23/04/2026
"বিটিভি ও রেডিওর নেশা থেকে ২ হাজার বইয়ের পাঠাগার: আমার পাঠযাত্রার গল্প"
শৈশবের শুরুটা বই দিয়ে নয়, ছিল বিটিভির 'আলিফ লায়লা' আর রেডিওর গানে। সত্যি বলতে, পাঠ্যবইয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র টান ছিল না। এমনকি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত দেখে দেখে রিডিং পড়তে আমার রীতিমতো কালঘাম ছুটে যেত। আমার জগৎ তখন দখল করে ছিল ভাড়ার ভিসিডিতে দেখা বাংলা সিনেমা, বিটিভির সেই জাদুকরী সব সিরিজ আর বাবার রেডিও। সকালে 'গানের ডালি', দুপুরে সিনেমার গান আর বিকেলে খুলনা বেতারের সুর না শুনলে যেন দিনই কাটত না।
বাকি সময়টা কাটত সমবয়সীদের সাথে ধুলোবালিতে—ক্রিকেট, ফুটবল, মার্বেল কিংবা গোল্লাছুট খেলে। স্কুলকে মনে হতো অনেকটা কারাগারের মতো। তবে মায়ের কড়া শাসনের কাছে আমার সব ফাঁকিবাজি হার মানত। তিন বেলা ভাত খাওয়ার শর্তই ছিল একটাই—স্কুল যেতে হবে। স্কুলের ভয়ে কিংবা টিভির মোহে যখন লুকিয়ে থাকতাম, দাদী খুঁজে বের করে এক প্রকার জোর করেই আমাকে স্কুলের গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসতেন।
পরিবর্তনটা এল চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার পর। রিডিং পড়া শেখার পর হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলাম পত্রিকার বিনোদন পাতা! শুক্রবারে বিটিভিতে কোন সিনেমা দেবে, সেই খবরটা জানার নেশায় স্থানীয় বাজারের সেলুনে গিয়ে পত্রিকা পড়তাম। পড়ার প্রতি এই আগ্রহটি বাবার নজর এড়ায়নি। তিনি বাড়িতে পত্রিকা আনা শুরু করলেন এবং আমাকে দিয়ে জোরে জোরে পড়িয়ে শুনতেন।
বাবা-মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিন্তু শিক্ষার গুরুত্ব তাঁরা জানতেন মর্মে মর্মে। বাবা আক্ষেপ করে বলতেন, "বাবা, ছোটবেলায় এতিম হওয়ায় পড়াশোনার সুযোগ পাইনি। তুমি ভালো করে পড়ো। আমাদের চোখ থাকলেও আমরা আজ জগতের আলো থেকে বঞ্চিত।" বাবার এই কথাগুলো মনের ভেতর অবচেতনেই এক গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল। পঞ্চম শ্রেণি পার হওয়ার আগেই পড়ার ঝোঁক বাড়ল; ছোট মামার আলমারি থেকে লুকিয়ে আনা প্রেমের উপন্যাস বন্ধুকে নিয়ে গোপনে পড়ার রোমাঞ্চ আজও মনে পড়ে।
জীবনের মোড় ঘুরে গেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পর। পরিচয় হলো মোকছেদুর রহমান (দুলু) ভাইয়ের সাথে। আমার পড়ার নেশা দেখে তিনি তাঁর পারিবারিক লাইব্রেরি থেকে বই আর জাতীয় পত্রিকা পড়ার সুযোগ করে দিলেন। তাঁর উচ্চশিক্ষিত পরিবারের গল্প আর জীবনের গভীর বোধের কথাগুলো আমার সামনে নতুন এক দিগন্ত খুলে দিল। বই তখন কেবল অক্ষর নয়, আমার কাছে জীবনের মানে হয়ে দাঁড়ালো।
বইয়ের প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই ইচ্ছা জাগল—নিজের এলাকায় যদি একটা লাইব্রেরি থাকত! ভাবনাটা শেয়ার করলাম বন্ধু মিন্টু রহমানের সাথে। অবিশ্বাস্যভাবে, মাত্র একদিনের উদ্যোগে মিন্টু পীরগাছা বাজারে জায়গা ভাড়া করে পাঠাগারের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করে ফেলল। সাথে পেলাম বড় ভাই সরকার হাসান এবং দুলু ভাইয়ের পরিবারের মান্না ভাইয়ের অকুণ্ঠ সমর্থন।
আজ আমাদের সেই ক্ষুদ্র স্বপ্ন 'অগ্রদূত দুলু পাইকার স্মৃতি পাঠাগার' ২ হাজারেরও বেশি বইয়ে সমৃদ্ধ। কেবল বই পড়া নয়, ‘অগ্রদূত ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে আমরা এখন বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কাজও পরিচালনা করছি।
বই পড়া দিবসে পেছনে ফিরে তাকালে অবাক হই—স্কুল পালানো সেই ছেলেটি আজ বইয়ের মাঝেই সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে। আমাদের এই যাত্রার কেবল শুরু, পথ চলা এখনো অনেক বাকি। আজকের দিনে প্রত্যাশা এটুকুই—বই হোক সবার নিত্যসঙ্গী, আর আলো ছড়িয়ে পড়ুক ঘরে ঘরে।
আমাদের এই স্বপ্নযাত্রায় আপনাদের সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা কাম্য।
লেখক: সরকার রায়হান
২৩-৪-২০২৬
#বইপড়াদিবস #বইয়েরদুনিয়া #পাঠাগার #স্মৃতিচারণ #শৈশব #বইপড়া #আলোকিতমানুষ
#অগ্রদূতফাউন্ডেশন #অগ্রদূতদুলুপাইকারস্মৃতিপাঠাগার #বগুড়া #পীরগাছা #সমাজসেবা