26/04/2024
কামতাপুর রাজ্যের অংশ ছিল আগে রংপুর। কামতাপুরের রাজাদের রঙ্গালয় বলে তখন খ্যাতি ছিল রংপুরের। রঙ্গালয় থেকে রঙ্গপুর>রংপুর নামকরণ হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। এর আশেপাশের জেলাগুলোর নামকরণেও রঙের উল্লেখ দেখা যায়। লালমনিরহাট ও নীলফামারী তে আছে যথাক্রমে লাল ও নীল রং।
"সাদা-কালো এই জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে, তোমার আমার নাল-নীল সংসার!"
আর রংপুরে রং তো মেলাই আছে বাহে।
এ রাজ্যের প্রাকৃতজনের মুখের ভাষা হল রাজবংশী ভাষা। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ছাড়াও অবিভক্ত ভারতের উত্তরাঞ্চল কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, উত্তর দিনাজপুর, গোয়ালপাড়া এলাকার সাধারণ মানুষের ভাষা এই রাজবংশী ভাষা। লেখক দেবেশ রায় ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ নামে যে বৃহৎ মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনা করেছেন তাতে রংপুর তথা উত্তরাঞ্চলের মানুষের মুখের রাজবংশী ভাষা মুনশিয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন পুরো উপন্যাসেই।
রংপুরের ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্য আমাদের কাছে সুপরিচিত। এই ভাষায় ক্রিয়াপদের আগে না বসে। না যাঁও (যাই না), না খাঁও (খাই না)। র বর্ণের পরিবর্তে অ বর্ণ ব্যবহার বেশি, রংপুর হয় অংপুর, রসুন হয় অসুন। ল বর্ণের পরিবর্তে ন ব্যবহারের প্রবণতা। লাউ হয় নাউ, লাল হয় নাল। জায়গার নামের শেষে এ-কার থাকলে যেমন হাটে, মাঠে, ঘাটে হয়ে যায় হাটত, মাঠত, ঘাটত। উত্তম পুরুষে ভবিষ্যৎ কালের ক্রিয়ায় হয় খাইম, যাইম, দেখিম। আরও হয় মুঁই (আমি), আমরা (হামরা), তুঁই (তুমি), অঁয় (সে), ওমরা (তারা)।
মুই হনু আসল অম্পুইরা। মাঝত মাঝত হামার সাথোত তোমরা আও কইরেন।
হামরা বোলে অ্যালা বাংলাদ্যাশ ছাড়ি নেপ্যালের মানুষ হনো। তা একান দিক থাকি ভালই হচি, ট্যাকা খরচ করি আর নেপ্যালোত ঘুরব্যার যাবার ন্যাগব্যানায়।
মুরুব্বির ঘর কয়, ছাওয়া পোয়াক বেশি নেকাপড়া করা ভালো নোয়ায়। কথায় কথায় ইংরেজি কইবে হামার সামনোত, এটা হামার সহ্য হবার লয়।
আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে রংপুরের কৃষক নেতা নুরুদ্দীন ইংরেজদের কাছে মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে দেখা দেয়। পলাশীতে বিপর্যয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অপশাসন ও লুটপাটের ফলে ১১৭৬ বঙ্গাব্দে সৃষ্ট ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে’ কোটি মানুষ বাংলা ও বিহারে মারা গেছে না খেয়ে। ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে নুরুদ্দীন রংপুরের কৃষকদের সংঘটিত করে ইংরেজদের কর প্রদান বন্ধ করেন। ইংরেজ সেনাদের বিরুদ্ধে অসম সাহসিকতার পরিচয় দেখিয়ে যুদ্ধ করেন। এই নুরুদ্দীন সৈয়দ শামসুল হকের লেখায় হয়ে ওঠেন কালজয়ী নূরুলদীন।
"আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক, 'জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?"
এভাবেই প্রায় দু'শো বছর পূর্বে রংপুরের কৃষক বিদ্রোহের নেতা নূরলদীনের 'জাগো, বাহে ,কোনঠে সবায় ডাকটি সমসাময়িক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বের দাবি রাখে।
আসামের গোয়ালপাড়ার কিছু লোকগান শুনলাম। ভাওয়াইয়া গান। রংপুর, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি ও গোয়ালপাড়ার সম্বন্ধ খুবই ঘনিষ্ঠ। ব্রিটিশ আমলে রংপুরের সঙ্গে গোয়ালপাড়া একসঙ্গে ছিল। মূলত রংপুর, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, গোয়ালপাড়া এদের একসঙ্গে বলা হত রত্নপীঠ। গোয়ালপাড়া বাংলাভাষী এলাকা। এটি এখন ভারতের আসাম রাজ্যের অধীনে। করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, শিলচর, কাছাড় বাংলাভাষী অধ্যুষিত এলাকা।
১৮২৬ সালে ব্রিটিশরা আসাম দখল করার পর ১৮৭৪ সালে আসামকে চিফ কমিশনারের শাসনে আলাদা প্রদেশ বানায়। সিলেট বিভাগকে বাংলা থেকে কেটে আসামের সঙ্গে যোগ করে। ১৯৪৭ সালে সিলেট (করিমগঞ্জসহ) পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত হয়। করিমগঞ্জ ভোটে জিতেও ভাগ্যের ফেরে আসামে পড়ে। হাইলাকান্দি ও গোয়ালপাড়াতে ভোটই হয়নি। গোয়ালপাড়া বেশ বড় জেলা। ১৯৮৩ সালে এটিকে ভাগ করে মোট তিনটি জেলা করা হয়। গোয়ালপাড়া, ধুবড়ী ও কোকরাঝাড়। ১৯৮৯ সালে আরেকটি জেলার উদ্ভব ঘটে এখানে বঙাইগাঁও নামে।
রংপুর অঞ্চলের প্রধান গান ভাওয়াইয়া। ভাব (মনের অনুভূতি) থেকে ভাও+ইয়া, ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয়। আরও অনেক মতবাদ আছে। ভাওয়াইয়া গানের চল আছে রংপুর, কুচবিহার, গোয়ালপাড়া জেলায়।
‘বাপুত চেংরা রে ওমুত গাছত চড়িয়া একখান জলপাই পাড়িয়া দে’ কিংবা ‘ওহে গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি তুমি চিলমারীর বন্দরে’ ইত্যাদি গান শুধু রংপুর বা দিনাজপুর নয়, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, গোয়ালপাড়া অঞ্চলের অন্যতম প্রধান লোকসংগীত।
(গোয়ালপাড়ার কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডের গান কমেন্ট সেকশনে দেওয়া হল।)
-মোরশেদ হাসান