11/04/2026
ইরান আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। যুদ্ধবিরতির কালি শুকাতে না শুকাতেই সেই চুক্তির কাগজ ছিঁড়ে গেল।
কলমের নিচে যে শান্তির স্বাক্ষর পড়েছিল, তার আয়ু মাত্র কয়েক ঘণ্টা। আর তারপরই লেবাননের আকাশে আবার বোমারু বিমানের গর্জন। মাত্র দশ মিনিটে একশোটিরও বেশি স্থানে হামলা। পঞ্চাশটি যুদ্ধবিমান, একশো ষাটটি বোমা। যে জায়গাগুলোকে লেবাননের সাধারণ মানুষ নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেখানেই আগুন আর ধোঁয়ায় ঢেকে গেল সবকিছু। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়লেন অসংখ্য নিরীহ।
একটি জানাজা চলছিল। সেখানে মিসাইল এসে পড়ল। জানাজায় অংশ নেওয়া কেউ বেঁচে ফিরলেন না। একজনও না। পুরো শহরজুড়ে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর্তনাদ করছে। আহতের সংখ্যা আটশোর কাছাকাছি। মৃতের সংখ্যা এখনো নির্দিষ্ট করে বলা যায়নি—শুধু জানা যাচ্ছে, এটি লেবাননের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ এক দিন।
এই কি যুদ্ধবিরতি?
যেদিন বিশ্ব শ্বাস ফেলার চেষ্টা করছিল, সেদিনই আবার রক্তের নদী বইতে শুরু করল।
মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা প্রশ্ন তুলছেন—ট্রাম্প কি শুধু দৃশ্যপট থেকে সরে গেলেন? পুরো বিশ্ব জানে, ইসরায়েল মার্কিন সমর্থন ও সম্মতি ছাড়া এত বড় পদক্ষেপ নেয় না। প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আমেরিকান ট্যাক্সপেয়ারের অর্থ চলে যায় ইসরায়েলের যুদ্ধ তহবিলে। তাহলে এই হামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের নীরব সম্মতি ছিল কি না—সেই প্রশ্ন উঠছে জোরালোভাবে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই ইসরায়েল বলে দিয়েছে—লেবানন এই চুক্তির আওতায় পড়ে না। ইরান বলছে—চুক্তিতে লেবাননও ছিল। দুই পক্ষের ব্যাখ্যা আলাদা। ফলে হরমুজ প্রণালী আবার বন্ধ। বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধমনীতে আবার চাপ। অর্থনীতি আবার অস্থির।
পুরো পৃথিবী শান্তি চেয়েছিল। গ*ণহ*ত্যা বন্ধ চেয়েছিল। অর্থনীতি স্থিতিশীল চেয়েছিল। মানুষ সুস্থ হাওয়া চেয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে আবার অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল।
এই সংঘাতের মূলে যে জটিলতা, তা শুধু একটি জাতি বা একটি ধর্মের নয়। এটি ক্ষমতা, ভূ-রাজনীতি, ঐতিহাসিক শত্রুতা আর আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াই। ইসরায়েল নিজেকে প্রতিরক্ষার অধিকারে হামলা চালাচ্ছে বলে দাবি করে। হিজবুল্লাহ ও ইরান বলে—এটি আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে ন্যায্য প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের কাছে এসব যুক্তি শুধু শব্দ। তাদের কাছে শুধু বেঁচে থাকার আর্তি।
মিডিয়া আর বর্ণনায় প্রায়ই একপেশে ছবি তুলে ধরা হয়। কখনো এক পক্ষকে পুরোপুরি সন্ত্রাসী বানিয়ে দেখানো হয়, অন্য পক্ষকে নিরীহ। বাস্তবে সংঘাত অনেক জটিল। উভয় পক্ষেরই বেসামরিক হতাহত হচ্ছে। উভয় পক্ষই নিজেদের নিরাপত্তার যুক্তি দিচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধের শেষ পরিণতি সবসময় একই—ধ্বংস, শোক আর আরও বেশি ঘৃণা।
এই মুহূর্তে লেবাননের আকাশে ধোঁয়া উঠছে, হরমুজে জাহাজ আটকে আছে, আর বিশ্ব অপেক্ষা করছে—এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কতক্ষণ টিকবে। শান্তির জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের সংলাপ, আন্তর্জাতিক চাপ এবং উভয় পক্ষের আপস। না হলে কলমের কালি বারবার শুকিয়ে যাবে, আর রক্তের দাগ আরও গাঢ় হতে থাকবে।
মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনো রাজনীতি নেই। কোনো ভূখণ্ড, কোনো প্রতিশোধ, কোনো আদর্শ—কিছুই একটি শিশুর হাসি বা একজন মায়ের চোখের জলের চেয়ে মূল্যবান নয়।
শান্তি যেন ফিরে আসে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
©️®️