12/06/2025
পড়ার অনুরোধ রইল💖
পশ্চিমা বিশ্ব, তাঁদের মিডিয়া, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কিভাবে কাজ করে, কিভাবে দেশে দেশে সংকট তৈরি, তা জিইয়ে রেখে, কখনো বা ইন্ধন দিয়ে তার থেকে সুবিধা নেয়, কিভাবে তাদের কাজ উদ্ধারের জন্য পুতুল সরকার বসায়, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। কিভাবে সাহায্য করার নামে ব্যবসা করে- এইসব কিছু, তাদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোর ৩৪ বছরের তরুণ নেতা ইব্রাহীম ত্রাওরে।
সম্পূর্ণ ভাষণের বংগানুবাদ:
• ইব্রাহীম ত্রাওরে (Ibrahim Traoré) বর্তমানে বুরকিনা ফাসোর (Burkina Faso) অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে, ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, যেটি তাকে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধানদের একজন করে তোলে। তাঁর নেতৃত্ব নতুন এক প্রজন্মের আফ্রিকান রাজনীতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে ঔপনিবেশিক প্রভাব ও পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রবল অবস্থান স্পষ্ট। সম্প্রতি তাঁর দেয়া একটা ভাষণ নিয়ে সারাবিশ্বে তোলপাড় শুরু হয়েছে। এই ভাষণ শুনলে মনে হয় যেন কেউ কাজী নজরুল ইসলামের “বিদ্রোহী” কবিতা আবৃত্তি করছে।
ইব্রাহীম ত্রাওরের ইংরেজিতে দেয়া ভাষণের বঙ্গানুবাদঃ
সিএনএন বিবিসি ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর, সবার দিকে আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে। তোমাদের বলা প্রতিটি মিথ্যা
আমি রেকর্ড করছি। প্রতিটি বিকৃতি সংরক্ষণ করছি। আমি ইব্রাহিম ত্রাওরে, এবং আজ আমি তোমাদের মুখোশ খুলে দিচ্ছি।
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছো। আমি, যাকে তোমরা তরুণ সামরিক জান্তা নেতা বলো, যাকে বিপজ্জনক চরমপন্থী বলে চিহ্নিত করো, যাকে তুমি পশ্চিমবিরোধী স্বৈরাচারী হিসেবে উপস্থাপন করো, আজ তোমাদের সত্য বলছি।
এবার তোমরা তোমাদের মাইক্রোফোন বন্ধ করতে পারবে না। এবার তোমরা তোমাদের ক্যামেরা সরিয়ে নিতে পারবে না। এবার তোমাদের সম্পাদকরা এর একটি কথাও কেটে ফেলতে পারবে না।
কারণ, তোমরা যে বিশ্বকে একচেটিয়া ভাবে, ইচ্ছেমত চালাতে, তা আর নেই। কারণ, এখন কোটি কোটি মানুষ এই কথা শুনবে।
আমার বয়স ৩৪। আমার জীবনের প্রতিটি দিন, আমি তোমাদের বলা মিথ্যার মধ্যে বড় হয়েছি। ছোটবেলায়, আমি টেলিভিশনে আফ্রিকা দেখতাম। সবসময় একই ছবি: মাছির ভিড়ে শিশু, অনাবাদী শুকনো জমি, অস্ত্র, মৃত্যু। তোমাদের দেয়া শেখানো বুলিতে তারা বলত, এটাই আফ্রিকা। আমরা বিশ্বাস করতাম। আমরা নিজেদের অস্তিত্ব, পরিচয় নিয়ে লজ্জাই মরে যেতাম।
কিন্তু তারপর আমি বড় হলাম। পড়লাম, গবেষণা করলাম, প্রশ্ন করলাম। এবং বুঝলাম, তোমরা যে আফ্রিকা দেখিয়েছিলে, তা বাস্তব নয়। তোমরা যে গল্প বলেছিলে, তা মিথ্যা।
বছরের পর বছর, তোমরা তোমাদের খুশিমতো আফ্রিকাকে কিভাবে উপস্থাপন করেছো? কিভাবে দেখিয়েছো? কিভাবে তোমাদের দর্শকদের কাছে বিক্রি করেছো? যেন আমরা সভ্যতা, মানবতার অংশ নই। যেন আমরা সভ্যতার বাইরে থাকা বর্বর। যেন আমরা তোমাদের উদ্ধার ও দয়ার আশায় অপেক্ষমাণ দুর্ভাগা।
প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টা, প্রতি মিনিটে, তোমাদের পর্দায় একই গল্প চলে: ক্ষুধা, যুদ্ধ, রোগ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বিশৃঙ্খলা। আফ্রিকা বললেই এই শব্দগুলো মনে আসে। তোমাদের তৈরি করা আফ্রিকা অভিধানে অন্য কোনো শব্দ নেই।
কোনো আশা নেই। কোনো সাফল্য নেই। কোনো উন্নয়ন নেই। কোনো প্রতিরোধ নেই। কোনো সম্মান নেই। কোনো গর্ব নেই। কোনো বিজয় নেই।
তাই আমি তোমাদের জিজ্ঞাসা করি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান, লে মঁদ: কখনো কি আফ্রিকার সাফল্যকে তোমরা শিরোনাম করেছো? কতবার তোমরা রুয়ান্ডার প্রযুক্তি বিস্ময় নিয়ে লিখেছো? কতবার তোমরা ইথিওপিয়ার বনায়ন প্রকল্প দেখিয়েছো? কতবার তোমরা বতসোয়ানার গণতান্ত্রিক সাফল্য প্রশংসা করেছো? কতবার তোমরা কেনিয়ার অসামান্য নতুনরূপে সাজা পরিবেশের অভূতপূর্ব ফিরে আসা বর্ণনা করেছো?
না, কারণ এগুলো তোমাদের চিত্রনাট্যে ফিট করে না। তোমাদের আফ্রিকা সফল হতে পারে না। কারণ, তাহলে তোমাদের শোষণ বৈধতা পাবে না। যদি সাহায্যের প্রয়োজন না হয়, তাহলে তোমরা কিভাবে হস্তক্ষেপ করবে? যদি পিছিয়ে না থাকে, তাহলে তোমরা কিভাবে তাচ্ছিল্য করবে?
কখনো কি তোমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করেছো, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ভূমির মানুষরা কেন দরিদ্র?
শুনে রাখো, এবং আমি তো নিশ্চিত, তোমাদের মত করে এইগুলো আর কেউ জানেনা, এই সংখ্যাগুলো তোমাদের জন্য, বাস্তব সংখ্যা:
• আফ্রিকা বিশ্বের ৭০% কোবাল্টের মালিক। তোমাদের সেল ফোন, কম্পিউটার, ইলেকট্রিক গাড়ি কোবাল্ট ছাড়া চলবে না। এই কোবাল্ট কঙ্গো থেকে আসে, কিন্তু কঙ্গোলিজরা সেল ফোন কিনতে পারে না।
• আফ্রিকা বিশ্বের ৯০% প্লাটিনামের মালিক। ক্যাটালিটিক কনভার্টার, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, মেডিকেল ইমপ্লান্ট—সবকিছুর জন্য প্লাটিনাম চায়। এই প্লাটিনাম দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসে, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকানরা বেকারত্বে পিষ্ট।
• আফ্রিকা বিশ্বের ৩০% স্বর্ণ উৎপাদন করে। মালি, বুর্কিনা ফাসো, ঘানা, তানজানিয়া—আমাদের ভূমি থেকে স্বর্ণ নদীর মতো প্রবাহিত হয়, কিন্তু আমাদের মানুষরা দারিদ্রে সাঁতার কাটে।
• আফ্রিকা বিশ্বের ৬৫% হীরার যোগান দেয়। বতসোয়ানা, অ্যাঙ্গোলা, কঙ্গো, সিয়েরা লিওন—বিলিয়ন ডলারের হীরা উত্তোলন হয়, কিন্তু আমাদের খনি শ্রমিকরা দিনে ১ ডলারে খেয়ে না খেয়ে জীবনযাপন করে।
এই বাস্তবতা, এই পরিসংখ্যান, এই সত্য—তোমরা কখনো তোমাদের শিরোনামে আনো না। কারণ, তাহলে তোমাদের মিথ্যার পাহাড় ভেঙে যাবে।
তাই আমি বলছি, তোমাদের মিথ্যা শেষ। তোমাদের মুখোশ খসে গেছে। তোমাদের খেলা শেষ। আফ্রিকা মুক্ত। আফ্রিকা শক্তিশালী। আফ্রিকা চিরকাল বিজয়ী।
আফ্রিকা বিশ্বের ৩৫% ইউরেনিয়াম রিজার্ভের মালিক।
নাইজার, নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা—এইসব দেশের ইউরেনিয়ামে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলে।
প্যারিসের আলো জ্বলে আমাদের ইউরেনিয়ামে, কিন্তু আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ নেই।
তবুও তুমি জিজ্ঞেস করো, “আফ্রিকা গরিব কেন?”
না, সঠিক প্রশ্নটা হলো: আফ্রিকা এত ধনী হয়েও কীভাবে গরিব রাখা হলো? জানতে চাও?
এই নাও তোমার উত্তর।
উপনিবেশবাদ শেষ হয়নি। এটি শুধু রূপ বদলেছে।
আগে তোমরা এসে আমাদের জমি দখল করতে, এখন তোমরা এসে হরেকরকম কোম্পানি খোলো।
আগে বলপ্রয়োগ করে ছিনিয়ে নিতে, এখন চুক্তি করে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে ফেল।
আগে চাবুক দিয়ে শাসন করতে, এখন ঋণ দিয়ে শাসন করো।
আমি এখন তোমাদের সংখ্যাসহ, নামসহ, তারিখসহ নির্দিষ্ট উদাহরণ দিচ্ছি—কিন্তু এসব তোমরা কখনও লিখবে না।
Glencore, সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক খনির দৈত্য, কঙ্গোতে কোবাল্ট উত্তোলন করে।
২০২২ সালের আয়: ২৫৬ বিলিয়ন ডলার।
কঙ্গোতে কর প্রদান করেছে: মাত্র ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ ০.২%।
এটাই কি তোমাদের ন্যায়বিচার?
Rio Tinto, ব্রিটিশ-অস্ট্রেলিয়ান খনি প্রতিষ্ঠান, গিনিতে বছরে ২ কোটি টন বক্সাইট উত্তোলন করে।
গিনির জন্য কী রেখে যায়? পরিবেশ দূষণ আর ক্যান্সার।
Total, এখন Total Energies, ফরাসি তেল কোম্পানি।
অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া, কঙ্গোতে তেল উত্তোলন করে।
২০২২ সালের লাভ: ৩৬ বিলিয়ন ডলার।
আফ্রিকায় বিনিয়োগ? জরাজীর্ণ পাইপলাইন।
Anglo-American, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত, এখন লন্ডনে।
হীরা, প্লাটিনাম, লোহা—সবকিছু নিয়ে যায়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় কী রেখে গেছে? ছয় মিলিয়ন বেকার খনি শ্রমিক।
আর এসব কেবল পানির উপরে ভেসে থাকা বরফের সামান্য অংশ মাত্র। অদৃশ্য চুক্তিগুলো কী হবে? গোপন লেনদেন? অফশোর একাউন্ট? ট্রান্সফার প্রাইসিং চাতুরী?
প্রতি বছর, ৮৮ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে আফ্রিকা থেকে বাইরে চলে যায়। কে এসব নিয়ে লেখে? প্রতি বছর, ৪৫ বিলিয়ন ডলার “সাহায্য” আসে আফ্রিকায়।
সবাই লেখে। কিন্তু কেউ বলে না: আফ্রিকা সাহায্য নিচ্ছে না, আফ্রিকা সাহায্য দিচ্ছে। তুমি যখন তোমার ক্যামেরা শিশুদের ফুলে থাকা পেটের দিকে জুম করো, তখন পেছনে এক বিশাল ব্যবস্থা নিঃশব্দে কাজ করছে। প্রতিদিন, সোনা, হীরা, কোবাল্ট, ইউরেনিয়াম, তেল টনকে টন আমাদের ভূমি থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু কীভাবে? এই হলো সেই ব্যবস্থা যা সবার সামনে এখন উন্মোচন করবঃ ধাপ এক:
দুর্নীতি তৈরি করো, আমাদের নেতাদের ঘুষ দাও, অফশোর একাউন্ট খুলো, বিলাসবহুল জীবনের প্রতিশ্রুতি দাও, তাদের সন্তানদের তোমাদের স্কুলে পাঠাও। ধাপ দুই: চুক্তি করো, ৫০ বা ৯৯ বছরের জন্য সুবিধা নাও, কর মওকুফ চাও, পরিবেশগত নিয়মের বাইরে থাকো, শ্রম অধিকারের তোয়াক্কা কোরো না। ধাপ তিন:
অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নাও—বন্দর, বিমানবন্দর, রেলপথ দখলে নাও—কিন্তু শুধু খনি থেকে বন্দর পর্যন্ত। গ্রামে রাস্তা বানিও না, স্কুলে বিদ্যুৎ দিও না। ধাপ চার: নিরাপত্তা সরবরাহ করো—প্রাইভেট নিরাপত্তা কোম্পানি বসাও, তাদের অস্ত্র দাও, প্রতিবাদ করলেই ‘সন্ত্রাসী’ ঘোষণা করো। ধাপ পাঁচ: গণমাধ্যম স্তব্ধ করো—স্থানীয় সাংবাদিকদের কিনে ফেলো, বিরোধী কণ্ঠ রুদ্ধ করো, দেশের ভিতরের বিশৃঙ্খলাকে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে ফলাও করে পরিবেশন করো। এভাবেই এই ব্যবস্থা চলে। ১০০ বছর ধরে চলছে। তুমি এটা দেখো না। দেখতে চাও না। কারণ তুমি নিজেও এই ব্যবস্থার অংশ। New York Times, CNN, BBC—এই গণমাধ্যমগুলোর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনদাতা কারা? তেল কোম্পানি, খনি কোম্পানি, অস্ত্র কোম্পানি, ওষুধ কোম্পানি—যারা আফ্রিকাকে শোষণ করে। তোমরা তাদের টাকায় বাঁচো, তাদের স্বার্থ রক্ষা করো। আর আমি যেটা বলছি, তাতে আমার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে—
কিন্তু চুপ করে থাকার সময় শেষ। ফ্রান্সের আফ্রিকা-ব্যবস্থা হলো CFA ফ্রাঁ। ১৪টি আফ্রিকান দেশ এখনো ফরাসি ঔপনিবেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে। এই দেশগুলোর ৫০% কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ফরাসি কোষাগারে পড়ে থাকে। ফ্রান্স এই টাকার ওপর নেগেটিভ সুদ আরোপ করে, অর্থাৎ আমরা ফ্রান্সকে টাকা দিই, আমাদের নিজের টাকা ব্যবহারের জন্য। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে, প্রতি বছর ফ্রান্স আফ্রিকা থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে যায়। কেউ এটা নিয়ে লেখে?
না। কিন্তু ফ্রান্স যখন আফ্রিকাকে ১০ বিলিয়ন ইউরো সহায়তা দেয়, তখন সেটা শিরোনাম হয়। ব্রিটেনের ব্যবস্থা আরো সূক্ষ্ম। লন্ডন হলো বিশ্বের মানি লন্ডারিং-এর কেন্দ্র। City of London, অফশোর স্বর্গ। আফ্রিকা থেকে চুরি হওয়া প্রতিটি পয়সা লন্ডন, জার্সি, গার্নসি, কেম্যান আইল্যান্ডস, ভার্জিন আইল্যান্ডস—সবই ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন—এর ভেতর দিয়ে যায়। আফ্রিকার সম্পদ ওখানেই লুকানো থাকে। আমেরিকার ব্যবস্থা হলো AFRICOM—Africa Command। আফ্রিকায় তাঁদের ৪৬টি সামরিক ঘাঁটি। সরকারি উদ্দেশ্য মুখে যা তাঁরা বলে: নিরাপত্তা। আসল বাস্তব উদ্দেশ্য: সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। প্রতিদিন ড্রোন আমাদের আকাশে, সর্বত্র গুপ্তচর ডিভাইস। তারা বলে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’, কিন্তু আসলে লক্ষ্য সন্ত্রাসী নয়, জনগণের নেতা। চীন হলো নতুন খেলোয়াড়। বলছে “উইন-উইন”—অবকাঠামো বানাচ্ছে, ঋণ দিচ্ছে। কিন্তু বিনিময়ে কী নিচ্ছে? ৯৯ বছরের বন্দর ইজারা, খনির অধিকার, কৃষিজমি, ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি। শ্রীলঙ্কাকে জিজ্ঞেস করো। জাম্বিয়াকে জিজ্ঞেস করো। আর এসবের কিছুই তুমি লেখো না। কেন? কারণ তুমি স্বাধীন গণমাধ্যম নও, তুমি কর্পোরেট মিডিয়া।
তোমার বসেরা বিলিয়নিয়ার। Jeff Bezos কিনে নিয়েছে Washington Post।
কেন? সাংবাদিকতাকে ভালোবেসে? রূপার্ট মারডকের গণমাধ্যম সাম্রাজ্য। ফক্স নিউজ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য সান, দ্য টাইমস — সব এক হাত থেকে, সব এক বার্তা দিচ্ছে। পশ্চিম ভালো, অন্যরা খারাপ। কার্লোস স্লিম, নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার, মেক্সিকান বিলিয়নেয়ার। তার সম্পদের উৎস কোথা থেকে? টেলিকমিউনিকেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ — লাতিন আমেরিকার ঘাড়ে চেপে ধনী হয়েছে, আর এখন নিয়ন্ত্রণ করছে আমেরিকার সবচেয়ে সম্মানিত পত্রিকা, আর তুমিই বলছো তোমরা স্বাধীন সাংবাদিকতা করো? তোমাদের সম্পাদকরা কারা? তারা কোন স্কুল থেকে পাশ করেছে? হার্ভার্ড, ইয়েল, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ — সবসময় একই এলিট স্কুল, সবসময় একই দৃষ্টিভঙ্গি, সবসময় একই ধরনের পূর্বগৃহীত তোতাপাখিকে শেখানো বুলি আর ধারণা। তোমাদের রিপোর্টাররা কীভাবে নির্বাচিত হয়? তোমাদের আফ্রিকা সংবাদদাতা কয়টি ভাষা জানে? ফরাসি, ইংরেজি — এই পর্যন্তই। সোয়াহিলি, হাউসা, ইয়োরুবা, আমহারিক — তারা কিছুই জানে না। তারা মানুষের সঙ্গে কথা বলতেও পারে না। তোমাদের সূত্র সবসময় একই — পশ্চিমা কূটনীতিক, এনজিও, বিশেষজ্ঞ — তারপর তোমরা এসে আমাদেরকে সব বিষয়ে ছবক দাও। তারা প্যাট্রিস লুমুম্বাকে হত্যা করেছিল। ১২ জানুয়ারি ১৯৬১, সিআইএ এজেন্ট ল্যারি ডেভলিন তা স্বীকার করেছিল। বেলজিয়ান ভাড়াটে সেনারা তাকে হত্যা করে। তার দেহ এসিডে গলিয়ে ফেলে, দাঁতগুলি স্মারক হিসেবে নিয়ে যায়। ২০২২ সালে, সেই দাঁত ৬১ বছর পর বেলজিয়াম থেকে তার পরিবারকে ফেরত দেওয়া হয়। তখন তুমি কী বলেছিলে? “কঙ্গোতে বিশৃঙ্খলা।” তুমি খুনিদের খোঁজ করোনি। সিআইএর নথিপত্র খুঁজে দেখোনি। বেলজিয়ামের অপরাধ নিয়ে লেখোনি। তারা থমাস সানকারাকে হত্যা করেছিল। ১৫ অক্টোবর ১৯৮৭। আমার নায়ক, আফ্রিকার আশার আলো। হামের ও মেনিনজাইটিসের বিরুদ্ধে ২৫ লক্ষ শিশুকে টিকা দিয়েছিলেন। এক কোটি গাছ রোপণ করেছিলেন। সাক্ষরতার হার ১৩% থেকে ৭৩%-এ নিয়ে গিয়েছিলেন। নারীদের সমান অধিকার দিয়েছিলেন। নারী অঙ্গচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেছিলেন। দুর্নীতি বন্ধ করেছিলেন। মার্সিডিজ গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিলেন, রেনল্ট ফাইভ ব্যবহার করতেন। IMF ও বিশ্বব্যাঙ্ককে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি বলেছিলেন — আমরা আফ্রিকার ঋণ শোধ করব না। আমরা সেই ঋণ করিনি। আমাদের আগের পুতুল সরকাররা করেছিল, উপনিবেশবাদীদের হয়ে। ঠিক তখনই তাকে হত্যা করতে হয়েছিল। আর তারা তাকে হত্যা করেছিল। কে হত্যা করেছিল? তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ব্লেইজ কমপাওরে। কার সহায়তায়? ফ্রান্স।প্রমাণ চাই? ফুকো আর্কাইভস দেখো। জ্যাক ফুকো, ফ্রান্সের আফ্রিকা-বিষয়ক উপদেষ্টা। সবকিছু সেখানে লেখা আছে। আর তুমি কী বলেছিলে? “বুরকিনা ফাসোতে সামরিক অভ্যুত্থান।” তুমি সানকারার স্বপ্ন নিয়ে লেখোনি। তার প্রকল্প নিয়ে লেখোনি। তার সাফল্য দেখাওনি। তুমি শুধু বলেছিলে — “আরেক স্বৈরাচারীর মৃত্যু।” মুয়াম্মার গাদ্দাফি। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন স্ব রশাসক। হ্যাঁ, তিনি ছিলেন নির্মম। কিন্তু লিবিয়ায় তিনি কী করেছিলেন? মাথাপিছু আয় $১২,০০০ — আফ্রিকার সর্বোচ্চ। সাক্ষরতার হার ২৫% থেকে ৮৭%-এ উন্নীত। গড় আয়ু ৫১ থেকে ৭৪ বছর। বিনামূল্যে চিকিৎসা, বিনামূল্যে শিক্ষা, নবদম্পতিদের জন্য $৫০,০০০ অনুদান। বাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ। নবজাতকের জন্য $৫,০০০। পেট্রোল প্রতি লিটার ১৪ সেন্ট। দানবীয় মানবসৃষ্ট নদী প্রকল্প। মরুভূমিকে সবুজ করতে সেচ প্রকল্প। আর গাদ্দাফির আসল অপরাধ কী ছিল? আফ্রিকাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নের সবচে বড় বাধা। আফ্রিকান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা। আফ্রিকান বিনিয়োগ ব্যাংক। আফ্রিকান মুদ্রা তহবিল। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর — স্বর্ণ দিনার। ডলারের বদলে তেল বিক্রিতে অস্বীকৃতি। ২০ অক্টোবর ২০১১, সির্তে শহরে তাকে হত্যা করা হয়। হিলারি ক্লিনটন হেসে বলেছিলেন — We came, we saw, he died. এখন লিবিয়ার দিকে তাকাও — তিনটি পৃথক সরকার, শেষ নেই গৃহযুদ্ধের, আইএস, আল-কায়েদা বন্যভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে, দাসবাজার চলছে। ২০১৭ সালে সিএনএন-ও দেখিয়েছিল—তেল লুট হচ্ছে, অস্ত্রের গুদাম খালি করে সাহেলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তুমি একে গণতন্ত্র বলো? তুমি একে স্বাধীনতা বলো? তুমি একে সাফল্য বলো? এবং এখন কার পালা? সাহেল, মালি, নাইজার, বুরকিনা ফাসো। তোমরা আমাদেরও লিবিয়া বানাতে চাও। তোমরা আমাদের সিরিয়া বানাতে চাও। তোমরা আমাদের ইরাক বানাতে চাও। কিন্তু এবার নয়। কারণ আমরা জেগে উঠেছি। কারণ আমরা শিখেছি। কারণ আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। অপারেশন বারখানে—ফ্রান্সের সাহেল অভিযান, ২০১৩ থেকে ২০২২। আনুষ্ঠানিক উদ্দেশ্য: সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই। আসল উদ্দেশ্য: সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। ৫ থেকে ১০০ ফরাসি সৈন্য, বার্ষিক বাজেট এক বিলিয়ন ইউরো। ফলাফল কী? ২০১৩ সালে মালিতে ৫০০ সন্ত্রাসী, ২০২২ সালে সাহেলে ৫,০০০-এর বেশি। দশগুণ বৃদ্ধি। এটা কেমন সাফল্য? কিন্তু ফরাসি সৈন্যরা কী করছিল? আরেভা ও ওরানোর জন্য নাইজারের ইউরেনিয়াম খনি রক্ষা, টোটালের জন্য তেল পাইপলাইন সুরক্ষা, বোলোরের জন্য বন্দর ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণ। আর সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই? না, উল্টোটা। সন্ত্রাসীরা ফরাসি সৈন্যদের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে আসতে পারত না, কিন্তু সহজেই আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিত। কেন? কারণ বিশৃঙ্খলা তাদের উদ্দেশ্য পূরণ করত। যদি বিশৃঙ্খলা থাকে, তারা নিরাপত্তার অজুহাতে থাকতে পারত। মাইনুসমা—মালিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী। ১৫,০০০ সৈন্য, বার্ষিক বাজেট ১.২ বিলিয়ন। দশ বছর। ফলাফল? ৩০০-র বেশি জাতিসংঘ সৈন্য নিহত, হাজার হাজার বেসামরিক নিহত। সন্ত্রাস কমেনি, বেড়েছে।
আর এখন তুমি বলো ওয়াগনার বিপজ্জনক। রাশিয়ানরা আফ্রিকা দখল করছে। ওয়াগনার এল। ১,০০০ সৈন্য। ছয় মাসে কী হলো? সন্ত্রাসীরা পালালো। গ্রামগুলো নিরাপদ। খনিগুলো চালু। মানুষ শান্তিতে। পার্থক্য কী? ওয়াগনার আমাদের আমন্ত্রণে এসেছে। অন্যদিকে ফ্রান্স জোর করে এসেছে। ওয়াগনার চুক্তি মেনে চলে। ফ্রান্স ব্ল্যাকমেইল করে। ওয়াগনার ফলাফল আনে। ফ্রান্স অজুহাত তৈরি করে।(RFI)
কিন্তু তুমি সত্য লিখো না। তুমি তাঁকে বলো রাশিয়ান ভাড়াটে। তাহলে ফরাসি লেজিওন এত্রাঞ্জেরে কী? তারা কি ভাড়াটে নয়? আমেরিকান ব্ল্যাকওয়াটার একাডেমি কী? ব্রিটিশ G4S কী? ইসরায়েলি ব্ল্যাক কিউব কী? তারা নিরাপত্তা কোম্পানি। ওয়াগনার হুমকি কেন? কারণ ওয়াগনার তোমাদের নয়। তোমাদের স্বার্থে কথা বলে না। আর সন্ত্রাসবাদের বিষয়টি? এই সন্ত্রাস কে তৈরি করেছে? কে আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠা করেছে? ১৯৮০-এর দশক, আফগানিস্তান, সিআইএ, পাকিস্তানের আইএসআই, সৌদি অর্থ—সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে। বিন লাদেন ছিল সিআইএর লোক। তোমরা তাদের মুক্তিযোদ্ধা বলেছিলে। কে তালেবানকে সমর্থন করেছিল? আবার, তোমরা। সোভিয়েত দখলের বিরুদ্ধে বীর মুজাহিদিন। তোমরা অস্ত্র দিয়েছিলে, অর্থ দিয়েছিলে, প্রশিক্ষণ দিয়েছিলে। তারপর নিয়ন্ত্রণ হারালে। আইএসআইএস কীভাবে জন্ম নিল? ২০০৩, ইরাক আক্রমণ। তোমরা সাদ্দামকে সরালে। সেনাবাহিনী ভেঙে দিলে। বাথ পার্টি নিষিদ্ধ করলে। আবু গারিবে নির্যাতন করলে। আর সেই লোকরাই আইএসআইএস হলো। তারপর সিরিয়া। তোমরা বললে আসাদকে যেতে হবে। তোমরা বললে মডারেট বিদ্রোহী। তোমরা অস্ত্র দিলে। সেই অস্ত্র আইএসআইএসের কাছে গেল। আল-নুসরার কাছে গেল। তোমরা লিবিয়া ধ্বংস করলে। কে গাদ্দাফির অস্ত্র গুদাম লুট করেছিল? সেই অস্ত্র কোথায় গেল? মালি, নাইজার, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, চাদে। কে বোকো হারামকে শক্তিশালী করেছিল? ২০০৯ সালে নাইজেরিয়ান পুলিশ তাদের নেতা মোহাম্মদ ইউসুফকে হত্যা করেছিল। বিচারবহির্ভূত হত্যা। তুমি কী বলেছিলে? কিছু না। তোমাদের মানবাধিকার সংস্থাগুলো কোথায় ছিল? নীরব। তারপর প্রতিশোধ শুরু হলো। বোকো হারাম চরমপন্থী হলো। কিন্তু তারা অস্ত্র কোথায় পেল? লিবিয়া থেকে। তোমরা যে লিবিয়া ধ্বংস করেছিলে। আর এখন তুমি আমাদের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শেখাতে এসেছো। তোমরা আমাদের সাহায্য করছো তোমাদের তৈরি দানবদের পরিষ্কার করতে। না, আমরা এখন খেলা বুঝে গেছি। সন্ত্রাস তোমাদের ট্রয়ান হর্স। তোমরা সন্ত্রাসের অজুহাতে আসো। তোমরা থাকো। তোমরা শোষণ করো। কিন্তু এখন শেষ। আমরা আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আমরা আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে লড়ব। আর আমরা জিতব। কারণ আমরা এই মাটির সন্তান। আমরা এই মাটির প্রতিটি কোণা চিনি। আমরা এই মানুষদের জানি। আমরা সন্ত্রাসী আর গ্রামবাসীর পার্থক্য বুঝি। আমরা ড্রোন থেকে, স্যাটেলাইট থেকে, ১০,০০০ কিলোমিটার দূর থেকে যুদ্ধ করি না, তোমাদের মতো।
আর আমরা জিতছি। মালিতে, নাইজারে, বুরকিনা ফাসোতে সন্ত্রাস শেষ হচ্ছে। গ্রামগুলো নিরাপদ। মানুষ আশাবাদী। কারণ এখন আমাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী, আমাদের নিজস্ব পুলিশ লড়ছে। বিদেশিদের জন্য নয়, বরং জনগণের জন্য। কিন্তু তুমি এটা মেনে নিতে পার না। তুমি বল গণতন্ত্র হ্রাস পাচ্ছে। তুমি বল মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। কোন গণতন্ত্র? কোন মানবাধিকার? গুয়ানতানামোতে কতজনকে বিচার ছাড়াই বন্দী করে রাখা হয়েছে? আবু গারিবে কী ঘটেছিল? তুমি বাগরামে কাকে হত্যা করেছ? সিআইএ-র ব্ল্যাক সাইটগুলোতে কাকে নির্যাতন করেছ? জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কেন কারাগারে, তোমার যুদ্ধাপরাধ ফাঁস করায়? কেন চেলসি ম্যানিংকে বছরের পর বছর জেলে রাখা হয়েছিল? সত্য প্রকাশ করায়? কেন এডওয়ার্ড স্নোডেন পলাতক, কারণ সে প্রকাশ করেছে তুমি সবার উপর নজরদারি কর? এবং তুমি আমাদেরকে মানবাধিকার নিয়ে ভাষণ দাও। তোমার ড্রোন হামলায় কতজন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে? তুমি বল “পার্শ্বপ্রিতিক্রিয়াজনিত ক্ষয়ক্ষতি” (collateral damage), তারপর আরো আছে। পাকিস্তান, ইয়েমেন, সোমালিয়ায় তুমি কতটা বিয়ের অনুষ্ঠান টার্গেট করেছ? কতটা স্কুল তুমি বোমা মেরে ধ্বংস করেছ? কতটা হাসপাতাল তুমি আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছ? আর তুমি আমাদের যুদ্ধের নিয়ম শেখা্ব? দেখ, আমি যুদ্ধ থেকে এসেছি। আমি ফ্রন্টলাইন চিনি। আমি মৃত্যু দেখেছি। আমি আহত সৈনিকদের বহন করেছি। আমি শহীদদের মায়েদের সান্ত্বনা দিয়েছি। এবং আমি তোমাকে বলি, একজন প্রকৃত সৈনিক তার জনগণকে রক্ষা করে। একজন প্রকৃত সৈনিক কখনও বেসামরিক লোকদের ক্ষতি করে না। একজন প্রকৃত সৈনিক সম্মানের সঙ্গে যুদ্ধ করে। তোমার ভাড়াটে সৈন্য, তোমার ড্রোন চালক, তোমার স্পেশাল ফোর্স—তারা সৈনিক নয়, তারা হত্যাকারী। তারা মানুষ হত্যা করে এক টিপে ১০,০০০ কিলোমিটার দূর থেকে, তারপর বাসায় ফিরে গিয়ে তাদের সন্তানদের সঙ্গে খেলে। আমরা সে রকম যুদ্ধ করি না। আমরা আমাদের শত্রুর চোখে চোখ রেখে যুদ্ধ করি। আমরা বেসামরিক মানুষদের রক্ষা করি। আমরা সম্মানের সঙ্গে যুদ্ধ করি। আমরা সম্মানের সঙ্গে মারা যাই। এবং আমরা জয়লাভ করব। কারণ ন্যায়বানরা জয়ী হয়। কারণ যারা তাদের জনগণের সঙ্গে যুদ্ধ করে তারা জয়ী হয়। কারণ যারা তাদের মাটির জন্য যুদ্ধ করে, তারা জয়ী হয়। আসো, এবার তোমাদের মিডিয়ার কথায় ফিরে যাই। আমি জানি তোমরা কীভাবে কাজ কর। আমার বন্ধুরা আছে যারা এই সিস্টেমের ভিতরে কাজ করে। বিবেকবান সাংবাদিক আছে, কিন্তু তারা চুপ করে থাকে। কেন? কারণ এই ব্যবস্থা তাদের চুপ করিয়ে দেয়। যারা সত্য লিখে, তারা চাকরি হারায়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বাজেট কাটছাঁটের নামে বাদ দেওয়া হয়। যারা ভিন্নমত পোষণ করে, তাদের পাঠক আগ্রহ না থাকার অজুহাতে সরিয়ে দেওয়া হয়। এবং তাদের জায়গা দখল করে কারা? থিঙ্ক ট্যাংক, এনজিও, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা, যারা সব সময় একই কথা বলে, একই মতবাদ রক্ষা করে—পশ্চিম ভালো, আফ্রিকা খারাপ। তাহলে এরা কারা? এদের অর্থায়ন কোথা থেকে আসে? ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্র্যাসি (NED), আমেরিকার গণতন্ত্র রপ্তানিকারী সংস্থা, সিআইএ-র আইনগত শাখা, সবখানে এর হাত, বিরোধীদের অর্থ দেয়, মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, তথাকথিত “সিভিল সোসাইটি” তৈরি করে। ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনস, জর্জ সোরোসের সংস্থা, বলে খোলা সমাজ, কিন্তু কার জন্য খোলা? কী খোলার জন্য খোলা? শোষণের জন্য? হস্তক্ষেপের জন্য? নিয়ন্ত্রণের জন্য?
ফোর্ড ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, সবাই আফ্রিকায় ত্রাণ কাজ করছে। কিন্তু তার বিনিময়ে কী পাচ্ছে? নিয়ন্ত্রণ, তথ্য, প্রভাব। আর তোমাদের মিডিয়া হচ্ছে তাদের বেহালা। তাঁরা হেডলাইন দেয়—“গেটস আফ্রিকাকে বাঁচাচ্ছেন।” কিন্তু তোমরা লেখ না—গেটসের ভ্যাকসিন ট্রায়ালে কত আফ্রিকান শিশু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছে? মনস্যান্টোর বীজের কারণে কত কৃষক আত্মহত্যা করেছে? তোমরা গল্প বলতে ওস্তাদ, কিন্তু সবসময় একই গল্প—সাদা মুক্তিদাতা। মনে আছে লাইভ এইড, ১৯৮৫? “We Are the World”—আফ্রিকার জন্য দাতব্য কনসার্ট, মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ওঠানো হলো। আফ্রিকায় কী গেল? দুর্নীতি বেড়েছে, নির্ভরতা বেড়েছে, কিন্তু তোমাদের জন্য একটা দুর্দান্ত গল্প হলো। বব গেলডফ হয়ে গেলেন নায়ক। সংগীতশিল্পীরা বিবেকবান হয়ে উঠলেন। দর্শকেরা নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করল। আফ্রিকা অনাহারে রইল। মনে আছে কোনি ২০১২? ভাইরাল ভিডিও—“জোসেফ কোনিকে থামাও,” ১০ কোটি ভিউ। ফলাফল কী? কোনি এখনো মুক্ত, কিন্তু ভিডিও নির্মাতা ধনী হয়েছে। ইনভিজিবল চিলড্রেন অর্গানাইজেশন কোটি কোটি ডলার তুলেছে। উগান্ডায় কী গেল? মার্কিন সেনা।
আর তোমরা এসবকে সফলতা হিসেবে উপস্থাপন কর। অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, ম্যাডোনা, বোনো—সবাই আফ্রিকার “ভলান্টিয়ার।” আসে, ছবি তোলে, শিশু দত্তক নেয়, চলে যায়। আর তোমরা বল, “আফ্রিকায় আগ্রহ বেড়েছে।” কিসের আগ্রহ? কার আগ্রহ? কোন স্বার্থের জন্য আগ্রহ? ম্যাডোনা মালাউই থেকে শিশু দত্তক নিলেন, তোমরা হেডলাইন করলে। কিন্তু মালাউইতে প্রতিদিন ১০০ শিশু ম্যালেরিয়ায় মারা যায়। তোমরা তা লেখেনি, কারণ সে খবর বিক্রি হয়না। বোনো হয়ে গেলেন আফ্রিকার মুখপাত্র, U2 কনসার্ট করে বিলিয়ন ডলার তুললেন, কিন্তু নিজের কোম্পানি নেদারল্যান্ডসে সরিয়ে নিলেন কর ফাঁকি দিতে। আফ্রিকার সম্পদ লুটের টাকাও যায় নেদারল্যান্ডস হয়ে। তোমরা এই নিয়ে এটা লিখ? জর্জ ক্লুনি ডারফুরের জন্য প্রচারণা চালালেন—“ডারফুরকে বাঁচাও।” ফল কী? সুদান ভাগ হয়ে গেল। তেল রয়ে গেল দক্ষিণ সুদানে। এখন দক্ষিণ সুদান গৃহযুদ্ধে। তেল পাচ্ছে কে? অনুমান কর। তুমি সবসময় এগুলোকে মানবিক সাহায্য হিসেবে উপস্থাপন কর, কিন্তু এগুলো আসলে সাম্রাজ্যবাদের ছদ্মবেশি ভিত্তি। এগুলো শোষণের প্রচারক। আমি তোমাকে প্রকৃত সংখ্যা দিই। প্রতি বছর আফ্রিকায় ১৩৪ বিলিয়ন ডলার সাহায্য ও বিনিয়োগ আসে। প্রতি বছর আফ্রিকা থেকে ১৯২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ বেরিয়ে যায়। নেট ক্ষতি, প্রতি বছর ৫৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তুমি কেবল ১৩৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা লেখেন। ১৯২ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে কথা লেখেন না। কেন? কারণ তখন মানুষ প্রশ্ন করবে, আফ্রিকার সাহায্যের প্রয়োজন কেন? অবৈধ আর্থিক প্রবাহ, প্রতি বছর ৮৮.৬ বিলিয়ন ডলার; বহুজাতিক কর্পোরেশনের মুনাফা স্থানান্তর, ৪৮.২ বিলিয়ন ডলার; ঋণের সুদ, ১৭ বিলিয়ন ডলার; ব্রেইন ড্রেইনের খরচ, ১৩.৮ বিলিয়ন ডলার; জলবায়ু পরিবর্তনের খরচ, ১০.৬ বিলিয়ন ডলার; অবৈধ বন নিধন, ১৭ বিলিয়ন ডলার; অবৈধ মাছ ধরা, ১.৩ বিলিয়ন ডলার; মোট ১৯২ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রতি বছর। এই পরিমাণ সম্পদ প্রতি বছর আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে যায়। কিন্তু তোমার শিরোনাম কী? ইইউ আফ্রিকার জন্য ২০ বিলিয়ন ইউরো সাহায্য প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। চীন আফ্রিকাকে ৬০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। আমেরিকা আফ্রিকাকে ৮ বিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে। মানুষ এগুলো পড়ে ভাবে, তারা কত উদার, কত দয়ালু, আফ্রিকা কত অকৃতজ্ঞ। কিন্তু সত্য ঠিক উল্টো। আফ্রিকা তোমার জীবনযাত্রার মান অর্থায়ন করছে। আফ্রিকা তোমার সমৃদ্ধিকে ভর্তুকি দিচ্ছে। আফ্রিকা তোমার প্রযুক্তিকে সম্ভব করছে। তোমার আইফোনের কোবাল্ট, কঙ্গো থেকে। তোমার টেসলার লিথিয়াম, জিম্বাবুয়ে থেকে। তোমার কম্পিউটারের ট্যানটালাম, রুয়ান্ডা থেকে। তোমার গহনা, বতসোয়ানা থেকে। তোমার চকলেট, আইভরি কোস্ট থেকে। তোমার কফি, ইথিওপিয়া থেকে। তোমার তেল, নাইজেরিয়া থেকে। তোমার ইউরেনিয়াম, নাইজার থেকে। আর আমরা বিনিময়ে কী পাই? ঋণ, দারিদ্র্য, অপমান। কিন্তু যথেষ্ট হয়েছে। এই খেলা এখন শেষ হবে, কারণ আমরা জেগে উঠেছি। আমাদের যুবকরা সামাজিক মাধ্যমে সত্য শেয়ার করছে। আমাদের হ্যাশট্যাগ ১০০ মিলিয়ন বার ব্যবহৃত হয়েছে। ৫০ মিলিয়ন বার। ৭৫ মিলিয়ন বার। আর তুমি কী করছ? তুমি বলেন, রাশিয়ান বট। তুমি বলেন, চীনা প্রচারণা। তুমি বলেন, বিভ্রান্তিকর তথ্য। না। এগুলো বাস্তব আফ্রিকানদের বাস্তব কণ্ঠস্বর। এটা বাস্তব ক্ষোভ। এটা বাস্তব জাগরণ। টিকটকে লক্ষ লক্ষ যুবক। ফরাসি সৈন্যদের প্রত্যাহার উদযাপন করছে। ওয়াগনারের আগমনকে স্বাগত জানাচ্ছে। টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুকে সত্য ব্যাখ্যা করছে। সর্বত্র একই কণ্ঠস্বর। যথেষ্ট হয়েছে। আর তুমি আতঙ্কিত হচ্ছেন, কারণ তুমি নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। তুমি তোমার ন্যারেটিভ হারাচ্ছেন। তুমি একচেটিয়া অধিকার হারাচ্ছেন। তুমি ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। AfricaCheck, AFP FactCheck। এগুলো কে অর্থায়ন করে? ফেসবুক, গুগল, বিল গেটস। আবার একই সিস্টেম। তুমি কী যাচাই করছ? তুমি কার তথ্য রক্ষা করছ? আমরা বলি, ফ্রান্স প্রতি বছর ৫০০ বিলিয়ন ডলার শোষণ করে। তুমি বলেন, মিথ্যা। শুধু ৪৪০ বিলিয়ন ডলার। যেন এতে কিছু পরিবর্তন হয়। যেন ৪৪০ বিলিয়ন ডলার কম। আমরা বলি, ওয়াগনার সফল হয়েছে। তুমি বলেন, ওয়াগনার মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। তাহলে ফরাসি সৈন্যরা কী করছিল? ফুলানি গ্রামে বোমা ফেলছিল। ডোগন মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিচ্ছিল। দুর্ঘটনাক্রমে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলা করছিল। তোমার ভণ্ডামি এত স্পষ্ট যে কেউ আর তোমাকে বিশ্বাস করে না। স্মরণ কর, অ্যান্ডারসন কুপার CNN-এ কী বলেছিলেন? আফ্রিকায় গণতন্ত্র হ্রাস পাচ্ছে। কোন গণতন্ত্র, অ্যান্ডারসন? তোমার গণতন্ত্র? আমেরিকার গণতন্ত্র? তোমার ক্যাপিটল দাঙ্গা, ৬ জানুয়ারি ২০২১। তুমি বললেন, গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ। পাঁচজন মারা গেল। আমাদের সানকারা হত্যাকাণ্ড, ১৫ অক্টোবর ১৯৮৭। তুমি বললেন, অভ্যন্তরীণ বিষয়। একজন মারা গেল, কিন্তু সেই ব্যক্তি ছিল ২০ মিলিয়ন মানুষের আশা। তোমার নির্বাচনে, কর্পোরেশন প্রার্থীদের অর্থায়ন করে। লবিস্টরা আইন লেখে। তুমি আমাদের নির্বাচনকে বলেন, কারচুপিপূর্ণ। তোমার দেশে, পুলিশ কৃষ্ণাঙ্গদের হত্যা করে। জর্জ ফ্লয়েড, ব্রেওনা টেলর, আহমদ আরবেরি। তুমি আমাদের পুলিশ সহিংসতা সম্পর্কে উপদেশ দেন। BBC-তে, কাসিয়া মাদেরা আফ্রিকা নিউজ উপস্থাপন কর। পোলিশ বংশোদ্ভূত। তিনি কত বছর আফ্রিকায় বসবাস করেছেন? তিনি কতটি আফ্রিকান ভাষা জান? কিন্তু প্রতিদিন তিনি আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কথা বলেন। আফ্রিকা এমন, আফ্রিকা তেমন। ফ্রান্স ২৪-এ, ক্যামেরাম্যান, সম্পাদক, প্রযোজক, বেশিরভাগই ফরাসি। এমনকি আফ্রিকা সংবাদদাতারাও বেশিরভাগই ফরাসি। আর তারা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করে। এমনকি আল জাজিরাও, কাতার এটি অর্থায়ন করে। কাতারের সাহেলে কী কাজ আছে? কিন্তু প্রতিদিন তারা সাহেল সংকট রিপোর্ট করে। তারা কার সংকট বলছে? ডয়চে ভেলে, ভয়েস অফ আমেরিকা, আরএফআই—সব রাষ্ট্রীয় মিডিয়া, সব প্রপাগান্ডার হাতিয়ার। কিন্তু এরা স্বাধীন মিডিয়ার ভান করে। আর আমাদের স্থানীয় মিডিয়াগুলো? অধিকাংশই বিক্রি হয়ে গেছে। অধিকাংশই ভীতু। অধিকাংশই নির্ভরশীল। বুরকিনা ফাসোর Le Pays পত্রিকা—এর সম্পাদক কে? কোথা থেকে সে পড়াশোনা করেছে? কোথা থেকে সে অর্থায়ন পায়? তার বিজ্ঞাপনদাতারা কারা? আমরা সব জানি। সব একই ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। সব একই প্রভুর সেবা করছে। কিন্তু একটা ন