06/12/2025
একজন অশিক্ষিত মহিলা!
এই কথাটি তাঁকে বহুবার শুনতে হয়েছে। বিদ্রূপের সুরে, অবজ্ঞার হাসি মিশিয়ে, বিরোধী রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে।
কিন্তু আমরা যারা নব্বইয়ের দশকের ছাত্র, আমরা জানি—এই “অশিক্ষিত মহিলা”ই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটা যুগান্তকারী সংস্কারের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেছেন, যার ফল আজও আমরা ভোগ করছি।
সেই সময়টা মনে পড়ে?
আশির দশক আর নব্বইয়ের গোড়ার দিক।
প্রকাশ্যে বস্তা বস্তা নকল, টেবিলের নিচে প্রশ্নপত্রের ছবি তোলা, পরীক্ষার হলে শিক্ষকদের পকেট ভর্তি উত্তরপত্র—এসব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।
একজন ছাত্র যদি সত্যিই পড়তে চাইত, তার চেয়ে বেশি পড়তে হতো কীভাবে নকল করতে হবে, কার সঙ্গে কত টাকায় দর কষাকষি করতে হবে।
ডিগ্রি ছিল কাগজের টুকরো, মেধার সার্টিফিকেট নয়।
তারপর এলেন তিনি—বেগম খালেদা জিয়া।
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসেই তিনি শিক্ষাকে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। গণপাশের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
১৯৯২-৯৬ সালের মধ্যে যা ঘটল তা ছিল অভূতপূর্ব:
- পরীক্ষাকেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের কঠোর নজরদারি
- প্রশ্নপত্র ছাপানো হতো গোপনে, সিলগালা করে পাঠানো হতো
- নকল করতে ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার, কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া
- বোর্ড স্ট্যান্ডিংয়ের জন্য ন্যূনতম ৮০% নম্বর আর কঠিন শর্ত
- স্টার মার্কস পাওয়া হয়ে উঠল স্বপ্নের মতো কঠিন
ফল?
পাশের হার নেমে এল ৬০-৭০%-এ। অনেকে বললেন, “এটা তো ধ্বংস করা হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার!”
কিন্তু আসলে যা হলো—ধ্বংস হলো জালিয়াতির সাম্রাজ্য।
আজকে যখন আমরা শুনি:
- অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ডে বাংলাদেশি ছাত্রদের নাম
- গুগল, মাইক্রোসফট, নাসায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের পদচারণা
- আইইএলটিএস-এ ৮/৯ ব্যান্ড, জিআরই-তে ৩৩০+ স্কোর
তাদের অধিকাংশের জন্মই সেই কঠিন সময়ে।
তারা পড়েছে যখন নকল করার কোনো রাস্তা ছিল না।
তারা জেনেছে—মেধা ছাড়া বাঁচার কোনো উপায় নেই।
এই পরিবর্তনটা এনেছিলেন একজন নারী, যাঁকে আমরা “অশিক্ষিত” বলে হেয় করি।
যাঁর নিজের হাতে ডিগ্রি কম, কিন্তু যিনি বুঝেছিলেন—শিক্ষা ছাড়া জাতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
তিনি নিজে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোননি, কিন্তু তিনি লাখো ছেলেমেয়েকে বিশ্বের দরজা খুলে দিয়েছেন।
আজ যখন তিনি অসুস্থ, বয়সের ভারে ন্যূব্জ, একা—
তখন আমার মনে পড়ে সেই কিশোর বয়সের স্মৃতি।
টেলিভিশনে তাঁর মুখ দেখতাম, শাড়ির আঁচলে হাত রাখা, চোখে দৃঢ়তা।
তিনি কথা বলতেন কম, কিন্তু যা করতেন, তা ইতিহাস হয়ে গেছে।
শ্রদ্ধেয় বেগম খালেদা জিয়া,
আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন?
একজন সাধারণ ছাত্র, যে আজ নিজেকে মেধাবী বলে গর্ব করে,
সে আপনার কাছে ঋণী।
আপনি আমাদের বাধ্য করেছিলেন পড়তে।
আপনি আমাদের শিখিয়েছিলেন—সততাই সবচেয়ে বড় ডিগ্রি।
আপনার ভালো-মন্দের হিসেব আল্লাহ রাখবেন।
আমি শুধু এসেছি একটু কৃতজ্ঞতা জানাতে।
আর দোয়া করতে—
আপনি যেন শান্তিতে থাকেন, সুস্থ থাকেন,
আর যেদিন বিদায় নেবেন, সেদিন যেন হাসিমুখে বলতে পারেন, “আমি একটা জাতিকে পড়তে শিখিয়েছিলাম।”