**********জেলা পরিচিতি***********
৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷ নামকরণ ও প্রতিষ্ঠাকাল ৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷৷
১. নামকরণ ও প্রতিষ্ঠাকাল
পিরোজপুর জেলার উত্তরে বরিশাল ও গোপালগঞ্জ, দক্ষিণে বরগুণা জেলা। পূর্বে ঝালকাঠি ও বরগুণা জেলা এবং পশ্চিমে বাগেরহাট জেলা ও সুন্দরবন। আয়তন ১,৩০৭.৬১ বর্গকিলোমিটার বা ৫০৪.৮৭ বর্গমাইল। মোট জনসংখ্যা ১১,১৩,২৫৭ জন। পুরুষ ৫,৪৮,২২৮ জন, মহিলা ৫,৬৫,০২৯ জন। (২০১১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী) পি
রোজপুর জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, কাউখালি, ভাণ্ডারিয়া, জিয়ানগর ও মঠবাড়িয়া।
পিরোজপুর জেলার নামকরণ সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না। নাজিরপুর উপজেলার হেলাল উদ্দিন মোঘল দাবি করেন যে, সুবেদার সুজার বংশধর ফিরোজ শাহের নাম অনুসারে স্থানটির নাম হয় প্রথমে ফিরোজপুর এবং পরবর্তীতে উচ্চারণ বিভ্রাটে পরিবর্তিত হয়ে পিরোজপুর হয়। কলকাতার বরিশাল সেবা সমিতির পক্ষ থেকে প্রকাশিত বাকেরগঞ্জের ভূগোল পুস্তকেও এ মতকেই গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যমতে দামোদরের পাড়ে ফিরোজ নামে কোনো এক মোঘল কর্মচারী বাস করতেন। তার নাম অনুসারে এই স্থানটির নাম হয় পিরোজপুর । পিরোজপুর নামের প্রেক্ষাপটে বিশ্বাসযোগ্য কোনো জনশ্রুতি বা কিংবদন্তিও নেই । নাজিরপুর উপজেলার শাখারিকাঠি গ্রামের হেলাল উদ্দিনের বিবরণীকে কিংবদন্তির মতো ধরে নিলে নামকরণের একটা সূত্রের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। হেলাল উদ্দিন নিজের নামের সাথে মোঘল শব্দ সংযুক্ত করে নিজেকে মোঘল বংশের প্রতিভূ বা শেষ বংশধর হিসেবে দাবি করেছেন । হেলাল উদ্দিন মোঘল যে সূত্রটি স্থাপন করেছেন তা বাংলার সুবেদার শাহ্ সুজার সঙ্গে সম্পৃক্ত। শাহ্ সুজা আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীরজুমলার হাতে পরাজিত হয়ে সপরিবারে বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে পালিয়ে এসেছিলেন। আত্মগোপনের এক পর্যায়ে তিনি নলছিটির সুগন্ধা নদীর তীরে একটি কেল্লা নির্মাণ করে কিছুকাল বসবাস করেন । মীরজুমলার সৈন্যবাহিনী হানা দিলে তিনি তার দু'কন্যাসহ আরাকানে পালিয়ে যান। সেখানে আরাকান রাজার চক্রান্তে নিহত হন। পালিয়ে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী এক পুত্রসহ সেখানে থেকে যান । পরবর্তীতে তারা পশ্চিম দিকে এসে বর্তমান পিরোজপুর পার্শ্ববর্তী দামোদর নদের মুখে আস্তানা তৈরি করেন । এ শিশুপুত্রের নাম ছিল ফিরোজ। শাহ সুজার পুত্র ফিরোজ শাহ্ মৃত্যুবরণ করলে তাঁর মরদেহ পিরোজপুরের পুরান মসজিদ (কেয়ামুদ্দিন) উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন কবর দেওয়া হয়। তাঁর নামানুসারে পিরোজপুর শহরের মূল ভূখণ্ডের নামকরণ করা হয় ফিরোজপুর।
অন্যদিকে ইতিহাসে আর এক ফিরোজের সন্ধান মেলে। তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র ফিরোজ মন্দ । সম্রাট শাহজাহানের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার যুদ্ধে নিহত হলে
আওরঙ্গজেব তার এক বিধবা বাইজি পত্নীকে বিয়ে করেন। তার গর্ভে আওরঙ্গজেবের ঔরসে ফিরোজ মন্দ জন্মগ্রহণ করেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে তার পুত্রদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে ফিরোজ মন্দ প্রাণভয়ে দিল্লি ত্যাগ করে আত্মগোপন করেন এবং তিনি প্রপিতাসহ সম্রাট জাহাঙ্গীর বা সেলিমের নামে আখ্যায়িত সেলিমাবাদ পরগনায় এসে পরগনার মধ্যবর্তী অবস্থান বলেশ্বর এবং দামোদর নদীর সংযোগস্থল পিরোজপুর ভূখণ্ডে অবস্থান করেন। তার নামেই যে পিরোজপুর হয়েছে সে তথ্যের কোন প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি ।
পিরোজপুর জেলা একসময় ছিল টেগরা বা তুগরা থানার অন্তর্গত ছোট্ট একটি গ্রাম । ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দে পাড়েরহাটের টগরা গ্রামে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে টগরা থানা স্থাপিত হয় । কচা নদী বা কচার্দন এবং টেগরা থানার দক্ষিণাঞ্চলে ডাকাতি বন্ধ করা এবং প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর পিরোজপুরকে একটি মহকুমা হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং টেগরা থানা পিরোজপুরে স্থানান্তরিত হয়। পিরোজপুর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ পর্যন্ত বরিশালের একটি মহকুমা ছিল । ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ মার্চ পিরোজপুর মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয় ।
১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে কোটালিপাড়া ও মির্জাগঞ্জ থানা সৃষ্টি হয়। জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে সুন্দরবন কেটে বসত বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমান বেতাগি ও পটুয়াখালি নিয়ে মির্জাগঞ্জ থানা গঠন করা হয়। কোটালিপাড়া ও মির্জাগঞ্জ বাকেরগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে নলচিড়া থানা মেহেন্দিগঞ্জে স্থানান্তরিত হয়। ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে বারৈকরণ থানা ভাগ করে নলছিটি ও ঝালকাঠি থানা গঠন করা হয়। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে বাকেরগঞ্জে মোট থানা ছিল ১০টি :
১. বারৈকরণ (বর্তমান ঝালকাঠি ও নলছিটি)
২. আঙ্গারিয়া (বাকেরগঞ্জ)
৩. বাউফল
৪. খলীগাখালি (গলাচিপা)
৫. চান্দিয়া বা সন্দ্বীপ (ভোলা)
৬. বুখাইনগর (বরিশাল কোতোয়ালী)
৭. নলচিড়া মুলাদি ও মেহেন্দিগঞ্জ)
৮. কেওয়ারি (স্বরূপকাঠি ও বানারিপাড়া)
৯. কাউখালি
১০. টেগরা বা তুগরা (বর্তমান পিরোজপুর) ।
১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে বাকেরগঞ্জ জেলায় থানা ছিল মোট ১৪টি : বরিশাল, কোতোয়ালী, মির্জাপুর, মেহেন্দিপুর, খলীগাখালি, বাউফল, আঙ্গারিয়া, নলছিটি, কচুয়া (বর্তমানে বাগেরহাট জেলায়), কেওয়ারি, টেগরা, বুড়িরহাট, গৌরনদী ও কোটালিপাড়া । পুলিশ ফাঁড়ি ছিল ৯টি— গঙ্গাপুর, বুখাইনগর, শ্রীরামপুর, রাজাপুর, ঝালকাঠি, রাজৈর, আগরপুর, কাউখালি ও ভগীরথপুর। ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ মার্চ পটুয়াখালি মহকুমা গঠন করে বরিশালের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জেলা গঠনের প্রথম দিকে বরিশাল জেলায় মোট পাঁচটি মহকুমা ছিল, বরিশাল সদর, দক্ষিণ সাহাবাজপুর, মাদারিপুর, পিরোজপুর ও পটুয়াখালি । ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে পিরোজপুর মহকুমায় ৩টি থানা ছিল। পিরোজপুর, স্বরূপকাঠি ও মঠবাড়িয়া । মোট জনসংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৬৩ হাজার ৪২৬ জন। পিরোজপুরের অধীনস্থ ২টি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল একটি নাজিরপুর, অপরটি ভাণ্ডারিয়া। পুরাতন থানা কেওয়ারির কিছু অংশ নিয়ে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে স্বরূপকাঠি থানা গঠিত হয় ।
১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মাদীরপুর মহকুমাসহ পালং ও কোটালিপাড়া বরিশাল থেকে বিচ্ছিন্ন করে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ফরিদপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয় । একসময় বাগেরহাটের কচুয়া থানা (বলেশ্বরের পশ্চিম পাড়), মাদারিপুরের বুড়িরহাট এবং
গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়া বাকেরগঞ্জ জেলাধীন ছিল। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে পিরোজপুর মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি পটুয়াখালিকে আলাদা জেলার মর্যাদা দেয়া হয় এবং পিরোজপুর মহকুমা থেকে বামনা ও পাথরঘাটা থানা দুটিকে পটুয়াখালির সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে বরিশাল জেলাকে ভেঙে আরও তিনটি জেলা গঠন করা হয়। এগুলো হলো- ভোলা ও ঝালকাঠি (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪) এবং পিরোজপুর (১ মার্চ ১৯৮৪)। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ফেব্রুয়ারি ইন্দুরকানি থানাকে পিরোজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০২ খ্রিষ্টাব্দের ২১ এপ্রিল প্রশাসনিক থানা ইন্দুরকানিকে জিয়ানগর থানা নামকরণ করে উপজেলায় উন্নীত করা হয় ।
তথ্যসূত্রঃ-
১.বরিশালের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, বরিশাল ১৯৮২।
২. পিরোজপুর: গ্রাম থেকে জেলা, শ্রী নিত্যরঞ্জন মণ্ডল, পিরোজপুর মিলনোৎসব, স্টুডেন্টস হল, কলেজ স্কোয়ার, কলকাতা-৭০০০০৭৩।
৩. পিরোজপুর জেলার অতীত কথা, গোলাম মোস্তফা, জেলা পরিক্রমা, প্রকাশ : জেলা তথ্য অফিস, পিরোজপুর।