22/06/2025
ফার্সিপাড়া সফিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, দেড়শ বছরের প্রাচীন এক ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের ইতিহাস।
🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁🍁
লেখক প্রভাষক মোঃ আব্দুর রাজজাক (রাজু)।
গ্রন্থ, নওগাঁ জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য।
পটভূমি,
আঠারোশ সালের গোড়ার দিকে ইরানের ইস্পাহান এলাকা থেকে পীরে কামেল হযরত আলিশাহ রহঃ ইসলামের সুমহান বানী প্রচারের উদ্দেশ্যে বঙ্গদেশে ধামইর হাট অঞ্চলের চকউমর গ্রামে আগমন করেন।
এবংতার অনুসারী ৪০ জন সঙ্গিসহ তিনি সেখানে বসতি স্থাপন করেন। সঙ্গীরা ইসলামের তাহজিব ও তামাদ্দুন প্রচারে পার্শ্ববর্তী গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েন। পীরে কেবলা খানকা শরীফ নির্মাণ পূর্বক জরুরী মাসলা মাসায়েল ও আরবি, উর্দু্্ ফার্সি, শিক্ষা দানের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন।
তদিও পুত্র হযরত মাহমুদ শাহ (রহমাতুল্লাহ আলাই) এলাকায় ইসলাম প্রচার ও তার পুত্র বণেজ মাহমুদ শাহও চকউমার থেকে বর্তমান স্হানে উঠে আসেন এবং উক্ত খানকায় ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামের সুমহান মর্যাদা প্রচার অব্যাহত রাখেন। এলাকায় অব্যাহত ভাবে আরবি, উর্দুর পাশাপাশি ফার্শি শিক্ষাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার জন্য গ্রামের নাম হয় পার্শি পাড়া। (খান সাহেব মোহাম্মদ আফজাল)
উনিশ শতকে গোড়ার দিকে ১৯০৪ সালে দক্ষিণ এশিয়ার মহান ধর্ম প্রচারক ফুরফুরা শরীফের পীরে কামেল হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক রহমাতুল্লাহ এর অনুপ্রেরণায় মক্তবটি পারিবারিক খানকা শরীফ থেকে স্থানান্তর করে বর্তমান স্হানে স্থায়ী মাদ্রাসা রূপে ইসলামী শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন।
১৯২৮ সালে মাদ্রাসাটি ব্রিটিশ সরকার বাহাদুরের আর্থিক আনুকূল্য লাভ করে এবং মাদ্রাসাটি হাই অ্যাংলো মাদ্রাসা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। তার পূর্বে এর নাম ছিলো এম,ই বা মিডিয়াম ইংলিশ স্কুল। শিক্ষা বোর্ড কতৃপক্ষ ১৯৪২ সালে মাদ্রাসাটি পরিদর্শনে এসে শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ করেন।
(সূত্র, অধ্যাপক আব্দুস সোবহান,)
স্কুলের নামকরণ,
প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষার আলো প্রসারে অত্র প্রতি ষ্ঠানের সুনাম দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালে এটি অত্র এলাকার জমিদার মফিজ উদ্দিন চৌধুরীর পিতা জনাব শফিউদ্দিন চৌধুরীর স্মরণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ফার্সিপাড়া সফিয়া উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে নামকরণ করা হয়।
বিদ্যালয় পরিদর্শন
১৯৫২ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ইতরাত হোসেন জুবেরী সাহেব মাদ্রাসাটি পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার মানে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে জুবেরী সাহেব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন।১৯৫৬ সালের দিকে মাদ্রাসাটির শিক্ষার আধুনিকায়নের ফলে মাদরাসাটি পূর্ণ স্কুলের রুপলাভ করে। আধুনিকায়নে জনাব বজলুল হক সাহেবের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
পরবর্তী সময় স্কুলটি যোগাযোগের সুবিধার কারণে ফার্সিপাড়া থেকে অত্র স্কুলের শিক্ষকগনের প্রচেস্টাই
উৎসাহী সদস্যধের নেতৃত্বে সুবিধা জনক স্থানে আমাই তাড়ায় স্থানান্তর করা হয়। উক্ত পুরাতন স্কুলে জায়গাটি বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণহাইস্কুলে রূপ গ্রহণ করাতে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলমান ফার্সি পাড়ার উত্তর পার্শ্বে মাদ্রাসার জন্য একখণ্ড জমি ক্রয় করার জন্য চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। একখন্ড জমি পাওয়া গেলে সেখানে মাটির দেওয়াল দ্বারা মাদ্রাসা ঘর নির্মান পূর্বক আলেমগন পূর্ণরূপে ইসলামী শিক্ষার কার্যক্রম শুরু করেন।
মাদ্রাসার জন্য জমি দান,
মাদ্রাসা জায়গাটি সাইতানকুড়ি গ্রামের সবুজন বেওয়া নামে এক নিঃসন্তান ধর্মপ্রাণ মহিলা ৫০শতাংশ জমি দান করেন। পুরাতন স্কুল ভবন সহ স্কুলের জায়গাটি স্কুল কর্তৃপক্ষ বিক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে মাদ্রাসার ৫০ শতাংশ জায়গা ছাতন কুড়ি গ্রামের মো,খাইরুজ্জামান দুলুর নিকট ৭০ হাজার টাকায় বিক্রয় করেন।
এবং উক্ত টাকায় সফিয়া স্কুলের জায়গাটি ক্রয়করা হয়। সরকারি অনুমোদনক্রমে সুফিয়া স্কুলের পুরাতন জমির বিক্রয় দলিলে সই করেন স্কুল কমিটির সদস্য ফার্সীপাড়া নিবাসী মোঃ আব্দুল গফফার (ধনী গফফার)। জায়গা ক্রয়ের পর পুরাতন স্কুল ভবনে মাদরাসার কার্যক্রম পূর্ণ রূপে চালু করা হয়।
মাদ্রাসার নামকরণ
নতুন মাদ্রাসাটির নাম হয় ফার্সি পাড়া মোজাফফর রহমানিয়া দাখিল মাদ্রাসা। এটি স্থাপিত হয় ১৯৬৯ সালে।
সফিয়া স্কুলের জয়যাত্রা।
নিভৃতে এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষা প্রসারে উক্ত প্রতিষ্ঠানটির বহুবিদ ভূমিকা রেখে চলেছে। উক্ত সফিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সুযোগ্য শিক্ষক মন্ডলী ও মেধাবী ছাত্রগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছেন।সম্প্রতি যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী কারিগরি শিক্ষার লক্ষ্যে স্কুলটিতে ভোকেশনাল শাখা খোলা হয়েছে। এছাড়া স্কুল চত্বরে রয়েছে কিন্ডারগার্টেন শাখা।
স্কুলের ঐতিহাসিক অর্জন।
১৯৩৭ সালে শেরেবাংলা এ,কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির সদস্য সংগ্রহের লক্ষ্যে (শিক্ষাবিদ ও পরবর্তীতে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী) হুমায়ুন কবির ফার্সিপাড়ায় আসেন এবং সোফিয়া স্কুলের দক্ষিণের রুমে রাত্রি যাপন করেন। ১৯৩৮ সালে ডঃ মোঃ শহিদুল্লাহ ব্রিটিশ সরকারের শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি। হিসেবে সফিয়া স্কুল পরিদর্শনে আসেন এবং একই রুমে রাত্রি যাপন করেন।
সফিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কৃতি ছাত্র ডক্টর নুরুল আমিন প্রফেসর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ডক্টর ইমতাজ হোসেন প্রফেসর কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এবং মোহাম্মদ ফরিদ হোসেন সাবেক প্রিন্সিপাল ধামইরহাট গভর্নমেন্ট কলেজ মো শহিদুল ইসলাম, সাবেক অধ্যক্ষ ধামইর হাট এম,এম ডিগ্রি কলেজ,সকলেই বলেন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই অঞ্চলে স্কুল শিক্ষা বলতে ধামইরহাটের সফিয়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয়কে বুঝাতো।
এই স্কুলের কৃতি ছাত্র ডক্টর রেজাউল ইসলাম বিদগ্ধ গবেষক ও ইতিহাসবিদ অপর ছাত্র ডক্টর শাহিনুর রশিদ টুটুল বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও নিদর্শন
সংগ্রহকারী গবেষক। আয়কর অফিসার শাদত হোসেন, ডক্টর মোস্তফা জাহিদ ব্রেজনেভ (প্রফেসর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়), খাদ্য কর্মকর্তা এম,এ হান্নান সহ অসংখ্য কৃতি ছাত্র দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী আজিজুর রহমান সরকার এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন এছাড়া কাজিমদার ওয়াসিম উদ্দিন (এম, এন, এ)ও দিনাজপুরের ঐতিহাসিক অধ্যাপক মেহরাব হোসেন ফার্সিপারা সুফিয়া স্কুলের কৃতি ছাত্র।
সফিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস পরিক্রমায় স্কুলে পাঠ দানকারি প্রথিতযশা বাংলা সাহিত্যের বরেণ্য শিক্ষক মন্ডলী।
(১) শ্রী প্রভাত কুমার কুন্ড (এম, এ) ইংরেজি। তিনি পরবর্তী সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ছিলেন।
(২) মাওলানা আবু ইসহাক। (সু সাহিত্যিক ওকবি) পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রধান ছিলেন।
(৩) রাধিকা রমন বর্মন (এম এ ইংরেজি) তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ছিলেন।
(৪) মোহাম্মদ আলমগীর জলিল (কবি ও সাহিত্যিক) পরবর্তী সময় তিনি ময়মনসিং বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ছিলেন।
(৫)মোঃ শহিদুল্লাহ বিএসসি এম এ বাংলা তিনি ময়মনসিং বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন এবং টাঙ্গাইল কলেজের বাংলা প্রভাষক ছিলেন।
(৬)মোঃ আবু সুফিয়ান।(বি,এস,সি) বাড়ী পাঁচবিবি। তিনি বাংলাদেশের আণবিক শক্তি কমিশনের মেম্বার ছিলেন।
(৭)মাওলানা আব্বাস আলী খান। তিনি কলকাতায় আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। বাড়ি মহিপুর পাঁচবিবি। তিনি পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ও জামাতে ইসলামীর আমির ছিলেন।
(৮) মোহাম্মদ বজলুল হক( বি-হক) বাড়ি খরমপুর। তিনি ০১-০১-১৯৫০ হতে ৩১-১২-১৯৫২ সন পর্যন্ত ফার্শিপাড়া সফিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি নওগাঁ বি,এম,সি কলেজের প্রিন্সিপাল ও আস্তান মোল্লা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সি পাল ছিলেন।
(৯) মো,আবু নোমান শিবলী। (বি,এস,সি) বাড়ি খুলনা।
তিন খুলনা জুট করর্পোরেশনের ম্যানেজার ছিলেন।
(১০) মোহাম্মদ ফজলুল হক (এম এ) বাড়ি শংকরপুর।
তিনি ১৬-০৯-১৯৭০ হতে ০৭-০৩-১৯৭২ সন পর্যন্ত ফার্শিপারা সফিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘ সময় নজিপুর সরকারি কলেজের প্রফেসর ছিলেন।
(১১) শহীদ বুদ্ধিজীবী ওসমান গনি মন্ডল ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালে ২৭শে মে তাকে পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা শহীদের মর্যাদা লাভ করেন ゚