20/06/2026
ইতিহাস সাক্ষী — যৌবন কেবল ভোগের জন্য নয়, এই বয়স পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার
বদর প্রান্তরে সেদিন দুজন কিশোর এগিয়ে গিয়েছিল। মু'আয ইবন আমর আর মু'আউইয ইবন আফরা — বয়স চৌদ্দ থেকে ষোলো। ইসলামের চিরশত্রু আবু জাহিলকে ধরাশায়ী করেছিলেন এই দুই কিশোর। আজকের পৃথিবীতে এই বয়সের ছেলেকে আমরা "শিশু" বলে একা কোথাও পাঠাই না। অথচ ইতিহাস তাদের নাম লিখে রেখেছে সোনার হরফে।
আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, আব্দুল্লাহ বিন উমর, উসামা বিন যায়দ — এঁরা যুদ্ধে যাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করতেন, কারণ বয়স তখনও কম। সেই একই বয়সের ছেলেরা আজ একা বাজারে যেতে পারে না — পরিবার বলে, "এখনও ছোট।"
মক্কা বিজয়ের পর মাত্র ২১ বছর বয়সে একটি মহানগরীর গভর্নর হয়েছিলেন ইতাব বিন উসায়দ। আর আমাদের ২১ বছরের তরুণ? ভোরবেলা প্রিয় দলের খেলা দেখতে ঘুম ছেড়ে উঠতে পারে, কিন্তু দায়িত্বের কথা এলে উধাও।
মসজিদুল হারামের মুয়াজ্জিন হিসেবে আবু মাহজুরা রাদিআল্লাহু আনহু-কে নিয়োগ দিয়েছিলেন স্বয়ং রাসূল ﷺ — তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোলো। আজকের ষোলো বছরের তরুণ মসজিদে না গিয়ে বরং কয়েক কিলোমিটার লম্বা পতাকা বানানোর প্রকল্পে বাবার কাছ থেকে টাকা চাইছে।
যায়দ বিন সাবেত — তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে উহুদে যেতে পারেননি, বয়স কম বলে। কিন্তু তাঁর মেধা দেখে নবী ﷺ তাঁকে দায়িত্ব দিলেন ওহী লেখার এবং হিব্রু ও সুরিয়ানি ভাষা শেখার — যা তিনি মাত্র কয়েক সপ্তাহেই আয়ত্ত করলেন। বিনোদনের ভিড়ে আজকের তরুণ যখন নিজের মাতৃভাষাটুকুও শুদ্ধ করে লিখতে পারে না, তখন যায়দ ছিলেন ইসলামের সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিনিধি।
মাত্র ২১ বছর বয়সে সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ সেই কনস্টান্টিনোপলের প্রাচীর ভেঙেছিলেন — যে প্রাচীর শতাব্দীর পর শতাব্দী অজেয় ছিল। রাসূল ﷺ যে বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা বাস্তবে পরিণত করেছিলেন একজন একুশ বছরের যুবক। আর আমাদের একুশ বছর বয়সীরা হাস্যরসের রিলস বানিয়ে ভাইরাল হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।
তারেক বিন যিয়াদ স্পেনের মাটিতে পা রেখে নিজের জাহাজ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন — পিছু হটার পথ নিজেই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছিল ইউরোপের ইতিহাস। আর আমরা? নিজেরাই বদলে যাচ্ছি — তবে উল্টো দিকে।
মুহাম্মদ বিন কাসিম মাত্র ১৭ বছর বয়সে সিন্ধু ও মুলতান জয় করে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই বয়সে আজকের একটি ছেলে ক্যারিয়ারের ভাবনায় দিশেহারা অথবা গেমসের লেভেল পার করতে ব্যস্ত।
এই ইতিহাস নতুন নয়। আমরা সবাই জানি। কিন্তু জানা আর অনুভব করা এক কথা নয়। আমরা এই ইতিহাসকে কেবল গর্বের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করি — বাস্তব জীবনের অনুপ্রেরণা হিসেবে নয়।
ব্যর্থতা, আত্মতুষ্টি, আর স্বার্থপরতার এক অদৃশ্য জাল আমাদের চারদিকে বিছানো। আমরা নিজেরাও টের পাচ্ছি — তবু নড়ছি না। সুখের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে আমাদের। জয়ের মানদণ্ড পাল্টে গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে যেটা বিজয়, সেটাই আজ আমাদের কাছে "বাড়াবাড়ি।"
অথচ আমাদের পূর্বসূরিদের মাত্র অর্ধেক চেতনা যদি আমাদের মধ্যে থাকত — শুধু অর্ধেক — তাহলে বাংলাদেশ হতে পারত আমাদের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ। কিন্তু বাস্তবতা কী? বাংলাদেশ আজ এমন একটি রাষ্ট্র যার কোনো কৌশলগত মিত্র নেই। আজ যদি কোনো বাহ্যিক আক্রমণ আসে, এমন কোনো দেশ নেই যার সাথে আমাদের সামরিক চুক্তি রয়েছে — যে নিঃশর্তে এগিয়ে আসবে। কোনো পরাশক্তি হয়তো বিশেষ শর্তে পাশে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু সেটা সাহায্য নয়, সেটা দরকষাকষি। এই ভঙ্গুর বাস্তবতার মাঝে আমরা কি সত্যিই সচেতন? আমাদের নৈতিক অবস্থান, আমাদের দাওয়াহ, আমাদের প্রস্তুতি — কোনোটাই কি যথার্থ আছে? নাকি আমরা এখনও এক অদ্ভুত ঘোরে ঘুমিয়ে আছি — ভাবছি, "বয়স হলে করা যাবে, একটু গুছিয়ে নিই আগে"? এ আর কিছু নয় — নিজের সাথে নিজের প্রতারণা।
আল্লাহ সমগ্র জীবনের হিসাব তো নেবেনই, কিন্তু যৌবনকালের হিসাব আলাদাভাবে নেবেন। এই উদ্যম, এই শক্তি, এই সুযোগ — এগুলো কোথায় ব্যয় করলে, তার জবাব একদিন দিতে হবে।
হে যুবক — আলী রাদিআল্লাহু আনহু যে বয়সে রাসূল ﷺ-এর বিছানায় নিজের জীবন বাজি রেখে শুয়েছিলেন, মুসআব বিন উমাইর রাদিআল্লাহু আনহু যে বয়সে মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো পৌঁছে দিচ্ছিলেন — সেই বয়সটা কি শুধু স্ক্রিন স্ক্রল করে, খেলার নেশায় মেতে, আর উদ্দেশ্যহীনভাবে পার করে দেওয়ার জন্য?
আমরা না জাগলে এই উম্মাহ জাগবে না। জাগুন। পরামর্শ নিন। একে অপরের হাত ধরুন। মানবপ্রাচীর গড়ুন। একটি সুন্দর, সুষম, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করুন।
যৌবনের এই শক্তিকে যারা ভোগের পেছনে উড়িয়ে দিচ্ছে, তারা আসলে এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে — যা কখনো ধরা দেয় না, কেবল সময়টুকু নিয়ে নেয়।
আপনার জাগরণের ওপরই নির্ভর করছে এই উম্মাহর আগামীকাল। এগিয়ে আসুন, দায়িত্ব নিন।
সংগ্রহীত....