01/05/2026
সিলেটি নাগরী লিপিতে মোট ৩৩টি বর্ণ রয়েছে, যার মধ্যে ৫টি স্বরবর্ণ এবং ২৮টি ব্যঞ্জনবর্ণ। সিলেটী ভাষা কেবল একটি আঞ্চলিক উপভাষা নয়, বরং এটি একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি মানুষ এই ভাষায় কথা বলেন, যা একে জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রভাষার চেয়েও শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। অভিবাসী সিলেটিদের মাধ্যমে এই ভাষা লন্ডন (বিশেষ করে পূর্ব লন্ডন), আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডনের অনেক স্থানে এই ভাষা দাপ্তরিক স্বীকৃতিও লাভ করেছে।
সিলেটি ভাষা ও লিপি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি বাংলার শত বছরের ঐতিহ্যের প্রতীক। এটি রাজা গৌড় গোবিন্দ কর্তৃক নির্যাতিত মুসলিমদের প্রতিরোধের ভাষা। সিলেটি নাগরী মূলত হযরত শাহজালাল (র.) এবং ৩৬০ আউলিয়ার পুণ্যভূমি সিলেটে ধর্ম প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। এই ভাষা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এবং ১৯৪৭ সালের গণভোটে করিমগঞ্জকে হারানোর বেদনাবিধুর স্মৃতির প্রতীক। এমনকি আজ অবধি চা বাগানে স্বল্প মজুরিতে কাজ করা শ্রমিকদের জীবন সংগ্রামের সাথেও এই ভাষা মিশে আছে।
সিলেটি নাগরীতে আরবি ও ফার্সি শব্দের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়। এটি মূলত সাধু ও সুফিদের ভাষা হিসেবে পরিচিত। চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে সুফি-সাধকদের মাধ্যমেই এই লিপির প্রচার ও প্রসার শুরু হয়। সিলটি ভাষা বা সিলেটি উপভাষার সাহিত্যের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যময়। এই ভাষার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নিজস্ব লিপি, যা 'সিলটি নাগরী' (Sylheti Nagri) নামে পরিচিত। এই লিপিটি মূলত আধ্যাত্মিক এবং মরমি সাহিত্য চর্চার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। হাসন রাজা, রাধারমণ দত্ত, শাহ আব্দুল করিম এবং শীতালং শাহের গান ও দর্শন এই ভাষার মাধ্যমেই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে।
এই ভাষায় কথা বলতেন বৃহত্তর সিলেটের সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের একাংশের মানুষ। এছাড়াও ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামের অনেক অঞ্চলেও এই ভাষার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা হলেও সকল দাপ্তরিক কাজে ইংরেজি ব্যবহার করা হয়, যা সত্যিই খুব লজ্জাজনক। অন্য একটি স্বতন্ত্র ভাষা আজ কালকুঠুরিতে হারিয়ে যাচ্ছে, যে ভাষার ইতিহাস খুবই প্রাচীন এবং যে ভাষায় রয়েছে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া।
সিলেটি ভাষাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে অন্তত ১০০ বছরের জন্য একে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।
আগামীতে যখন, IDCPর নেতৃত্বে ভারতের সেভেন সিস্টার, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, মালদ্বীপ নিয়ে 'আখন্ড সিলেট' গঠিত হবে, তখন "আখন্ড সিলেট" এর রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে নাগরী লিপিতে লেখা 'সিলেটি ভাষা'কে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।