26/08/2026
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একটানা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী কে ছিলো জানেন?
—বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।
তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বর বাইরে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, যার মধ্যে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় একটি। আমি এখানে আজ ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে’ নিয়ে আলোচনা করবোনা, আলোচনা করবো ‘বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে’ নিয়ে।
বিদ্যুৎমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ঐ দেড় দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা। ‘খাম্বা যুগ’ থেকে আমরা প্রবেশ করেছিলাম শতভাগ বিদ্যুতের যুগে। ২০০৯ সালে যে সক্ষমতা ছিলো ৫ হাজার মেগাওয়াট, সেই বিদ্যুতের সক্ষমতা ২০২৪ সালে এসে পৌঁছেছিলো ৩০ হাজার মেগাওয়াটে। এমনকি ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছিলো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই অগ্রগতিও থমকে দিয়েছে এক ‘প্রতারণার জুলাই’।
বিদ্যুৎ মন্ত্রী হিশেবে দেশরত্ন শেখ হাসিনার সবথেকে বড়ো ও অভাবনীয় কাজ ছিলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে গেলে এর মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা হবে ২,৪০০ মেগাওয়াট। যা দিয়ে দেশের প্রায় ১৫ মিলিয়ন পরিবার অথবা বাসাবাড়িতে সেবা দেওয়া সম্ভব, দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১২% একাই পূরণ করতে সক্ষম হবে।
গ্রামের যে ঘরে একসময় সন্ধ্যার পর কেরোসিনের বাতি জ্বলত— সেখানে বিদ্যুৎ গেছে।
কৃষকের সেচে বিদ্যুৎ গেছে।
স্কুলে বিদ্যুৎ গেছে।
হাসপাতালে বিদ্যুৎ গেছে।
কারখানায় বিদ্যুৎ গেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে বিদ্যুৎ গেছে।
এটাই উন্নয়নের সবচেয়ে মৌলিক অবকাঠামো।
জননেত্রী শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ নীতির আরেকটি বড়ো দিক ছিল ভবিষ্যৎ চাহিদাকে সামনে রেখে ক্যাপাসিটি তৈরি করা।
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা, LNG, লিকুইড ফুয়েল, ভারত থেকে বিদ্যুৎ, রাশিয়া থেকে পারমাণবিক শক্তি এবং renewable energy... বিভিন্ন উৎসকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুধু বিদ্যুৎ কেনা ছিলো না!এটি ছিলো দক্ষিণ এশিয়ার রিজিয়োনাল পাওয়ার কো-অপারেশনের দুয়ার খোলা। অথচ সেই ভারতকে জড়িয়ে কম অপপ্রচারটা চালায়নি এখনকার ক্ষমতাসীনরা!
‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা দুরদর্শি ছিলেন’- এ কথা মুখে বলার থেকে কাজগুলো দেখলেই বুঝাতে বেশি সুবিধা হয়। ক্রাইসিস এলে তিনি কীভাবে-কোন উপায়ে যেন সব ম্যানেজ করে নিতেন। অথচ এখন? খাম্বা যুগের শাসকরা আমাদেরকে ‘টেইক ব্যাক বাংলাদেশ’ স্লোগান শুনিয়ে ফের নিয়ে গিয়েছে সেই খাম্বা যুগে। এখন আপনার বাড়ির পাশে খাম্বা আছে ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। ঢাকা শহরের যেসব অঞ্চলে গত এক দশকে মানুষ লোডশেডিং দেখে নাই, তারাও গত কদিনে দেখে ফেলেছে। ফের অনেকগুলো কলকারখানা বন্ধ হতে শুরু করেছে।
সবথেকে বাজে অবস্থা গ্রামগুলোতে, এখানে বেশিরভাগই পল্লীবিদ্যুতের সংযোগ। দেশের ৬১ জেলায় সেবাপ্রদানকারী পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডের হেড অফিসের কল সেন্টারে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম, আমি কাজ করেছিলাম গতবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৫ মাস। মানুষের কী পরিমাণ ভোগান্তি, বিদ্যুৎ সংক্রান্ত অভিযোগ দৈনিক কত আসে, এবং বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়াচ্ছে-সেসবের মোটামুটি ভালো একটা ধারণা ও অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। অবাক করার ব্যাপার, যেখানে পুলিশ নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, সেখানে দেখলাম পল্লীবিদ্যুতের কর্মচারীরা পুলিশের কাছে চাইছে নিরাপত্তা। অবস্থা কতটা ভয়াবহ তাহলে বুঝুন!
দেশ চালাতে দক্ষতা লাগে, যোগ্যতা লাগে, এবং বিশেষকিছু ঐশ্বরিক ক্ষমতাও থাকা লাগে, কেননা নেতৃত্ব সবার জন্য না। আপনি শেখ হাসিনার মধ্যে সেইসব গুণাবলির কোনটা ঘাটতি ছিলো আমাকে দেখাতে পারবেন? হ্যাঁ, সমালোচনা ছিলো, ত্রুটি ছিলো। কিন্তু জনভোগান্তি ঠিক কবে এমন চরমে দেখেছিলেন বলুন তো? মানুষ যথেষ্ট স্বস্তিতে ছিলো।
তর্কের খাতিরে কেউ-কেউ বলবেন, লোডশেডিং তো আগেও হতো! তা মশাই, আগে হয়ে থাকলে এখনো হবে কেন? প্রতারণামূলক আন্দোলন করে আপনারা সরকার ফেলে দিলেন, আনলেন পছন্দের লোককে, বললেন দেশ বানাবেন ইউরোপ-আম্রিকা— তাহলে আমরা এখনো আগের তুলনা সহ্য করবো কোন যুক্তিতে? বরং আগে তো এত বিপর্যয় ছিলোনা।
একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন, ২০০৯ সালের বিদ্যুৎ-সংকটের বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালের প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুতায়নের বাংলাদেশে যাত্রাটি ছোটো কোনো পরিবর্তন নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত রূপান্তর। আর সেই রূপান্তরের রাজনৈতিক স্থপতিদের তালিকায় শেখ হাসিনার নাম থাকবেই।
ইতিহাস তাঁকে কীভাবে বিচার করবে তা সময় বলবে।
কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ২০০৯–২০২৪ অধ্যায়কে উপেক্ষা করে সেই ইতিহাস লেখা যাবে না।