18/08/2023
⚪বেশির ভাগ নয়, বেশিভাগ⚪
বেশির ভাগ মানুষ মনে করেন দেশ ভুল পথে এগুচ্ছে। আজকাল বেশির ভাগ সময় তিনি বই পড়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন। টেকনাফে বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। অর্থসঙ্কটে বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ স্থবির। দেশের বেশির ভাগ উলামা দেওবন্দপন্থী। বেশির ভাগ আধুনিক কবিতা অক্ষরবৃত্তে রচিত। আত্রাই নদীতে বছরের বেশির ভাগ সময় পানি থাকে না। বেশির ভাগ বেশির ভাগ বেশির ভাগ। সবাইকে লিখতে দেখি, সর্বত্র। কিন্তু আমি তা লিখি না। আমি লিখি "বেশিভাগ"। কারণ "বেশির ভাগ" শব্দবন্ধটা সুন্দর নয়, সম্ভবত শুদ্ধও নয়।
"বেশির ভাগ" শব্দটা—শব্দই বলা যাক—পুরনো বাঙলায় ছিল না। ছিল "অধিকাংশ"। সেই "অধিকাংশ" থেকে, শব্দটাকে ভেঙে অর্থ বের করে, বানানো হয়েছে "বেশির ভাগ"। কেননা অধিক মানে বেশি, অংশ মানে ভাগ। তাই "অধিকাংশ" মানে "অধিক অংশ", "অর্ধেকের বেশি" কিংবা "দুই বা ততোধিক অংশসমূহের মধ্য থেকে অধিক"। একইভাবে "বেশির ভাগ" বললেও আমরা বুঝি "বড় ভাগ" বা "অর্ধেকের বেশি"। ইংরেজিতে "মোস্ট" বা "গ্রেটার পার্ট অব"। কিন্তু "অধিক" এবং "অংশ" যেমন শুদ্ধভাবে সন্ধির মাধ্যমে একত্র হয়েছে, "বেশির ভাগ" শব্দটা সেভাবে গঠিত হয় নি। শেষোক্ত শব্দের গঠনে সমস্যা আছে।
“বেশির ভাগ” মানে ‘বেশি-এর ভাগ’। অর্থাৎ শব্দবন্ধটি ভেঙে আমরা পাই তিনটে শব্দ—“বেশি”, “এর” এবং “ভাগ”। দু’ প্রান্তের দু’টি বিশেষ্যের মাঝখানে বসেছে “এর” বিভক্তি। বসে, বিশেষ্য দু’টোকে দিয়েছে জুড়ে। সমস্যা হল, ‘বেশি’ বা ‘কম’ শব্দ দু’টোর সঙ্গে আমরা সাধারণত ‘এর’ বিভক্তি যোগ করি না। কারণ এক, তার দরকার পড়ে না; দুই, যোগ করলেও ‘এর’ শব্দটি বাড়তি কোনো অর্থ যোগায় না। এজন্যেই ‘বেশির ভাগ’ ছাড়া আর কোথাও ‘বেশির’ শব্দ আমরা দেখি না। ‘কমের’ শব্দও চোখে পড়ে না—‘বন্যার পানি কমের দিকে’ না লিখে, লেখা হয় ‘বন্যার পানি কমতির দিকে’, ‘পানি কমছে’, ‘পানি নেমে যাচ্ছে’।
প্রথমত, আসুন ভেবে দেখি, ‘বেশি-এর ভাগ’ শব্দবন্ধে ‘এর’ কি জরুরি? ‘যে-ভাগটা বেশি’ বোঝাতে ‘এর’ কেন লাগবে? কোনোকিছু বেশি বা কম হতে পারে। বেশি-এর ভাগ বা কম-এর ভাগ বলে ভাগাভাগি করলে অর্থে অনর্থক গোল বাঁধে, শব্দে অহেতুক বিভক্তিযোগের ভুল ঘটে। এই যে ‘এর’ বা ‘র’, ব্যাকরণে এর নাম ষষ্ঠী বিভক্তি। দৈনন্দিন জীবনে বেশুমার শব্দে এটা আমরা লাগাই। দরকারে লাগাই। গাছের আম, মাছের পোনা, ফুলের গন্ধ, চিলের ডানা, বিলের কৈ, ধানের খেত, ঘোড়ার দৌড়, মামার বাড়ি, নদীর জল—অজস্র শব্দে। ‘এর’ খুব দরকার এসবে। ‘বেশির ভাগ’-এ সেই দরকারটা ধরা পড়ে না। ‘বেশিভাগ’ বললেই কাজ চলে।
তবু যদি আপনার মনে হয় ‘এর’ যোগ করে ‘বেশির ভাগ’ বলার দরকার আছে, তাহলে ‘বেশিভাগ’-এ আপনাকে রাজি করাবার দ্বিতীয় যুক্তি হল সমাস। ‘অধিক অংশ’ যেমন সন্ধি মেনে একশব্দে হয়েছে ‘অধিকাংশ’, তেমনি আমরা ‘বেশির ভাগ’-কে সমাসের সাহায্যে একসঙ্গে জুড়ে বলতে পারি ‘বেশিভাগ’। এটা শুদ্ধ। সমাসের নিয়মে সহজেই ‘এর/র’ ফেলে দিয়ে দু’টো শব্দকে এক করা যাচ্ছে। এর নাম ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। যেখানে দুই শব্দকে এক করা সম্ভব ও শুদ্ধ, সেখানে হরহামেশা আমরা তা করি। ‘ধানের খেত’ না-বলে বলি ‘ধানখেত’, ‘পুকুরের ঘাট’-কে বলি ‘পুকুরঘাট’, ‘শ্বশুরের বাড়ি’-কে ‘শ্বশুরবাড়ি’। তেমনি মামার বাড়ি>মামাবাড়ি, ঘোড়ার দৌড়>ঘোড়দৌড়, নদীর জল>নদীজল, রাজার পুত্র>রাজপুত্র, বাঁদরের নাচ>বাঁদরনাচ, চায়ের বাগান>চাবাগান, খেয়ার ঘাট>খেয়াঘাট, বটের তলা>বটতলা, তালের গাছ>তালগাছ, হাতের ঘড়ি>হাতঘড়ি, ফুলের বাগান>ফুলবাগান, মৌলভীর বাজার>মৌলভীবাজার; একইভাবে বেশির ভাগ>বেশিভাগ।
কাজেই আজ থেকে ‘বেশিভাগ’ই সই। এক শব্দে যেখানে কাজ চলে এবং তা শুদ্ধও, সেখানে খামাখা দুই শব্দ কেন লিখবেন!
﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋﹋
⚪আবদুল হক ॥ "শব্দের চালচরিত্র" ॥ ১৬-০৮-২০২৩।
★আবদুল হকের পেজ থেকে কপি করা হয়েছে।