22/02/2024
"ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ
ও অগ্নিগর্ভ বায়ান্নর একুশে"।
============
============
যে কেউ এই লিখাটি পড়বে
ভাবনার তরঙ্গ তাকে ছুঁয়ে যাবেই ..!!
আমি নিশ্চিত। ✔
-সৈয়দ হাদি তর্কবাগীশ ।
Syed Hadi Tarkabagish.
মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ তখন সরকারি দলের পুর্ববঙ্গ আইন পরিষদের মুসলিম লীগ দলীয় সদস্য। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তখন ১৪৪ ধারা।
আগের দিন পুর্ববঙ্গের কুখ্যাত প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন ১৪৪ ধারা জারি করেছেন...।
২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের ঔ দিনই ডাকা হয়েছে পুর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক পরিষদের বাজেট অধিবেশন (সংসদের বাজেট অধিবেশন)। বৈঠকে যথারীতি উপস্থিত আছেন ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ।
পার্লামেন্টারি বৈঠক চলাকালে সহসা ভেসে এলো গুলির শব্দ। চমকে উঠলেন তর্কবাগীশ। কেঁপে উঠলো তাঁর অন্তরআত্বা...।
অবাক বিস্ময়ে তিনি দেখলেন উপস্থিত সদস্যরা বিচলিত ; কিন্তু মন্ত্রীরা নির্বিকার ।
ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ এক মুহুর্ত থাকতে পারলেন না। তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
পরিষদ ভবনের সামনের (সংসদ ভবনের সামনের) রাজপথ জনশুন্য। অদুরে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল থেকে মাইকে ভেসে আসছে ছাত্রদের অন্তরভেদী আর্তচিৎকার...।
তাঁরা ব্যবস্থাপক পরিষদের (অ্যাসেম্বলি/ সংসদ) সদস্যদের কাছে জানাচ্ছে অধিবেশন বর্জনের আহ্বান।
ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ ছুটে চললেন সেই দিকে। মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গনে এসে দেখলেন এক হৃদয় বিদারক বীভৎস দৃশ্য...।
রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রাজপথে...। গুলির আঘাতে ঝাঝরা হয়েছে কয়েকটি টগবগে তরুনের বুক, দেহ...।
ইতি মধ্যে নিভে গেছে কয়েকটা প্রান প্রদীপ। সাথী বন্ধুদের মৃত্যু চিৎকার আর রক্তের ফিনকি ছাত্রদের বুকের ভিতর জ্বেলে দিয়েছে অগ্নিশিখা...।
সমাজ সংস্কারক গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা, ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশের জবানীতেই সেই দিনের ঘটনা তুলে ধরছি....।
আমি তখন পুর্ববাংলা আইন পরিষদের সদস্য। ২০ শে ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় জারি করেন ১৪৪ ধারা...।
কাজেই জনসভা, মিছিল ইত্যাদি নিষদ্ধ ছিল। রাস্তায় রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ ও মিলিটারি। এরই মধ্যে দুপুর দুইটার দিকে অ্যাসেম্বলি হাউসে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি দলের সভা বসে।
আমার মনে পড়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে পরিষদের সভা আহ্বান করা হয়( সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা হয়)। তখন বাহিরে মুহুর্মুহু রাইফেলের গর্জন। কিন্তু কোন মন্ত্রী কিংবা পরিষদের কোন সদস্যদের মধ্যে কোন সাড়া নেই।
মাঝ মাঝে গুলি কাঁদানে গ্যাস, শেল বর্ষনের শব্দে আমি শিউরে উঠছিলাম। এক সময় হাউস থেকে বেরিয়ে আসি (একসময় সংসদ থেকে আমি বেরিয়ে আসি)।
দেখি রাজপথ জনশুন্য। রাইফেল ও লাঠি হাতে স্থানে স্থানে দাড়িয়ে আছে পুলিশ ও সৈন্যরা।
আমি মেডিকেল কলেজের দিকে অগ্রসর হলাম।
কলেজের কাছে এসে আমি যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমি অশ্রু সংবরন করতে পারিনি। ছাত্ররা চিৎকার করছে। দূর থেকে তারা আইন সভার সদস্যদের প্রতি (সংসদ সদস্যদের প্রতি) আহ্বান জানাচ্ছে বেরিয়ে এসে পরিস্থিতি দেখার জন্য।
আহত ছাত্ররা আর্তনাদ করছে। কারও কারও কাপড়ে ফেনা যুক্ত রক্ত...।
শুনতে পেলাম বহু ছাত্র হতাহত হয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে আমার সক্রিয় রাজনীতির চল্লিশ বছরের জীবনে হাসপাতালের অভ্যান্তরে পুলিশের গুলি বর্ষনের এমন ঘটনা আমি দ্বিতীয়টি আর দেখিনি....।
মর্মান্তিক এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলাম না।
হাউসের কাছে প্রতিবাদ জানানোর জন্য, অবস্থা বিবৃতি করার জন্য ছুটে এলাম অ্যাসেম্বলি হাউসে (সংসদ ভবনে)।
বিকাল তিনটা ত্রিশ মিনিট, স্পিকার আব্দুল করিম আসন গ্রহন করলেন। আমি তখন সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাড়ালাম...।
জনাব স্পিকার: প্রশ্নোত্তরের পূর্বে আমি আপনার কাছে একটা নিবেদন করতে চাই...,
ভবিষ্যতের আশা ভরসা দেশের ছাত্ররা যখন পুলিশের গুলিতে জীবন দিচ্ছে তখন আমরা এখানে বসে সভা করতে পারিনা। আমার দাবি প্রথমে ইনকোয়ারি, তারপর হাউস বসবে।এর আগে হাউস বাসতে আমি
দিবো না.....।
এ নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে আমার দীর্ঘ বাকবিতন্ডা হয়। তিনি বারবার আমাকে অ্যাসেম্বলির আইন মোতাবেক আচরন করার কথা বলেন।
আমারও এক কথা, যে সরকার আমাদের সন্তানদের গুলি করে হত্যা করছে, সেই সরকারের আইন মানা যায় না....।
আমি মানবো না.....।
আগে প্রধান মন্ত্রীকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এসে বিবৃতি দিতে হবে, তারপর অধিবেশন চলবে (সংসদ চলবে), তার পূর্বে নয়....।
আমি অধিবেশন চলবে দেব না...।
তুমুল বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি ঘোষনা করতে বাধ্য হয়। অধিবেশন মুলতবির পর অধিবেশন আবার শুরু হলে,
এক বিবৃতির মাধ্যমে এহেন জুলুমের প্রতিবাদ জানিয়ে আমি পরিষদ ভবন (সংসদ ভবন) ত্যাগ করি। এবং চিরতরে মুসলিম লীগ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেই...।
ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ একাই পরিষদ ভবন (সংসদ ভবন) ত্যাগ করে সরাসরি চলে আসেন মেডিকেল কলেজে।
তিনি এখানে ছাত্রদের মিছিলে এবং সমাবেশে যোগ দেন...।
মিছিল সহযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে যেখানে বর্তমানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সেখানে যে টিনের হোস্টেল ছিল তার বারান্দায় দেখতে পান একজন শহীদ ছাত্রের মাথার খুলি বুলেটের আঘাতে উড়ে গেছে...। ছাত্রদের মধ্যে চরম উত্তেজনা...। হোস্টেল সমাগত ছাত্রদের উদ্দ্যেশে ভাষন দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
মাওলানা তর্কবাগীশ ভাষনে বলেন,
যার হাতে আমার জীবন মৃত্যু সেই মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ পাকের কসম, শহীদদের পবিত্র রক্তের শপথ আল্লাহ পাক যদি আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে বাংলা ভাষাকে আমি রাষ্ট্রভাষায় পরিনত করবোই ইনশাআল্লাহ...।
শৃংখলার মাধ্যমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা না পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ।
*** উল্লেখ্য বক্তৃতা দেয়ার সময় ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক মাওলানা তর্কবাগীশের ডান হাতে ভাষা শহীদদের পবিত্র রক্ত লেগেছিল...।
তিনি একাই মুসলিম লীগ ও পরিষদ ভবন ( সংসদ ভবন) ত্যাগ করে ছাত্র জনতার কাতারে শামিল হয়ে গেলেন...।
এর জন্য তাঁকে রুদ্ধদার কক্ষে বৈঠক কিংবা কোন আলোচনায় বসতে হয়নি কারো মতামতের জন্য এক মুহুর্ত অপেক্ষা করতে হয়নি..।
.. চীর বিপ্লবী মাওলানা তর্কবাগীশ নিজ বিবেক তাড়িত হয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে এক মুহুর্ত দ্বিধা করেননি...।
আবার ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ
মাওলানা তর্কবাগীশের জবানিতেই বলি....,
পরদিন ২২ শে ফেব্রুয়ারি যথারীতি অধিবেশন বসেছে পরিষদের (সংসদ ভবনে)।
আমি প্রস্তাব উত্থাপন করলাম অধিবেশন মুলতবির (সংসদ অধিবেশন মুলতবির), এ প্রস্তাবের প্রতি ৩৫ জন সদস্যের সমর্থন আছে কিনা সদস্যদের কাছে স্পিকার জানতে চাইলেন...।
কিন্তু খয়রাত হোসেন, খান সাহেব ওসমান আলী, আলী আহমেদ, আনোয়ারা খাতুন, মনোরঞ্জন ধর, ধীরেন দত্ত, গোবিন্দ বল্লভ ব্যানার্জী, বসন্ত কুমার দাস, মনির উদ্দিন আকন্দ, সামসুদ্দিন আহমেদ, আলী আহমদ চৌধুরী, কবির চৌধুরী, ডাঃ ভোলানাথ বিশ্বাস, হারান চন্দ্র বর্মন ছাড়া কেউই প্রস্তাবে সমর্থন করলেন না, ফলে মুলতবি প্রস্তাব স্পিকার নাকচ করে দিলেন...।
*** অতপর আমি নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করলাম...।
ঘোষনা দেয়া হলো ২৫ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে...।
সারাদেশ তখন অগ্নিগর্ভ, তীব্র ক্ষোভ ও রোষে দাউ দাউ করে জ্বলছে...।
প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে ধিক্কার দেশ জুড়ে...।
এরই মধ্যে সরকার বাংলা ভাষা আন্দোলনের পিছনে বিদেশী হাত বিশেষ করে অপসংস্কৃতির প্রভাব আবিষ্কার করলো এবং এ আন্দোলনকে পাকিস্তানের ঔক্য ও সংহতি বিনষ্টের ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করলো...।
*** জাতির এ সন্ধিক্ষনে ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন...।
ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ আইন পরিষদে (অ্যাসেম্বলি হাউসে) প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিন সরকারের বিরুদ্ধে যে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন তা সমর্থন করার জন্য ছাত্ররা এম এল এ দের সাথে সাক্ষাৎ করে ব্যাপক ভাবে অনুরোধ জানাতে লাগলো...।
তখন পরিষদ সদস্যদের (সংসদ সদস্যদের) আবাসস্থল পার্টি হাউসের দোতলায় যে কক্ষটিতে ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ থাকতেন, সেটাই তখন ভাষা আন্দোলন পরিচালনা এবং ছাত্র নেতাদের বৈঠক ও আলাপ আলোচনার এক মাত্র কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছিলো...।
ছাত্রদের ব্যাপক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারনা বদ্ধমুল হলো, ২৫ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাশ হয়ে যাবেই.....।
এরই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমিনের পক্ষ থেকে মাওলানা তর্কবাগীশের কাছে অনাস্থা প্রস্তাব প্রত্যাহারের বিনিময়ে কিছু লোভনীয় প্রস্তাব এলো... ।
... ক্রুদ্ধ মাওলানা তর্কবাগীশ দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রত্যাখান করলেন...। নুরুল আমিনের দূত ফিরে গেলেন, কিন্তু আবার এলেন আরও বড় প্রস্তাব নিয়ে.....,
.. বৃহৎ আকারের ঢাকায় চার খানা বাড়ী এবং ২ লাখ নগত টাকা।
কিন্তু ভাষা আন্দোলনের মহানায়ক মাওলানা তর্কবাগীশ কৃত সংকল্প।
..জেল, জুলম, মৃত্যু, বাড়ী, টাকা পয়সা কিছুই পরোয়া করেননি অকুতোভয় মাওলানা তর্কবাগীশ... ।
যখন তাঁকে কোন কিছুতেই টলানো গেলোনা...,
অবশেষে ২৪ ফেব্রুয়ারি শেষ রাতে পুলিশ এসে ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ মাওলানা তর্কবাগীশ ও তৎকালীন ছাত্রনেতা তাঁর জ্যোষ্ঠ পূত্র ভাষা সৈনিক এস এম নুরুল আলম কে গ্রেফতার করে।
পাকিস্তান সরকার তখন ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দানের অপরাধে মাওলানা তর্কবাগীশ এবং তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ভাষা সংগ্রামী এস এম নুরুল আলমকে ১৮ মাস কারাগারে আটক করে রাখে ।
১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, রোববার রাতে গভর্নর ফিরোজ খান নুন বিশেষ ক্ষমতা বলে অর্ডিন্যান্স জারি করে আইন পরিষদের অধিবেশন (সংসদ অধিবেশন) বন্ধ করে দেন।
এভাবে নিয়ম তান্ত্রিক আন্দোলন ও গনতন্ত্রের সুচনাকে রুদ্ধ করে হত্যা করা হলো.....।
অংকুরিত হলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বীজ...।
-সৈয়দ হাদি তর্কবাগীশ ।
( ভাষা আন্দোলনের সিংহ পুরুষ
মাওলানা তর্কবাগীশের নাতি )