19/08/2022
লড়াই করতে গেলে প্রথমেই স্থির করতে হয় একটা লক্ষ্য। লক্ষ্য অর্জন করার জন্য লক্ষ্য স্থির করা খুব জরুরী আর লক্ষ্য স্থির করতে গেলে দরকার হয় ওই লক্ষ্যের প্রতি প্রচন্ড আকাঙ্ক্ষা আর ভালোবাসা। তোমরা যদি মিলখা সিং এর জীবনী নিয়ে সিনেমাটি দেখো তাহলে দেখতে পাবে যে... মিলখা সিং বিরাট বড় দৌড় বীর কিন্তু ছিলেন না। কিন্তু যে কোন ক্ষেত্রে তিনি তার লক্ষ্য স্থির করে নিতেন এবং সেই লক্ষ্যকে তিনি মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন বলেই সেই লক্ষ্যকে স্থির করতেন। মনে করে দেখো সেই সিনেমায় মিলখা সিং প্রথমবার যখন জিতেছিল তখন তার লক্ষ্য ছিল এক গ্লাস দুধ।হাজার চেষ্টা করেও মিলখা সিং কোন দৌড়ে কোনোদিন প্রথম হতে পারেননি .......কিন্তু যেই তাকে বলা হল যে দৌড়ে আগে যেতে পারলে এক গ্লাস দুধ বেশি পাওয়া যাবে.... তিনি লক্ষ্য স্থির করে নিলেন এবং ঠিক সবার আগে পৌছে গেলেন।
এই দুধের প্রতি ভালোবাসাই তাকে লক্ষ্য স্থির করতে সাহায্য করল। তুমি যদি কোনো লক্ষ্যকে না ভালোবাসতে পারো তাহলে তুমি কোন লক্ষ্যও ঠিক করতে পারবে না।
"পরাজয় এটা নয় ..... যে তুমি কোন লক্ষ্য অর্জন করতে পারোনি.....
বরং পরাজয় এটা ..... যে তুমি তোমার জীবনে কোনো লক্ষ্যই সঠিক স্থির করতে পারনি.."
বিল গেটস একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তার সফলতার রহস্য হলো তিনি খুব কম ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্যকে স্থির করেছেন কিন্তু যেখানে লক্ষ্যস্থির করেছেন সেই লক্ষ্যকে মনেপ্রাণে চেয়েছেন বলেই লক্ষ্যস্থির করেছেন।
আজ আমি তোমাদের ইয়ান কারদোজো.... এর কথা শোনাতে চাই।
ইনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্টের একজন সেনা ছিলেন। 1971 সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় একটি ল্যান্ড মাইন এর ওপরে তার পা পড়ে তার একটি পা উড়ে যায়। তখন ডাক্তার এসে তার পায়ের অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেয় যে তার পায়ের হাটুর নিচে যেটুকু অংশ বেঁচে আছে সেটুকু কেটে ফেলতে হবে। সেই ডাক্তার তার নিজেরই সঙ্গীর পা কেটে ফেলতে খুব দ্বিধা বোধ করছিল। গোর্খা রেজিমেন্ট এর সৈন্যদের কাছে একটি ছুরি থাকে। ডাক্তার পা কাটতে পারছে না দেখে কারদোজো তার ছুরি টি বের করে নিজেই নিজের পা কেটে ফেললেন।এতটাই সাহসী ছিলেন কারদোজো...... তারপর ডাক্তার তার উপযুক্ত চিকিৎসা করল । তিনি এক পা হারিয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে গেলেন । আমরা সবাই জানি যে প্রতিবন্ধীরা সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে পারে না সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরেও যদি কেউ প্রতিবন্ধী হয় তাহলেও তাকে সেনাবাহিনীতে আর রাখা হয় না।প্রতিবন্ধী হয়ে গেছেন বলে তাকে সেনা রেজিমেন্ট থেকে অব্যাহতি দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো।সেনাবাহিনীকে মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন তিনি। সেনাবাহিনীতে কাজ করার জন্য যা যা দরকার হয় ....সবকিছুই তার ছিল...... সাহস শৌর্য-বীর্য কোনোটিই তার কম ছিল না। শরীরে ছিল শক্তি । মনে ছিল বল আর সেনাবাহিনীর প্রতি ও দেশের প্রতি ছিল তার অগাধ, অকৃত্রিম ভালোবাসা । কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তিনি তার পা হারিয়ে ফেলেছেন। যে ব্যক্তি দিন রাত সেনাবাহিনীর সেবার কাজে ব্যস্ত থাকতেন..... সেই ব্যক্তির আশ্রয় হল ঘরের বিছানা। কিন্তু তিনি তো ঘরে বসে থাকার লোক নন.... ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে লাগিয়ে নিলেন কাঠের পা। সেই কাঠের পা লাগিয়েই তিনি ধীরে ধীরে দৌড়ানো প্র্যাকটিস করতে লাগলেন। নিজের পুরনো ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে লাগলেন ......এবং অনেক অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের দ্বারা তিনি এই বিশ্বাস অর্জন করতে পারলেন যে তিনি আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফেরত যেতে পারেন।
কি মনে হচ্ছে ?.......গল্প?.... জাদু?
নাকি কারদোজো রাতের ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছেন যে তিনি একপা হারিয়েও সেনাবাহিনীর যুদ্ধ করতে যাবেন?
না না গল্পও নয় .....জাদুও নয় .....আবার স্বপ্নও নয়....
আসলে কি ? কেউ অসম্ভব কিছু কে মনে প্রাণে চাইলে এবং সেই অসম্ভব কিছু কে অর্জন করার জন্য লড়াই করতে চাইলে.... প্রায়শই আমাদের গল্প বা জাদু বা স্বপ্ন বলে মনে হয়......
যাই হোক....
অনেকেই নিষেধ করল যে তুমি আর পারবে না.... তুমি যেও না.....কারদোজো বললেন যে.... তিনি এই কদিনে নিজেকে এতটা পারদর্শী করতে পেরেছেন যে যার পা আছে তাকেও তিনি দৌড়ে হারাতে পারবেন..... এবং সত্যিই তিনি হারিয়েও দিলেন।
সেখান থেকে তিনি সেনা অফিসে গিয়ে তৎকালীন মেজর জেনারেলের সঙ্গে দেখা করে নিজের পারদর্শিতার ও সক্ষমতার কথা জানিয়ে আবেদন করলেন যে তাকে যেন পুনরায় সেনাবাহিনীতে বহাল করা হয়। মেজর জেনারেল অনেকক্ষণ কারদোজোর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন যে কারদোজো কি পাগল হয়ে গেল? নাকি কারদোজো স্বপ্ন দেখছে? তিনি বললেন সেনাবাহিনীতে প্রতিবন্ধীদের কোন জায়গা নেই.....
কিন্তু কারদোজো যে নিজের প্রতিবন্ধীত্বকে ,নিজের অসহায়তা কে জয় করে একটি সাধারণ মানুষের ন্যায় স্বাভাবিক হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন সে কথা মেজর জেনারেল জানতেন না । যাইহোক ...নিজেকে প্রতিবন্ধী বলতে নারাজ কারদোজো মেজর জেনারেল কে চ্যালেঞ্জ করে বললেন যে তিনি সেনাবাহিনীর পরীক্ষা পুনরায় দিতে রাজি। মেজর জেনারেল কি করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না.... একদিকে কারদোজো নাছোড় বান্দা ...... অন্যদিকে মেজর জেনারেল দেখছিলেন যে প্রতিবন্ধী একজন সেনা পদপ্রার্থী কে চাকরি দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়........ কোনমতেই কারদোজো কে বোঝাতে না পেরে.... মেজর জেনারেল একটি এমন অসম্ভব কাজের কথা কারদোজোকে বললেন যাতে কারদোজো কোনমতেই সেই কাজটি না করতে পারে। মেজর জেনারেল বললেন তুমি 6000 ফুট উঁচু পাহাড়ে চড়ে দেখাও তাহলেই তোমাকে সেনা পদে বহাল করা হবে।মেজর জেনারেল জানতেন যে কারদোজো এই 6000 ফুট পাহাড়ে কোনো দিনই চড়তে পারবে না .....এবং কারদোজো 6000ফুট পাহাড় আরোহণ করতে ব্যার্থ হলে কারদোজোর আবদার থেকে তিনি মুক্তি পাবেন.....।কিন্তু কারদোজো তো সেনায় বহাল হতেচান....দেশের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান....সেনাবাহিনী আর দেশমাতৃকা যে তাকে অনবরত ডাকছে। আর এই সারা তিনি পেয়েছিলেন তার হৃদয়ের অন্তঃকরণ থেকে...... এই কারণেই তার লক্ষ্যের প্রতি ছিল তার অগাধ ও অসীম ভালোবাসা........ তিনি কোনরকম প্রত্যুত্তর'' না করে...... সঙ্গে সঙ্গে কারদোজো বেরিয়ে পড়লেন ছয় হাজার ফুট পাহাড় জয় করতে..... সব সেনা আধিকারিক ও অন্যান্যরা হা করে তাকিয়ে থেকে দেখতে লাগলো কারদোজোর কীর্তি....মেজর জেনারেল জানতেন যে কারদোজো এই পাহাড়ে উঠতে পারবে না, এমনকি, নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সকল মানুষ জানত যে কারদোজো ওই পাহাড়ে উঠতে পারবে না.... এই পৃথিবীর কেউই হয়তো বিশ্বাস করবে না যে কারদোজো যার কিনা একটা পা নেই সে 6000 ফুট উঁচু পাহাড়ে চড়তে পারবে ........ একমাত্র কারদোজো বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি ওই ছয় হাজার ফুট পাহাড় জয় করতে পারবেন।
অন্যের বিশ্বাস.... বিশ্বাস নয়..... বিশ্বাস হলো, নিজের বিশ্বাস.... কারদোজো নিজের বিশ্বাসে ভর করে ওই ছয় হাজার ফুট পাহাড় জয় করে মেজর জেনারেল এর সামনে এসে দাঁড়ালেন...... মেজর জেনারেল জানতেন যে কারদোজো 6000 ফুট পাহাড়ে উঠতে পারবে না কিন্তু কারদোজোর কীর্তি দেখে.... নিজের ভাবনার প্রতি খুবই লজ্জিত হলেন এবং কারদোজোকে জড়িয়ে ধরে সাবাসী দিলেন এবং তাকে সেনাবাহিনীতে বহাল করলেন....
কারদোজো ভারতীয় সেনাবাহিনীর একমাত্র প্রতিবন্ধী সেনাকর্মী যিনি কিনা মেজর জেনারেল rank পর্যন্ত গেছিলেন.....এবং তার এই জয় সম্ভব হয়েছিল কেবলমাত্র তার নিজের বিশ্বাস এবং নিজের জিদের দ্বারা.... বিশ্বাস জিদ আর লক্ষ্যের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া কখনই কোন কিছু অর্জন করা যায় না.....
জিততে গেলে অবশ্যই মনে বিশ্বাস আনতে হবে...... জিদ আনতে হবে.....আর যদি বিশ্বাস ও জিদ না আনতে পারো তাহলে জেনে নিও যে তোমার ওই লক্ষ্যের প্রতি কোনই ভালোবাসা নেই.......... যেটুকু আছে সেটুকু হল মোহ। জিদ, ভালোবাসা আর বিশ্বাস এই তিনটের দ্বারা মানুষ সফলতার রাস্তা খুঁজে পেতে পারে ..... বিশ্বাস করো.. এই তিনটের দ্বারাই তুমি সফলতা রাস্তা খুঁজে পাবে .....পাবেই পাবে.....আমি বলছি ...রাস্তা তুমি পাবেই........ আর যদি রাস্তা না পাও..... তাহলে আমি নিশ্চিত যে তুমি নিজেই নতুন রাস্তা তৈরি করে নেবে...........
Mihir Karmakar
WBCS (exe)
8906090524