23/05/2025
করিডোর ও নাগরিকত্ব নিয়ে খলিলুরের মিথ্যাচার, উঠছে প্রশ্ন, বাড়ছে বিতর্ক
করিডোর ও নাগরিকত্ব ইস্যুতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং তথ্য গোপন করার ঘটনায় তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে তিনি মানবিক করিডোর নিয়ে আলোচনা অস্বীকার করছেন, অন্যদিকে তাঁর মার্কিন নাগরিকত্ব গোপন করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে বসে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। জাতিসংঘে দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত এই কর্মকর্তা বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে সম্প্রতি দুটি ইস্যুতে তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডোর স্থাপন নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যকে তিনি সরাসরি অস্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়ত, তার মার্কিন নাগরিকত্ব নিয়ে একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্র বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছে।
২১ মে দুপুরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে খলিলুর রহমান বলেন, “মানবিক করিডোর নিয়ে কারও সঙ্গে কোনো কথা হয়নি এবং হবেও না। এটি আমাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। আরাকানের যে অবস্থা, তাতে করিডোরের কোনো প্রয়োজন নেই। করিডোর সৃষ্টি করে লোকজনের যাতায়াতের ব্যবস্থা করার কোনো প্রয়োজনীয়তা এখন নেই। যেটা প্রয়োজন আছে, সেটা হলো ত্রাণ সরবরাহ করা।
এর আগে খলিলুর বলেছিলেন, করিডর নয়, বাংলাদেশ আসলে প্যাসেস দিচ্ছে। তবে প্যাসেস ও করিডোর কী তা নিয়ে তিনি বিস্তারিত কিছুই বলেননি। সবশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি ত্রাণ চ্যানেল তৈরির কথা বলেন। এটাও কেমন হবে তাও বিস্তারিত জানাননি।
অথচ তার এসব বক্তব্যের আগে গত ২৭ এপ্রিল পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, রোহিঙ্গা সংকটে শর্তসাপেক্ষে করিডোর স্থাপন বিষয়ে বাংলাদেশ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে খলিলুর ইনিয়ে-বিনিয়ে করিডোর নিয়ে মিথ্যাচার করছেন।
এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা, বাংলাদেশ ও আরাকান আর্মির সদস্যরা একটি বৈঠক শেষে বের হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, করিডোর ইস্যুতে হতে পারে এই বৈঠক।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা উঠেছে। বিশেষ করে, মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়ে সরকারের নীতিকে অনেকেই দ্ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। একদিকে সরকার রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর কথা বলছেন। অন্যদিকে মানবিক করিডোর করে আরও রোহিঙ্গা প্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।
২০২৫ সালের শুরুতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন যে, মিয়ানমার প্রথম ধাপে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে । তবে, এই ঘোষণা বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। পরবর্তীতে, ইউনূস জানান যে, রাখাইনে সহিংসতার কারণে গত কয়েক মাসে ৮০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে । পরে জানা যায়, এই সংখ্যা এক লাখ ১৩ হাজার। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফর এবং রোহিঙ্গা শিবিরে ইফতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে অনেকেই রাজনৈতিক নাটক হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে, এই সফর এবং ইউনূসের মন্তব্যের মাধ্যমে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভুয়া আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে কার্যকর হয়নি ।
এরপর সামনে এসেছে রাখাইনের মানবিক করিডোর ইস্যু। এই প্রস্তাব নিয়ে দেশে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ স্পষ্ট। সেনাবাহিনীর একটি অংশও করিডোর স্থাপনের বিরোধিতা করছে, কারণ এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হতে পারে । রাখাইনে সহায়তার জন্য মানবিক করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ঝুঁকির কথা জানিয়েছে বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতৃবৃন্দও। তারা বলেছেন, ভূরাজনৈতিক সুবিধার কারণে কেউ আমাদের কাছে করিডোর চাইল আর আমরা তাতে সম্মতি দিয়ে দিলাম, এটা তো চরম অদূরদর্শী ও আত্মঘাতি সিদ্ধান্তের সামিল। একটি মানবিক করিডোরের আড়ালে সামরিক করিডোর স্থাপন করতে চায় এবং এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে তাদের আলাদা খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নপূরণ করতে চায়।
এই করিডোর ইস্যু নিয়ে চলা বিতর্কের মধ্যে সামনে আসে খলিলুরের নাগরিকত্ব বিতর্ক। ভারতীয় গণমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, খলিলুর রহমান ‘রজার রহমান’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন এবং অন্তত ২৬ বছর সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেছেন। এমনকি, মার্কিন সরকারে চাকরিও করেছেন বলে সেখানকার রেকর্ডে পাওয়া গেছে।
নিউইয়র্কের স্কারসডেলে তাঁর স্থায়ী বসবাস, ম্যাসাচুসেটস ও কানেকটিকাটের একাধিক ঠিকানায় বসবাসের তথ্য এবং তার স্ত্রী ও আত্মীয়দের মার্কিন বসবাসের রেকর্ডও উন্মোচিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, রজার রহমান নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে তার ও তার পরিবারের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো, তার স্ত্রীকে ‘সাথী’ নামে সম্বোধন এবং আত্মীয়দের মন্তব্য থেকে খলিলুর রহমান ও রজার রহমান একই ব্যক্তি বলেই প্রতীয়মান হয়।
সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি পরিণত হয়েছে ‘টক অব দ্য টাউন’-এ। “রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির যদি সত্যিই দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকে এবং তিনি সেটা গোপন করে থাকেন, তবে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়”—এমন মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা।
মানবিক করিডোর ইস্যুতে সরকার কী অবস্থান নেবে, এবং খলিলুর রহমানের নাগরিকত্ব বিতর্ক কতদূর গড়াবে, এখন তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই বিতর্ক খলিলুরকে নিয়ে নয় বরং তা রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিরাপত্তা কাঠামোর অখণ্ডতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।