31/12/2023
পঁচিশ তম পাত্রপক্ষের সামনে বসে আছি।আম্মু বারবার বলে দিয়েছেন উনারা যা বলবে তাই করতে।এক রাশ দুঃখ নিয়ে বসে আছি তাদের সামনে। পাত্রপক্ষ ছবি চাওয়াতে আমি সরাসরি নাকচ করি।আম্মু চোখ রাঙিয়ে বললো ছবি দাও?কিন্তু আমি অটল আমার কথায়। অতঃপর পাত্রের আম্মা বেয়াদব বলে উঠে চলে যান।
অসহায় আমি মাথা নত করে এক কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি।আমার প্রফেসর আব্বু রাগে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে যান। আম্মু চুলের মুঠি ধরে পরপর তিন-চারটা কষিয়ে থাপ্পর দিলেন গালে।
রাগী কন্ঠে বললেন, তোর পিঁছনে আমরা আর নাই। নিজের বিয়ে নিজে বসবি, যে মেয়ে পিতামাতার কথার উপর কথা বলে সে যে কেমন দ্বীনদার তা আমাদের বুঝা হয়ে গেছে। আরে তোদের সাত কপালের ভাগ্য এমন সমন্ধ তোদের বংশে এসেছে ? মায়ের কথার কোনো তর্ক করলাম না। জানি এখন কিছু বললেই হিতে বিপরীত হবে।চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সন্ধ্যায় বসার ঘরে আমাকে নিয়ে বৈঠক বসে। আমার পাঁচ বছরের ছোট ভাইটা এসে বলল,আপু বসার ঘরে তোমাকে যেতে বলেছে। মনে মনে হাসলাম। এ আর নতুন কি? তেইশ বছরের জীবনে পঁচিশ বার বৈঠক বসেছে আমাকে নিয়ে। সবকিছু হজম করার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। গুটি গুটি পায়ে বসার ঘরে আসতেই আম্মুকে দেখলাম কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আব্বু থমথম মুখ করে একবার আমার দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আমাকে দেখেই মেঝো চাচ্চু বললেন, তুমি কি দ্বীনদার ছেলে ছাড়া বিয়ে বসবেনা উম্মি?
ভয়ে ভয়ে সবার দিকে তাকালাম।দৃষ্টি সবার আমার দিকেই।মাথা নিচু করে জবাব দিলাম, না চাচ্চু। আমি বিয়ে করলে দ্বীনদার কাউকেই করবো, অন্যথায় হলে যেভাবে আছি সেভাবেই জীবন পার করবো।
আম্মু দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন, দেখেছো দেওরঝি,তোমার ভাতিজীর আচরণ?বেয়াদব মেয়ে বড়দের মুখের উপর উত্তর দেয়।ওর কীসের সিদ্ধান্ত?
সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমরা বাপ মা কি মরে গিয়েছি?
আব্বু তখনও চুপ। চাচ্চু বললেন,
ভাবী আমাকে বলতে দিন। আপনি আপাতত চুপ থাকুন।
মেঝো চাচ্চু বললো, আমরা তোমার সিদ্ধান্তকে যদি মেনেই নিই তবে এটা মনে রেখো সারাজীবন এভাবে তোমাকে কেউ লালন করবেনা? আর বিয়ের পরে কখনো এটা বলতে পারবেনা তুমি মানিয়ে নিতে পারছো না, তোমার কষ্ট হচ্ছে?কোনো সাহায্য করবোনা আমরা। এমনকি ফিরেও তাকাবোনা।
এমন শক্ত কথায় আমি খানিক মৌনব্রত পালন করলাম। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে হাসি মুখে বললাম, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ'লার গুণবাচক নাম সমূহের মধ্যে অন্যতম একটি নাম হলো –
"আল -মুকিত" সংরক্ষণকারী, লালনপালনকারী
"আল - মুকিত" অর্থ যিনি সমস্ত সৃষ্টিজীবের জীবন নির্বাহের জীবিকা পৌঁছে দেন, আশা করি আমার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন।আমি তো তার কাছে হালাল রিজিক চেয়েছি। আমার কথার পিঠে ছোট আম্মু বলেন, একটা হুজুরের চারহাজার টাকা বেতনে তুমি চলতে পারবেনা উম্মি? আমাদের বাড়ির কাজের লোকের ও আটহাজার টাকা বেতন সেখানে তুমি কি না....? এসব আবেগ দিয়ে জীবন চলেনা উম্মি।
নিজেকে বিচলিত না করে বললাম, ছোট চাচ্চু প্রতিমাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা ইনকাম করেন। মেঝো চাচ্চু স্যালারী পান ষাট হাজার টাকা।তাও তো উনারা পারেন নি উমরা হজ করতে? অথচ আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব ছয় হাজার টাকা বেতনের চাকরি করে সংসার খরচ বাবদ দুইবার উমরা হজ করে এসেছেন। বরকতময় রব চাইলে চার হাজার টাকায়ও সংসার চলে অনায়াসে।তিনি যদি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে ষাট হাজারে ও কাজ হবে না? যেমনটা দিনশেষে আপনারা বলেন, টাকা নেই কীভাবে চলবে বাকিদিনগুলো??
আম্মু সবার সামনে দুইটা চড় দিলেন গালে। দেখেছো কি বেয়াদব মেয়ে?ওকে এসব বলে কি হবে বলো,তার মাথায় হাদিসের ভূত চেপেছে। সে একাই সব জান্তা আমরা আর কিছু জানিনা।
সবাই অনেক কথা শুনালো আমাকে তবে আব্বু এখনো চুপ। মেঝো চাচ্চু আব্বুর কি মতামত তা জানতে চাইলেন? আব্বু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
আমরা তোমার জেদকেই মেনে নিলাম। তবে আজকের পর থেকে তোমার যাবতীয় সবকিছুর ভার হতে নিজেকে মুক্ত করে নিলাম। যেহেতু তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে শিখে গেছো বাকিটা তুমিই বুঝে নিয়ো।
ছোট ফুপি বললো, সমন্ধটা যেহেতু ভালো তাহলে আমরা ইয়ানার জন্য প্রস্তাব পাঠাই। এমন পাত্র হাতছাড়া করা ঠিক হবেনা। বিয়ের পরে ছেলে ইয়ানাকে নিজের সাথে নিয়ে যাবে। ফুপির কথায় কেউ দ্বিমত করলোনা। আমার আপন ছোট বোন সেদিন খুশিতে গদোগদো হয়ে বলল,
তুই কতো বোকারে আপু?
এবার দেখিস আমি জার্মান গিয়ে সুন্দর সুন্দর ফটোশুট করবো। লাইফকে ইন্জয় করবো নিজের মতো করে। পাত্রপক্ষ ইয়ানাকে দেখে পছন্দ করলো। সামনের সপ্তাহে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য করলেন। সেদিনের পর থেকে বাড়ির সবাই আমাকে এড়িয়ে চলেন। আগে আমার বোনটা আমাকে চোখে হারাতো। এখন সেও এড়িয়ে চলে। নিজের ভাগ্যের এমন পরিহাস দেখে হাসলাম তবে সেটা ও তৃপ্তিকর ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ!
বড় বোন রেখে ছোটবোনের বিয়েটা আমাদের সমাজ কেন জানি হজম করতে পারেনা। যদিও এমন কোনো নিয়ম ইসলামে নেই তবুও কড়াল শিকল পড়িয়েছে সমাজ। আমাকে দেখে অনেকেই কানাঘুঁষা শুরু করলো।
বিয়ের আগেরদিন সকালে আম্মু এসে বললেন, তুমি তো মেয়ের বড় বোন। যদিও প্রথমে সমন্ধটা তোমার জন্য এসেছে। তাই তুমি আজকে থেকে দুইদিন রুম থেকে বেরুবেনা। মানুষ কি বলছে শুনেছেতো?
আশা করি যা বুঝার বুঝেছো। সময় মতো খাবার তোমার ঘরে পৌঁছে যাবে।কথাটা বলেই হনহন করে চলে গেলেন।
বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম আম্মুর যাওয়ার পানে।
দরজার খিল এঁটে সিজদায় লুটিয়ে পড়লাম। বোবা কান্নাগুলো আর আটকে রাখতে পারলাম না। মস্তিষ্কে হানা দিলো রব্ব কে ডেকে বললাম,
"ইয়া রব্ব,আমি তো আপনার উপরই ভরষা করেছিলাম।
রব্ব আমি তো দুনিয়ার সুখ সাচ্ছন্দ্য চাই নি আমি তো শুধু একজন দ্বীনদার জীবনসঙ্গী চেয়েছি। আপনি কী আপনার এই বান্দী কে নিরাষ করবেন?
আপনিই তো গরীবকে ধনী করেন,বিপদাপদে পতিত সমস্ত কঠোরতাকে আপনিই তো সহজ করেন, বিপদে ধৈর্য্য ধারণ করলে তাকে এর চেয়েও বেশি পুরষ্কার দান করেন। জীবনে উন্থান- পতন আসবেই। তাই বলে কারো জীবন তো থেমে থাকেনা। কেটে গেলো সাতটি বছর। বয়স এসে ঠেকলো ত্রিশের কোঠায়।সেদিনের পরে আর কারো সামনে যাইনি। দীর্ঘ সাত বছরের অক্লান্ত পরীক্ষার ফলে সময় আজকে সেই সন্ধিক্ষণে এসে ঠেকলো।
বউ সেজে বসে আছি। যেমনটা চেয়েছি মহান রব তার থেকে ও অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। হইহট্টগোল শোনা যাচ্ছে,পাত্রপক্ষ এসে পড়েছে। লজ্জারাঙা আভায় পুলকিত আমার মন। ইয়ানার সাড়ে চার বছরের বাচ্চা মেয়েটা এসে বলল, খালামনী তোমাকে অনেক সুন্দর লাগছে। পুরাই লাল টুকটুকে বউ!
কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু দিলাম তাকে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়ানার চোখে পানি চিকচিক করছে। হাসিমুখটা মলিন হয়ে গেলো নিমিষেই। বছর তিনেক হলো তার ডিভোর্স হয়েছে। আমাকে দেখে হয়তো নিজের বিয়ের কথা মনে পড়েছে। সময় স্রোত মানুষ কে কোথায় দাঁড় করিয়ে দেয়। ভিতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। মাদ্রাসায় উস্তাযার বলা কুরআনের সেই আয়াতের কথা স্মরণ হলো --
সূরা ফাতির এর ২ নং আয়াতে আমার রব্ব বলেন,
"আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন তা আটকে রাখার কেউ নেই। আর তিনি যা আটকে রাখেন, তারপর তা ছাড়াবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।"
আমার রব্বের উপর কেউ যদি ভরষা করে ,সবর করে তাহলে আমার রব্ব সেই সবরের প্রতিদান অনেক গুণ বাড়িয়ে দেন। যেটা আমার হ্মেত্রে রব্ব দিয়েছেন।
ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ
কান্না চলে আসছে আপুর কথাগুলো পড়ে। নিঃসন্দেহে আমার রব উত্তম পরিকল্পনাকারী।
লেখা: হুরাইন জান্নাত ইলম-
©