21/05/2026
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ পালনে অধিকার এর আলোচনা সভা
আজ ২১ মে (বৃহস্পতিবার) এশিয়ান ফেডারেশন এগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিস্এ্যাপিয়ারেন্সের (আফাদ) এর সহযোগিতায় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ (International Week of the Disappeared - IWD) উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সপ্তাহ হলো একটি বৈশ্বিক প্রচারণা, যা প্রতি বছরের মে মাসের শেষ সপ্তাহে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এবং সত্য, বিচার, জবাবদিহিতা ও ক্ষতিপূরণের চলমান সংগ্রামকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে পালন করা হয়। এই উদ্যোগটি প্রথম ১৯৮১ সালে ল্যাটিন আমেরিকান ফেডারেশন অফ এ্যাসোসিয়েশন ফর রিলেটিভস অফ ডিস্এ্যাপিয়ার্ড-ডিটেইনিস (FEDEFAM) গ্রহণ করে।
অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইন বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্যবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন । বক্তারা বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুম, বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা করেন ।
অধিকারের প্রশিক্ষণ ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক তাসকিন ফাহমিনার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অভিজ্ঞতা ও চলমান সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন ।
গুমের শিকার ইসমাইল হোসেন বাতেনের স্ত্রী নাসরিন জাহান স্মৃতি আবেগঘন বক্তব্যে গুমের শিকার পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন । তিনি বলেন, “আমাদের কষ্টের কোনো রং নেই, কোনো ভাষা নেই ।” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন কেন কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে এবং তাঁর স্বামী গুম হওয়ার পর তিনি কেন তাঁর স্বামীর ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না এ বিষয়ে সরকারের কাছে প্রশ্ন তুলেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরেক সদস্য আমেনা আক্তার বৃষ্টি তাঁর স্বামী ও দেবরের গুম হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেন এবং তাঁদের পরিবারের দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরেন ।
মোহন মিয়ার বাবা জামশেদ আলী তাঁর ছেলেকে হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেন । তার ছেলে ২০১৮ সালে ডিবি পুলিশ কর্তৃক গুমের শিকার হন । তিনি তাঁর ছেলেকে খুঁজতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তৎকালীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় গিয়েছেন। তিনি হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদনও দায়ের করেছিলেন। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও তিনি এখনও তাঁর ছেলের সন্ধান পাননি।
গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক কমিশনার মো: সাজ্জাদ হোসেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করেন । তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কাঠামোতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, কারণ আট সদস্যবিশিষ্ট বাছাই কমিটির পাঁচজন সদস্য — স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য — সরাসরি সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। রাষ্ট্রপতি মূলত তাঁদের সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেবেন । এই প্রক্রিয়ায় গঠিত কমিশন সরকারের প্রভাবমুক্ত হবে না এবং তা কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা খর্ব করবে । তিনি বলেন, গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় তদন্ত কমিশনের সংগৃহীত গোপন তথ্য এখন সরকারের হেফাজতে থাকবে, যা এসব সংবেদনশীল তথ্যের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, অধ্যাদেশ বাতিল এবং নতুন প্রস্তাবিত খসড়া আইনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কীভাবে গুমের ঘটনাগুলো মোকাবিলা করবে।
গুম সংক্রান্ত কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ এর ২০ ধারা এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইনের ১৪ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন । তিনি বলেন, ২০ ধারা অনুযায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে না । অন্যদিকে, গুমের খসড়া আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী, সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গুমের ঘটনা তদন্ত করবেন । তাঁর মতে, বাস্তবে এটি কার্যকর নয়, কারণ পুলিশ কর্মকর্তারা র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারবেন না । ড. নাবিলা ইদ্রিস তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন: আইনি দুর্বলতা দূর করা, নিরাপত্তা বাহিনীর কাউন্টার ইন্টিলিজেন্স সিস্টেম পরিবর্তন করা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম (আরমান) বলেন, আইনমন্ত্রী পূর্বে জোরপূর্বক গুম বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন । কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত খসড়া আইনে ভুক্তভোগী ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে। তিনি ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার দাবিও জানান।
সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, দেশ আর গুমের সংস্কৃতির প্রত্যাবর্তন চায় না। তিনি সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়কে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখারও সমালোচনা করেন এবং এটিকে সমস্যাজনক বলে উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্র যদি গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রকৃত চেতনা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে জোরপূর্বক গুমের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে ।
তিনি আরও বলেন, আইসিটিতে বিচারিক অগ্রগতি এখন মন্থর গতিতে চলছে এবং যেসব অপরাধীরা বিদেশে পালিয়ে গেছে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনতে হবে ।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের(OHCHR)-এর মানবাধিকার বিষয়ক সিনিয়র কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন বলেন, জোরপূর্বক গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন আর কখনও ফিরে আসতে দেওয়া যাবে না । তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তি কোনো পরিস্থিতিতেই অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক থাকতে পারেন না । তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক কনভেনশন (ICPPED) গ্রহণ করেছে। তিনি আরও বলেন, কনভেনশনের বাস্তবায়ন ও দায়বদ্ধতা সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন সরকারকে দুই বছরের মধ্যে জাতিসংঘ সচিবালয়ে জমা দিতে হবে।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন গুম থেকে ফিরে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আবদুল্লাহ হিল আমান আজমী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাসিনুর রহমান, হুমায়ুন কবির, এবি পার্টির সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ডা: ফয়জুল হাকিম এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার শরিফুল ইসলাম ।
বক্তারা বাতিল হওয়া অধ্যাদেশ এবং নতুন প্রস্তাবিত খসড়া আইন উভয়ের প্রতিই অসন্তোষ প্রকাশ করেন । তাঁদের মতে, প্রস্তাবিত খসড়াটি বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের বাস্তবতা মোকাবিলায় যথেষ্ট নয় । তাঁরা অপরাধীদের দায়মুক্তি, বিচারিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন ।