13/03/2025
কুপোকাত
- মুনীর চৌধুরী [১৯২৫-১৯৭১]
[চরিত্র:- খরগোশ, বাঘ, শিয়াল, মোষ, সজাবু, হরিণ, ময়ূর। (অরণ্য। একপার্শ্বে মাটির ঢিবি, তার গায়ে স্তম্ভের আকারেই ইষ্টক চিত্রিত। দেখে মনে হবে যেন একটা কুয়ো, ঢিবির চূূড়োয় তার মুখ[
ঘটনা: পশুদের সভা। আছে মোষ, ময়ূর, হরিণ, সজারু, শিয়াল ও খরগোশ। সভাপতি হলেন মোষ।
মোষ।। (সকলের করতালি শেষ হলে) এক ভীষণ
বাঘের অত্যাচারে আমাদের সকলের জীবন আজ বিপন্ন। আমাদের অনুরোধে শিয়াল বাঘের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে একটা আপোষ রফা করেছে। সেই অনুযায়ী স্থির হয়েছে, খরগোশ স্বেচ্ছায় মহামান্য বাঘের খাদ্য হিসেবে নিজেকে অদ্য উৎসর্গ করবে। কিন্তু খরগোশ ঐ প্রস্তাব মানতে অনিচ্ছুক। এখন উপায় কি? আমি আর একবার শিয়ালকে বলি, আপনাদেরও বলি, খরগোশকে বুঝিয়ে বলুন, তাকে রাজি করান।
শিয়াল।। দেখ খরগোশ, আমি অনেক কষ্টে বাঘকে শান্ত
করেছি। সে বলেছে যে, তাকে যদি রোজ একটি করে জীব আমরা উপহার দিই, তবে সে আর অকারণে অন্য জীব হত্যা করবে না। আজ তুমি বীরের মত সহাস্যে এগিয়ে যাও, কাল তোমার পথ অনুসরণ করে অন্য প্রাণী যাবে। সকলের মঙ্গলের জন্য নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতে তোমার ইচ্ছে করে না?
খরগোশ।। না। আমি অন্যের খাদ্য হতে চাই না। আমি
বাঁচতে চাই।
সজারু।। যেদিন আমার সময় আসবে, আমি পেছপা
হব না। অবশ্য হয়ত আমাকে নির্বাচন করা কখনই ঠিক হবে না। কারণ আমার সর্বাঙ্গে কাঁটা। চেহারাও বিদঘুটো বাঘ হয়ত আমাকে দেখে খাওয়ার বদলে রেগে যাবে। খরগোশ অবুঝ হয়ো না, বাঘের গুহায় চলে যাও।
মোষ।। সজারু ঠিকই বলছে। শিয়াল যা করে তা
আমাদের মঙ্গলের জন্যই করে।
ময়ূর ।। অবশ্য এর মধ্যে আরও একটু কথা আছে।
সজারুর কথাও ঠিক, আবার তার উল্টোটাও ঠিক।
শিয়াল।। একটু পেখম ছড়িয়ে বল, সবাই সহজে বুঝতে
পারবে।
ময়ূর।। যেদিন সকলে আমার যাওয়া স্থির করবেন,
আমি নিশ্চয়ই যাব। তবে, আমি লক্ষ করেছি আমাকে সামনে পেলে সবাই খাওয়ার কথা ভুলে যায়। আমার শোভায় মুগ্ধ হয়। বেশি সুন্দর বলে কেউ আমাকে খেতে চায় না। আমাকে খাওয়া চলে না বলে মনে করে।
হরিণ।। কথা বাড়াস নে খরগোশ। লক্ষ্মী ভাই, তোর
লেজে পড়ি, এবার যা তুই।
মোষ।। বেলা বেড়ে যাচ্ছে। বাঘ নিশ্চয়ই অস্থির হয়ে
উঠেছে। আর বেশিক্ষণ এখানে সমবেতভাবে থাকা মোটেই নিরাপদ মনে হচ্ছে না।
শিয়াল।। সভাপতি সাহেব, সভা ভেঙে দিন। গর্জন
শোনা যাচ্ছে। বাঘ হয়ত এখানেই এসে পড়বে। খরগোশ না যেতে চায় এখানেই থাকুক।
মোষ।। সভা ভঙ্গ। বিদায়।
[খরগোশ ব্যতীত অন্য সকলের দ্রুত প্রস্থান]
খরগোশ।। [একাকী, চতুর্দিকে তাকিয়ে]
কত গাজর, কত মুলো, কত না সুন্দর এই পৃথিবী, স্বপ্নের মত কচি কচি, কত সবুজ ঘন বাঁধাকপি।
মরিতে চাহি না অল্প বয়সে,
চাহিনাক যেতে বাঘের গ্রাসে।
যে করে পারি রহিব আঁকড়ি লইব মাটির সুরভি, [চিন্তাযুক্ত ভাবে পদচারণা]
সকলে বলে ভেজিটেবলে
শক্তি বাড়ে, বুদ্ধি গজায়।
ও ভাই পালং ও ভাই মুলো
শীঘ্র বল মুক্তির উপায়।
গাজর, কপি, মটর শুঁটি
খেয়েছি রোজ মজায় মজায়
তবু কি আজ হবে না কাজ
বিপদ যখন নাকের ডগায়?
[প্রাণপণে কাঁচা তরকারি চিবিয়ে খায় এবং
চিন্তা করে হঠাৎ উল্লসিত হয়ে]
পেয়েছি পেয়েছি পেয়ে গেছি ভাই বুদ্ধি। ফুর্তি, ফুর্তি।
এখনি দেখিবে, কেমনে হবে কার্য সিদ্ধি, ফুর্তি ফুর্তি।
বাবাজি ব্যাঘ্র, দেখেছ মোষ, দেখনিক খরগোশ,
[নেপথ্যে বাঘের গর্জন]
বাবারে বাবা, কাঁপিছে প্রাণ হাঁকিছে বজ্রনির্ঘোষ
দেখিয়া দেরি, আসিছে স্বয়ং, ক্ষেপেছে ব্যাটা রাক্ষস।
[খরগোশ মাথা নিচু করে কাঁদতে থাকে। বাঘের প্রবেশ।]
বাঘ ।। আমি ক্ষুধার্ত, কথা ছিল সূর্য মাথার উপর ওঠার
সঙ্গে সঙ্গে দুপুরের খাদ্য আমার সামনে হাজির হবে। হয় নি কেন?
খরগোশ।। হুজুরের কাছে হাজির হলাম।
বাঘ।। কিন্তু দেরি হল কেন?
খরগোশ।। সে কথা মনে করেই তো কাঁদছি।
বাঘ।। তোর মনে আবার এত দুঃখ থাকবে কেন?
এতটুকু পশু তুই। তোর সুখই কি,
আর দুঃখই কি!
খরগোশ।। আমার অনেক দুঃখ, মনে অনেক কষ্ট।
বাঘ।। দেখ, আমি হচ্ছি এই অরণ্যের সন্ত্রাস, যাকে বলে
রাজা বাহাদুর। আমার উপরে কেউ নেই। আমার ডোরাদার পেটের মধ্যে যেতে পারা তোর মত ক্ষুদ্র পশুর পক্ষে এক মহা সৌভাগ্য। কাছে আয় দেখি। তাইত, তুই দেখছি সত্যি অতি ক্ষুদ্রকায়। শিয়াল পণ্ডিত দেখছি ভারি পাজী। বেছে বেছে সবচেয়ে শুটকোটাকে পাঠাল।
খরগোশ।। না না হুজুর, শিয়াল মামার কোনও দোষ
নেই। আপনার জন্য পাঠান হয়েছিল আমার সেজ আপাকে। ইয়া মোটাসোটা। কী হৃষ্টপুষ্ট!
বাঘ।। এ্যা, তাহলে তার বদলে তুই এলি কি জন্য?
খরগোশ।। সেই দুঃখেই ত কাঁদছি। মেজ আপাকে
আরেকটা বাঘে খেয়ে ফেলেছে।
বাঘ ।। কি বললি? আমার মুখের গ্রাস অন্যে কেড়ে
নিয়েছে, এত বড় সাহস?
খরগোশ।। সেজ আপাও কত কান্নাকাটি করল।
বারবার আপনার কথা বলল। কিন্তু কিছুতেই শুনল না। ঐ বাঘটা দেখতেও ঠিক আপনার মত। তবে আরও রাগী, আরও তেজী। তাইত কাঁদছি।
বাঘ।। কাঁদিস না। কারণ আমার ভীষণ ইচ্ছে, নিজের
ঐ জাতভাইটির ঘাড় মটকাই। কোথায় ওটাকে পাওয়া যাবে, একবার আমাকে দেখিয়ে দিতে পারিস?
খরগোশ।। তা পারব। তবে আপনি সামনে থাকবেন,
আমি পেছনে পেছনে এগিয়ে আসব।
বাঘ।। কোন ভয় নেই তোর। আমি সঙ্গে আছি। পথ
দেখিয়ে নিয়ে চল। আমি আবার দিনের বেলায় সব ঠিকমত ঠাহর করতে পারি না।
খরগোশ।। পথ চলতে চলতে আসুন। এই দিক দিয়ে
আসুন। হুজুর। এইবারে একটু উপরের দিকে উঠতে হবে। এর মাথাতেই আপনার দুশমনের গুহা। আসুন। সাবধানে পা ফেলবেন পাহাড়িয়া পথ কিনা। আরও এগিয়ে আসুন। গুহার মধ্যে চোখ দিয়ে নিচের দিকে তাকান।
বাঘ।। [কুয়োর নিচে তাকিয়ে] কই,
কিছুতো দেখা যাচ্ছে না?
খুরগোশ।। আর একটু চেষ্টা করে দেখুন। কিন্তু সাবধান
থাকবেন, আপনাকে দেখতে পেলে
ও কিন্তু ক্ষেপে যাবে।
বাঘ।। ওই ত দেখা যাচ্ছে। চকচক করছে। অবিকল
আমার মত দেখতে। এ্যা, এত 'বড় সাহস, চোখ পাকাচ্ছে। খবরদার। আমাকে তুই হুমকি দিস?
খরগোশ ।। হু-জু-র।
বাঘ।। না না। কোনও কথা নয়। ওর একদিন কি আমার একদিন। আমার মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছিস। তোর মাথা ফাটাব। দাঁত ভাঙব, গোঁফ উপড়ে ফেলব, চামড়া খুলে ফেলব। কি. আমাকে পাল্টা গালি দিচ্ছিস তুই? তবে রে জানোয়ার, হালুম।- হালুম! [ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বাঘ কুয়োর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায়। পানির মধ্যে ঝপাৎ করে পড়ার এবং পরে তার মধ্যে হাবুডুবু খাবার শব্দ শোনা যায়।
খরগোশ।। [নাচতে নাচতে]
হুররে হুয়া, কেয়া মজা, বনের রাজা কুপোকাত,
কুয়োর মধ্যে দেখে ছায়া, লম্ফ দিয়ে প্রাণপাত।
হুররে হুয়া কেয়া মজা, কেল্লা ফতে বাজিমাত,
বনের রাজা কুপোকাত, ঝম্প দিয়ে প্রাণপাত।
তাই তো বলি যত পার কেবল খাও তরকারি,
বাড়বে মেধা গায়ের বল, বুদ্ধি হবে তরবারি।"
সৌজন্যে
আইডিয়্যাল এক্সারসাইজ শিক্ষা পরিবার
নিকলী পরিক্রমা