07/06/2026
আড়াই বছর ধরে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পড়ে থাকা এক সেনা কর্মকর্তার লাশ কিন্তু পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এই একটি বাক্যই যথেষ্ট একটি রাষ্ট্রের অন্ধকারতম অধ্যায়ের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।
একজন মানুষকে হত্যা করা এক বিষয়, কিন্তু মৃত্যুর পরও তার পরিবারকে শেষ বিদায়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার নির্মমতা। এটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতা এবং এক ভয়ঙ্কর সময়ের প্রতিচ্ছবি, যখন মানুষের পরিচয়, সম্মান, এমনকি মৃত্যুর পর তার মর্যাদাও নিরাপদ ছিল না।
মেজর জাহিদুল ইসলাম ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেধাবী, চৌকস ও প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা। ২০০০ সালে ৪৩তম বিএমএ লং কোর্সের মাধ্যমে কমিশনপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা কঙ্গোতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন, পাকিস্তানে মিড-ক্যারিয়ার কোর্স সম্পন্ন করেছেন এবং কানাডায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন শৃঙ্খলাবদ্ধ, সৎ এবং দায়িত্বশীল একজন অফিসার।
২০০৯ সালের পিলখানা ট্র্যাজেডির সময় তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বেদনাদায়ক ঘটনাগুলোর একটি। সে সময় তার বন্ধু ক্যাপ্টেন শহীদ মাজহারুল হায়দার পিলখানায় কর্মরত ছিলেন। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের সময় ক্যাপ্টেন মাজহারুল ফোনে মেজর জাহিদকে পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মেজর জাহিদ পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও আলোচনায় সক্রিয় ছিলেন বলে দাবি করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই কারণেই তিনি অনেক সংবেদনশীল তথ্য জানতেন এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। তার সমর্থকদের মতে, তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে তাকে সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু সেখানেই সবকিছু শেষ হয়নি।
২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাত।
সেই রাতেই ঢাকার রূপনগরে তাকে কথিত "বন্দুকযুদ্ধে" নিহত দেখানো হয়। সরকারি ভাষ্যে বলা হয়েছিল, তিনি অস্ত্র নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা করেছিলেন এবং আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং বিভিন্ন অভিযোগে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র উঠে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সেদিন রাত ১০টার দিকে তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার করা হয়। পরিবারের দাবি, তার হাত পিছনে বেঁধে এমনভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল যে হাতের হাড় ও কাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মুখমণ্ডল বিকৃত করা হয়েছিল। পরে খুব কাছ থেকে ২৯ রাউন্ড গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এমনকি মরদেহের অবস্থা নিয়েও ভয়াবহ অভিযোগ উঠে আসে, যা সরকারি বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
অথচ রূপনগর থানার মামলার বিবরণে বলা হয়েছিল, তিনি নাকি ছুরি ও পিস্তল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা করেছিলেন এবং আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছিল।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়।
মৃত্যুর পরও মেজর জাহিদের পরিবারের ওপর নেমে আসে এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন।
অভিযোগ রয়েছে, মেজর জাহিদকে হত্যার রাতেই তার স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা এবং দুই শিশুকন্যাকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের চোখ বেঁধে আটক রাখা হয়। ছোট্ট এক বছরের শিশুকন্যাকেও মায়ের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বড় মেয়েকে প্রথমে আত্মীয়দের কাছে দেওয়ার কথা বলা হলেও পরে তাকেও আরেকটি কথিত অভিযানের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
২০১৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে একটি কথিত জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তিন শিশুকে উদ্ধারের খবর প্রচার করা হয়। সেই শিশুদের মধ্যে ছিল মেজর জাহিদের মাত্র পাঁচ বছরের নিষ্পাপ কন্যা জুনাইরা বিনতে জাহিদ।
ভাবা যায়?
একজন বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, আর তার পাঁচ বছরের শিশুকন্যাকে জাতির সামনে জঙ্গি নাটকের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ এখানেই থামেনি।
মেজর জাহিদের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলাকে দীর্ঘ সময় গোপন আটক, জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরে একাধিক জঙ্গি মামলার আসামি করা হয়। বছরের পর বছর তাকে কারাগার, আদালত এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জীবন কাটাতে হয়েছে। প্রায় চার বছর কারাভোগের পর জামিন পেলেও পরে আবার সেই জামিন বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আবার জামিন পেলেও এখনো তাকে বিভিন্ন মামলার বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
এদিকে ছেলের মৃত্যুর শোক সহ্য করতে পারেননি মেজর জাহিদের বাবা-মাও। অভিযোগ অনুযায়ী, ছেলের হত্যার এক বছরের মধ্যেই তারা দুজনেই স্ট্রোক করে মারা যান।
একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে আর কী লাগে?
একজন ছেলেকে হারানো।
একজন স্বামীকে হারানো।
একজন বাবাকে হারানো।
একজন মাকে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা।
দুই শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া।
আর তারপর সেই মানুষের মরদেহটুকুও পরিবারের কাছে না দেওয়া।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, মেজর জাহিদের মরদেহ প্রায় আড়াই বছর ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পড়ে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু পরিবারের কাছে সেটি হস্তান্তর করা হয়নি। পরে পরিবার মরদেহের অবস্থানও খুঁজে পায়নি বলে অভিযোগ করে।
একজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এটাই যথেষ্ট ভয়াবহ।
কিন্তু একজন মানুষকে হত্যা করে তার পরিবারকে বছরের পর বছর হয়রানি করা, শিশু সন্তানদের শৈশব ধ্বংস করা, স্ত্রীকে মামলার পর মামলা দিয়ে বিপর্যস্ত করা এবং মরদেহ পর্যন্ত পরিবারের কাছে না দেওয়া এসব কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার গল্প।
এটি সেই সময়ের গল্প, যখন ক্ষমতাই ছিল সত্য, আর সত্য বলার চেষ্টা করাই ছিল অপরাধ।
ফ্যাসিবাদ শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করে না। ফ্যাসিবাদ মানুষের পরিচয় কেড়ে নেয়, মর্যাদা কেড়ে নেয়, ইতিহাস কেড়ে নেয়। ফ্যাসিবাদ একজন মানুষকে মৃত্যুর পরও শান্তিতে থাকতে দেয় না। তার পরিবারকে শাস্তি দেয়, সন্তানদের শাস্তি দেয়, স্মৃতিকেও শাস্তি দেয়।
আজ বহু বছর পেরিয়ে গেছে। সরকার বদলেছে, ক্ষমতা বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। কিন্তু প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে।
সেদিন আসলে কী হয়েছিল?
কেন একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে জঙ্গি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল?
কেন তার স্ত্রী ও সন্তানদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
কেন তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি?
কেন একটি পুরো পরিবারকে কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু মেজর জাহিদের পরিবারের জন্য নয়; পুরো জাতির জন্য প্রয়োজন।
কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার ন্যায়বিচারে। একটি জাতির মর্যাদা নির্ধারিত হয় সে কতটা সাহসের সঙ্গে নিজের অন্ধকার অতীতের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে তার ওপর।
মেজর জাহিদুল ইসলামের ঘটনাটি তাই শুধু একজন সেনা কর্মকর্তার গল্প নয়। এটি বিচারহীনতার বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় খামখেয়ালির বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি প্রশ্ন।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো ক্ষমতা একদিন শেষ হয়, কিন্তু সত্যের প্রশ্ন কখনো শেষ হয় না।