07/03/2026
রমজানের সেই বিজয়দিন: বদরের যুদ্ধ
রমজানের ইতিহাসে এমন একটি দিন আছে, যেদিন মরুভূমির বুকে সংঘটিত একটি যুদ্ধ শুধু একটি যুদ্ধই ছিল না এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার এক স্পষ্ট ফয়সালা। সেই দিনটি ১৭ রমজান, ২ হিজরি। দিনটি ছিল শুক্রবার। ইতিহাস একে চেনে বদরের যুদ্ধ নামে যা ইসলামের প্রথম বড় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ।
মদিনা থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে বদর নামের উপত্যকায় মুখোমুখি হয়েছিল দুটি বাহিনী। একদিকে ছোট একটি মুসলিম দল মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি। অন্যদিকে মক্কার কুরাইশদের শক্তিশালী বাহিনী প্রায় ১০০০ সৈন্য।
সংখ্যা, অস্ত্র ও বাহনের দিক থেকে তুলনা করলে ফলাফল যেন আগেই অনুমান করা যায়। কিন্তু বদরের ময়দানে নির্ধারণ হয়েছিল শুধু বাহ্যিক শক্তি দিয়ে নয় ঈমান, দোয়া এবং আল্লাহর সাহায্যে।
- আল-আকানকালে কুরাইশের অবস্থান
কুরাইশ বাহিনী বদরে এসে প্রথমে অবস্থান নেয় একটি উঁচু পাহাড়ে যাকে বলা হয় আল-আকানকাল (Udwatul Quswa)। আগের দিন বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে ঘোড়া ও উট নিয়ে পাহাড়ে উঠতে তাদের কষ্ট হচ্ছিল। পরে তারা পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকার ভেতরে শিবির স্থাপন করে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন তাদের পাহাড় থেকে নেমে আসতে দেখলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন,
“হে আল্লাহ! এরা কুরাইশ অহংকার ও গর্ব নিয়ে এসেছে, তোমার সাথে বিরোধ করতে এবং তোমার রাসুলকে মিথ্যাবাদী বলতে। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছ, তা দান কর।”
- কুরআনের প্রতিশ্রুতি
কুরাইশরা মুসলিমদের অবস্থা জানার জন্য উমাইর ইবনে ওয়াহব নামে একজনকে পাঠায়। তিনি মুসলিম বাহিনী দেখে ফিরে এসে বললেন, সংখ্যায় তারা খুবই কম, বাইরে থেকে কোনো সহায়তার চিহ্নও নেই। কিন্তু তিনি এটাও সতর্ক করে দেন যদি যুদ্ধ শুরু হয়, কুরাইশদের বড় ক্ষতি হতে পারে। এতে তাদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়। কিন্তু আবু জাহল অহংকার উসকে দিয়ে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে।
পরদিন সকালে রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি নিজের হাতে ছোট সেই বাহিনীকে সারিবদ্ধ করলেন একটি তীর হাতে ধরে দাঁড়িয়ে কাতার ঠিক করে দিলেন।
অন্যদিকে আবু জাহলও প্রার্থনা করেছিল,
“হে আমাদের রব! দুই দলের মধ্যে যে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং অজানা কিছু এনেছে তাকে ধ্বংস কর।”
এই প্রার্থনার জবাবেই কুরআনে বলা হয়েছে,
“যদি তোমরা বিজয় কামনা করে থাক, তাহলে তো তোমাদের নিকট বিজয় এসে গিয়েছে। আর যদি তোমরা বিরত হও, তাহলে সেটি তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা পুনরায় কর, তাহলে আমিও পুনরায় করব এবং তোমাদের দল কখনো তোমাদের কোন উপকারে আসবে না যদিও তা অধিক হয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের সাথে আছেন।”
~ সূরা আনফাল (৮:১৯)
- যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধ শুরুর আগে কুরাইশদের কয়েকজন সৈন্য বদরের কূপ থেকে পানি নিতে এগিয়ে আসে। মুসলিমরা তাদের লক্ষ্য করে আক্রমণ করে। তাদের প্রায় সবাই নিহত হয়। শুধু একজন বেঁচে যান,হাকিম ইবনে হিজাম।পরে তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেন।
এরপর যুদ্ধের সূচনা করে কুরাইশদের এক উগ্র যোদ্ধা, আল-আসওয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ দ্বারা। তিনি শপথ করেছিলেন মুসলিমদের পানির পাত্র ধ্বংস করতে বা সেই পথে মারা যেতে। কিন্তু হামজা (রা.) তার মোকাবিলা করেন এবং তাকে হত্যা করেন।
- একক দ্বন্দ্বের গল্প
এরপর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আরবদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী প্রথমে কয়েকজন যোদ্ধা একক দ্বন্দ্বে লড়াই করতে এগিয়ে আসে।
কুরাইশদের পক্ষ থেকে সামনে আসে তিনজন যোদ্ধা উতবা ইবনে রাবিয়া, তার ভাই শায়বা এবং তার ছেলে ওয়ালিদ। তারা মুসলিমদের চ্যালেঞ্জ জানায়।
প্রথমে আনসারদের কয়েকজন এগিয়ে এলেও কুরাইশরা বলে,
“আমরা আমাদের সমকক্ষ কুরাইশদের সাথেই লড়তে চাই।”
তখন সামনে এগিয়ে আসেন তিনজন সাহসী সাহাবি:
হামজা (রা.), আলী (রা.) এবং উবাইদা ইবনে হারিস (রা.)।
হামজা (রা.) শায়বার মোকাবিলা করেন, আলী (রা.) ওয়ালিদের সামনে দাঁড়ান, আর উবাইদা (রা.) লড়াই করেন উতবার সঙ্গে। হামজা ও আলী দ্রুত তাদের প্রতিপক্ষকে পরাজিত করেন। উবাইদা (রা.) ও উতবার দ্বন্দ্বে দুজনেই আহত হন। পরে হামজা ও আলী এসে উতবাকে পরাজিত করেন এবং আহত উবাইদা (রা.)-কে নিজেদের শিবিরে ফিরিয়ে আনেন। পরে তিনি শহীদ হন।
- পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধ শুরু
এরপর আর অপেক্ষা রইল না পূর্ণ শক্তিতে শুরু হয়ে গেল বদরের যুদ্ধ। কুরাইশরা আক্রমণ শুরু করল। কিন্তু মুসলিমরা ভীত হয়নি। মরুভূমির বুকে ধ্বনিত হতে লাগল,
“আহাদ! আহাদ!”
এক আল্লাহর ঘোষণা।
এদিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন আল্লাহর দরবারে গভীর দোয়ায় মগ্ন। তাঁর দোয়া ছিল এমন আন্তরিক যে চাদর কাঁধ থেকে পড়ে যাচ্ছিল। তিনি আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিলেন।
আল্লাহ সেই দোয়ার জবাব দিলেন। মুসলিমদের সাহায্যে এক হাজার ফেরেশতা পাঠানো হলো।
রাসুল ﷺ তখন আবু বকর (রা.)-কে বললেন,
“সুসংবাদ গ্রহণ করো, আবু বকর! আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এ যে জিবরাইল তিনি ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছেন।”
এরপর রাসুল ﷺ সামনে এগিয়ে এলেন। এক মুঠো ধুলা তুলে কুরাইশদের দিকে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন,
“মুখগুলো বিকৃত হয়ে যাক।”
পরে কুরআনে এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলা হয়,
“সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি নিক্ষেপ করনি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন* এবং যাতে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে মুমিনদেরকে পরীক্ষা করেন উত্তম পরীক্ষা। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
~ সূরা আনফাল (৮:১৭)
তারপর রাসুল ﷺ সাহাবিদের বললেন,
“উঠে দাঁড়াও!”
- বদরের বিজয়
ছোট সেই বাহিনী আল্লাহর ভরসায় এগিয়ে গেল। তিনগুণ বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলো। অদৃশ্য ফেরেশতাদের সাহায্যে যুদ্ধের দৃশ্য দ্রুত বদলে যেতে লাগল। কুরাইশদের সারি ভেঙে পড়ল, একসময় তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে শুরু করল।
ইতিহাসে উল্লেখ আছে সেদিন শয়তানও সুরাকা ইবনে মালিকের রূপ ধরে কুরাইশদের পাশে ছিল। কিন্তু ফেরেশতাদের উপস্থিতি দেখে সে ভয়ে সরে পড়ে।
মরুভূমির সেই সকাল শেষ হয়েছিল এমন এক বিজয়ে যা মানুষের শক্তি দিয়ে নয়, আল্লাহর সাহায্যে লেখা হয়েছিল।
এইদিনে সাজদায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কান্নার বিনিময়ে বাহ্যত দূর্বল ও নিরস্ত্র মুসলিম বাহিনীকে অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত বিরাট কাফের বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অবিস্মরণীয় বিজয় দান করেছিলেন।
আমাদের রব চিরঞ্জীব। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। ছোট-বড়, সহজ-কঠিন, সম্ভব-অসম্ভব ও ধারণাতীত সকল কাজের একচ্ছত্র ক্ষমতা তারই। তিনি মুস্তাজাবুদ দাওয়াত, আমাদের ডাকে সাড়া দানকারী। ডাকলেই শুনেন।
তাই বদরের ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প নয়। এটি একটি শিক্ষা।
- সংক্ষিপ্ত স্মরণ
▪ ৩১৩ জন মুসলিম সেনার বিরুদ্ধে ১০০০ কাফির সেনা।
▪ মুসলিমদের ৮টি তলোয়ারের বিরুদ্ধে ৬০০ বিভিন্ন অস্ত্র।
▪ মুসলিমদের ৭০টি উটের বিরুদ্ধে কাফিরদের ৭০০টি উট।
▪ মুসলিমদের ২টি ঘোড়ার বিরুদ্ধে কাফিরদের ৩০০টি ঘোড়া।
▪ ১৪ জন শহীদের বিনিময়ে ৭০টি কাফিরের লাশ ও ৭০ জন বন্দি কাফির।
সুতরাং নিশ্চিত বিজয় আমাদেরই। এখন অপেক্ষা শুধু সেই সাজদা, সেই কান্নার।
👉 শেয়ার করে দিন, যেন সবাই জানতে পারে—বিজয় আসে আল্লাহর সাহায্যে।