20/08/2026
মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব,
আজকের দিনটি হয়তো আপনার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন দিনগুলোর একটি। যদি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবি.ধানিক দায়িত্ব আপনার কাঁধে অর্পিত হয়, তবে সেটি শুধু একটি নতুন পদে যাত্রা হবে না, এটি হবে প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক পথচলার এক ঐতিহাসিক পরিণতি।
মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি, আপনার রা.জনৈতিক যাত্রা আজকের নয়। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনেই আপনার রা.জনৈতিক পথচলার সূচনা। ১৯৬৯-এর গণ.অভ্যু.ত্থানের উত্তাল সময়ে আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের নে.তৃত্বে ছিলেন। পরবর্তী জীবনে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর নে.তৃত্ব, সংসদ, ম.ন্ত্রিসভা এবং দীর্ঘ রা.জনৈতিক সংগ্রামের পথ পেরিয়ে আপনি জাতীয় রা.জনীতির অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত হয়েছেন।
এই পথ শুধু ফুলে সাজানো ছিল না। এখানে ছিল আন্দোলন, পরাজয়, অপেক্ষা, কারাবরণ, রা.জনৈতিক প্রতিকূলতা এবং অসংখ্য কঠিন সময়। তবুও আপনার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থেকেছে আপনার সংযত ভাষা, ভদ্রতা এবং রা.জনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও শালীনতা বজায় রাখার চেষ্টা।
আপনার শিকড়েও রয়েছে এক দীর্ঘ রা.জনৈতিক ও রা.ষ্ট্রীয় ইতিহাস। আপনার পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী, রা.জনীতিবিদ ও একাধিকবার নির্বাচিত সং.সদ সদস্য, তিনি কৃষি ম.ন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। আপনার চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সং.সদের স্পি.কার এবং আইন, বিচার ও সং.সদবিষয়ক ম.ন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস. আর. মির্জা! আজ তাই মনে হয়, ইতিহাস কখনো কখনো একটি পরিবারের কয়েক প্রজন্মের পথ হেঁটে এসে একজন মানুষের কাঁধে নতুন দায়িত্ব তুলে দেয়।
মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি, মির্জা ফখরুল সাহেব,
এতদিন আপনাকে একটি দলের মহাসচিব হিসেবে মানুষ চিনেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাং.বিধানিক আসনে অধিষ্ঠিত হলে সেখানে আর শুধু একটি দলের পরিচয় বহন করা যায় না। তখন আপনি বি.এনপির একার নন, আপনি হবেন বাংলাদেশের। যিনি আপনাকে ভো.ট দিয়েছেন, যিনি দেননি, যিনি আপনার রা.জনীতি ভালোবাসেন, যিনি আপনার রা.জনীতির বিরোধিতা করেন, সবার প্রতিই সমান মর্যাদা ও দায়িত্ব হবে আপনার সেদিন আপনাকে দলীয় সম্বোধনের চেয়েও বড় একটি নামে ডাকবে বাংলাদেশ, মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি।
আপনার চুলে আজ সময়ের শুভ্রতা। সেই শুভ্রতার ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের বহু দশকের রা.জনৈতিক ইতিহাস। আজ হয়তো আপনারও মনে পড়বে আপনার বাবা মির্জা রুহুল আমিনকে। মনে পড়বে পরিবারের সেই মানুষগুলোকে, যাঁরা হয়তো আজ বেঁচে থাকলে নীরবে তাকিয়ে থাকতেন, আর একজন বাবা হয়তো সন্তানের এত দীর্ঘ পথচলার পর শুধু বলতেন, আমার ছেলে, মানুষের সম্মান রেখো; দেশের সম্মান রেখো।
জীবনের কিছু অর্জনের সামনে করতালি ছোট হয়ে যায়। সেখানে শুধু চোখ ভিজে আসে। মাননীয় প্রধানম.ন্ত্রীকে আমি আন্তরিকভাবে সম্মান ও স্যালুট জানাই, এমন একজন প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের রা.জনৈতিক সহযোদ্ধাকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদার জায়গায় বিবেচনা করার জন্য। রা.জনৈতিক নেতৃত্বের সৌন্দর্য এখানেই, নিজের পাশে থাকা মানুষের ত্যাগকে ভুলে না যাওয়া এবং সময় এলে তাঁকে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে পৌঁছে দেওয়া।
মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি,
আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার যেন কোনো পদ না হয়, হোক আপনার ভদ্রতা, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা। একদিন রা.ষ্ট্রপতির মেয়াদও শেষ হবে। ক্ষমতার চেয়ার অন্য কারও হবে। বঙ্গ.ভবনের দরজায় নতুন নাম লেখা হবে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে সম্মান অর্জিত হয়, তার কোনো মেয়াদ শেষ হয় না।
আপনি যদি মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি হন, আমার প্রার্থনা থাকবে, আপনি এমন একজন রাষ্ট্র.পতি হোন, যাঁর কাছে বিরোধী মতের মানুষও নিরাপদ বোধ করবে, যাঁর দরজা ক্ষ.মতাবানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্যও খোলা থাকবে, এবং যাঁকে দেখে আগামী প্রজন্ম শিখবে, রা.জনীতিতে দীর্ঘ পথ চলেও একজন মানুষ ভদ্র, বিনয়ী ও মানবিক থাকতে পারেন।
প্রায় ছয় দশকের পথচলার পর যদি আজ ইতিহাস আপনার দরজায় এসে দাঁড়ায়, তবে মাথা উঁচু করে তাকে গ্রহণ করুন। কারণ কিছু সম্মান মানুষ চেয়ে নেয় না, একটি দীর্ঘ জীবন, অসংখ্য ত্যাগ আর সময় নিজেই সেই সম্মান মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। আপনার প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সালাম।
আর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে একটি কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই! অতীতে বি.এনপির সমর্থনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাং.বিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ডা. এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং পরবর্তীতে প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ-এর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গভীর অসন্তোষ, দূরত্ব ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই অধ্যায়গুলোর রা.জনৈতিক পরিণতি আপনি আমাদের অনেকের চেয়েই কাছ থেকে দেখেছেন।
ইতিহাসের সেই অভিজ্ঞতা আজ কাউকে অসম্মান করার জন্য নয়, বরং মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, রা.ষ্ট্রের সর্বোচ্চ আসনে বসা একজন মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ক্ষমতা নয়, বিশ্বাস। আর বিশ্বাস অর্জন করতে একটি জীবন লেগে যেতে পারে, কিন্তু হারাতে কখনো কখনো একটি সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। যদি সত্যিই আপনাকে “মহামান্য রা.ষ্ট্রপতি” বলে সম্বোধন করার সৌভাগ্য আমাদের হয়, তবে আমাদের গর্বিত করবেন।
আর যদি কোনোদিন জাতির সামনে এমন কোনো সংকট আসে, যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, চারপাশের কণ্ঠস্বর বিভ্রান্ত করে এবং আপনাকে একাই বিবেকের সামনে দাঁড়াতে হয়, তখন শুধু একটি মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে আমাদের প্রয়াত নেত্রী বেগম খা.লেদা জিয়ার জীবনের কোনো একটি স্মৃতি মনে করবেন। মনে করবেন তাঁর দীর্ঘ রা.জনৈতিক সংগ্রাম, ব্যক্তিগত ত্যাগ, কঠিন সময় এবং সেই মানুষগুলোর কথা, যাঁরা বিশ্বাস নিয়ে একটি পতাকার নিচে বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আপনি অবশ্যই সংবিধান ও সমগ্র বাংলাদেশের রা.ষ্ট্রপতি হবেন, কোনো দলের নয়। কিন্তু নিরপেক্ষতা মানে নিজের অতীত, নিজের সহযোদ্ধাদের ত্যাগ কিংবা যারা কঠিন সময়ে আপনার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের ভুলে যাওয়া নয়।
কারণ ইতিহাস রা.ষ্ট্রপতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে, জাতির সবচেয়ে কঠিন দিনে তিনি কারও বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছিলেন, নাকি
দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন, সম্মানিত রাখুন!