16/09/2025
'চলে যাবো দূরে কোথাও ঠিকানাগুলো ছিঁড়ে ফেলে'
একেএম রুহুল আমিন সুমন১৯৮১-১৯৮৯
দুহাত ছড়িয়ে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠতো, বাইক নিয়ে যখনি ছুটতাম দূর অজানায় অথবা নদের তীরে। দীর্ঘ প্রায় ৫৫টি বছর কিভাবে কেটে গেল মনে হয় কয়েক মুহূর্ত আগে বা এই তো সেদিনের দিনগুলো। ছেলেবেলায় টারজান টারজান নাট্যকার আব্দুল্লাহ আল মামুনের বাড়ির পেছনের জঙ্গলে, একদা যেখানে ছিল বানর, লতা গুল্ম ও বেতের কাঁটাওলা ঝাড়। সেই জঙ্গলের মাঝখানে একটি ঘরে প্রায়াত মাসুদ ভাইয়ের নিকট মার্শাল আর্ট- নান চাকু ঘোড়ানো শেখা রুটিন করে। জিলা স্কুলের ব্যায়ামাগারে বম বাষ্টিং Apu Dam, Shabuj Kabir, Bishwajit Kumar Shome আমাদের দুরন্তপনার লাগামটা ধরে রাখতেন। স্কুলের গাছের ডাবগুলো আমাদের জন্য অপেক্ষায় থাকতো কখন গেছেল গাছে উঠবে। স্কুলের পাশে নদের পাড়ের কড়ই গাছের মগডাল থেকে টারজান ড্রাইভ দিতে আমাদের মাঝে শুধু একজনেরই সাহস ছিল। তেজ পাতার বিড়ি, সুরভী হলে ব্রুস লী, স্নেক ইন দা মাংকি শ্যাডো এগুলো লুকিয়ে দেখা। ব্রেকড্যান্স। এসডিও সাহেবের ঘাট, পাবলিক হলের ঘাট, চুতরাপাতা, নদে ঝাঁপাঝাঁপি করে চোখ লাল করে বাড়ি ফেরা। বন্যার সময় ট্রাকের টিউব ভাড়া করে উজানে জেনারেল হাসপাতালের সামনে থেকে ঝাঁপিয়ে স্রোতে ভাসতে ভাসতে পাবলিক হল ঘাট। আমলা পাড়া পানির ট্যাংকে ছাদে উঠে কাটা ঘুড়ি নিয়ে আসা ছিল মামুলি ব্যাপার। সাঁতরে নদের এপার ওপাড় যাওয়া আসা, স্রোতে লুঙ্গি ফুলিয়ে ভাসা। স্কুলের ডাব খাওয়ার শাস্তি এসেম্বলিতে সোলেমানি বেত, টিফিন চুরি। বিকেলে স্কুলের মাঠে ফুটবল। ফাস্ট বেঞ্চটা সব সময় ফাঁকা থাকতো, ওটা ছিল গুডবয়দের জন্য। ব্যাকবেঞ্চার আমরা ক'জনা। লেখাপড়া তখন তুঙ্গে! চাঁপাতলা ঘাট থেকে বিকেলে গুন টানা নৌকার মাঝি যেমন নদের তীর বেয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেত, টিফিনের পর অলস সময় আর কাটে না। ক্লাসরুমে বসে সেদিকে তাকিয়ে দুটো ক্লাশ পার হতে না হতেই পলায়ন। পরদিন বেতের বাড়ি থেকে রক্ষা পাওয়ার কৌশল প্যান্টের নিচে আরও একটা মোটা কাপড়ের হাফ প্যান্ট। দুরন্তপনার নেইকো শেষ।
গঠনমূলক কাজের মধ্যে প্রথমে কাব স্কাউট, রেড ক্রিসেন্টের সাথে যুক্ত থেকে স্থানীয় ক্যাম্প, আঞ্চলিক ক্যাম্প, ১৯৮৫-৮৬ এ এশিয়া প্যাসিফিক জাম্বুরী, রেড ক্রিসেন্ট জাতীয় ক্যাম্প ও বিভিন্ন চক্ষু চিকিৎসা কেন্দ্রে ভলান্টিয়ার হিসেবে অংশগ্রহন।
ক্লাস এইটের ষান্মাসিক পরীক্ষায় একটাও অংক কমন না পরায় 'আমার নাম সুমন এমন একটা মন.... ' পুরো গান লিখে খাতা জমা দিয়ে বাড়ি ফেরা সুমন। নিরহংকারী সেই শৈশবের বন্ধু সুমন।
নিথর অবশ শরীর নিয়ে আমলা পাড়ার বাসায় শয্যাশায়ী। নড়াচড়া নেই, মুখে কথা নেই, খাওয়া নেই শুধু শুধু ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকা। দেখলেই বুকের ভেতর কেমন মোচর দিয়ে ওঠে। বোঝাতে পারি না। যে কিনা জীবনে এতটা পথ আনন্দে ভাসিয়েছে আমাদের। কোনদিন শুনিনি কোন কষ্টের কথা ওর জীবন নিয়ে ছিল না কোনো অভিযোগ। সদা হাসিতে আনন্দ ছড়িয়ে যেত সবার মাঝে নিঃস্বার্থ ভাবে। ছিল না কোন বাড়তি চাওয়া পাওয়া।
ফিরে আয় তুই
আবার একটু ঘুরি
দু'হাত মেলে উড়ি
আবার গাই গান
মনে হল বলছে সে
শহরের উষ্ণতম দিনে...
বন্ধু'রা সময় পেলে আমলা পাড়ায় এসে দেখে যেও সুমন কে। কেমন করে বেঁচে আছে সে।