10/09/2026
'শুধু রিটেনটা পাশ কর, ভাইবা আমরা দেখবো।'
সরকারি কর্মচারী নিয়োগে গ্রেড ১১–২০-এর ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি গ্রহণযোগ্য নয়।
এটি একটি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে বিএনপি সরকার সরকারি চাকরির নিয়োগে আবারও লবিং, স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে জায়গায় দীর্ঘদিনের দাবি ছিল লিখিত পরীক্ষায় মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন বাড়িয়ে ভাইভার প্রভাব কমানো, সেখানে তারা ঠিক তার উল্টো পথে হাঁটছে। এর ফলে মেধাবী প্রার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পুরো নিয়োগব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী ভালো করেও যদি ভাইভায় লবিং, মামা-খালু বা টাকার জোরে পিছিয়ে যায়, তাহলে মেধাভিত্তিক নিয়োগের আর অর্থ কী?
সরকারি চাকরি কোনো দলের লোক নিয়োগের জায়গা নয়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বদলে যদি পুরোনো সেই পথ আবার খুলে দেওয়া হয়, তাহলে এর চেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত আর কী হতে পারে!
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় গ্রেড ১১–১২-তে লিখিত ১০০-এর বিপরীতে ভাইভা ৫০, গ্রেড ১৩–১৬-তে ৪০ এবং গ্রেড ১৭–২০-তে ২৫ নম্বর। অর্থাৎ লিখিত পরীক্ষায় একজন প্রার্থী কতটা ভালো করেছেন, তার ফলাফলকে interview board-এর subjective assessment দিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এখানেই আপত্তি।
লিখিত পরীক্ষা তুলনামূলকভাবে objective। সবাই একই প্রশ্নে, একই সময়ে পরীক্ষা দেন। কিন্তু ভাইভা অনেক বেশি subjective। ফলে ভাইভার নম্বর যত বাড়বে, interview board-এর discretionary power তত বাড়বে। আর এই discretion-এর জায়গায় transparency ও accountability দুর্বল হলে পক্ষপাত, পরিচিতি এবং রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগও বাড়বে।
আর গ্রেড ১১–২০-এর কর্মচারীরা মূলত street-level bureaucrat—সরাসরি জনগণের service provider। সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা নিতে গেলে তাদের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সেবা নিতে হয়। তাই এই পর্যায়ের নিয়োগে partisan consideration ঢোকার সুযোগ তৈরি করা কোনোভাবেই ছোট বিষয় নয়।
কারণ মনে রাখা দরকার, এই পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা যদি দলীয় বিবেচনায় কাজ করে, তাতে জনগণ যে শুধু সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে তাই নয়, বরং ব্যাপক জনঅসন্তোষ তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে। street level bureaucrat রা যদি fair এবং জনগণের সেবক না হন, তাহলে সরকার যে সেবাই চালু করুক, হোক তা ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষক কার্ড, তা কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের লোকজনের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
সরকারি চাকরি কোনো দলের লোক নিয়োগের জায়গা নয়। একজন মানুষকে রাষ্ট্রের হয়ে জনগণকে সেবা করার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। নিয়োগের সময় যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত পরিচয় বা পক্ষপাতের প্রভাব রাখার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সেই কর্মকর্তা ভবিষ্যতে কতটা নিরপেক্ষভাবে জনগণকে সেবা দেবেন—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
আমরা ভাইভা বাতিলের কথা বলছি না। বরং ভাইভাকে আরও structured, transparent এবং accountable করতে হবে। কিন্তু লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাক্রমকে বড় ধরনের subjective নম্বর দিয়ে উল্টে দেওয়ার সুযোগ রাখা উচিত নয়।
আমাদের অবস্থান পরিষ্কার—ভাইভা থাকুক, কিন্তু নির্দিষ্ট Rubrics মেনে। Subjective assessment থাকুক, কিন্তু নির্দিষ্ট criteria-এর মধ্যে। Interview board থাকুক, কিন্তু unchecked discretion নয়।
আর সরকারি নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, মেধা ও যোগ্যতাই হোক একমাত্র ভিত্তি।
সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন চায়, তাহলে নিয়োগে discretionary power বাড়ানোর পরিবর্তে transparency, accountability এবং merit-based recruitment শক্তিশালী করা উচিত।
আমাদের আপত্তি ভাইভায় নয়; আপত্তি এমন একটি ব্যবস্থায়, যেখানে ভাইভার subjective নম্বর দিয়ে objective merit-কে পরাজিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
আমরা দিনশেষে সেই বাংলাদেশে ফিরতে চাইনা যেখানে সরকার দলীয় নেতা ঘোষণা করার ক্ষমতা পায় যে, 'তোরা রিটেনটা পাশ কর, ভাইবা আমরা দেখবো।'