছবি বা মূর্তিতে মালা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করব না। ওনার আসল শিক্ষা—"জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর" এবং "দরিদ্রনারায়ণ সেবা"-র মন্ত্রকে বুকে ধারণ করব।
বিভাজন নয়, উগ্রতা নয়—আসুন ভালোবাসার ভিত্তিতে, ত্যাগের ভিত্তিতে এক শান্ত ও সমৃদ্ধ ভারত গড়ে তুলি। ওনার সেই অমোঘ ডাক—"মানুষ হও" (Be and Make)—যেন আমরা ভুলে না যাই।
সবাইকে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মজয়ন্তীর শুভেচ্ছা। 🙏🇮🇳
বিঃ দ্রঃ - এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের ব্যক্তিগত ক্ষমতায় প্রদত্ত এবং শিক্ষামূলক চিন্তাভাবনার উদ্দেশ্যে উপস্থাপিত। এগুলি প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে অপরিহার্যভাবে প্রতিফলিত করে না।
আমাদের সংস্থার অন্যতম মূল লক্ষ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক যেকোনো বিষয়ে মুক্ত চিন্তা ও মতামত বিনিময়ের মাধ্যমে সুস্থ আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হওয়া। ভিন্ন মতামত ও দর্শন স্বাগত 🙏
পোস্টের লেখক: Arpan Sinha