07/04/2026
বিষয়: কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দায় প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্প বিষয়ে প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর সংবাদের প্রতিবাদ।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দায় চীনা প্রতিষ্ঠান হান্ডা (Handa) কর্তৃক প্রস্তাবিত বিনিয়োগ প্রকল্প সম্পর্কে যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বিভ্রান্তিকর, অসম্পূর্ণ এবং বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকৃত তথ্য উপস্থাপনের স্বার্থে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ স্পষ্ট করা হলো:
১। ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার সোনাকান্দা মৌজায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের বিষয়টি ২০১৫ সালে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় ও বেজা’র গভর্নিং বোর্ডের সভায় অনুমোদিত হয়। এ লক্ষ্যে উক্ত স্থানের ৪০.৩১ একর খাস জমি দীর্ঘস্থায়ী বন্দোবস্ত মামলার মাধ্যমে বেজার অনুকূলে আসে এবং পরবর্তীতে নামজারি সম্পন্ন হয়। ২০১৫ সালের পরবর্তী সময়ে উক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল সংক্রান্ত পরবর্তী কোনোরূপ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। ফলে একদিকে যেমন সরকারি সম্পত্তি অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছিলো অপরদিকে উক্ত অঞ্চলে কোনোরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নি।
২। চীনের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান Handa Industries Limited বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইন সৃষ্টির লক্ষ্যে ৩,০০০+ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫,০০০ এর অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিডার সাথে একটি MoU স্বাক্ষর করে গত এপ্রিল ২০২৫ এ অনুষ্ঠিত Bangladesh Investment Summit-এ। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির লক্ষ্যে Handa সিন্থেটিক টেক্সটাইল উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে, যা দেশের টেক্সটাইল সাপ্লাই চেইনের বৈচিত্র্য এবং সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
• তৎপ্রেক্ষিতে, গত ৩০ জুলাই ২০২৫ তারিখে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মীরসরাই এ ৩০ একর জমিতে প্রায় ১,০০০ কোটি বিনিয়োগের মাধ্যমে ১০,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেপজার সাথে জমি বরাদ্দ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইতোমধ্যে উক্ত ইউনিটের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।
• ভ্যালু চেইনের বাকি অংশ সংশ্লিষ্ট শিল্প ইউনিট নির্মাণের লক্ষ্যে বেজা কর্তৃক প্রতিষ্ঠানটিকে কতিপয় অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয় যার মধ্যে কেরানীগঞ্জ উপজেলার অব্যবহৃত অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহ প্রকাশ করে। এ প্রেক্ষিতে অব্যবহৃত অর্থনৈতিক অঞ্চলটিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় এবং প্রায় ৩৭ একর জমি আনুমানিক ২১৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অধিগ্রহণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়।
২। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে আলোচ্য অর্থনৈতিক অঞ্চলটি উন্নয়নে বেজা ও সরকার ৫৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে কিন্তু এর বিপরীতে বার্ষিক আয় হবে মাত্র ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা যেটি সম্পূর্ণ অসত্য। উক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল সংলগ্ন সংযোগ সড়ক রয়েছে এবং অদূরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। উক্ত সংযোগ স্থাপনের আনুমানিক ৩০ কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। ভূমি অধিগ্রহণ ও পরিসেবা সংযোগ স্থাপনের আনুমানিক সর্বোচ্চ ২৫০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগের প্রয়োজনিয়তা রয়েছে যা বেজা’র অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় কম। ৫০ একর অনুন্নত জমিতে বার্ষিক ৩ডলার/বর্গমিটার হিসেবে লীজ ধার্য হয়েছে, যা বার্ষিক প্রায় ৭ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা এবং ৫০ বছরে মোট আয় আনুমানিক ৩৬০ কোটি টাকা (১ ডলার=১২০ টাকা হিসেবে)। একইসাথে, প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে ২০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ, ১৫,০০০+ মানুষের কর্মসংস্থান, এবং বাংলাদেশে বৈচিত্র্যময় রপ্তানি পণ্য তৈরির সুযোগ।
• উল্লেখ্য, বেজা তথা সরকারের মূ্ল লক্ষ্য শুধুই বাণিজ্যিকভাবে মুনাফা অর্জন নয় বরং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সাধন করা। আলোচ্য সমীক্ষা অনুযায়ী এ প্রকল্পের Economic Internal Rate of Return (EIRR) ২১% এবং Benefit-Cost Ratio = 3.31। অর্থাৎ, এ প্রকল্পে প্রতি ১ টাকা খরচের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে ৩.৩১ টাকার সুবিধা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এ হিসেবে উক্ত প্রকল্পে সরকার ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ৮০০ কোটির টাকা সমমূল্যের সুবিধা সৃষ্টি করতে সম্ভব হবে। ১০০% বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে গঠিতব্য প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে দেশে একদিকে যেমন প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে তেমনি উক্ত শিল্প কারখানা হতে বাৎসরিক প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।
৩। জমির লীজমূল্য ৩ ডলার/বছরে/বর্গমিটার হিসেবে ধরা হয়েছে, যা প্রতিবেদনে নামমাত্র মূল্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, সোনাকান্দা মৌজায় অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের লক্ষ্যে ২০২১ সালেপ্রাক-সম্ভ্যাবতা সমীক্ষা সম্পাদনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যাতে জমির সম্ভাব্য লীজ মুল্য ২.২ ডলার/বছরে/বর্গমিটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সম্ভাব্য লীজ মুল্যের চেয়ে ০.৮ ডলার বা ৩৬% অধিক লীজমূল্য যোগ করে ৩ ডলার/বছরে/বর্গমিটার অনুন্নত জমি লীজ প্রদান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, এই হারটি দেশের অন্যান্য অনুমোদিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
৪। সোনাকান্দায় Handa তাদের উৎপাদন কার্যক্রমে Zero Liquid Discharge (ZLD) টেকনোলজি ব্যবহার করবে যার মাধ্যমে পানির সর্বোত্তম ও ন্যূনতম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এছাড়া, Handa আলোচ্য প্রকল্পটিকে একটি পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে এবং পরিবেশ পরিবেশগত সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য একটি খসড়া পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (EMP) জমি প্রাপ্তির আবেদনের সাথে দাখিল করেছে।
৫। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার চীন সফর নিয়ে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। এ মর্মে স্পষ্ট করা যাচ্ছে যে, বিডার হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট জনাব নাহিয়ান রহমান হান্ডা প্রতিষ্ঠানের ৩০ বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে টেক্সটাইল ভ্যালু চেইনবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য একদিনের সফরে চীন গমন করেন। ২০০-এর অধিক বিনিয়োগকারীর উপস্থিতিতে আয়োজিত উক্ত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, মিশরসহ একাধিক দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দেশের পক্ষে চীনা বিনিয়োগকারীদের টেক্সটাইল শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে বিনিয়োগ সম্ভাবনা, সুবিধা ও নীতিগত সহায়তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিডার হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ও বিকেএমইএ নির্বাহী পরিচালক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে থেকে অংশগ্রহণ করেন। অতএব, উক্ত সফরকে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
৬। প্রতিবেদনটি দাবি করেছে যে BEZA-এর কর্মীরা এই বিনিয়োগ প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে ছিলেন, যা সঠিক নয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বেজা’র সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ বর্তমান সরকারে নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কর্মসংস্থান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
• বর্তমান মধ্যপপ্রাচ্য যুদ্ধ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সামগ্রিক বিনিয়োগ নিম্নগামী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
• এর মধ্যে Handa এর মত সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনয়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছে। এবং এরই মধ্যে তাদের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল, মীরসরাই এর প্রোজেক্ট বাস্তবায়নাধীন।
• আলোচ্য প্রকল্পের বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সম্পন্ন হচ্ছে এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে যে ধরনের সহায়তা প্রদান করা হয়, এ ক্ষেত্রেও সেই একই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কাঠামোর মধ্যেই কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
• Handa কে সফলভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আনয়নের মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে অপরদিকে তা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিকট একটি ইতিবাচক বার্তা দিবে।
এরূপ কৌশলগত বিনিয়োগকারীর বিষয়ে ভুলতথ্য ও ভুল উপস্থাপনের মাধ্যমে একদিকে যেমন বিনিয়োগ পরিবেশ বাধাগ্রস্থ হবে তেমনি তা দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। তাই বেজা প্রত্যাশা করে, সকল সংবাদ মাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে পেশাদারিত্ব বজায় রেখে দেশের উন্নয়নে কাজ করবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী সংবাদ প্রচার/প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকবে।