14/12/2025
১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: এক চাপা পড়ে যাওয়া ইতিহাস
পীর মোহসেন উদ্দিন দুদু মিয়া পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি শান্তি কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় বহু আলেমকেই পাকিস্তান সরকার কার্যত বাধ্য করেই এই কমিটিতে রেখেছিল। এর নেপথ্যে ছিলেন গোলাম আযম।
১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে এক আলেমদের মজলিসে পীর দুদু মিয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা বলেন। সেই মজলিসে উপস্থিত একজন শ্রুতা নিজে আমাকে এই ঘটনাগুলো শুনিয়েছেন। তিনি আমার খুব কাছের আত্মীয়, একদম রক্তের । তিনি মেডিক্যালের ছাত্র ছিলেন। আলেমদের মজলিসে তার অবস্থান ছিল বেশ ভালো ।
--------------
শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক আহমদের সরকার যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় তার প্রথমটি আসে পাকিস্তান থেকে। মোশতাক বুঝেছিলেন পাকিস্তানের স্বীকৃতি পেলে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পথ খুলবে। এই লক্ষ্যেই তিনি পীর দুদু মিয়াকে পাকিস্তান পাঠান।
পাকিস্তানে তখন আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন গোলাম আযম। সেখানে বাঙালিদের পক্ষ থেকে পীর দুদু মিয়াকে এক সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়, সেই অনুষ্ঠানে গোলাম আজম একটি বিস্ময়কর প্রস্তাব হাজির করেন—বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যেন আবার একটি রেফারেন্ডামের মাধ্যমে একই রাষ্ট্রে একীভূত হয়ে যায়। রাষ্ট্র এক থাকবে, শুধু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আলাদা সরকার থাকবে।
এই প্রস্তাবে পীর দুদু মিয়া হতবাক হয়ে যান। তিনি সরাসরি বলেন— “অগণিত মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ আবার কীভাবে আগের কাঠামোতে ফিরে যেতে পারে?”
তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন এবং পাকিস্তান সরকারের কাছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। শেষ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রতি পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় হয়।
-------------
ঘটনাচক্রে ফেরার পথে ইংল্যান্ডের হিথ্রু বিমানবন্দরে পীর দুদু মিয়ার সঙ্গে টিক্কা খানের সাক্ষাৎ হয়, যেই লোক মুক্তিযুদ্ধকালে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর প্রধান ও ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক ছিল (তখন সরাসরি ফ্লাইট ছিল না, ইংল্যান্ড হয়েই যেতে হতো)।
সেখানে টিক্কা খান এক ভয়ংকর তথ্য দেয় পীর দুদু মিয়াকে—১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য আল বদর ও আশ শামস পাকিস্তানি বাহিনীকে একটি তালিকা দেয় গণহত্যা চালানোর জন্য । সেনাবাহিনী শুরুতে পুরোপুরি সম্মত ছিল না। পরে আল বদর নিজেরাই হত্যাকাণ্ড চালায় বলে টিক্কা খান দাবি করে। যদিও ইতিহাসে সেনাবাহিনীও শামিল ছিল সেই হত্যাকাণ্ডে ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল বদর আরও একটি তালিকা দেয় যেখানে বড় বড় আলেমদের নাম ছিল। তাদের অভিযোগ ছিল এই আলেমরা পাকিস্তানের পক্ষে যথেষ্ট ভূমিকা রাখেননি, বা ইন্ডিয়ার দালালি করেছে (এটা তাদের চিরাচরিত স্বভাব ছিল, সবকিছু ইন্ডিয়ার ষড়যন্ত্র ও ইন্ডিয়ার দালাল বলা) , সেই তালিকায় পীর দুদু মিয়া, মাওলানা মহিউদ্দিন খানসহ বহু আলেমের নাম ছিল।
টিক্কা খান জনায়— পাকিস্তানি বাহিনী অনেক অপরাধ করেছে কিন্তু আলেমদের হত্যা করার সীমা তারা অতিক্রম করেনি। বরং রাজাকাররাই তাদের সে পথে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। টিক্কা খানের দাবি তারা যত জুলুম নির্যাতন করেছে, তা রাজাকারদের উস্কানি ও সহযোগীতায় করেছে ।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় এই বক্তব্য পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বহু ঘটনার সঙ্গে এর ভয়ংকর মিল পাওয়া যায়।
ছবি: পীর মোসলেহউদ্দিন দুদু মিয়া