20/01/2026
শহীদ আসাদ কোনো একক মানুষের নাম নয়, তিনি একটি সময়ের নাম। একটি অগ্নিগর্ভ সময়—যেখানে শাসকের বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে ছাত্রসমাজ প্রথম স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছিল, আর নয়। ১৯৬৯ সালের সেই জানুয়ারির দিনে আসাদ যখন রাস্তায় নামেন, তিনি জানতেন না তিনি ইতিহাসে ঢুকে যাচ্ছেন; তিনি জানতেন শুধু অন্যায় টিকে থাকলে মানুষও টিকে থাকতে পারে না।
আসাদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় তার মূল পরিচয় ছিল না। তার আসল পরিচয়—তিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাধারণ তরুণ। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করে রেখেছে। ভোটাধিকার নেই, কথা বলার অধিকার নেই, অর্থনৈতিক শোষণ চলছে নির্লজ্জভাবে। সেই দমবন্ধ করা বাস্তবতায় আসাদ মিছিলে নেমেছিলেন বুকের ভেতর ক্ষোভ আর চোখে স্বপ্ন নিয়ে।
পুলিশের গুলি তার শরীর ভেদ করেছিল, কিন্তু আসাদের মৃত্যু আন্দোলনকে থামায়নি; বরং তাকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। তার রক্তমাখা শার্ট হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা—শব্দহীন কিন্তু তীব্র। সেই শার্ট দেখেই মানুষ বুঝে নিয়েছিল, এই রাষ্ট্র আর শুধরে নেওয়ার নয়, একে ভাঙতে হবে।
শহীদ আসাদের মৃত্যু ছিল আইয়ুব শাসনের নৈতিক মৃত্যুদণ্ড। তার পরের দিনগুলোতে রাজপথ আর চুপ করে থাকেনি। শ্রমিক, ছাত্র, সাধারণ মানুষ—সবাই নেমে এসেছিল রাস্তায়। এই গণঅভ্যুত্থানই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের জন্য রাজনৈতিক ও মানসিক জমিন তৈরি করে দেয়। বলা যায়, ১৯৭১-এর বন্দুকের আওয়াজের আগে ১৯৬৯-এর রাজপথেই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটেছিল, আর সেই বিস্ফোরণের নাম ছিল আসাদ।
আজ আসাদ গেট দিয়ে আমরা প্রতিদিন যাতায়াত করি, কিন্তু খুব কম মানুষ থেমে ভাবে—এই নামটা কেন? শহীদ আসাদ আমাদের মনে করিয়ে দেন, স্বাধীনতা কোনো দয়া নয়, এটি ছিনিয়ে নিতে হয়। তিনি শেখান, ইতিহাস এগোয় নামী নেতাদের বক্তৃতায় নয়, এগোয় অচেনা তরুণের রক্তে।
শহীদ আসাদ তাই শুধু স্মৃতির অংশ নন। তিনি প্রশ্ন হয়ে থাকেন—আমরা কি আজও অন্যায়ের সামনে দাঁড়াতে পারি, নাকি তার নামটা শুধু একটি বাসস্টপে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি?