01/05/2016
বাঙালি সমাজের সঙ্গে
বাউলের পরিচয় ও যোগ
অনেককালের। বেশ কয়েক শতক
ধরে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের
ভেতর দিয়ে বাউল তার
বিকাশের সর্বোচ্চ স্তরে
পৌঁছায় মূলত ফকির লালন সাঁইয়ের
কল্যাণে। লালনই বাউল
সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি—
কি গানে, কি সাধনায়, কি
তত্ত্বজ্ঞানে। এই লোকমনীষী আজ
আর বাংলাদেশ বা বাংলা
ভাষাভাষী অঞ্চলের গণ্ডিতে
আবদ্ধ নন, তাঁর আসন আজ
বিশ্বলোকে।
সাধনার অনুষঙ্গে ‘গানের ভিতর
দিয়ে’ লালন দেখেছিলেন মরমি
‘ভুবনখানি’। অধরা মনের মানুষের
সন্ধানে লালনের পরিক্রমণ ‘গভীর
নির্জন পথে’, কাল থেকে
কালান্তরে। তাঁর দুই চোখে এসে
লাগে অন্য আলোর ছটা—বিভক্ত
হয়ে যান লালন—একদিকে সাঁই
নিরঞ্জনের সন্ধানে শুরু হয় নিরন্তর
যাত্রা, পাশাপাশি পথের
কাঁটা সামাজিক বাধাকে
পেরিয়ে যাওয়ার জবর লড়াই।
এভাবে লালন হয়ে ওঠেন একই
সঙ্গে মরমি ও দ্রোহী—
সমাজশিক্ষক ও সংস্কারক—
অধ্যাত্মসাধনার পরম গুরু ও
মানবমুক্তির দিশারি এবং
লোকায়ত বাঙালির বিবেক।
লালন জন্মেছিলেন ২৪২ বছর আগে
সংস্কারশাসিত বাংলার এক
অখ্যাত পল্লিতে। ১১৬ বছরের
দীর্ঘ আয়ু পেয়েছিলেন তিনি।
তাঁর এই দীর্ঘ জীবন বিচিত্র
অভিজ্ঞতায় পূর্ণ। জাতপাত,
সম্প্রদায়-বিদ্বেষ, শাস্ত্রধর্মের
প্রতাপ, শ্রেণিপীড়ন, সামাজিক
অনাচার, নারীনিগ্রহ, মনুষ্যত্বের
অবমাননা, মানবতার লাঞ্ছনা,
শক্তির অর্চনা, যুক্তিহীন আচরণ,
সামন্তশোষণ-মানুষের জীবনকে
বিষাদ-নৈরাশ্যে ডুবিয়ে
রেখেছিল। উত্তরকালেও এই
পরিস্থিতি পাল্টায়নি। হয়তো
কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর রূপ
বদলেছে, কিন্তু সমাজদেহ থেকে
এর ছাপ পুরোপুরি মুছে যায়নি।
লালনের জীবন দুই ধারায় বয়ে
গেছে—একদিকে মরমিসাধনার
নম্র ধারা, অন্যদিকে দ্রোহের
আগুন জ্বেলে সমাজের অনাচার-
আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলার প্রয়াস।
অথচ যে সাধনার ভুবনে তিনি
প্রবেশ করেছিলেন, সেখানে
তো বাইরের জগতের ঘটনায়
আলোড়িত হওয়ার কথা ছিল না।
কিন্তু বাউলকে প্রতিবাদী ও
দ্রোহী হতে হয় কেন? আসলে
বাউলের জন্মই তো প্রতিবাদের
মধ্য দিয়ে—ক্ষমতাশালী
বিত্তবান ও শাস্ত্রবাহকের
বিপক্ষে এ ছিল নীরব ‘গরিব-
গণবিদ্রোহ’। মরমিসাধনায় যাঁরা
শামিল হয়েছিলেন সমাজের
অবজ্ঞা ও নিগ্রহ থেকে
আত্মরক্ষার জন্য, প্রাতিষ্ঠানিক
ধর্মকে তাঁরা অস্বীকার ও
প্রত্যাখ্যানের গরজ বোধ
করেছিলেন অন্তরে। বাউলের
তাই কোনো শাস্ত্র নেই—গুরুর
আদেশ-নিষেধই গান হয়ে তাঁদের
দিশা দেয়—পথ দেখায়। লালনের
জীবন ও সাধনাও চলেছে এই
ধারায়।