10/08/2026
জামায়াতের রাজনীতি আর কর্নেল অলির রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা: বলির পাঁঠা, নাকি চরম রসিকতা? 🎭
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একটি পরোক্ষ নির্বাচন। এখানে জনগণের সরাসরি ভোটে নয়, জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে সংসদে যে পক্ষের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, বাস্তব রাজনৈতিক অঙ্কে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলও অনেকটাই পূর্বনির্ধারিত।
এর সঙ্গে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান যুক্ত হওয়ায় ক্ষমতাসীন দলের কোনো এমপির পক্ষে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিরোধী প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ কার্যত অত্যন্ত সীমিত। অর্থাৎ, সংসদ যার নিয়ন্ত্রণে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের অঙ্কও মূলত তার পক্ষেই যায়—এটি আবেগের নয়, নিছক সংখ্যার হিসাব।
এই সহজ অঙ্ক জামায়াত ও তাদের ১১ দলীয় জোটও নিশ্চয়ই ভালো করেই বোঝে। তারা জানে, এমন নির্বাচনে নিজেদের কোনো প্রার্থী দাঁড় করানো মানেই নিশ্চিত পরাজয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এই বাস্তবতা জেনেও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমকে সামনে আনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী?
এখানেই শুরু হয় রাজনীতির কড়া বাস্তবতা, নাটকীয়তা এবং ব্যঙ্গাত্মক অধ্যায়।
# # # ১. আদর্শের রাজনীতি থেকে আপসের রাজনীতি?
একসময় বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক ঐক্য ও জোটনীতির বিরোধিতা করে যিনি নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিলেন, আজ সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক বৈপরীত্য।
যিনি একসময় আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে নিজের রাজনৈতিক পথ আলাদা করেছিলেন, জীবনের সায়াহ্নে এসে সেই পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সমর্থনেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার চেষ্টা—এটিকে সমর্থকেরা রাজনৈতিক কৌশল বলতে পারেন, কিন্তু সমালোচকের চোখে এটি নিঃসন্দেহে এক গভীর রাজনৈতিক পরিহাস।
প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়—রাজনীতিতে আদর্শ কি শেষ পর্যন্ত কেবল ক্ষমতার সমীকরণের কাছে পরাজিত হয়?
# # # ২. বীর বিক্রমের রাজনৈতিক বলিসাধন, নাকি জামায়াতের কৌশল?
কর্নেল অলি আহমদ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর যোদ্ধা। কিন্তু আজ যে রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করানো হচ্ছে, সেই জামায়াতের রাজনৈতিক অতীত নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্ক ও সমালোচনা অত্যন্ত গভীর।
তাই এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বৈপরীত্যটি তৈরি হয়।
একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি একসময় স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, আজ সেই শক্তির রাজনৈতিক জোটের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী—দৃশ্যটি তাই নিছক রাজনৈতিক সমীকরণ নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার এক চরম ব্যঙ্গাত্মক ছবি।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—যে রাজনৈতিক জোটের নির্বাচনী শক্তি জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফল পাল্টানোর মতো অবস্থানে নেই, তাদের সমর্থনে এমন একটি প্রার্থিতা আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত?
# # # ৩. উপহার, নাকি রাজনৈতিক বিদ্রূপ?
যদি ফলাফল আগে থেকেই সংখ্যার অঙ্কে প্রায় নিশ্চিত থাকে, তাহলে এমন একজন প্রবীণ ও সাবেক বীর বিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার প্রকৃত রাজনৈতিক লাভ কোথায়?
সমালোচকেরা বলতেই পারেন—এটি কোনো বাস্তবসম্মত বিজয়ের পরিকল্পনা নয়; বরং একজন প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর কৌশল।
আর সবচেয়ে নির্মম ব্যাখ্যাটি হতে পারে—এটি সম্মান জানানোর চেয়ে রাজনৈতিকভাবে তাকে ব্যবহার করার একটি কৌশল।
অর্থাৎ, জামায়াতের কাছে অলি আহমদ হয়তো রাষ্ট্রপতি হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থী নন; বরং একটি রাজনৈতিক ঘুঁটি—যাকে সামনে রেখে নিজেদের বার্তা দেওয়া, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক মঞ্চে একটি নাটকীয়তা তৈরি করা সম্ভব।
# # # শেষ কথা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যদি বাস্তব অর্থে সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যদের ভোটের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে ফলাফল পাল্টানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি ছাড়া এমন প্রার্থিতা কতটা রাজনৈতিকভাবে অর্থবহ—সেটিই মূল প্রশ্ন।
কর্নেল অলি আহমদ কি সত্যিই রাষ্ট্রপতি হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন, নাকি অন্য কারও রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে তাকে একটি ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
সময়ই হয়তো তার উত্তর দেবে।
তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রসিকতা হয়তো এখানেই—যে রাজনীতি একদিন আদর্শের প্রশ্নে অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, সেই রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত তাকে এমন এক শক্তির হাত ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনের পথে হাঁটাচ্ছে, যার সঙ্গে তার অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানের রয়েছে গভীর বৈপরীত্য।
**বলির পাঁঠা, রাজনৈতিক ঘুঁটি, নাকি চরম রসিকতা—ইতিহাসই শেষ বিচার করবে।** 🎭