17/07/2013
নওগাঁ শহরের এক মাইল পশ্চিমে চকবাড়া গ্রামের একটি পুকুরে ১৯৭০ খ্রিঃ একটি পাথরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। ঐ গ্রামের আর একটি পুকুরে বাঁধানো ঘাট রয়েছে। এর প্রাচীন ইতিহাস অজ্ঞাত। সন্দেহ নেই এটি একটি প্রাচীন জনপদ। গ্রামটির পাশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হত বলে মনে হয়। হয়ত এখানকার নওগাঁ শহরের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। তবে এ থেকে এ এলাকায় জনবসতির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
১৯৩২ খ্রিঃ প্রকাশিত একটি ক্ষুদ্র পুসিত্মকাসূত্রে জানা যায় যে, নওগাঁ শহরের প্রাচীন অধিবাসী তরফদারগণ নাকি এখন থেকে চার শতাধিক বৎসর পূর্বে সুদূর আজমীর (মতামত্মরে বাগদাদ) থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেন এবং পরবর্তীকালে মুর্শিদাবাদের নবাব সরকার হতে ‘তরফদার’ খেতাব পান। নবাবী আমলের বহু পূর্বেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হিসেবে গড়ে না উঠলে তাদের পূর্ব পুরুষ নওগাঁয় এসে বসতি স্থাপন করবেন কেন?
১৭৬৪ খ্রিঃ. জেমস রেনেল বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিকৃত এলাকাসমূহের জরিপ কাজ আরম্ভ করেন। ‘মেজর রেনেল অতি নিপুণ হসেত্ম তার কাজ সমাধা করে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের প্রথম ভূচিত্রাবলী প্রকাশ করেন।’ (বাঙলাদেশ-৫৩)
রেনেলের মানচিত্রে একটি নদী বন্দর হিসেবে নওগাঁর সুষ্পষ্ট উলেস্নখ রয়েছে। রাজস্ব বিভাগের পুরাতন দলিলপত্রানুসারে ১৭৮২ খ্রিঃ নওগাঁয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একটি ফ্যাক্টরি ছিল। ফ্যাক্টরিটি কুমারখালি কুঠির তত্ত্ববাবধানে পরিচালিত হত। সেটি যে কি ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো সে সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
উত্তরণের পথে- পূর্বাপর ১৮৩৪ সালে নওগাঁ ছিল দুবলহাটী থানার অধীন। ১৮৭২ এর পূর্বেই কোন এক সময় থানা সদর বান্দাইখাড়াতে স্থানামত্মরিত হয়। নওগাঁর সংলগ্ন, যমুনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী সুলতানপুর তখন বগুড়া জেলার অধীন। সুলতানপুর দুপচাঁচিয়ার আনন্দনাথ চৌধুরীর এবং দুবলহাটির জমিদারীর অমত্মর্গত ছিল। চাউলের ব্যবসায় এবং ইংরেজ বণিকদের রেশম কেনাবেচার জন্যে সুলতানপুর বাজারের যথেষ্ট প্রসিদ্ধি ছিল। কিন্তু ঐ বাজারে খাজনা ভাগাভাগি নিয়ে দুই জমিদারের বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। কুপিত দুবলহাটির রাজা নিজ এলাকা নওগাঁয় পাল্টা বাজার বসান এবং তাঁর ব্যক্তিগত প্রভাবে নওগাঁর বাজার দ্রুত জমে ওঠে। সুলতানপুর তৃতীয় শ্রেণীর একটি গ্রাম্য বাজারে পরিণত হয়। অচিরে নওগাঁ বাজার রাজশাহী জেলার উত্তরাঞ্চলের তো বটেই বগুড়া জেলার পশ্চিমাঞ্চলের পক্ষেও নদীপথে পণ্য আমদানীর একটি প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বদলগাছি ও আদমদীঘির উৎপাদিত চালের প্রধানতম বাজার তখন নওগাঁ।
এই সময় থেকেই নওগাঁ শহরে অর্থনৈতিক তৎপরতা প্রবল হয়ে ওঠতে থাকে। মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হবার আগেই সুদূর রাজস্থানের বিকানির থেকে কয়েকজন ভাগ্যান্বেষী মাড়োয়ারী নওগাঁ শহরে এসে ব্যবসায় শুরু করেন এবং শূন্য হাতে এসে কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা কয়েক বছরের মধ্যে প্রচুর টাকা পয়সার মালিক হন। নওগাঁর কাজী পরিবারের অবস্থা তখন তুঙ্গে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যমত্ম বস্ত্তত নওগাঁর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন মাড়োয়ারীগণ এবং কাজী পরিবার। প্রবাদ ছিল যে নওগাঁ শহরের বারো আনা মাড়োয়ারীদের আর কাজীদের, বাকি চার আনা অন্যদের।
সুলতানপুরের পাল্টা বাজারটি প্রথমে নওগাঁর ডালপট্টি এলাকায় বসতো। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশক পর্যমত্ম তা সেখানেই ছিল বলে জানা যায়। দুবলহাটীর জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই নতুন বাজারের বিকাশে তৎকালে উদীয়মান প্রভাবশালী ব্যবসায়ী তিনকড়ি সাহা, বলাই সাহা, মহেশ সাহা এবং পার-নওগাঁর মাতম বানিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নওগাঁতে মহকুমা সদর প্রতিষ্ঠিত হবার সময়কালে এখানে সরকারি কোন পাকা ভবন ছিলনা। প্রথম দিকে, এমনকি থানা এবং হাজত খানা পর্যমত্ম ছিল বেড়া ও টিনের চালা ঘরে। নওগাঁ শহরের প্রথম পাকা ভবন নির্মাণ করেন চগনলাল আগরওয়াল। তারপর বজরঙ্গ লাল আগরওয়াল এর পিতা লাদুরাম মাড়োয়ারী পাকা ভবন নির্মাণ করেন। তার সমকালে অথবা কিছু পরে নওগাঁ বাজারকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য ‘ভবানী ভান্ডার’ নির্মিত হয়। দুবলহাটীর জমিদার ঘনদানাথ চৌধুরী এটি নির্মাণ করান বলে অনেকের অভিমত। জমিদারের নিজস্ব উদ্যোগে ভবানী ভান্ডারে বিরাট দোকান খোলা হয়। সেখানে মসলা-পাতি, কাপড়-চোপড়, বই-খাতা, এক কথায় মাইটর পাতিল ও কলাপাতা বাদে সবই নাকি পাওয়া যেত। ভবানী ভান্ডারের আগে বা সমকালে কাজীদের পাকা ভবন নির্মিত হয়। ইতোমধ্যে ১৮৮৪ খ্রিঃ নওগাঁর তৎকালীন সাব-ডেপুটি কালেক্টর ও গাঁজা মহালের সুপারভাইজার বাবু কৃষ্ণধন বাগচির উদ্যোগে শহরে একটি এন্ট্রেন্স স্কুল এবং ১৮৯৬ খ্রিঃ দুবলহাটির জমিদারের উদ্যোগে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় নওগাঁবাসীর শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক ধাপ অগ্রগতি সাধিত হয়।
বলা বাহুল্য, তখন পর্যমতও নওগাঁ একটি শহর হিসেবে ততটা গড়ে উঠতে পারেনি। এর সারা অঙ্গে ছিল গ্রামীণ জীবনধারার সুষ্পষ্ট ছাপ। এখানকার বি এম সি কলেজ ভবনের আশেপাশের গভীর জঙ্গলে এক জাতের বাঘ এবং হাট নওগাঁর মরহুম আসত্মান মাস্টার সাহেবের বাড়ির সন্নিহিত এলাকায় ছিল বড় বড় দাঁতাল শূকরের আবাস। শহর তখন বলতে গেলে কে ডি-র মোড় থেকে নদীর তীর ঘেঁষে কাচারি রোড, পুরাতন হাসপাতাল রোড, কাজী পাড়া, তরফদার পাড়া, হোটেলপট্টী, তুলাপট্টী, ভবানী ভান্ডার, চুড়িপট্টী এবং ডালপট্টী, ডাব পট্টী হয়ে পতিতালয় পর্যমত্ম দুপাশের সঙ্কীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল।
১৯১১ খ্রিঃ এর ১২ ডিসেম্বর দিলস্নীতে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক উপলক্ষ্যে যে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় হয়েছিল, তার উদ্বৃত্ত অর্থে ১৯১৬ সালে নওগাঁ করোনেশন হল সোসাইটির জন্ম। তবে সোসাইটির বর্তমান থিয়েটার হলটির নির্মাণ কাজ সম্ভবত ১৯২০-২১ সালে সম্পন্ন হয়। তখনও শহরের মর্গ বা লাশকাটা ঘরটি ছিল থিয়েটার হলের সামান্য উত্তরে, বর্তমান সমবায় ব্যাংক ভবনের নিকটে। তার মাত্র কয়েক রশি ফাঁকে ছিল ভাগাড় ও মল ফেলার স্থান। আর শ্মশান ছিল এখানকার কালিতলা ক্লাব ভবনের পেছনে ‘ভুপেন বসাক নির্মিত মন্দিরের নিকটে। ১৯২৫ খ্রিঃ এর কাছাকাছি সময়েও চকদেব পাড়ায় এম এ রকীব সাহেবের বাসভবনের পশ্চাৎভাগে, এখানকার গোরস্থানসহ বিস্তৃত এলাকা জুড়ে কেবল উলুখড়ের মাঠ ছিল।
(ঙ) নবীনা নওগাঁ : আধুনিক শহর হিসেবে নওগাঁর শুভযাত্রা, বলতে গেলে ১৯১৭-তে নওগাঁ গাঁজা উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠার পর থেকে। ১৯২১ সালে ক্যামেল পার্ক নির্মাণের দ্বারা নওগাঁর সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তারপরে ১৯২৩-এ যমুনা নদীর উপর লিটন সেতু নির্মিত হলে আধুনিক যুগ ও বাইরের জগতের সঙ্গে নওগাঁর মন দেওয়া নেয়া ত্বরান্বিত হয়। ১৯৩০ সালের মধ্যে গাঁজা সোসাইটির বেশকিছু বড় বড় ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়। এ সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায় বলেন, ‘নওগাঁর যে পাড়াটি গাঁজা কালটিভেটার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি গড়ে তুলেছে সেটি একটি ছোটখাটো টাউনশিপ। সেখানে শহরের মতো বড় বড় ইমারত। মহকুমা অফিসারের বাংলো তার বাইরে পড়ে। আকারেও অকিঞ্চিৎকর’ (স্বাধীনতার পূর্বাভাস- পৃঃ-৬)।
নওগাঁর এ নবযাত্রার কালে, ১৯৩৩-এ উকিলপাড়ায় বলিহারের জমিদার নির্মিত বলিহার প্যালেস, তার প্রায় সমকালে নির্মিত গাঁজা সোসাইটির মসজিদ প্রভৃতি এখনো শহরটির সব চেয়ে দর্শনীয় ভবন। আর নওগাঁ জেলা ঘোষণার পরে, প্রাথমিকভাবে গাঁজা সোসাইটির ঐসব ‘বড় বড় ইমারত’গুলোই হয়েছিল নতুন জেলা প্রশাসনের প্রধান অবলম্বন।
তথাপি বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিন পর্যমত্ম শহর নওগাঁর বিকাশের গতি ছিল অত্যমত্ম মন্থর। এর অন্যতম কারণ, তখন পর্যমত্ম দুবলহাটী, বলিহার, মহাদেবপুর প্রভৃতি জমিদার প্রধান রমরমা গ্রামগুলো ছিল এর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী, সতীন-কাঁটা।
১৯৪৭ এর পরে তাজ সিনেমা হল, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ডিগ্রী কলেজ, ভকেশনাল স্কুল, আধুনিক হাসপাতাল, আনসার হল, স্টেডিয়াম, সি.ও. অফিস ইত্যাদির নির্মাণ এবং সাবেক বি,এম,সি কলেজ, ডিগ্রী কলেজ, কে,ডি স্কুল, মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ নওগাঁ শহরের বাহ্যরূপে কিছুটা পরিবর্তন আনলেও এর মৌলিক রূপামত্মর ঘটেছে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা পরবর্তীকালে। নব-নির্মিত কালেক্টরেট ভবন ও জজকোর্টসহ নতুন নতুন সরকারি বেসরকারি প্রাসাদোপম অট্রালিকা, আধুনিক বিপণীকেন্দ্র, বাস টার্মিনাল, কল-কারখানা, বিদ্যায়তন, চিকিৎসাকেন্দ্র সব মিলিয়ে নওগাঁ হয়ে উঠেছে কর্মচঞ্চল ও শ্রীমতি এক নতুন নগর জনপদ।
মাত্র ১৯৬৩ সালের ৭ ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত নওগাঁ পৌরসভা এ শহরের দর্পণ স্বরূপ। ১৯৮০-তে দ্বিতীয় এবং ১৯৮৯-এ প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত নওগাঁ পৌরসভা সম্প্রসারিত হয়ে এখন ২৪.৫৮ বর্গ কিঃমিঃ আয়তন বিশিষ্ট। উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে এর রাসত্মাঘাটের, পানি নিষ্কাশণ ব্যবস্থার, উন্মোচিত হয়েছে নাগরিক সুযোগ সুবিধাও। এই অর্জন সামান্য নয়।