05/06/2026
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সুবিধাবাদের বাস্তবতা।বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ—তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে সুবিধাবাদী। সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে:
আসিফ মাহমুদ: যিনি এনসিপি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন। অথচ,যতক্ষণ না পর্যন্ত দলটিতে নিজের জন্য একটি সুবিধাজনক বা প্রভাবশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছেন, ততক্ষণ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেখানে যোগ দিতে চাননি।
ইসহাক সরকার: বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে যাঁর বিরুদ্ধে অগুনতি মামলা হয়েছে, যিনি দলের জন্য একসময় জীবন উৎসর্গ করার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। অথচ একটা সময়ে এসে যখন দেখলেন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় ভাটা পড়ছে, তখনই তিনি দল পরিবর্তন করলেন।
আরিফুল আদীব: যাকে একসময় ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’-এর মূল দায়িত্বে আসীন করা হয়েছিল, যিনি নিয়মিত টকশোতে দলের প্রতিনিধিত্ব করতেন। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সংগঠনে থেকে নিজের ভবিষ্যৎ সুবিধা করতে পারবেন না বুঝতে পেরে তিনি পরিষদ ছেড়ে চলে গেলেন। অথচ সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা এঁদের বিশ্বাস করে বড় দায়িত্ব দিয়েছিল, সংগঠনের অভিভাবক বানিয়েছিল।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—তাহলে রাশেদ আর এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা কোথায়? এমন উদাহরণ কেবল দু-চারটি নয়, খুঁজলে সমসাময়িক এবং অতীতের রাজনীতিতে শত শত না, হাজারেরও বেশি পাওয়া যাবে।
কেন এই সুবিধাবাদ? পেছনের মনস্তত্ত্ব ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
আসলে রাজনীতিবিদের এই ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ বা চাহিদার পেছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে। রাজনীতি এক ধরণের নেশা। এই তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে অনেক সময় বৃহত্তর আদর্শকে পেছনে ঠেলে নিজের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিতে হয়।
এখানে একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে—যাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থে বা অন্য কোনো কারণে দলবদল করছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই কিন্তু দেশের জন্য, জাতির অধিকার আদায়ের জন্য ত্যাগ, নির্যাতন ভোগ এবং সাহসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে।
কিন্তু যখন তাঁরা দেখেন যে বর্তমান সংগঠনে থেকে রাজনীতিতে নিজের ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তখনই দল বা সংগঠন পরিবর্তনের চিন্তা মাথায় আসে এবং তাঁরা সেটাই করেন।
‘পাইলট ফিশ’ সিন্ড্রোম ও বুর্জোয়া রাজনীতির বৃত্তঃ আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিটাই এমন যে, ছোট এবং উদীয়মান সংগঠনের নেতারা টিকে থাকার জন্য বড় দলের ওপর ভরসা করতে বাধ্য হন। সমুদ্রের ছোট ‘পাইলট ফিশ’ যেমন হাঙ্গর বা বড় মাছের গায়ে লেগে থেকে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে, আমাদের দেশের ছোট দলের নেতারাও তেমনি বড় দলের লেজুড়বৃত্তি করে টিকে থাকতে চান। কারণ তা না করলে সারাজীবন শুধু মাঠের রাজনীতিই করে যেতে হয়, কখনো কোনো নীতি-নির্ধারণী বা দায়িত্বশীল জায়গায় অধিষ্ঠিত হওয়া যায় না, নির্বাচনেও জয়ী হওয়া যায় না।
এর পেছনে আমাদের সাধারণ জনগণের মনস্তত্ত্বও দায়ী। আমাদের দেশের ভোটাররাও সাধারণত বুর্জোয়া বা বড় দ্বিদলীয় শ্রেণীকে ভোট দিতে পছন্দ করে। ফলে অর্থবল, জনবল এবং নানা সংকটে জর্জরিত ছোট দলের নেতারা একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই বড় দলের সমর্থন বা জোটের আশ্রয় খোঁজেন।
রাজনীতির এই নির্মম বাস্তবতা নিয়ে আরও অনেক কিছুই লেখা সম্ভব, তবে সংক্ষেপে এটাই আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আসল চিত্র।
#গণঅধিকার