মৃণালিনী নক্ষত্রা

মৃণালিনী নক্ষত্রা 🖤🥀 •~ কল্পনার রাজ্যে বাস্তবের চেয়েও সত্য কিছু গল্প থাকে ~• 🕊️💌

 #সুমাইয়া_তালুকদার  #বিষাদের_বসন্ত  #পার্ট০২ ___" তুই কি ভয় পাচ্ছিস আমায়?" অরণ্য চমকে উঠলো।___" না....না...মামা!" আফ্...
24/08/2026

#সুমাইয়া_তালুকদার
#বিষাদের_বসন্ত
#পার্ট০২
___" তুই কি ভয় পাচ্ছিস আমায়?" অরণ্য চমকে উঠলো।

___" না....না...মামা!" আফ্রিদি ঠান্ডা গলায় শুধালো,

___" তাহলে ওমন করেছিস কেনো? আর এভাবে কি দেখছিস? আমার বাড়িতে তো এর আগেও অনেক বার এসেছিস।"

অরণ্য কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

____" না আসলে, মামা, আপনি এতো বড়ো বাড়িতে কিভাবে একা থাকেন?"

আফ্রিদির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো,

___" তাহলে কি করতে হবে? কে থাকবে আমার সাথে?"

অরণ্য কিছু একটা বলতে চাইলো, কিন্তু বলল না। ঠিক সেই মুহূর্তে আফ্রিদির ফোনে কল এলো, কে কল করেছে? দেখার জন্য সে পকেট থেকে ফোন টা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকালো। রিসিভ করে কথা বলতে বলতে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরের রুমে চলে যেতে লাগলো।
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বর সাধারণত একটা মেয়ের ছিলো, আর আফ্রিদির চলে যাওয়ার ধরন দেখে তার সেটাই মনে হলো; আফ্রিদির গার্লফ্রেন্ড আছে, আর থাকাটাই তো স্বাভাবিক, বাহিরের রাষ্ট্র থেকে পড়াশোনা করে আসা আর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তার যোগ্যতা আর সৌন্দর্য দেখে কতো মেয়েই মুগ্ধ হবে, এটাই বাস্তব!

খানিক্ষণ পর কথা শেষ করে আফ্রিদি নিচে আসতেই গম্ভীর গলায় বলল,

___" কিরে, তখন থেকে এভাবে মূর্তির মত এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা ফ্রেশ হয়ে নে।"

অরণ্য সোজা হেটে বাথরুমে চলে গেল। অরন্যর মুখে দেখা সন্দেহের ছাপটা আফ্রিদি ধরে ফেলল ঠিকই কিন্তু কোন কথা বাড়ালো না। অরণ্য যখন ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িং রুমে এসে এক পাশে থাকা ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল, আফ্রিদি তখন টেবিলে খাবার রেডি করতে করতে বলল,

___"চেয়ারে বোস।"

কথাটা বলেই আফ্রিদি চেয়ার টেনে বসলো, কিন্তু অরণ্য তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আফ্রিদি বিরক্ত কন্ঠে বলল,

___"কিরে? ওভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বোস!"

অরণ্য ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো,

___"আপনি আমাকে টেবিলে বসতে বলছেন?"

___" আরে ধুর! কেনো টেবিলে বসে কোনদিন খাস নি নাকি?"

অরণ্যর চোখ ভিজে এলো,

___" কিন্তু, আমাকে তো আজ পর্যন্ত কেউ টেবিলে খেতে দেয়নি।"

কথাটা শুনে আফ্রিদি ভেতরে ভেতরে স্তম্ভিত হয়ে গেলেও বাহির থেকে কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সে চড়া গলায় শুধালো,

___"তোর সাথে কে কি করেছে সে গল্প বাদ দিয়ে টেবিলে চুপচাপ বোস।"

অরণ্য আফ্রিদির কঠোর রূপ দেখে এক সেকেন্ডও দেরি করল না, বাধ্য মেয়ের মতো চেয়ারে বসে খেতে শুরু করলো। অরণ্য স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত খাচ্ছিল। আর অন্যদিকে আফ্রীদি ধীরে ধীরে খেতে খেতে তার দিকে গভীর দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে রইল।
এক সময় এভাবে খেতে খেতে অরণ্য প্রচন্ড এক বিষম খেলো, কাশির বেগ সামলাতে না পেরে পানির জগতে হাত বাড়াতেই আফ্রিদি এক গ্লাস পানি দিলে অরণ্যর ঠোঁটের কাছে ধরল। পানি সামনে পেয়েই গ্লাসটা হাতে নিয়ে এসে ঢকঢক করে এক নিঃশ্বাসে গ্লাসটা ফাঁকা করে দিয়ে টেবিলের ওপর সজরে রেখে দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। আফ্রিদি শান্ত দৃষ্টিহেনে খেতে খেতে বলল,

____"ওরকম রাক্ষসের মত খাচ্ছিলি কেন? সারাদিন না খেয়ে আছিস নাকি?"

অরণ্য সামান্য মাথা নেড়ে বলল,

____"আমি দুপুরে কিছু খাইনি।"

___"না খেয়ে আছিস? তাহলে একটু আগে পাত্রপক্ষের সাথে উঁচু গলায় কথা বললি কিভাবে?"

অরণ্য হালকা গলায় বলল,

___"রাগ উঠলে মেজাজ বিগড়ে যায়।"

আফ্রিদি হাত ধুয়ে রুমাল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল,

___"ঠিকই করেছিস তুই, এত ছোট বয়সে বিয়ে করা ঠিকও নয়। আবার ওই ছেলেও তোর যোগ্য ছিল না।"

অরণ্য জিজ্ঞেস করতে চাইলে 'কেন যোগ্য নয়?' কিন্তু করেনা, অরণ্য প্রশ্ন করে না।

_________

খাওয়া শেষ করে অরণ্য সিঁড়ি বেয়ে দোতালায় আফ্রিদির রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।

____" ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না, ভেতরে আয়।"

অরণ্য পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকলো।

___" মামা...আমি একটা প্রশ্ন করবো?"

___" বল,কি বলবি?"

অরণ্য এক পলক আফ্রিদির দিকে তাকালো, তারপর দীর্ঘ একটা নিশ্বাস নিয়ে সাহস সঞ্চার করে আঙ্গুল খুটতে খুটতে বলল,

___" আচ্ছা একটু আগে যে কল করেছিল, সে কি আপনার গার্লফ্রেন্ড? "

কথাটা শুনেই আফ্রিদির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো, সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে অরন্যর দিকে এগিয়ে গেল। খুব কাছাকাছি যেতেই, অরণ্য এবার ভয়ে পিছাতে লাগলো,
এই লোকটা এমন করছে কেনো? আমি কি ভুল কিছু বলে ফেললাম?

পিছাতে পিছাতে অরণ্যের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল। আফ্রিদি খুব কাছাকাছি এসে হঠাৎ দেয়ালে দুই হাত রেখে মাঝখানে অরণ্যকে আটকে ফেলল, তার তপ্ত নিঃশ্বাস অরণ্যের মুখে আছড়ে পড়তে লাগলো। প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে সে বলে উঠলো,

____" মা-মামা, কি করছেন, সরুন। আমার ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না। আমি আর প্রশ্ন করবো না। ক্ষয়া করে দিন।"

আফ্রিদি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল,

____" ক্ষমা? হ্যাঁ?,,, ক্ষমা? তুই আমার ভাগ্নি হয়ে আমার ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করিস?"

____" সরে যান, আর হবে না।"

অরণ্য প্রচন্ড আতঙ্কে অসার হয়ে আফ্রিদির প্রশস্ত পেশিবহুল বুকে ও কাঁধে নিজের ছোট ছোট হাত দুটো দিয়ে সকল শক্তি একসঙ্গে করে ধাক্কা দিতে লাগলো। কিন্তু আফ্রিদির দানবীয় পুরুষালী শক্তির কাছে অরণ্যের সমস্ত শক্তি ছিল সামান্য খরকুটোর মতো।
ঠিক সেই মুহূর্তে আফ্রিদি প্রচন্ড এক থাপ্পর বসিয়ে দিলো অরণ্যের গালে, থাপ্পড়ের বেগ সামলাতে না পেরে সে মেঝেতে আছড়ে পড়লো। দুহাতে মুখ ঢেকে সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

___" আমাকে মারবেন না, প্লিজ। আমাকে এখানে মারার জন্য নিয়ে এসেছেন? আপনি তো একটু আগে বললেন, বাসায় থাকলে ওরা আমাকে মারবে, কিন্তু আপনি তো এখানে নিয়ে এসে সেই একই কাজ করলেন।"

আফ্রিদি প্রচন্ড রাগের চোটে অরণ্যর দিকে তেরে গিয়ে বলল,

___" তুই কি অন্যদের সাথে আমাকে কমপেয়ার করছিস?"

কথা টা বলেই আরেকটা থাপ্পড় ' ঠাস!' বসিয়ে দিলো আফ্রিদি। থাপ্পড়ের তীব্রতায় অরণ্যর ঠোঁটের কোণ বেয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এলো। সে জানে আর কথা বাড়ালে এই লোকটা তাকে আরো বেশি ক্ষত বিক্ষত করবে। সে চুপচাপ মেঝেতে বসে হাঁটুতে মুখ গুজে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো। আফ্রিদি রাগের চোটে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বিকট শব্দে কাঠের দরজাটা বন্ধ করে গেলো।

অরণ্য মেঝেতে বসে শুধু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদছিলো আর বির বির করে বলছিলো,

____" বাবা, মা তোমরা কোথায়? আমার যে আর ভালো লাগে না। সবাই আমাকে কষ্ট দেয়, তোমরা যেহেতু ওপারে চলে গেছো, আমাকেও কেনো নিয়ে গেলে না? আমার সৎ মা,বাবা আমাকে একদম দেখতে পারে না, বোঝা মনে করে। কিন্তু তোমরা থাকলে কি আমাকে বোঝা মনে করতে? বলো? সব ছেলে মেয়র বাবা মা ওদের কতো আদর করে, কিন্তু আমি কেনো তোমাদের ভালোবাসা পেলাম না? আমার কি দোষ ছিলো?"

____________

সারা রাত, হ্যাঁ,সারা রাত! এভাবে ঠান্ডা মেঝেতে বসে অরণ্য অশ্রু বিসর্জন দিয়ে গেলো। রাতে আফ্রিদি ড্রইং রুমের সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

সকালে যখন তার ঘুম ভাঙলো ,তীব্র অপরাধ বোধে তার বুকের ভিতর টা মোচর দিয়ে উঠলো। কাল রাতে অরণ্যর কথার জন্য নয়, অন্য এক কারনে আফ্রিদির মেজাজ বিগরে ছিলো আর সেই রাগ সে উগরে দিয়েছে নিষ্পাপ অরণ্যের উপর। বুকের ভেতরে তীব্র অপরাধ বোধ নিয়ে সে ছুটে গেলো উপরের রুমে।
রুমের কাঠের দরজা তখনো খোলা। আফ্রিদি শান্ত ভাবে চাপানো দরজা খুলে পর্দা সরিয়ে রুমে প্রবেশ করলো, তবে রুমের এক কোনের ঠান্ডা মেঝের দৃশ্য দেখে তার হৃদয়ে যেনো এক সাথে এ সহস্র তীর এসে বিধলো।

অরণ্য ঠান্ডা মেঝেতে এক কোণে ঠান্ডায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে, আফ্রিদি আরো কাছে এগিয়ে গিয়ে হাটু গেরে বসে লক্ষ্য করলো, অরণ্যের ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে, ঠান্ডা আর ব্যাথার চোটে। চোখের পাতা জোড়া বন্ধ, তবুও কোণ দিয়ে অশ্রু গাল এবং কান বেয়ে মেঝেতে এসে পড়ছে, কাল রাতের দুটো তীব্র থাপ্পড়ের দাগ এখনো তার ফর্সা গালে স্পষ্ট। ঠোঁটের কোণে রক্ত শুকিয়ে গাঢ় খয়েরী বর্ন ধারন করেছে।

আফ্রিদি আর এক সেকেন্ডো দেরি না করে দ্রুত তাকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলো। কিন্তু হালকা নরচরা পেতেই অরণ্যের কাঁচা ঘুম এক ঝটকায় ভেঙ্গে গেলো। সে চোখ ডলতে ডলতে আস্তে আস্তে উঠে বসলো। আফ্রিদি দ্রুত এসে তার পাশে বসে ঠোঁটে হাত বুলাতে বুলাতে অস্থির হয়ে বলল,

____" তোর ব্যাথা হচ্ছে, তাই না? দেখ আমার দিকে, দেখ।"

অরণ্য তাকানো তো দূরের কথা, উল্টো আফ্রিদির হাত দুটো সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। আফ্রিদি আবার ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলো,

____" তুই আমার উপর রাগ করেছিস তাই না? তোকে আমি আর মারবো না, একদম বকবো না।"

কিন্তু অরণ্য কোনো জবাব দিলো না।

____" কথা বল অরণ্য, আমি কাল তোকে ইচ্ছে করে মারিনি। তুই তো জানিস না, কাল আমি অন্য একটা কারনে রেগে ছিলাম, বিশ্বাস কর আমি তোর কথায় রেগে যাই নি।"

অরণ্য কোনো জবাব না দিয়ে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দরজার দিকে পা বাড়ালো। আফ্রিদি উন্মাদের মতো তার হত ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে করতে গালে মৃদু থাপ্পড় দিতে দিতে বলল,

____" কথা বল , রাগ করিস না। আমার ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না সত্যি বলছি।"

অরণ্য আলতো করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।

_________________

সেই দিন অরণ্য না খেয়েই আফ্রিদির বাড়ি থেকে চলে এসেছিল। ঘটনার পর ৪ দিন কেটে গেছে, কিন্তু অরণ্য আর অভিমান ভেঙে আফ্রিদির সামনে গিয়ে দাড়ায় না।
একটু আগে বিকেলে আফ্রিদি এসেছিল। এসে সালমা কে বলেছিল,

____" আপা, অরণ্য কোথায়? "

সালমা ইশারায় বলেছিল, উপরের ঘরে। আফ্রিদি কয়েকবার ডাকলো, কিন্তু অরণ্য আসেনি, একবার জবাবও দেয় নি। অস্থির হয়ে আফ্রিদি সিঁড়ি বেয়ে উপরে গিয়ে,কোনো কথা না বলেই সরাসরি অরণ্যের রুমে ঢুকে পড়েছিল। অরণ্য তখন জানলার পাশে টেবিলে বসে পড়াশোনা করতে মগ্ন। আফ্রিদি এগিয়ে গিয়ে দেখলো সে অঙ্কের গভীর হিসাব মিলাচ্ছে, আর আফ্রিদির উপস্থিত টের পেয়েও তাকে অবজ্ঞা করছে। হঠাৎ আফ্রিদি হাত থেকে কলম টা কেড়ে নিয়ে বলল,

____" তোকে নিচ থেকে অত বার ডাকলাম জবাব দিলি না কেনো? এখনো রাগ করে আছিস?"

অরণ্য টেবিল থেকে মুখ না তুলেই বললো,

____" পড়ার সময় ডিস্টার্ব করবেন অন্তত, চলে যান এখান থেকে।"

আফ্রিদি অরণ্যর কাঁধে হাত রেখে বলল,

___" এখন তো বিকাল, এখন খেলার সময়, আর তুই এখন পড়ছিস?"

অরণ্য কোনো কথা না বলে সামনের কলম দানি থেকে আরেকটা কলম নিয়ে অঙ্কে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু আফ্রিদি এতো সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিল না। সে হুট করে আবার কলম টা কেড়ে নিলো। অরণ্য এবার স্থির হয়ে টেবিলের দিকেই তাকিয়ে যেভাবে ছিলো ঠিক সেভাবেই রইলো। আফ্রিদির কাঁধের উপর রাখা হাতটা আস্তে আস্তে নিচের দিকে নেমে অরণ্যের কোমল পিঠ আর বাহু ছুঁয়ে গেলো। প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে অরণ্য সাথে সাথে ছিটকে সরে গিয়ে গায়ে ও মাথায় আরো ভালো ভাবে ওড়না টেনে নিলো। আফ্রিদি শান্ত গলায় বলল,

___" সরে যাচ্ছিস কেনো?"

অরণ্য পিছিয়ে যেতে যেতে বলল,

___" আ-আপনি কোন উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? চলে.....চলে যান।"

আফ্রিদি ক্ষীণ হেসে বলল,

____" সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে, আঙুল একটু বেকাতে হয়, কথা টা শুনিস নি? আমি আসলে সেই উদ্দেশ্যেই ঢুকেছি।"

একদিকে আফ্রিদির প্রতি তীব্র অভিমান আর আরেকদিকে আফ্রিদির এই বিপরীত আচরণ,সব মিলিয়ে অরণ্য আতঙ্কিত হয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো,

___" প্লিজ চলে যান, কেনো আমার জীবন টাকে নরক বানাতে চান? আমাকে আবার কোনো অযুহাতে মারতে এসেছেন তাই না? আমি আর এতো মানসিক যন্ত্রণা আর চাপ নিতে পারছি না, প্লিজ চলে যান।"

আফ্রিদি বুঝতে পেরেছিল, মেয়েটা আসলে সেদিনের ঘটনায় কতটা কষ্ট পয়েছে আর হৃদয়ে তার প্রতি এক অবিশ্বাস পুষে রেখেছে।

____" আমার নিজের বাবা মা নেই বলে আপনারা সবাই এর সুযোগ নিচ্ছেন তাই না? আমি তো অনাথ, আমার তো কেউ নেই, আমি প্রতিবাদ করতে পারবো না,আর আমার হয়ে কথা বলার জন্য কেউ নেই বলে আপনি সেদিন আপনার রাগের শিকার বানিয়েছেন তাই না?"

আফ্রিদি অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছে কিন্তু অরণ্য বোঝে নি , সে বারবার বলে গেছে,

____" নিজের মামা নন বলে আজ এমন করে কষ্ট দিচ্ছেন তাই না? নিজের মামা হলে এমন করতে পারতেন?"

আফ্রিদির তখন চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, তোর নিজের মাম না বলেই তো তোকে এতো ভালোবাসি, নিজের মামা হলে কি তোকে এভাবে ভালবাসতে পারতাম? নিজের মামা হলে কি আর তোকে নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সাজানোর স্বপ্ন দেখতাম?

কিন্তু আফ্রিদির হাত পা বাঁধা, সে এটা বলতে পারবে না। এখন বলার মক্ষম সুযোগ না। হৃদয় ভরা কষ্ট আর শূন্যতা ও হাহাকার নিয়ে আফ্রিদি ফিরে গেছে। নিজের ভেতরের আত্ম চিৎকার সে কাউকে শোনাতে বা বোঝাতে পারে নি। একবারের জন্য তার মনে হয়েছিল, অরণ্য সম্ভব হলে তোকে আমি নিজের বুক চিরে দেখাতাম, তোকে আমি কতটা ভালোবাসি, সম্ভব হলে তোকে আমি নিজের ভেতরের আত্ম চিৎকার গুলো শুনাতাম, তাহলে তুই আমার ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে পারতি।

#চলবে ..................?

#উপন্যাস

24/08/2026

উপন্যাস: নিরুদ্ধ নৈসঃঙ্গ 🚩🕊️❤️‍🔥


 #সুমাইয়া_তালুকদার  #পার্ট০১ পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে।ছেলে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো, আবার অ...
22/08/2026

#সুমাইয়া_তালুকদার #পার্ট০১
পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে।
ছেলে অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ভালো, আবার অভিজাত্যের দিক থেকেও কম নয়। সামনে সোফায় শাড়ি পড়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে অরণ্য, কিছুতেই সে বিয়ে করতে চায় না; তবে বাবা-মা এবং পরিবারের চাপে সে এখন পাত্রপক্ষের সামনে মার্জিত ভঙ্গিতে চোখ নিচু করে বসে আছে।
আশেপাশের পরিবারের লোকজনের কথা শুনে মনে হচ্ছে এখনই টি টেবিলের উপরে থাকা নাস্তা এবং শরবতের গ্লাসগুলো আছড়ে ফেলে দিতে। হঠাৎ, অরণ্যর চোখে পড়ল, পাত্রের পাশে বসে থাকা পাত্রের বাবার দিকে। মাথায় একটাও চুল নেই বললেই চলে, তার মনে হচ্ছে এখনই টাকটা বাড়ি মেরে ফাটিয়ে দেয়। অরণ্য দাঁতের দাঁত চেপে সব কথা হজম করে যাচ্ছে, হঠাৎ পাত্রের মা বলে উঠলো,

____"মা... তুমি একটু হেঁটে দেখাও তো।"

এবার সহ্যের সীমা অতিক্রম হয়ে গেছে, এতক্ষন নানা ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছে, যেমন: তুমি রান্না করতে পারো? পড়াশোনা কতদূর?
এমনকি একটু আগে পাত্রের মা অরণ্যের গালে আঙুল ঘষে দেখেছে অরণ্য মেকআপ করেছে কিনা।
অরণ্য মাথার কাপড়টা এক ঝটকায় ফেলে দিয়ে মাথা উঁচু করল, রাগে দ্রুত নিঃশ্বাস নিতে নিতে সে কর্কশ গলায় বলে উঠলো,

____"আমার না হওয়া শাশুড়ি মা! আমি কি একটু আগে এখানে শুয়ে শুয়ে এসেছি?"

অরণ্যের কন্ঠ সবার মাঝে প্রতিদ্ধনিত হতেই পাত্রের মুখটা গোমরা হয়ে গেল। পাত্রের মা মুখভঙ্গি পাল্টে ফেলে বলল,

____"কি বেয়াদব মেয়ে রে বাবা!"

পাত্র উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের এই অসম্মান দেখে বলল,

____"এই যে মেয়ে, তোমার সাহস হলো কিভাবে আমার মায়ের সাথে এভাবে কথা বলার?"

সে পাত্রের দিকে আঙুল তুলে প্রচন্ড রাগে বিগড়ে যাওয়া মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উগড়ে দিল,

____"এই যে মিস্টার! যেইনা চেহারা, আবার আমাকে বিয়ে করতে এসেছেন? চেহারার কথা তো বাদই দিলাম, লজ্জা করে না স্কুল পড়ুয়া একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করতে এসেছেন?"

কথাটা শেষ হতে না হতেই পাত্রের বাবা গর্জে উঠলেন।

____" এখানে কি আমাদেরকে অপমান করার জন্য ডেকে আনা হয়েছে?"

পরিস্থিতি বিগরে যেতে দেখে ইব্রাহিম সাহেব এগিয়ে এলেন , কোন মত পরিস্থিতির সামলে তাদের বিদায় করলেন।
তারা যেতে না যেতেই তিনি তার বিশাল অবয়ব নিয়ে অরন্যর দিকে তেড়ে এলেন। তার ডান হাত শূন্যে ভাসতেই অরণ্য দু হাত দিয়ে নিজের চেহারা আড়াল করার চেষ্টা করল। সেই বিশাল হাতের থাবা তার গালে পড়ার ঠিক এক মুহূর্ত আগে আচমকা একজন বিশাল দেহি পুরুষ অরণ্যকে এক ঝটকায় নিজের বুকের মাঝে নিয়ে আড়াল করে ফেলল।
সে আর কেউ নয়, অরণ্যর মায়ের মেজো ভাই, নাদিভ আফ্রিদি। আফ্রিদির ডান হাতের আঙ্গুলের খাজে জ্বলন্ত সিগারেট, সে শান্ত ভঙ্গিতে সিগারেটের টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো, যেন কিছুই হয়নি।
ইব্রাহিম সাহেব প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে বললেন,

____"আফ্রিদি! ওকে ছাড়ো। আজ ওকে আমি জ্যান্ত কবর দেবো!'

ইব্রাহিম সাহেবকে রাগে ফুষতে দেখে আফ্রিদি হালকা হাসলো,

____"শান্ত হোন, রাখবেন না এতো। আসলে দোষ তো আপনারই। এত ছোট বয়সে এটুকু মেয়ে বিয়ে করে সংসার সামলাতে পারবে বলে আপনার মনে হয়? যেখানে ও এখনো ভালোভাবে নিজেকে সামলাতে পারে না, যেমন ধরুন.... একটু আগে যে ঘটনাটা ঘটালো, তাতে তো বোঝাই যায় ও এখনো পরের বাড়ি যেয়ে কিভাবে তাদের সাথে মিশতে হবে সেটাই জানেনা।"

পাশ থেকে সালমা রাগে কিটমিট করতে করতে বলল,

_____"ছিহ্ , আজ যে কান্ড ঘটালো, তাতে কি ওই ছেলের পরিবার আমাদের নামে সুনাম করে বেড়াবে?"

আফ্রিদি শান্ত গলায় বলল,

_____"আপা, তুই আর দুলাভাই শুধু লোকে কি বলবে আজীবন সেটাই ভাবলি, শুধু তোরা কেন? আমাদের পুরো সমাজটাই এমন।"

অন্যদিকে অরণ্য আফ্রিদির বুকের শার্ট খামচে ধরে কাঁদছিল। আফ্রিদি তার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে ইব্রাহিম সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

____"আপনি না একজন ম্যাজিস্ট্রেট? তাহলে কিভাবে পারেন, এত ছোট বয়সে একটা মেয়ের বিয়ে দিতে? নাকি নিজের মা-বাবা নন বলে এমন করছেন?"

_____" আফ্রিদি মুখ সামলে কথা বলো, ওর যখন বয়স মাত্র ছয় বছর তখন থেকে ও আমাদের ঘরে বেড়ে উঠেছে। ওকে বিয়ে দিব নাকি ঘরে রাখবো সেটা আমাদের ব্যাপার।"

অরণ্য চোখ ভর্তি জল নিয়ে ঝাপসা দৃষ্টিতে সালমার দিকে তাকালো,

____"মা, আমি কি তোমাদের নিজের সন্তান নই বলে আমাকে বোঝা মনে করো?"

কথাটা শুনেও সালমার মুখে কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। সে কর্কশ গলায় শুধালো,

____"আর একবারও তোর ওই ন্যাকা কান্নার শব্দ আমার কানে আসলে না? তোর আমি এমন অবস্থা করবো যে......।"

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আফ্রিদির হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিল,

____"আহা..... আপা এবার চুপ কর।"

____"হ্যাঁ, তোর আস্কারা পেয়েই ও এমন হয়েছে।"

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অরণ্যের সৎ বোন শিশির যোগ করে বলল,

____" মুখপুরী একটা, এত ভালো ঘরের ছেলে তোকে দেখতে এলো, তাও এভাবে বিয়েটা ভেঙে দিলি। দেখবি তোর কপালে কি জোটে, আর তোর মত পেত্নিকে কে বিয়ে করবে রে? একটা রিক্সাওয়ালাকেও তো তোর পাশে মানাবে না।"

কথাটা বলেই শিশির এক কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করল। অরণ্য কোন জবাব দিল না। আফ্রিদি হালকা গলায় বলল,

____"এই ভারী শাড়িটা পাল্টে আয়, যা।"

অরণ্য ধীরে আফ্রিদি বুকের শার্ট ছেড়ে দিয়ে হাত দুটো আলগা করে দিল। সে চলে যেতেই সালমা ডাইনিং টেবিলে ভাতের প্লেট গুলো এক এক করে সাজিয়ে রাখছিল।

'ঠকাস!' 'ঠকাস!' শব্দে বাসন রাখার আওয়াজে সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে যে সালমা ঠিক কতটা রেগে আছে। একটু পর অরণ্য যখন শাড়ি পাল্টে একটা সুতির গোল জামা পরে এল, তখন টেবিলের ভাতের প্লেটের গরম ভাত থেকে ধোঁয়া উঠছে। এতক্ষণের পরিস্থিতির চাপে তার মাথা ভনভন করছিল।

____" আজ তোর ভাত খাওয়া বন্ধ! আজ যে কাজ করেছিস, তাতে তো তোকে না খাইয়ে মেরে ফেলা উচিত।"

আচমকা ধমকে অরণ্য চমকে উঠল। তার চোখে তখনও দরদর পানি। আফ্রিদি সোফায় বসে সবকিছু লক্ষ্য করছিল। সে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সালমাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

____" আচ্ছা, যেহেতু খেতে দিবি না, ও আজ তোদের ঘরে খাবেনা।"

কথাটা বলেই আফ্রিদি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে অরণ্যের দিকে এগিয়ে এলো,

____"চল আমার বাসায় যাবি।"

সালমা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অরণ্যের দিকে তাকালো, আফ্রিদিকে সরাসরি বাধা দিতে পারবে না বলে , চোখের ইশারায় সে অরণ্যকে শাসাচ্ছে। সালমার রাগে বড় বড় হয়ে যাওয়ার চোখ দেখে, অরণ্যের আর রাজি হওয়ার সাহস হলো না।

____" না, না আমি যাব না। আমি চলে যান,মামা।"

যেই অরণ্য কখনো আফ্রিদিকে না বলেনি, সে আজ সবার সামনে অবাধ্যতা করছে। কিন্তু আফ্রিদি বুঝতে পারল এর পেছনে সালমার হাত, সে সালমার দিকে ঘুরে তাকালো।

_____" আজ আমি ওকে নিয়ে যাবো, দেখি তোরা কি করতে পারিস।"

কথাটা বলেই আফ্রিদি অরন্যর বাম হাত ধরে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে তাকে নিজের সাথে নিয়ে যেতে লাগলো। বাড়ির লোহার গেটের বাইরে এসে আফ্রিদি সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিল, সে জানে অরণ্য সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারেনা।

আফ্রিদি এগিয়ে গিয়ে গাড়ির ভেতরে অরণ্যকে বসিয়ে দিল।

____" মামা, এমন করবেন না! পরে আম্মু ভিষণ বকবে।"

____" চুপ!"

আফ্রিদি ছোট্ট একটা ধমক দিল। সেই ধমকের রাগের চাইতে ভালবাসার পরিমাণটা বেশি।

____" চুপ চাপ গাড়িতে ওঠ, না হলে আবার তোকে এখানে রেখে গেলে আমি চলে গেলে যে, তোকে মারবে সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি, তাই চুপচাপ পড়ে থাক।"

অরণ্য কোনো কথা বললো না। আফ্রিদি ড্রাইভিং সিটে বসে, গাড়ি দরজা লক করে দিয়ে অরন্যর দিকে ঝুকে এসে তার গাল দুটো দুহাতের তালুতে নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল,

_____" একদম কাদবি না। আমি আছি তো। তুই কাঁদলে আমার ভালো লাগে না।"

কথাটা বলেই আফ্রিদি অরণ্যর সিটবেলটা বেঁধে দিল।
গাড়ি স্টার্ট নিলো। গাড়ি চলাকালীন আফ্রিদি লক্ষ্য করল অরণ্য এক দৃষ্টিতে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে, তবে তার কান্নার তোরটা এতক্ষণে অনেকটা কমে এসেছে, তার ছোট ছোট হাত দুটো কোলের উপর রাখা।

অরন্যর বাবা-মাকে সেটা সে জানে না। তার বয়স যখন মাত্র ৬ বছর, তখন ইব্রাহিম আর সালমা তাকে বড় করার জন্য নিজেদের কাছে রাখে। অরণ্য ভীষণ ইচ্ছা হয় একবার তার মা বাবার মুখ দেখতে, কিন্তু তারা কি বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে? অরন্যর মনে হয়, বেঁচে থাকলে কি তাকে এভাবে অন্যের বাড়িতে অবহেলায় বেড়ে উঠতে হতো? তার বাবা মা অবশ্যই এতটাও নিষ্ঠুর নয়!
ইব্রাহিম সাহেব একজন ম্যাজিস্ট্রেট, কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার মানবিকতা কোথায়? মাত্র ১৬ বছরের একটা মেয়েকে যে কিনা সদ্য ক্লাস টেনে পড়ে , তাকে এই অল্প বয়সে বিয়ে দিতে চায়? ইব্রাহিম সাহেবের তো টাকা পয়সার অভাব নেই! তাহলে কিসের অভাবে অরণ্যকে তারা বোঝা মনে করে? শিশির সালমা আর ইব্রাহিমের বড় মেয়ে, একটা মেয়ে থাকা সত্ত্বেও কোন কারণে তারা অরণ্যকে পালতে নিয়েছে? মাথায় আসে না অরণ্যের।

আফ্রিদির বয়স ২৯, শরীরের উচ্চতা 6 ফুট। তার প্রশস্ত পেশি বহুল কাঁধ, বুক, পিঠ এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও রেশমের মতো কালো চিকচিকে চুল তাকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে।

আফ্রিদি ঢাকার অন্যতম নামকরা সেন্ট জোসেফ হাই স্কুল, এবং নটর ডেম কলেজ থেকে গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে পাশ করার পর, দেশের বাইরে পাড়ি জমায়। সে আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (MIT) থেকে কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে রেকর্ড সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করে। এরপর প্রযুক্তির সাথে অর্থনীতির মেলবন্ধন ঘটাতে সে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ' পাবলিক পলিসি এন্ড গ্লোবাল ইকোনোমিক্স' বিষয়ে উচ্চতর মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে। সিলিকন ভ্যালির বড় বড় টেক জায়ান্ট কোম্পানিগুলো তাকে কোটি টাকার বেতনে লুফে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু আফ্রিদির লক্ষ্য ছিল অন্য কিছু।

দেশে ফিরেই আফ্রিদি সরাসরি কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দেয় নি। সে প্রথমে নিজের মেধা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের আইটি সেক্টরে দক্ষ করে তুলতে একটি বিশাল অলাভজনক এরেনা এবং start আপ হাব গড়ে তোলে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার এই প্রজেক্ট দেশের অর্থনৈতিক ও তথ্য প্রযুক্তি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়। সে দেশের তরুণ প্রজন্মের অলিখিত আইকন হয়ে ওঠে।


ঠিক এই সময়েই সরকারের আইসিটি ও ডাক, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে একজন দূরদর্শী এবং তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজন দেখা দেয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং আফ্রিদির মেধা, সততা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তার গ্রহণযোগ্যতা দেখে মুগ্ধ হন। যেহেতু সে কোন সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তাই প্রধানমন্ত্রী তার বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে আফ্রিদিকে ' টেকনোক্র্যাট কোটায়' তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও ডাক, টেলি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে ক্যাবিনেটে অন্তর্ভুক্ত করেন।

মাত্র ২৯ বছর বয়সেই সে দেশের ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়। যার এক দিকে রয়েছে অক্সফোর্ড এর প্রজ্ঞা, অন্যদিকে রয়েছে এক ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্ব।

#চলবে .....?





 #সুমাইয়া_তালুকদার  #পার্ট০২দূরে, কত দূরে বুঝতে পারেনি, তবে এটুকু ঠিকই বুঝেছে বোমা দুটো ছিল খুবই শক্তিশালী। ফেটেছে মিনি...
21/08/2026

#সুমাইয়া_তালুকদার #পার্ট০২
দূরে, কত দূরে বুঝতে পারেনি, তবে এটুকু ঠিকই বুঝেছে বোমা দুটো ছিল খুবই শক্তিশালী। ফেটেছে মিনিট তিনেক এর ব্যবধানে। তারমানে মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এখন খোদ ঢাকা শহরেই তৎপর? সাব্বাস ভাইয়েরা আমার! মনে মনে উৎসাহ দিয়ে ডান হাতটা শূন্যে ছুড়ে,' জয় বাংলা' বলে চিৎকার করে উঠতে চায় মিজান, কিন্তু করেনা, কারণ এখন প্রকাশ্যে উচ্চারণ মানেই মৃত্যুকে ডেকে আনা। মিজান কেন, দেশের প্রতিটি বাঙালি জানে, এখন যেমন মৃত্যু থাবা মেলে বসে আছে ঘাসের ডগায়, গাছের ডালে, টিনের চালে, রান্নাঘরের পেছনে ছাই এর গাদায়, তেমনই মুক্তিও মুক্তির আশায় ছটফট করছে নদীর ঢেউয়ে, আকাশে চলমান মেঘের স্তরে, পাখির পাখায়, কৃষকের লাঙ্গলের ফলায়। সব বোঝে মিজান। আরো বোঝে ঘরে বসে শুধু ভাবলে ভাবনাই একসময় তাকে গলা টিপে ধরে বলবে,

' রে কাপুরুষ ভিরু!লজ্জা করে না তোর?'

আপাতত লজ্জা কাটিয়ে ওঠার জন্যই সে জহির, জুয়েল, বুলবুলদের কাজে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে। দেশের জন্য এটুকু কাজ করলেও সে নিজেকেও অন্তত বোঝাতে পারবে আমি ওদের চিনতাম, আমি ওদের কাছে সামান্য হলেও সাহায্য করেছিলাম, সেই সামান্য সাহায্য খান সেনাদের একটু চিন্তায় ফেলেছিল।

জহির, জুয়েল, বুলবুলদের কাজ ছিল এসএসসি পরীক্ষা বানচাল করতে হবে। মিজান এসব পরিকল্পনার কিছুই জানেনা। গত বুধবারই বিকেলে অফিস থেকে ফিরে এসে দেখে বাইরের ঘরে জহির একটা পাতলা লম্বা শ্যামলা ছেলের সঙ্গে কথা বলছে। ছেলেটিকে মিজান আগে কোনদিন দেখেনি। জহিরের অনেক বন্ধুকেই চেনে মিজান, অনেককেই দেখেছে সামনে বড় হয়ে উঠতে। এদের মধ্যে তো কয়েকজনের ছিল মিজানের রান্নাঘর পর্যন্ত অবাধ যাতায়াত, তার মধ্যেও বাদল নামের ছেলেটির অধিকার বেশি ছিল। সে মিজানের স্ত্রী আনুকে কিছু বলারও প্রয়োজন মনে করত না, মিটসেফ খুলে সামনে যা খাবার পায়, তুলে মুখে দেয়। আনু একদিন রাগ করেই বলেছিল,

'তোমার একি স্বভাব বাদল!

' খাবার জিনিস সামনে পেলে খাব না?'

'তাই বলে জিজ্ঞেসও করবে না?'

' জহির কি সব সময় আপনাকে বলে খায়?'

আনু বলতে যায় জহির আর তুমি কি এক? কথাটা জিবের আগায় এসে গিয়েছিল। নিজেকে সংযত করে। ভাবে, কিছু কিছু ছেলে মেয়ে আছে যারা জোর করে আদর আদায় করে নেয়, অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সব সময় কার ভালো লাগে? সে বাদলকে আর কিছু বলতে গিয়েও বলে না।

বাদল সেই থেকে অনেক দিন আসেনি। আনু জিজ্ঞেস করে জহির কে।

' বাদল আর আসে না কেন?'

' মনে হয় আপনার ওপর রাগ করেছে।'

' বলেছে কিছু?'

' না, তবে আমার তাই ধারণা।'

লজ্জা ও কষ্টে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে আনু। আনু জহিরের ওপরেও তো রাগ করে। বিয়ে হয়ে এসে জহিরকে এত ছোট পেয়েছে যে নিজের সন্তানের মতই মনে করেছে, মানুষ করেছে। তাই জহিরের বন্ধুরাও যেন জহির। এভাবেই চলছিল, মাঝ থেকে বাদল টা একটু বাড়াবাড়ি করেছে বলেই না আনুর রাগ হয়েছিল।

জহির-বাদলদের বয়সী একটা ছেলে জহিরের সঙ্গে কথা বলছে দেখে মিজান ভেতরে এসে বলে আনু কে,

' জহিরের সঙ্গে যে ছেলেটি কথা বলছে, তুমি তাকে চেনো?'

' না।'

' আগে কোনদিন দেখেছো?'

' না।'

আনুর জবাবের মধ্যে একটা চাপা রাগ আছে বুঝতে পারে
মিজান। রাগ হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়, কারণ এখন সময়টাই এমন যে নতুন কোন মুখ দেখলে বুকের মধ্যে ভয় দানা বেঁধে ওঠে, মনে হয় কোন মতলবে এসেছে কে জানে। আনুদের দেশের বাড়িতে তারই এক মামাতো ভাইকে ১৫-১৬ বছরের এক কিশোর খান সেনার হাতে তুলে দিয়েছে। ছেলেটি ছিল এক মুসলিম লীগের ছেলে।

মামাতো ভাইটি ছেলেটিকে চিনতো। চিনতো বলে তার ঘন ঘন যাওয়া আসায় কিছু মনে করেনি, একদিন তার সামনে বঙ্গবন্ধু বেঁচে আছে না মরে গেছে বলে তার ভাগ্য নিয়ে বেশ মন খারাপ করেছিল, এই মন খারাপটাই তার কাল হয়ে দাঁড়ায়। খান সেনারা ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় শুধু বলেছিল,

' চলো,চলো, তোমাকে শেখ মুজিবর এর কাছে দিয়ে আসি।'

আনুর সেই মামাতো ভাই আর ফিরে আসেনি। সেই ঘটনার কথা ভোলেনি মিজান। তাই ভাবে, এইসব অচেনা ছেলের সঙ্গে জহিরের কিসের এত আলাপ? ডাক দেয় মিজান,

' জহির!'

জহিরের আলাপে ছেদ পড়ে। উঠে আসতে আসতে বলে,

' বিষয়টি আরো একটু ভাবতে হবে।'

এই কথাটিও কানে যায় মিজানের। জহির এলে বলে মিজান,

' ছেলেটি কে রে?'

' আমার এক ক্লাসমেট। জুয়েল।'

' আগে কোনদিন দেখিনি তো।'

' ও থাকে নারিন্দায়।'

অবাক হয় মিজান। কোথায় নারিন্দা আর কোথায় সিদ্ধেশ্বরী বয়েজ হাই স্কুল। ওই এলাকায়ও তো হাই স্কুল আছে। খটকা লাগে মিজানের। দূরত্বের কারণে নয়। এই বিপদের দিনে মানুষ যেখানে ঘর থেকে বারান্দায় পর্যন্ত যেতে চায় না, সেখানে নারিন্দা থেকে এখানে আসাতে মিজান ইশারায় জহির কে ভেতরে শোবার ঘরে যেতে বললে বোঝে জহির। গলাটা নামিয়ে বলে,

' আমি আপনাকে সব বলব।'

' কখন?

' ও গেলেই।'

জহির আবার বাইরের ঘরে গেলে মিজান পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখে জুয়েল মুখে একটা সন্দেহের ছাপ নিয়ে পর্দার দিকেই তাকিয়ে আছে। ধরা পড়ে গেছে মিজান। নিজের ঘরে ফিরে যেতে দুই পা বাড়াতেই শুনে পর্দার কাছ থেকে ডাকছে জুয়েল,

' ভাই এদিকে একটু আসবেন?'

জুয়েলের সে ডাক এড়িয়ে যাওয়া যায় না। সে ডাক শুধুই ডাক, না কাকুতি মিনতি, না নির্দেশ প্রথমে বুঝতে পারেনা মিজান। তবে এটা বোঝে সে ডাকে তার পা আটকে গেছে। এই বয়সের একটা ছেলে, কোন শক্তিতে তার চলা বন্ধ করে দেয় বুঝে উঠতে উঠতে বাইরের ঘরে ঢুকলে জুয়েল শান্ত গলায় বলে,

'ভাই ভয়ের কিছু নেই।'

' না, না আসলে, ব্যাপারটা বোঝই তো!'

' ভাই, এখন আর বোঝাবুঝির সময় নেই। হয় বাঁচব, না হয় মরবো, এই তো?'

থমকে যায় মিজান। জুয়েলের বয়স কত? জহিরের যা বয়স ওরও তো তাই হবে! কিন্তু এই বয়সেই সে যেন ৫০-৬০ এর অভিজ্ঞতা নিয়ে বসে আছে, যেখানে মৃত্যু ও জীবন শুধু একটা সুতোর উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে বাঁচার জন্যই যে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া দরকার তা এই কিসের জন্য তাকে ধাক্কা মেরে শিখিয়ে দিচ্ছে।

শান্ত গলায় বলে জুয়েল,

' ভাই আমরা যে কাজটা করতে যাচ্ছি তা করা খুব জরুরী।'

' কি কাজ?'

' আমরা এসএসসি পরীক্ষা হতে দেবো না।'

জুয়েলের গলায় দৃঢ়তা দেখে অবাক হয়ে মিজান। মনে হয় সে যেন মৃত্যু হাতের মুঠোয় নিয়ে নাচাচ্ছে। অবাক গলায় জানতে চায়,

' কিন্তু কিভাবে?'

' সেই ব্যাপারে জহিরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আগে আমাদের প্ল্যানটা ঠিক হোক, তারপর আপনাকে জানাবো।

মিজানের জানতে ইচ্ছা হয় প্লানটা কি? কিন্তু জুয়েলের মুখের ভাব বলছে সে পরিকল্পনাটা এখন জানাবে না। উদ্দেশ্যটা জানিয়েছে, যেন আপাতত এটুকুই থাক, এর বেশি জানতে চাইলে জুয়েল ভাবতে পারে জহিরের ভাই এত উৎসাহ দেখাচ্ছে কেন? ধীরপায়ে মিজান বাসার ভেতরে চলে এলে আনু বলে,

' জহির কে কি বলে দেব?'

' কি বলবে?'

' বাসায় এসব মিটিং-সিটিং ভালো লাগছে না।'

মিজান আনুর হাত ধরে বসায়। হাতটা ধরে মিজান বোঝে আনু কাঁপছে। মিজান নিজেও যে কাঁপছে তা কি বুঝতে পারছে আনু? ভয় ও চিন্তা তার মাথায় কি কম? অফিসে করাচি হেড অফিস থেকে এক বড় সাহেব বদলি হয়ে এসেছে, কেন এসেছে একথা একেবারে বোকা-সোকা লোকটিও বুঝতে পারে। লোকটি পাঞ্জাবি। রানা সাব্বির আহমদ খান। মিজানদের অফিসে সাড়ে তিন শ কর্মচারীর মধ্যে জনা চল্লিশেক অবাঙালি। মিজানের মনে হয় এই কয়দিনের মধ্যেই ওই ৪০ জন যেন চার শ থেকে চার হাজার লোকের শক্তি লাভ করেছে। সেই চার হাজারের নেতা রানা সাব্বির আহমদ খান। মিজান শুধু একা নয়, প্রত্যেক বাঙালি কর্মকর্তা কর্মচারীই লক্ষ্য করছে প্রত্যেকদিন নিয়মিত দু চার জন অবাঙ্গালি সাব্বির খানের সঙ্গে গলা নামিয়ে কথা বলছে। কোন বাঙালি ঘরে ঢুকলেই কথার ধরন পাল্টে যায়। মিজান একদিন সহকর্মী সালেক কে বলে,

' বাইরে আতঙ্ক, ভেতরে এই দম বন্ধ করা পরিবেশ, আর তো সহ্য হয় না!'

সালেক মিজানের মুখ চেপে ধরে বলে,

' যা বলেছেন আমাকেই বলেছেন। আমি যে আপনার ক্ষতি করব না তার কি কোন গ্যারান্টি আছে?'

সালেকের দিকে অবিশ্বাসী চোখে তাকায় মিজান। সালেক বুঝে মিজান ভয় পেয়েছে। পিঠে হাত রেখে বলে,

' পারতপক্ষে মুখ খুলবেন না। দেওয়ালেরও কান আছে। আর সব বাঙালিই যে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, আপনি ভাবলেন কি করে?'

কথাটা বুঝেও মিজান যেন বুঝতে চায় না। বাঙালি বাঙালির সর্বনাশ করবে-----এমন সর্বনাশা কথা ভাবতেও গা, হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও স্বাভাবিক। মিজান জানে মীরজাফরও তো নিজেদেরই লোক ছিল, নরওয়ের কুইসলিংও ছিল সে দেশের প্রধানমন্ত্রী। মীরজাফর হাত মিলালো ক্লাইভের সঙ্গে, কুইসলিং মিলালো হিটলারের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করে সালেক,

' কি ভাবছেন? আমি কি মিথ্যা বলছি?

' না।'

' সেই জন্যই ঘরের শত্রু বিভীষণের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সজাগ থাকবেন। রানা সাব্বিররা তো আমাদের পরিচিত শত্রু।'

এটাও বোঝে মিজান। এদের বুঝতে চোখ বন্ধ করে চিন্তা করতে হয় না। এদের ভাষা বলে এরা আমাদের শত্রু, এদের চেহারা, এদের পোশাক আচার-আচরণই বলে দেয় এরা আমাদের কখনোই বন্ধু নয়। কিন্তু যারা আমাদের এই ভাষায় কথা বলে, বাঙালি পোশাক পরে, ভাত খায়, এই মাটিতেই জন্ম, তাদেরি যদি কেউ কেউ শত্রু হয়ে যায় তাহলে বাঁচার উপায় কি? এমনিতেই অফিসের কাজে মন নেই, তার ওপর এই বিপদজনক আশঙ্কায় কতক্ষণ শাস্তিতে থাকা যায়। মনের ওপর একটা ভার চেপে থাকে।

অফিস থেকে ভার মন নিয়েই বাসায় ফিরে জুয়েলকে দেখে তার মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল। সেকি জুয়েল কে বলবে তুমি এসো না? বলতে পারেনা মিজান।

অস্বস্তিটা কাটেনা, কিছুতেই কাটেনা। বিকেলে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় আসে। অনেকদিন বারান্দায় বসে চা খায় না মিজানরা। অথচ এটা ওদের প্রিয় অভ্যাস ছিল। বিকেলে মিজান, আনু, জহির বাসায় থাকলে জহির, কখনো কখনো জহিরের দু একজন বন্ধু, মাঝে মাঝে পাড়ার এ-ও চায়ে অংশ নিতো। কিন্তু এখন কি করে নেয়? সামনেই যে আনসার হেডকোয়ার্টার! এই গ্রাম বাংলারি চাষা ভুসা সাধারণ ঘরের ছেলে-যুবারা লুঙ্গি মালকোচ মেরে পড়ে কোয়ার্টারের মাঠে লেফট রাইট করে, মিজানরা চা খেতে খেতে তাদের অসংখ্য ভুলে ভরা লেফট রাইট দেখে। তাদের ভুল দেখে, মুখে সরলতা দেখে হাসতো মিজানরা। হঠাৎ সেই সহজ-সরল গ্রামের ছেলেগুলো কোথায় গেল? স্পষ্ট মনে আছে মিজানের। আজ এই বারান্দায় বসে কাপে একটা চুমুক দিয়ে সামনে হেডকোয়ার্টারের মাঠে তাকিয়ে মনে পড়ে সেই ১৮-১৯ বছরের যুবকটি প্যারেড করতে করতে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠলো। কেন কাঁদে? কেন কেঁদে উঠলো? খানিক পরে জানতে পারে তার মা নিশ্চয়ই পিঠে বানিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ সে যেতে পারছে না। ছেলেটি ছুটি তো পাইনি, উল্টো শাস্তি, তাকে বোচকা বান্ডেল নিয়ে দুই দিন চার ঘন্টা-চার ঘন্টা আট ঘন্টা করে মাঠে দৌড়াতে হয়েছে। ছেলেটির সহজ কচি পাতার মতো মুখের প্রতিটি শিরা-উপশিরা দেখতে পেয়েছিল মিজান। চোখে দরদর পানি, কিন্তু ছুটি নেই। ঐরকম সরল ও আরো বোকাসোকা ছেলেগুলো মার্জের সাতাশ তারিখের মধ্যেই কোথায় চলে গেল? ছেলেটি কি তার মায়ের কাছে যেতে পেরেছিল? কে জানে, কে বলতে পারবে ওই কুচকুচে কালো ছেলেটা কোথায় গেল? সন্ধ্যার গাঢ় হয়ে এলেই কোয়ার্টারে তার ঘরে গলা ছেড়ে ভাওয়াইয়া গান গাইতো, গান শুনেই বোঝা যেত তার বাড়ি রংপুরের ওদিকেই হবে। মুখে বসন্তের দাগ, অসম্ভব হাসিখুশি ছেলেটি কি বেঁচে আছে? এখন যা চলছে তাতে কে বেঁচে আছে আর কে মরে গেছে তা জানার উপায় নেই, হঠাৎ যদি না সামনে এসে হাজির হয়।

আনসার হেডকোয়ার্টারটা রাতারাতি একটা ছোটখাট ক্যান্টনমেন্ট হয়ে গেল। মার্চের ছাব্বিশ তারিখের গভীর রাতে গাড়ির পর গাড়ির শব্দ শুনে মিজান, আনু, জহির অন্ধকার ঘরে জালনার পর্দা ফাঁক করে দেখতে পায় একসাথে ১১ টি ট্রাক আনসার অফিসের বড় গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে। জলপাই রংয়ের গাড়ি, জলপাই রংয়ের ত্রিপলে ঢাকা পেছনের অংশে ওই জলপাই রঙেরই চকরা বকরা পোশাক পরা মিলিটারিরা বসে, মিজানরা পেছনের গাড়িগুলোর হেডলাইটে মানুষগুলোকে দেখে ঠিকই বোঝে এরা কেউ এ দেশের নয়, ১০০০ দেড় হাজার মাইল দূর থেকে এরা এসেছে। তার অর্থ ভদ্রপাড়ায় একটা ক্যান্টনমেন্ট, তার চেয়েও বড় অর্থ পাকিস্তানের শত্রুদের খতম করার জন্য তারা এভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে।

এমনিতেই মিজানদের মনে ভয় ও আতঙ্ক, গতরাতে রাজার বাগ পুলিশ লাইন্সে প্রচন্ড গোলাগুলি শব্দে তারা কেউ দু চোখের পাতা এক করতে পারেনি, তার ওপর সন্ধার পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিওতে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে সমস্ত বাঙ্গালীর গায়ের রক্ত হীম হয়ে যাওয়ার কথা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেপ্তার, বন্দী। হুংকার ছেরেছেন ইয়াহিয়া খান,

'এইবার শেখ মুজিবকে আর রেহাই দেওয়া হবে না। শাস্তি তাকে পেতেই হবে, সে বিশ্বাসঘাতক, তার আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র করেছে।'

ইয়াহিয়ার ভাষণ শুনে মিজানের মনে হয়েছিল চিৎকার করে বলে, ইয়াহিয়া, বিশ্বাসঘাতক তুমি, তুমি আলোচনার নামে সময় নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য এনে নিরীহ নির্দোষ নিরস্ত্র বাঙালির উপর লেলিয়ে দিয়েছো; কিন্তু বলতে পারেনা মিজান, তখন বলতে পারেনা কেউই, শুধু আক্রোশের বাতাসে ঘুষি মারা ছাড়া কিই বা করতে পারে? মনে প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে শুয়ে পড়েছিল কিন্তু চোখে ঘুম নেই, যেন জনমের মতো ঘুম বিদায় নিয়েছে।

তার মধ্যে আজ নাকে ডগায় ক্যান্টনমেন্ট বসে গেল। বারান্দায় আনুও বসে। বলে,

' এখানে বসে চা খাচ্ছ কেন?'

' আমার কিছুই ভালো লাগছে না। বাইরের ঘরে চা দিয়েছো?

মিজানকে অবাক করে দিয়ে জবাব দেয় আনু,

' জুয়েল না বলেই চলে গেছে।'

' কেন? না বলে গেল কেন?'

' তার আমি কি জানি? জহির কে জিজ্ঞেস করো।'

মিজান ডাকে জহির কে। জানতে চায়, জুয়েল চা না খেয়ে চলে গেল কেন?
জহিরের জবাব থেকে মিজান বুঝতে পারে ,

'এখন চা খাওয়া না খাওয়া কোন ব্যাপার নয়, এখন সবচেয়ে বড় ব্যাপার পরীক্ষাটা কিভাবে বানচাল করা যায়। এখন চাই শুধু করার মত একটা কাজ। চাই এমন একটা কিছু করতে যাতে পাকিস্তানিরা লেজ গুটিয়ে পালানোর সুযোগ না পায়, একটা একটা ধরে কচুকাটা করতে পারলে তবেই শান্তি।'

জহির সহসা বুঝতে পারে তার গলাটা হঠাৎ চরে গেছে। বারান্দায় বসে এভাবে চড়া গলায় কথা বলা ঠিক নয়। সে সময় নিচে থেকে ডাকে বাদল,

' জহির আছিস?'

জহির গলা বাড়িয়ে বাদলকে উপরে আসতে বলে সামান্য হাসে।

'হাসলি কেন?'

' হাসলাম, চা-টা আছে ওর ভাগ্যে, জুয়েল খাবে কেন?

বলে আনু,

' আমার তো মনে হল রাগটাগ কিছু না। অনেকদিন এ বাসায় কিছু খায় না তাই এসেছে।'

বাইরের ঘরের দরজায় কড়া নড়ে। জহির উঠে যায়, আনু মিজানো। এতজন মানুষ বারান্দায় বসে কথা বলা ঠিক নয়। অনু ঘরে ঢুকেই বলে,

' কি ব্যাপার বাদল, এতদিন আসোনি কেন?'

' ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত।'

' কিসের ব্যস্ততা?'

' পড়া। পরীক্ষা। সামনে এসএসসি পরীক্ষা না?'

বাদলের এই জবাবে কোন ভান নেই। পরীক্ষাটাকে সে যে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বুঝতে পেরে মিজান শুধু জবাব দেয়,

'ও!'

অবাক হয় বাদল,

' ভাই, আমাদের এই পরীক্ষাটাকে মনে হয় কোন গুরুত্বই দিলেন না?'

' না, না, তা নয়। আমি ভাবছি দেশের যা অবস্থা, তার মধ্যে পরীক্ষা হবে তো?'

' কি যে বলেন, পরীক্ষা হবে না, পরীক্ষার বাপ হবে। আব্বার কাছে শুনেছি, পরীক্ষা যাতে হয়, ভালোভাবে হয়, তার জন্য government সমস্ত ব্যবস্থা নেবে।'

বাদলের দৃঢ় জবাবে জহির জালানা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশে তখন কালো মেঘ জমেছে, সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই বলে পাখিরা আকাশের এ মাথা ও মাথা করছে, তখনো পশ্চিম আকাশে অবশ্য সূর্যের আভা বেশ উজ্জ্বল। বাদল লক্ষ্য করে, তার এই দৃঢ় জবাবে জহির নিজে একজন পরীক্ষার্থী হয়ে কোন জবাবই দিল না। সে অবাক হয়ে জানতে চায়,

'কিরে জহির, তুই যে কিছু বলছিস না?'

' কি বলবো?'

' তোর ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে পরীক্ষা কোন ব্যাপারই না।'

'আমি আসলে ভাইয়ের কথাই ভাবছিলাম।'

ডান হাতের মধ্যমা আঙ্গুলি দিয়ে টুসকি দেয় বাদল। চায়ে চুমুক দিয়ে বলে,

'এর নাম পাকিস্তানি আর্মি। আব্বা বলছিলেন, পৃথিবীর বেস্ট আর্মি। এদের সামনে কয়েকটা ছেলে ছোকরা দাঁড়াতে পারবে?'

জবাব দেয় আনু,

' এদের সাথে যদি ইন্ডিয়ান আর্মি যোগ দেয়?'

হো হো করে হেসে ওঠে বাদল। বলে,

' ভাবি, ইন্ডিয়ান আর্মি হচ্ছে ভিতুর ডিম। এই গতরাতেই আব্বা বলছিলেন ৬৫ সালের যুদ্ধে ইন্ডিয়ান আর্মি লেজ তুলে পালিয়েছে।'

জহিরের ইচ্ছা হয় বাদলকে টেনে একটা থাপ্পর মারে। ভাবে, নিজের মগজ ধোলাই তো হয়েছেই, অন্যের মগজেও ধোলাই করতে এসেছে। কিন্তু অত সহজ না। শুধু বলে,

'মনে হচ্ছে তোর প্রিপারেশন ভালই হয়েছে।'

' খারাপ না। তোর?'

' চেষ্টা করছি।'

বাথরুমে যাওয়ার নাম করে উঠে যায় জহির। বাদলকে দেখে জহিরের মনে হয়েছিল ওকে বলবে, বাদল রে, উচিত নয়, এই অবস্থায় পরীক্ষা দেওয়া উচিত নয়। ভালোভাবে পরীক্ষা হওয়ার মানে পাকিস্তানিদের জয়। ভালোভাবে পরীক্ষা হলেই ওরা গলা ফাটিয়ে সারা পৃথিবীকে বলবে, সবকিছু নরমাল, সবকিছু ঠিকঠাক মত চলছে। ভাগ্যিস কথাটা শুরু করেনি। ওর আর বাইরের ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে না করলেও কি হবে। বাদল ডাকে,

' জহির কোথায় গেলি?'

ইচ্ছে করে খানিক দেরি করে ঘরে ঢুকে বলে জহির,

' হ্যাঁ বল।'

'মনে হল জুয়েল এসেছিল?'

' হ্যাঁ।'

' ঠিকই দেখেছি। তা এত দূর থেকে কেন এসেছিল?'

' এই পরীক্ষার ব্যাপারেই আলাপ করতে।'

মাথা ঝাকাতে ঝাকাতে বলে বাদল,

'ও তো ভালো ছাত্র। ওর আর চিন্তা কি?'

' তবুও এসএসসি, মানে স্কুল জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার পরীক্ষা। এই পরীক্ষাকে তো আর খাটো করে দেখা যায় না।'

মাথা আরো ঝাকায় বাদল, কিন্তু কোন জবাব দেয় না। জহিরের বুঝতে কষ্ট হয় না, ভালো ছাত্র জুয়েল তাদের মত সাধারণ ছাত্রদের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছিল বাদল এটা বিশ্বাস করেনি। না করে না করুক। সে আর কথা বাড়িয়ে বিষয়টি উসকে দিতে চায় না।

বাদলের ওই খাই খাই স্বভাব ছাড়া খারাপ লাগার মতো অন্য কিছু মিজান বা আনুর চোখে পড়েনি। তাছাড়া হইচই স্বভাবের জন্য ওর প্রতি ওদের আলাদা একটা টানও ছিল। কিন্তু সেই হইচই এর বাদল আর আজকের বাদলের মধ্যে কি আকাশ পাতাল পার্থক্য! সে যেন এখন আর কিশোর নেই, যুবুকও নয়, সে অনেক বয়সে পৌঁছে গেছে। মিজান আর আনু অবাক হয়ে বাদলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

হাতের ঘড়ির দিকে তাকায় বাদল। মনে হয় উঠবে, কিন্তু ওঠার কোন তারা লক্ষ্য করেনা মিজান, আনু ও জহির। কিছু কি বলতে চাই বাদল? ওরা তিনজন চোখের পলকে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে নেয়। হ্যাঁ, বাদল ঠিকই কিছু বলতে চায়, জানতে চায় বাদল,

' হ্যাঁরে জহির, পরীক্ষা যাতে না হয় সেই রকম চেষ্টা করছে কেউ কেউ?'

' কই তেমন তো কিছু শুনিনি! তুই কিছু শুনেছিস?'

' হ্যাঁ। ওই যে শুক্রাবাদে আমার খালাতো ভাই নঈম আছে না? নঈমও তো এবার পরীক্ষা দিচ্ছে। ওই বলছিল কারা নাকি পরীক্ষা হতে দেবে না।'

অবাক গলায় জানতে চায় আনু,

' কারা?'

' কার আবার! বোঝেননা? ওই যে যারা গুলতি দিয়ে পাকিস্তানি আর্মি মেরে শেষ করবে বলেছে।'

জহির হেসে বলে,

' আসলে তোর কথাই ঠিক, পরীক্ষা হবে না তো পরীক্ষার বাপ হবে। পাকিস্তানি আর্মির কাছে কোন টালটি বালটি চলবে না।'

উঠে দাঁড়াই বাদল, জিজ্ঞেস করে মিজান,

' চললে?'

' যাই, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সন্ধ্যার আগে বাসায় না ফিরলে আব্বা আম্মা ভীষণ চিন্তা করবেন।'

জহিরের মুখে এসে যায়, কেন, পাকিস্তানি আর্মি সারাদেশ টাইট দিয়ে ফেলেছে আর চিন্তা কিসের? কিন্তু সে খানিক চুপ থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,

' আসলে চিন্তার কথাই।'

দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বাদল জানায়,

' যদি দেখি পরীক্ষা দেওয়াই যাচ্ছে না তাহলে করাচিতে মামার কাছে চলে যাব। ওখানে পরীক্ষা দেব।'

হাসে জহির,

' আমার তো করাচি-ইসলামাবাদে কোন মামা চাচা নেই, আমার যে কি হবে?'

উৎসাহিত হয়ে ওঠে বাদল।

' তুই যেতে চাস? সে ব্যবস্থা আমি করতে পারি।'

শান্ত গলায় জবাব দেয় জহির,

' না ভাই, দেশ ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা নেই।'

থমকে যায় বাদল।

' কেন, ওটা আমাদের দেশ না?'

মিজান ও আনুর বুক কেঁপে ওঠে। কি বলতে কি বলবে জহির, ভেবে ওরা ভীত চোখে তাকায় জহিরের দিকে। ওদের আর বুঝতে বাকি নেই, কিছু কিছু বয়সী লোকই শুধু স্বাধীনতার বিপক্ষে নয়, তাদের ছেলে মেয়েরাও। একটি প্রমাণ তো তাদের সামনেই। বাদল তখনো জবাব পাওয়ার আশায় জহিরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার তাকিয়ে থাকা যেন বলে দিচ্ছে, যদি হ্যাঁ বলিস তাহলে বেঁচে গেলি, আর না বললে জানিস খরচের খাতায়।

জহিরান ম্লান হেসে বললো,

' হ্যাঁ এখন পর্যন্ত তাই।'

জহির বেশ কায়দা করে জবাব দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু বাদল কি বলে, বাদল যদি বলে তার মানে এক দেশ আর থাকবে না, তার অর্থ পাকিস্তানের আয়ু শেষ, অর্থাৎ তুই বলতে চাস পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবে? না, বাদল এসব কোন কথা বলে না, শুধু জানায়,

'পাকিস্তান থাকার জন্যই এসেছে।'

' হ্যাঁ, জিন্না এই কথাই বলেছিলো। বলেছিল পাকিস্তান হ্যাজ কাম টু স্টে।'

বিরক্ত হয় বাদল,

' তুই জিন্নাহ সাহেবকে শুধু জিন্না বললি? তিনি তো কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জাতির পিতা।'

বাদলের এই বিরক্তিতেও জহিরের কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। খুব স্বাভাবিক গলায় বলে,

' কেউ তা অস্বীকার করছে না।'

এমন সময় আনসার হেডকোয়ার্টারে ছয়টা বাজার ঘন্টা পরে। তার মানে কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা নামবে। বাদল নিজেই বাইরের ঘরের দরজা খুলে প্রথম সিঁড়িতে পা রাখার আগে বলে,

' জহির একটা কথা শুনে যা।'

' বল।'

' একটু নেমে আয়।'

বাদলের সঙ্গে নেমে যায় জহির। সিড়ির মাঝখানে গিয়ে নিচু গলায় বলে বাদল,

' শুক্রাবাদ এর খালাতো ভাই নঈমের কথা বললাম না? নঈম বাসায় ফোনে হুমকি পেয়েছে।'

' হুমকি!'

' হ্যাঁ হুমকি। বলেছে পরীক্ষা দিতে গেলে নাকি লাশ ফেলে দেবে। বল, এসব কথা শুনে পড়াশোনায় মন বসে?'

জহির হা হু কিছুই বলে না। বলেই যায় বাদল,

' তুই যদি এরকম কোন খবর পাস, জানাস। আর শোন, জুয়েল টুয়েলদের পাত্তা দিস না।'

'কেন?'

' এই পাড়ায় অচেনা একটা ছেলেকে দেখলে তোদেরও বিপদ হতে পারে, ওরও বিপদ হতে পারে।'

' ও আচ্ছা।'

বাদল আর কথা বাড়ায় না। তরতর করে নেমে যায়।

বাদল চোখের আড়াল হয়ে যেতেই জহির মিটমিট করে হাসতে হাসতে উঠে আসে। অবাক হয়ে জানতে চয় মিজান,

' কিরে, হাসিস কেন?'

' হাসছি, কারণ বাচ্চা রাজাকারের মনে ভয় ঢুকে গেছে।'

' মানে?'

' আমি আর জুয়েল যে প্লান করছিলাম, সে প্লান ঢাকাতেই আরো কয়েকটা জায়গায় হচ্ছে। বাদল সেইরকমই বলে গেল।'

মিজান আবেগে জহিরের হাতটা চেপে ধরলেও মনে ভয়টা ঠিক থেকে যায়। জহিররা যা করতে চাচ্ছে তাতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। দিলে পাকিস্তানের দালালদের জয়, মানে পাকিস্তানের ঢাক ঢোল পেটানো, পিটিয়ে পিটিয়ে বলবে,

'নরমাল, পূর্ব পাকিস্তানের সবকিছু স্বাভাবিক, নইলে ভালোভাবে এসএসসি পরীক্ষা হয়?'

আর ভয়টা?, যদি ধরা পড়ে? ধরা পড়ার অর্থ তো একজনের নয়, এ বাড়ির সবার মৃত্যু, পাড়ার আশেপাশের আরো যে কেউ জড়াবে না, কে জানে!

আশা ও ভয় নিয়েই মিজান ঘুমাতে যায়। কিন্তু ঘুম আসে না। বুঝতে পারছে রাত বাড়ছে, কিন্তু ঘুম কোথায়! ঠিক তখনই শোনে মিনিট তিনেকের ব্যবধানে দুইটা বোমা ফাটলো। বোমার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় আনুর। সে উঠে বসে মিজানকে ডেকে বলতে যাওয়ার আগে মিজান বলে,

' শুনেছ?'

' শুনেছি।'

'ওরা আছে।'

'হ্যাঁ, ওরা আছে।'

'জহিরদের মনে হয় বাধা দেওয়া উচিত নয়।'

আনুও দৃয় গলায় বলে,

' অবশ্যই বাধা দেওয়া উচিত নয়।'

#চলবে ..........?

#রশিদহায়দার



Address

Rangpur
5400

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when মৃণালিনী নক্ষত্রা posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share

Category