14/05/2026
বাশির থেকে বাশু। কিন্তু নামে কী যায় আসে, কাজেই আসল পরিচয়। ছোটবেলায় বিড়ালের মতো ছোট্ট বাশিরকে মা আদর করে বাশু ডাকতো। কলেজে গিয়ে বন্ধুদের সাথে সিগারেট ফুঁকতে শুরু করে বাশু থেকে বাঁশী হয়ে গেলো। আর প্রথম প্রেমে ছ্যাঁকা খাওয়ার পর একসময়ের বন্ধু ও সহপাঠী প্রেমিকার কাছে রীতিমত বাঁশ হয়ে গেলো। অবশ্য কে কাকে বাঁশ দিয়েছে তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক এখনো ওঠে, কিন্তু বাশুর কাজকর্মের সাথে সাথে নাম পাল্টে যাওয়াটা একদম স্বাভাবিক ঘটনা বলেই মেনে নিয়েছে সে।
বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে গল্পবাজ আর দারুণ কল্পনাবিলাসী বাশু। ওদের পাঁচজনের ছোট্ট সার্কেলটা ঘুরতেও প্রচুর ভালোবাসে। সাথে যদি এডভেঞ্চারের সম্ভাবনা যোগ হয়, তাহলে তো পোয়াবারো এক্কেবারে। যদিও এডভেঞ্চারের খুঁজে বেরুলে দূরের গ্রামেগঞ্জে ঠিকটাক পৌঁছাতে পৌঁছাতেই আসল এডভেঞ্চার হয়ে যায়। জায়গামতো পৌঁছে ওরা অস্বাভাবিক কোনো এডভেঞ্চার আজ অবধি খুঁজে পায়নি। তবে টিমের একমাত্র বাঁচাল সদস্য হওয়া বাশু নিজ দায়িত্বে এডভেঞ্চার তৈরি করে, জায়গায়-বেজায়গায় বিপদ উৎপাদন করে। তারপর বাকি বন্ধুরা মিলেমিশে একেকজনের একেক প্রতিভা ব্যবহার করে সেইসব বিপদ থেকে উদ্ধার হয়। এই যেমন গত বছর ওরা সিলেটের সীমান্ত ধরে বিছনাকান্দি থেকে জাফলং হাইকিং করতে বেরুলো। সাথে পানি ছাড়া কোনো খাবার-দাবার কিছুই নেয়নি। “আরে, সিলেট ভাই এটা, এখানের সীমান্তের প্রতিটা জায়গা পর্যটন স্পট। দোকানটোকানের অভাব হবে না”-বাশু বলেছিলো।
যদিও শীতকাল, কিন্তু মাঠের পর মাঠ রোদে হাঁটতে হাঁটতে ওরা একপর্যায়ে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে গেলো। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ আর সুন্দর প্রকৃতি দেখে দেখে তো পেট ভরে না। অবস্থা এমন হলো যে, এ ওরে দোষে, সে তারে গাইল্লায়, বকে। কিন্তু পুরো সুনসান সীমান্তে একটা খাবার দোকান নেই, রেস্টুরেন্ট নেই। তায় আবার অচেনা পথে নতুন কিছু আবিষ্কারের লোভে পান্তুমাই গ্রামের রাস্তা এড়িয়ে এসেছে ওরা, তাতেই তৈরি হয়েছে এই বিপদ।
এমন কঠিন অবস্থায় হঠাৎ করে একটা বিয়েবাড়ি দেখে ওদের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেলো। গ্রুপে সানা ছিলো একমাত্র উপস্থিত বুদ্ধির লোক। সে বললো: চল, আজকে দাওয়াত ছাড়াই বিয়ে খাবো। বাড়ির মালিককে খুঁজে বের কর, বাকিটা আমি দেখতেছি।
তখন বাশু বাগড়া দিলো, কেন, মালিককে খোঁজার কী দরকার, মেহমান হয়ে খেতে বসে গেলেই হয়। সানা রেগেমেগে বললো, আমরা ঢাকা থেকে এসেছি, সিলেটী ভাষা আমাদের মধ্যে জানে কেউ? আমরা একটা শব্দ বললেই তো ধরা পড়ে যাবো। গ্রামের লোকের কৌতূহল কী জিনিস মনে নাই তোর?
বাশুকে থামিয়ে দিয়ে একটু এদিক-সেদিক তাকাতেই বাড়ির মালিক নয়, তবে মুরব্বি গোছের একজনকে পেয়ে গেলো ওরা। সানা গিয়ে সুন্দরভাবে সালাম দিয়ে ভদ্রলোককে তাদের হাইকিং বৃত্তান্ত বর্ণনা করলো। তারপর বিনা দাওয়াতেই মেহমান হবার আশা ব্যক্ত করলো।
এরপরের ঘটনা অবর্ণনীয় সুন্দর! ভদ্রলোক এতো আন্তরিকভাবে ওদেরকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন যে, ওরা এমনটা ঘটবে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। প্যান্ডেল রেখে ভেতরের গেস্টরুমে নিয়ে বাথরুম দেখিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিতে বললেন। ওরা রেডি হতে হতে দেখে জম্পেশ খাবারদাবারও চলে এসেছে। সেই অজগরের খিদে নিয়ে ওরা এরপর কী পরিমাণ খেলো, তা তো আর বলে বুঝানোর মতো নয়। খেয়েদেয়ে ছবিটবি তুলে বাড়িওয়ালার ফোন নাম্বার নিয়ে সানারা বের হলো। আর বলে আসলো, ঢাকায় গেলে যে কাজেই হোক, অবশ্যই যেন উনারা ফোন করে তাকে। ঋণ পরিশোধ নয়, এতো সুন্দর মানুষদের সাথে বারবার দেখা হোক, এটাই তারা চায়.. এইসব বলেটলে অবশেষে বের হলো।
বাইরে বেরিয়ে সবাই সানার ভূয়সী প্রশংসা করলো। কিন্তু বাশু নিজেই নিজের প্রশংসা করে নিলো। এই অভিযানের আইডিয়াটা তার মাথাতেই এসেছিলো কি না। আর খাবারদাবার শহর থেকে কিনে না আনার প্লানও তারই ছিলো। খাবার কিনে আনলে এই বিয়ে কি আর খাওয়া যেতো? ইত্যাদি ইত্যাদি। সানারা আর কিছু বললো না। ওরা ধরেই নিয়েছে যে, কাজের সময় ছাড়া বাদবাকি সময় কথা বলার দায়িত্ব একমাত্র বাশুর। কী দরকার একজনের দায়িত্বে অন্য কারো বাগড়া দেবার?
এই বছর জুনে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। চতুর্দিকে গরমের চোটে মানুষজন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। ওদেরও পরীক্ষাটরিক্ষা শেষ, কলেজে গেলে খেলাধুলা ছাড়া কাজ কিছু নেই। বাশুর পর রনির ব্রেকাপ হয়েছে সদ্য। বেচারা প্রতিদিন এসে মনখারাপ করে বসে থাকে। বাশু একপর্যায়ে বলে, আরে, প্রেমিকা থাকলেই তো সমস্যা। আমরা নিজেদের মতো কোথাও ঘুরতেটুরতে যাবো, সেটা নিয়েও ওরা মনখারাপ করে থাকে। সঙ্গে নিতে গেলে আরো তেতাল্লিশ হাঙ্গামা। এই তো সুযোগ, চল পালাই…
বাশুর কথাটা এতদিনে মনে ধরলো রনির। সেও সায় দিলো, চল, আজকেই বেরিয়ে পড়ি।
রনিকে উৎসাহে কথা বলতে দেখে বাকিরাও ওর দিকে ফিরে তাকালো। চোখে-চোখে তাকিয়ে একে অন্যকে যেন বললো, চল, বেচারা রনিকে ডিপ্রেশন থেকে বাঁচানোর জন্য হলেও কোথাও বেড়াতে যাওয়া যাক। কিন্তু কোথায় যাবে?
তখন রনি বললো, আমরা এবার একটা সত্যিকারের এডভেঞ্চার করতে পারি। সোর্স একদম সলিড, যদিও ওরা একটু রিলিজিয়াস আর সতর্ক মানুষ।
বাশু বললো, কী বলবি ভেঙে বল।
রনি বললো, দেখ, আমার স্কুললাইফের বন্ধু একটা আছে না; রাজন, তোদের সাথে দেখা হয়েছিলো একবার। ওর বাড়ি তো সুনামগঞ্জে, শনির হাওরের দিকে। সেই বলেছিলো। ওদের ওদিকে নাকি গত কয়েক মাস ধরে অদ্ভূদ কিছু ঘটনা ঘটছে। হাওরে ঢোকার আগে নদীর যে অংশটাতে স্লুইসগেট আছে, সেখানেই গত শীতকালে একটা লোক হারিয়ে গেছে। পুরো হাওরেও তাকে কোথাও আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায় নাই। মরেছে না বেঁচেছে তা কেউ জানে না, পুলিশও না।
বাশু বললো, হুমম, চিন্তার ব্যাপার। কিন্তু এ আর অদ্ভুত কী? ওরে হয়তো র্যাবে গুম করে দিছে।
রনি বললো, আরে না, বুঝস নাই কথাটা। ও তো ২০-৩০ জন লোকের সামনে নদীর ওই জায়গাতে ডুব দিয়েই নাই হয়ে গেছে।
এইবার সানা নড়েচড়ে বসলো। “ঘটনা ইন্টারেস্টিং!”-বললো সে।
“শুন”, রনি ওদের আটকায়। “এখানেও ঘটনা শেষ না।”
: এরপর থেকে ওই জায়গায় কেউ গোসল করতে নামলেই অস্বাভাবিক ব্যাপারস্যাপার নাকি ফিল করতেছে। কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়া লাগছে। শীতকালে ওখানে পানি কম থাকে, কোমর সমান পানিতে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু নড়তে চড়তে পারছে না, যেন পানিতেই প্যারালাইজড হয়ে গেছে। গাঁয়ের লোকও ভয়ে নামে না, শেষে নৌকা নিয়ে গিয়ে ছেলেটাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিছে।
: এইবার মামা বহুত দিনে একটা ঘটনা বাইর করছস.. - বাশু বলে।
“কিন্তু রনি”, সানা বলে, “আমার দুটো প্রশ্ন, এক. এই ঘটনা তুই জানলি কবে, আর এই ব্যাপারে ডাক্তার ও পুলিশ প্রশাসনের কী বক্তব্য?”
রনি কিছুটা কাচুমাচু হয়ে বলে, “দ্যাখ ভাই, আমি এটা জেনেছি গত শীতেই। কিন্তু তোদেরকে বলিনি। বললেই তোরা যেতে চা’বি, আর বুঝসই তো…
“হ, হ” - রনিকে মাঝপথে আটকে হৈহৈ করে ওঠে বাশু। “তোমার প্রেমিকা এসব পছন্দ করে না তাই তুমি তোমার বন্ধুদের ওটা জানাওনি কারণ ওরা তোমাকে জোর করে ধরে নিয়ে যেতে চাইবে যেহেতু রাজন তোমার বন্ধু আর তুমি ওই নদীতে গিয়ে পড়ে মরে যাও তা তোমার প্রেমিকা কোনোভাবেই চাইতো না।” একনাগাড়ে বলে বাশু থামে। “কিন্তু এখন চায় সেটা। তাই তো?”
রনি এবার চোখ বড় বড় করে হেসে ওঠে, “আরে মামা, তাই তো। ও তো ব্রেকাপের আগে এই কথাই বলে গেছে, যা ওই নদীতে গিয়া ডুইবা মর.. হা হা হা। আমার এই কারণেই ব্যাপারটা এইভাতে এতো দ্রুত এবার মনে পড়লো…”
“এক্সপেরিয়েন্স মামা, এক্সপেরিয়েন্স!” বাশুর কথার ভঙ্গীতে রুমে থাকা বাকিরা এবার হো হো করে হেসে ওঠে। “চল মামা চল, বিড়ি খাই। খেতে খেতে বাকি আলাপ শোনা যাবে… এইবার একটা বিশাল এডভেঞ্চার আইতাছে…” বলতে বলতে ওরা হুড়মুড় করে দরজা টেনে বেরিয়ে পড়ে।
..........................................................................................................
অলীক শতদ্রু লিখিতং - এক সহস্র এক বঙ্গীয় রজনী
এটা পর্ব: ০০০১, অন্তত হাজার পর্ব লেখার ইচ্ছা ইনশাল্লাহ। পড়ে কেমন লেগেছে জানাতে ভুলবেন না। ..........................................................................................................