06/09/2026
আজ সংসদে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল পাস হয়েছে, যেটাকে আমি সরাসরি ‘বাবা-মায়ের নিরাপত্তা বিল’ বলতে চাই। কারণ বিষয়টি শুধু সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে নয়; বিষয়টি হচ্ছে একজন বাবা-মা জীবনের শেষ বয়সে নিজের ঘরে, নিজের সম্পত্তিতে, নিজের নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন কি না। আর সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো এমন একটি বিল নিয়েও বিরোধীদলের বিরোধিতা এবং ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে। তাই জানা দরকার, আসলে এই বিলটিতে কী আছে এবং এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ।
বিষয়টা খুব সহজ করে বলি। আমাদের দেশে এমন ঘটনা একেবারে বিরল নয় বাবা-মা জীবিত থাকতেই সন্তানকে নিজের বাড়ি, জমি বা অন্যান্য সম্পত্তি লিখে দিয়েছেন। বাবা-মায়ের ধারণা ছিল, সন্তান তো নিজেরই; আজ লিখে দিলাম, কাল তো সেই সন্তানই দেখবে। কিন্তু বাস্তবে কোথাও কোথাও দেখা গেছে, সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর সেই বাবা-মাই নিজের বাড়িতে পরের মতো হয়ে গেছেন কেউ কেউ বৃদ্ধাশ্রমে যেতেও বাধ্য হয়েছেন আবার সন্তান নিজেই বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছেন । সন্তান সম্পত্তির মালিক হয়ে গেছে, কিন্তু বাবা-মায়ের জীবনের নিরাপত্তা আর নিশ্চিত থাকেনি। এমন ঘটনা নিয়ে আদালতেও মামলা হয়েছে। এই বাস্তব সমস্যাটাকেই আইনের আওতায় এনে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এতদিন আইনে সমস্যা কোথায় ছিল? প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর কাঠামোয় কেউ সম্পত্তি দান করলে মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার গ্রহীতার কাছে চলে যাওয়ার ফলে দাতা জীবিত থাকলেও নিজের দেওয়া সম্পত্তি ব্যবহার করার আলাদা আইনি নিশ্চয়তা স্পষ্ট ছিল না। ফলে একজন বাবা হয়তো জীবিত অবস্থাতেই ছেলেকে বাড়ি লিখে দিলেন, কিন্তু পরে সেই বাড়িতে থাকার অধিকার নিয়ে তিনিই অনিরাপদ হয়ে পড়লেন। মন্ত্রিসভার অনুমোদিত সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল এই জায়গাটিতেই জীবনকালীন ভোগ ও ব্যবহারের অধিকারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া।
এই নতুন ব্যবস্থাটার একটা উদাহরণ দেই। ধরুন, একজন বাবা তাঁর বাড়িটি জীবিত অবস্থায় তাঁর ছেলের নামে লিখে দিলেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মালিকানা সন্তানের নামে চলে গেল। কিন্তু বাবা যদি দলিলে তাঁর জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করেন, তাহলে বাবা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন তিনি ওই বাড়িতে বসবাস ও সম্পত্তিটি ভোগ-ব্যবহার করার অধিকার রাখবেন। অর্থাৎ সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়া মানেই বাবা-মাকে সেই সম্পত্তি থেকে জীবিত অবস্থায় উচ্ছেদ করে দেওয়া নয়। মালিকানা হস্তান্তর আর বাবা-মায়ের জীবনকালীন ভোগের অধিকার—এই দুটো বিষয়কে আইনে আলাদা করে সুরক্ষা দেওয়াটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে আরেকটি বিষয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সংশোধনী শুধু ছেলে সন্তানদের জন্য নয়। বাবা-মা সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করলেও জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ সন্তান ছেলে না মেয়ে—সেটা এখানে মূল বিষয় নয়। ফলে যেসব বাবা-মা ভবিষ্যতে নিজেদের সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে দিয়ে যেতে চান, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তিত থাকেন, তাঁদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা তৈরি করছে।
আমি এটাকে ‘বাবা-মায়ের নিরাপত্তা বিল’ বলছি এই কারণেই। কারণ জীবনের শেষ বয়সে একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তাঁর জমি-বাড়ি নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, সম্মান এবং নিজের জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ। যে বাবা সারাজীবন সন্তানকে বড় করেছেন, নিজের কষ্টের টাকা দিয়ে বাড়ি করেছেন, জমি করেছেন, শেষ বয়সে সেই সম্পত্তি সন্তানকে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছেন—আইন যদি তাঁকে বলে, ‘সম্পত্তি দিয়েছ, কিন্তু জীবিত থাকা পর্যন্ত তোমার ব্যবহার ও ভোগের অধিকার থাকবে’, তাহলে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা।
আরেকটি বিষয় সাধারণ মানুষের বোঝা দরকার—এটি সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পুরো আইন বাতিল করে দেওয়া নয়। বরং বিদ্যমান আইনের মধ্যে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের একটি নির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। অর্থাৎ বাবা-মা চাইলে জীবিত অবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি দিতে পারবেন, কিন্তু একই সঙ্গে নিজের জীবদ্দশার নিরাপত্তাটাও আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করার সুযোগ পাবেন।
এখন প্রশ্নটা বিরোধীদলের দিকে। রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো বিলের বিরোধিতা করার অধিকার অবশ্যই আছে। কোনো বিলের কোনো ধারা নিয়ে আপত্তি থাকলে সংসদে যুক্তি দিয়ে আপত্তি জানানো, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া, ভোটে বিরোধিতা করা—এসবই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু যে বিলের মূল উদ্দেশ্য বাবা-মা বা দাদা-দাদির মতো দাতাদের জীবদ্দশায় তাঁদের সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেই বিলের বিরোধিতা করে ওয়াকআউট করার রাজনৈতিক যুক্তিটা সাধারণ মানুষ অবশ্যই জানতে চাইতে পারে। আজ সংসদে বিরোধীদলের ওয়াকআউট এবং বিলটির বিরোধিতাটা আসলে কেন সেটাই মাথায় ঢুকছে না।
প্রশ্ন খুব সরল—আপনারা বিলটির কোন জায়গার বিরোধিতা করছেন? বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত তাঁদের নিজের সম্পত্তি ব্যবহার করার অধিকার থাকবে—এই জায়গাটার বিরোধিতা করছেন? নাকি অন্য কোনো ধারায় আপত্তি আছে? যদি কোনো নির্দিষ্ট ধারা নিয়ে সমস্যা থাকে, সেটি জনগণের সামনে পরিষ্কার করে বলুন। কারণ সাধারণ মানুষ রাজনীতির জটিল ভাষা বোঝে না; তারা শুধু এটুকু বোঝে—‘আমি আমার সম্পত্তি সন্তানকে দিয়ে দিলেও আমি কি জীবিত থাকা পর্যন্ত আমার নিজের বাড়িতে থাকতে পারব?’
আজকের এই সংশোধনীর গুরুত্ব এখানেই। আমাদের সমাজে সন্তান মানেই বাবা-মায়ের নিরাপত্তা এই সুন্দর ধারণাটি সব পরিবারে বাস্তবে একই রকম থাকে না। অধিকাংশ সন্তান নিশ্চয়ই বাবা-মায়ের যত্ন নেয়, কিন্তু আইন কখনো শুধু ভালো মানুষের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় না; আইন তৈরি হয় সেই মানুষটির জন্যও, যে দায়িত্ব ভুলে যেতে পারে, সম্পর্কের মর্যাদা রাখতে নাও পারে, কিংবা সম্পত্তি পাওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রতি অন্যায় করতে পারে। তাই এই আইন কোনো সন্তানের বিরুদ্ধে নয়; বরং বাবা-মায়ের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য।
একজন বাবা যদি তাঁর জীবনের শেষ সম্বলটুকু সন্তানের নামে লিখে দিয়ে পরে সন্তানের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, সেটি কোনো সভ্য সমাজের কাঙ্ক্ষিত চিত্র হতে পারে না। বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি দেবেন এটা তাঁদের ভালোবাসা ও ইচ্ছা। কিন্তু সেই সম্পত্তি দেওয়ার কারণে বাবা-মা যেন নিজের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিরাপত্তাহীন না হন এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই জায়গা থেকেই আমি মনে করি, এই সংশোধনী শুধু একটি সম্পত্তি আইন সংশোধন নয়; এটি আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ।
তাই বিরোধিতা করুন, প্রশ্ন তুলুন, সংসদে কঠিন বিতর্ক করুন গণতন্ত্রে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাবা-মায়ের জীবদ্দশার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো একটি আইনি সুরক্ষা নিয়ে বিরোধিতা করলে জনগণও প্রশ্ন করবে আপনারা আসলে কোন ধারার বিরোধিতা করছেন? বাবা-মায়ের অধিকার নিয়ে আপত্তিটা কোথায়? কারণ রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জন্য। আর সেই মানুষটির জীবনের শেষ বয়সে যদি নিজের সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পরও নিজের ঘরে নিরাপদে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই আইনকে রাজনৈতিক চশমায় না দেখে আগে একজন বৃদ্ধ বাবা কিংবা অসহায় মায়ের চোখ দিয়ে দেখা উচিত।
বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁদের সম্পত্তি সন্তান পেতে পারে কিন্তু সেই সম্পত্তির কারণে বাবা-মা যেন নিজের ঘরেই পরবাসী না হন, এই নিশ্চয়তাটাই এই সংশোধনীর সবচেয়ে বড় কথা। তাই আমি এটাকে শুধু ‘সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধনী’ হিসেবে দেখি না আমি দেখি, এটি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপদ জীবনের একটি আইনি ঢাল হিসেবে।