28/02/2026
নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের পক্ষ থেকে সংরক্ষিত নারী আসন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানদের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে।
সম্মানিত দলীয় প্রধানবৃন্দ,
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকতা এবং জাতীয় সংসদে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রশ্নে আমরা, ‘নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’, আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সংরক্ষিত নারী আসন নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলেও, বাস্তবে এই আসনগুলোতে মনোনয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন, এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ না থাকলে নারী প্রতিনিধিত্ব কেবল “সংখ্যা”তে সীমাবদ্ধ থাকে, “ক্ষমতা”তে নয়।
‘নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরাম’ শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে দাবি জানিয়ে এসেছে যে নারীর প্রতিনিধিত্বকে “সংখ্যা” নয়, ক্ষমতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সে লক্ষ্যেই আমরা বারবার বলেছি: সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা শুরু করতে হবে; সাধারণ আসনেও দলগুলোকে উল্লেখযোগ্য হারে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, লিখিত মানদণ্ড ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে; রাজনৈতিক দলে নারী নেত্রীদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা, সাংগঠনিক পদ এবং সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটিতে নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে; নির্বাচনী পরিবেশে নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা, সমান সুযোগ ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে; এবং নারী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন-অফলাইন হয়রানি ও সহিংসতা রোধে দলীয় নীতিমালা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কার্যকর করতে হবে, যাতে নারী প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবেই “প্রতীকী” বা নিয়ন্ত্রিত উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে।
দু:খজনক হলো এবারের নির্বাচনেও সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন কার্যকর হয়নি। এই বাস্তবতা মেনে নিয়েও আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই: সংরক্ষিত আসনগুলো যেন শুধু লোক দেখানো প্রতিনিধিত্ব না হয়ে থেকে যায় এবং সংসদে নারীর সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থান ও মতামতকে যেন নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। সংরক্ষিত আসনের লক্ষ্য হবে নারীরা যেন সংসদে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে ও বাস্তব প্রভাব রাখতে পারেন তা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে আমরা নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলোর উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছি-
১। কে, কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় মনোনীত হবেন তা দলের পক্ষ থেকে লিখিত নীতিমালা তৈরি ও প্রকাশের মাধ্যমে মনোনয়নের পূর্বেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কিসের ভিত্তিতে ঐ প্রার্থীকে নির্বাচন করা হয়েছে তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা সংক্ষিপ্তভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
২। সংরক্ষিত আসন কোনো “সুবিধা” নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তাই মনোনয়নে যোগ্যতাভিত্তিক মানদণ্ড অপরিহার্য। যেমন-
- রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও মাঠের কাজ: সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, ইউনিট পর্যায়ে কাজ, জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিতে নেতৃত্বের প্রমাণ থাকা বাঞ্ছনীয়।
- সংসদীয় সক্ষমতা: আইন প্রণয়ন, বাজেট, নীতি-পর্যালোচনা ও কমিটির কাজ বোঝার সক্ষমতা/প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রস্তুতি।
- জনআস্থা ও নৈতিক মান: সহিংসতা/ঘৃণা/নারীবিদ্বেষী আচরণ থেকে দূরত্ব, শুদ্ধাচার ও দায়িত্বশীলতা।
- অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি/আচরণ: যুব নারী, প্রান্তিক অঞ্চল, আদিবাসী, সংখ্যালঘু, ও প্রতিবন্ধী নারীদের প্রতিনিধিত্বে বাস্তব অগ্রাধিকার।
৩। গুরুত্বপূর্ণ স্ট্যান্ডিং কমিটিতে নারীদের অর্থবহ সদস্যপদ নিশ্চিতকরণ, যোগ্যদের ক্ষেত্রে কমিটির সভাপতি/উপ-সভাপতি/সাব-কমিটির নেতৃত্বে নারী প্রতিনিধিদের সুযোগ, এবং সংসদে প্রশ্ন, নোটিশ, বিল-পর্যালোচনা, বাজেট আলোচনায় নারী এমপিদের সক্রিয় নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
৪। সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী এমপিদের ভূমিকা কার্যকর করার জন্য দলগুলোকে সংসদীয় নিয়ম, বিল বিশ্লেষণ, বাজেট, কমিটি-ওয়ার্ক বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নারী রাজনীতিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং অনলাইন ও অফলাইন হয়রানি মোকাবিলায় দলীয় প্রটোকল নিশ্চিতে কাঠামোগত উদ্যোগ নিতে হবে।
আমরা প্রত্যাশা করছি আপনারা -
- সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের রোডম্যাপ (নীতিগত অবস্থান ও সময়ভিত্তিক উদ্যোগ) ঘোষণা করবেন;
- বর্তমান কাঠামোতে, মনোনয়নে লিখিত নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন;
- সংরক্ষিত আসনকে প্রতীকী পদ হিসাবে না দেখে বাস্তব ক্ষমতায়নের জায়গা করবেন;
- নারী সংসদ সদসদের স্ট্যান্ডিং কমিটি ও নেতৃত্বে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করবেন;
- নারী সংসদ সদস্যদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য উদ্যোগ চালু করবেন।
আপনাদের কাছ থেকে আমরা অনুরোধ করছি, এই চিঠিতে উত্থাপিত সুপারিশগুলোর বিষয়ে দলীয় অবস্থান/অঙ্গীকার লিখিতভাবে বা জনসম্মুখে জানাবেন।
বিনীত,
নারী আন্দোলন, নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষে (বর্ণক্রম অনুসারে),
ক্ষুব্ধ নারী সমাজ
গণসাক্ষরতা অভিযান
দুর্বার নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশন
নাগরিক কোয়ালিশন
নারী উদ্যোগ কেন্দ্র (নউক)
নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা
নারী সংহতি
নারীপক্ষ
নারীর ডাকে রাজনীতি
ফেমিনিস্ট অ্যালায়েন্স অফ বাংলাদেশ (ফ্যাব)
বাংলাদেশ নারীমুক্তি কেন্দ্র
ভয়েস ফর রিফর্ম