Vintage Bangladesh

Vintage Bangladesh Discover the vintage beauty of Bangladesh with us.

পল্লীকবি জসীম উদ্দিনের বসতভিটা....ফরিদপুরের সদর উপজেলায় গোবিন্দপুর গ্রামে পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের বাড়ি। কুমার নদীর পাশে ...
14/09/2026

পল্লীকবি জসীম উদ্দিনের বসতভিটা....
ফরিদপুরের সদর উপজেলায় গোবিন্দপুর গ্রামে পল্লী কবি জসীম উদ্দিনের বাড়ি। কুমার নদীর পাশে কবির বাড়িতে রয়েছে পুরাতন ৪টি টিনের ঘর। বসত বাড়ির বিভিন্ন রুমে রয়েছে তার ব্যবহৃত নানান জিনিসপত্র। কবির বিভিন্ন লেখা বাড়ির চত্বরে প্রদর্শন করা আছে।

নদীর সামনে বিশাল জায়গায় রয়েছে আগত দর্শনার্থীদের জন্যে বসার স্থা্ন। বাড়ির উত্তরে রাস্তার পাশে কবির কবরস্থান। পল্লীকবি জসীম উদ্দিন ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ থেকে ডালিম গাছের তলে চিরশায়িত রয়েছেন। কবির চারপাশে শায়িত রয়েছেন তার বাবা, মা, কবির পত্নী, বড় ছেলে, বড় ছেলের স্ত্রীসহ তার ভাই, বোন, ভাগিনা ও নাতনিরা।

কবির জন্ম ১৯০৩ সালে সদর উপজেলার নানার বাড়ি তাম্বুলখানা গ্রামে। ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও তিনি বাংলার পল্লী প্রকৃতির রূপমাধুর্য, সহজ সরল মানুষের জীবন তাঁর কাব্য সাহিত্যের উপজীব্য হিসেবে নেন।

বাংলার পল্লী অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে বিশাল জনগোষ্ঠী, কৃষি যাদের প্রধান উপজীবিকা। তাদের মধ্যেই পল্লীকবির আবির্ভাব। জসীমউদ্দীনের বাল্যকাল, কৈশোর ও যৌবনের অনেকটাই কেটেছে এ পল্লীতে, সেখানকার মাঠে-ঘাটে, নদীতীরে, চরে সাধারণ মানুষের মধ্যে। জন্মসূত্রে পল্লীর সাথে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্কের কারণে তার কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

তথ্য ও ছবি: Kajal Jay

কলমা জমিদার বাড়ি, লৌহজং, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জএকটি মাত্র অট্টালিকা কলমা জমিদার বাড়িতে। মুন্সিগঞ্জের লৌহজং-এ এই কলমা গ্রাম...
13/09/2026

কলমা জমিদার বাড়ি, লৌহজং, শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ

একটি মাত্র অট্টালিকা কলমা জমিদার বাড়িতে। মুন্সিগঞ্জের লৌহজং-এ এই কলমা গ্রাম। বালাসুর ও ভাগ্যকূলের বিখ্যাত সব জমিদার বাড়ির তুলনায় প্রায় অপরিচিত এই বাড়ি। তার পরও অপরূপ কারুকাজ আর ভবনে উৎকীর্ণ এক বাণীর জন্য অনন্য বৈশিষ্ট্যময় এই বাড়ি। এই বাণী থেকে পরিচয় মিলে এই জমিদারের শিক্ষা ও রুচির গভীরতা।

অট্টালিকাটি ১৯৮৯ পর্যন্ত ব্যবহার হচ্ছিলো পাশের এল কে স্কুলের শিক্ষকদের নিবাস হিসাবে। এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। ক্রমে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নয়তো খসে খসে উধাও হচ্ছে অমূল্য সব কারুকাজ, জড়িয়ে ধরছে পরজীবী আগাছা। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো অনুমান করাও কঠিন হয়ে পড়বে এই ভবনের অতীত সৌন্দর্য্য।

ভবনটির একপাশে উৎকীর্ণ AGREE TO DIFFER; অপর পাশে VARIETY IS THE —। পরে ছিলো সম্ভবত BEAUTY, যা পড়ে গেছে খসে গিয়ে। এই বাণীর মর্মার্থ – ভিন্ন মতের অধিকার মেনে নেয়া; আর, বৈচিত্র-কে স্বাগত জানানো ।

এখনো প্রত্যন্ত এই অঞ্চল। গাড়িতে প্রায় ঘন্টা খানেকের দূরত্ব থানা সদর হতে । আগে একমাত্র যোগাযোগ ছিলো এ নদী ও নদী ঘুরে জলপথ।

এতো আগে, সুনসান পল্লীর এই ভবন গায়ে এমন অর্থপূর্ণ ঘোষণা! অভিনব ও কিছুটা আশ্চর্যেরই। তবে সেই সময়ে এই বাণীর অন্তর্নিহিত মর্ম বুঝতে পারার মতো লোকজন এই এলাকায় থাকার কথা নয়। ইংরেজী শিক্ষাই ছিলো না আশেপাশে। এর সূচনাও হয় পরবর্তীতে এই বাড়ির প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি দ্বারা। বাড়ির পাশের ‘কলমা এল, কে উচ্চ বিদ্যালয়’।

ভিন্ন মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা নিয়ে বহুল চর্চিত বাণীটি হচ্ছে, “I disapprove of what you say, but I will defend to the death your right to say it”। অনেকেই এটিকে জানেন ফরাশী দার্শনিক ভলতেয়ারির বলে। বাস্তবে এটি Evelyn Beatrice Hall নামের একজন ইংরেজ লেখিকার। তাঁর বিশেষ পরিচিতি ভলতেয়ারির জীবনী লেখিকা হিসাবে। তিনি লিখতেন S. G. Tallentyre ছদ্মনামে। তাঁর লিখা The Life of Voltaire ও The Friends of Voltaire প্রকাশ পায় যথাক্রমে ১৯০৩ ও ১৯০৬ সালে

তারও বেশ আগে এই দালানের নির্মান! কারণ স্কুলটির নির্মানই এর আগে, ১৯০১ সালে। তারো আগে এই বাড়ির নির্মান। স্কুলের নামের ‘এল, কে’ মানে লক্ষী কান্ত। পুরো নাম শ্রী লক্ষী কান্ত দাশ চৌধুরী। তাঁর হাতেই এই স্থানে প্রতিষ্ঠা হয় এখনকার এই জমিদার বাড়ি। তবে এই অট্টালিকার নির্মান হয় তাঁর পুত্র জ্যেষ্ঠ্য পুত্র রাজকুমারের হাতে। তার আগেই তিনি দুই হিস্যায় জমিদারী ভাগ করে দিয়েছিলেন দুই পুত্র রাজ কুমার ও তারাকান্তের মাঝে।

স্কুলের প্রতিষ্ঠা হয় এর পরের প্রজন্মের হাত ধরে। রাজকুমারের চার পুত্রের; দেয়ালে উৎকীর্ণ যাঁদের নাম- “সেবক জ্ঞানেন্দ্র কামিনী ভূপতি দক্ষিণা”। ভবনের গায়ে বাণী লিপিবদ্ধকারী রাজকুমার দাশগুপ্তের উপযুক্ত চার সন্তান – জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র, কামিনী রঞ্জন, ভূপতি চন্দ্র, দক্ষিণা রঞ্জন। চারজনই ছিলেন বিদ্যোৎসাহী।

এই স্কুলের শিলান্যাস হয় ১৯০১ সালের ১৯শে এপ্রিল। স্কুল প্রতিষ্ঠার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন লক্ষীকান্ত। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে, বাড়িটির নির্মান স্কুল প্রতিষ্ঠার এক পুরুষ আগে। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে, ১৮৭০-৮০, এমন কোন এক সময়ে দালানটির নির্মান বলে ধরে নেয়া যায়। ভলতেয়ারির বলে কথিত সেই বাণী প্রকাশের (১৯০৩) ৩০ হতে ৪০ বছর পূর্বে!

এই স্কুলের শিলান্যাস হয় ১৯০১ সালের ১৯শে এপ্রিল। স্কুল প্রতিষ্ঠার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন লক্ষীকান্ত। তারো আগে জমিদারী ভাগ করে দেন দুই পুত্র রাজকুমার ও তারাকান্তের মাঝে। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে, বাড়িটির নির্মান স্কুল প্রতিষ্ঠার এক পুরুষ আগে। উনবিংশ শতকের শেষ দিকে, ১৮৭০-৮০, এমন কোন এক সময়ে দালানটির নির্মান বলে ধরে নেয়া যায়।

পুরোনোদের কাছে বাড়িটি এখনো পরিচিত কলমার জমিদার বাড়ি ভুঁইয়া বাড়ি নামে। পরে পদবী পরিবর্তন (দাশ চৌধুরী, দাশগুপ্ত) করলেও এলাকায় এই বংশের আদি পরিচিতি ছিলো ভুঁইয়া। শুধু বিক্রমপুর নয়, সমগ্র বঙ্গে খ্যাতি ছিলো এই জমিদার বংশের। এর প্রমান পাওয়া যায় বিক্রম পুরের প্রাচীন ইতিহাসে। সেখানে বলা আছে, “উত্তর বিক্রমপুরের কলমার ভুঁইয়া বংশ বিশেষ প্রতাপান্বিত ছিলেন। ভুঁইয়া বাবুদের মহান উদ্দেশ্যের কথায় সেকালে বঙ্গদেশ মুখরিত থাকিত।”

কলমায় এই বংশের শুরু নিধিরাম দেওয়ান-কে দিয়ে। তিনি ছিলেন মুর্শিদাবাদ নবাব দরবারের বৈদ্য। সেই সুবাদে তিনি উপাধি পেয়েছিলেন ‘দেওয়ান’। কিন্তু নবাবের পারিতোষিক ভিন্ন অন্য উপার্জন ছিলো না। নবাব সিরাজ উদ্দৌল্লাহর পতনের পর ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়েন বজরায় করে। ভাটির টানে ভাসতে ভাসতে বজরা ভিড়ান কলমি বিলের পাড়ে।

নবাব দরবারে নিধিরাম দেওয়ানের পরিচিতি ছিলো রাজা রাজবল্লভের সাথে। সেই সূত্রে রাজবল্লভের অনুগ্রহে তিনি বসতি স্থাপন করেন এই কলমায়, যার নাম হয়েছে কলমি বিলের কলমি থেকে। এখনো কলমায় আছে তাঁর স্থাপিত দেবালয়, যার পরিচিতি এখন কলমা কালিবাড়ি নামে।

নবাবী পাঞ্জা ছিলো নিধিরামের, কিন্তু বিশেষ কিছু করতে পারেন নি এ দিয়ে। তবে এই পাঞ্জা কাজে লাগান উত্তরসুরী লক্ষীকান্ত। বরিশালের মাটিডাঙ্গা মঠবাড়িয়ার রাজস্ব আদায়কারী হিসাবে নিয়োগ পান তিনি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের ( ১৭৯৩ সালে) পর তিনি বিক্রমপুরের কলমা অঞ্চলে পত্তন করেন নুতন জমিদারী। নিজের বসতি করেন পূর্বপুরুষ নিধিরামের কালী বাড়ির অদূরে বর্তমান কলমা স্কুলের পাশে। জ্ঞাতি ভ্রাতারা থেকে যান আদি বসত ভিটাতে।

লক্ষীকান্তের জমিদারী দুইটি হিস্যায় ভাগ করে দেয়া হয় দুই পুত্রের মাঝে। বড় হিস্যা রাজকুমারের চার পুত্রের হাতেই সেই সময় উল্লেখযোগ্য জনহিতকর কাজ হয় বেশ কিছু । এর মাঝে অন্যতম হচ্ছে এলাকায় ইংরেজী শিক্ষার গোড়াপত্তনকারী এই কলমা এল কে স্কুল। এ ছাড়াও আছে কলমা বাজার, রাস্তাঘাট, সেতু, ডাকঘর, টেলিগ্রাম অফিস , রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম ইত্যাদি।

পক্ষান্তরে ছোট হিস্যার (তারাকান্ত) বংশধরের সংশ্লিষ্টতা ছিলো বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। তারাকান্তের তৃতীয় পুত্র যোগেন্দ্র চন্দ্র দাশগুপ্ত ছিলেন বিপ্লবী দলের সভ্য। তাঁর এবং এই বাড়ির উল্লেখ আছে মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর “জেলে ত্রিশ বছর ও পাকভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম” গ্রন্থে।

“ঢাকা জিলা বিক্রমপুরের অন্তর্গত কলমার প্রসিদ্ধ জমিদার বাড়ী অনুশীলন সমিতির একটি আশ্রয় কেন্দ্র ছিল। এই বাড়ীর যোগেন্দ্র চন্দ্র দাশগুপ্ত (যোগা ভুঁইয়া) অনুশীলন সমিতির সভ্য ছিলেন এবং বৈপ্লবিক কাজে সক্রিয় অংশ গ্রহন করিয়াছিলেন।”।

কলমা এল কে উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান ভবন
স্কুলের শিক্ষকদের নিবাস হিসাবে দালানটি অতীতে ব্যবহারের রেকর্ড হতে বুঝা যায় মোটামুটি স্কুলটির নিয়ন্ত্রণে বাড়িটি। স্কুলের অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলীর ভবনাদি থেকে বুঝা যায় আর্থিক দিক থেকে সমৃদ্ধ অবস্থানে আছে স্কুলটি। পাসাপাশি স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতাদের নাম বহনকারী তাঁদের বসতবাড়ির এই হীন অবস্থা দৃষ্টিকটুতো বটেই, স্কুলের জন্যও সম্মানের নয় মোটেই।

সরকারী আর্থিক বরাদ্দ/ প্রত্নতাত্বিক অধিদপ্তর তহবিল না পেলে, ভেঙ্গে পড়তে পড়তে এক সময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে অসাধারণ নির্মানশৈলীর ঐতিহ্যময় এই নিদর্শন।

তথ্য সূত্রঃ
মানুষ গড়ার কারখানা কলমা লক্ষীকান্ত উচ্চ বিদ্যালয়, মনোয়ার মাহবুব-উল-আলম , প্রথম প্রকাশ – আষাঢ়, ১৩৯৬, জুন ১৯৮৯। ( পুস্তকটি সরবরাহের জন্য কৃতজ্ঞতা, স্থপতি অধ্যাপক জনাব সাজ্জাদুর রশিদ)
ছবি: Abdur Rashid Khan

12/09/2026

পূবর বাড়ির টংগী ঘর
📍ভাদেশ্বর, দক্ষিণভাগ, সিলেট
📸 Saki Choudhury

৫০০ বছর আগে বাংলার বৈশ্বিক বানিজ্যমধ্যযুগের বাংলা কবিতা এবং বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ থেকে আমাদের মনে হয়, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শ...
12/09/2026

৫০০ বছর আগে বাংলার বৈশ্বিক বানিজ্য

মধ্যযুগের বাংলা কবিতা এবং বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ থেকে আমাদের মনে হয়, পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে বাংলা ছিল একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল। সমুদ্রপথে বাণিজ্য এবং নানা ধরনের শিল্পপণ্যের বৈচিত্র্য এই সমৃদ্ধিকে আরও বিস্তৃত করেছিল। কিন্তু এই ধারণাটি কখনো গভীরভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। এই প্রবন্ধে আমরা তুমে পিরেসের সুমা ওরিয়েন্টাল–এর আলোকে বাংলার অর্থনীতির বিভিন্ন দিক, বিশেষ করে বাণিজ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থা পর্যালোচনা করব। ষোড়শ শতকের শুরুতে এশিয়ার বাণিজ্যব্যবস্থা কেমন ছিল, তার প্রথম বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায় এই গ্রন্থে।

তুমে পিরেস ১৫১২ থেকে ১৫১৫ সালের মধ্যে মালাক্কায় সুমা ওরিয়েন্টাল রচনা সম্পন্ন করেন। সে সময় পর্তুগিজরা পূর্ব আফ্রিকার উপকূল থেকে চীনা সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সামুদ্রিক সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। মালাক্কায় পর্তুগিজ বাণিজ্যকুঠির লেখক ও হিসাবরক্ষক হিসেবে পিরেস এশিয়ার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবান পর্তুগিজ প্রতিবেদনগুলো ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর ছিল “প্রাচ্যের পর্যটক, জাহাজের ক্যাপ্টেন ও ব্যবসায়ীদের বহুজাতিক জগতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ”।
অন্যান্য অনেক দেশের মতো তাঁর বিবরণে বাংলার অবস্থানও ছিল কিছুটা প্রান্তিক। কারণ তাঁর মূল মনোযোগ ছিল মালাক্কার ওপর—যা তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য ও ব্যবসার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে সুমা ওরিয়েন্টাল–এ বাংলার যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা ইন্দোনেশিয়া থেকে পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত পূর্ব-পশ্চিম বাণিজ্যপথে বাংলার অবস্থান সম্পর্কে অত্যন্ত জীবন্ত ধারণা দেয়।

কৃষিনির্ভর এই অর্থনীতি কিংবা এর ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা পিরেসের তাৎক্ষণিক আগ্রহের বিষয় ছিল না। তিনি মূলত এশিয়ার বিভিন্ন বিষয় ও পরিস্থিতিকে এমন এক উদীয়মান বণিকসমাজের দৃষ্টিতে দেখছিলেন, যারা পণ্য এবং বাণিজ্য ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী ছিল।

তুমে পিরেস পশ্চিম ইউরোপের মধ্যযুগের শেষভাগের অর্থনীতি ও সমাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিয়ে এশিয়ায় এসেছিলেন। বাংলার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি রাজতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন এবং আবিসিনীয় অভিজাতদের অবস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘নাইট’ হিসেবে বিবেচিত এই অভিজাতরা সমাজের একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী গঠন করেছিল। যদিও পিরেস আবিসিনীয় অভিজাতদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেননি, আমরা মনে করি তাঁর মনে পশ্চিম ইউরোপের সামন্তব্যবস্থার ধারণা ছিল।

প্রশাসনিক কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী অভিজাতরা বিভিন্ন ভূখণ্ডের ওপর অধিকার ভোগ করতেন। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব, সে সময়ের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা এই কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও প্রশাসন বাণিজ্যিক উদ্যোগকে অনেকাংশে নিরুৎসাহিত করেছিল। কিন্তু কৃষিনির্ভর এই অর্থনীতি কিংবা এর ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা পিরেসের তাৎক্ষণিক আগ্রহের বিষয় ছিল না। তিনি মূলত এশিয়ার বিভিন্ন বিষয় ও পরিস্থিতিকে এমন এক উদীয়মান বণিকসমাজের দৃষ্টিতে দেখছিলেন, যারা পণ্য এবং বাণিজ্য ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী ছিল।

ফলে বাংলায় আরব, পারসি, তুর্কি ও আবিসিনীয়দের পাশাপাশি চাওল-দাভোল ও গোয়ার ব্যবসায়ীদেরও দেখা যেত। বাণিজ্যিক সমুদ্রযাত্রা কয়েকটি ধাপে পরিচালিত হতো। এসব ব্যবসায়ী মালাবার উপকূলের কালিকটে নিজেদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল এবং বাংলাতেও একই ধরনের সংগঠন তৈরি করেছিল।

প্রতি বছর চার-পাঁচটি জাহাজ মালাক্কা ও পাসাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা করত। এসব জাহাজ দুই ধরনের ছিল—ধাও, অর্থাৎ পশ্চিম ভারত বা আরব উপকূলে দেখা যেত এমন দ্রুতগামী ও হালকা জাহাজ; এবং অপেক্ষাকৃত ভারী ও বড় জাহাজ, যেগুলোকে ‘জাঙ্ক’ বলা হতো। প্রতি বছর অন্তত এক-দুটি বড় জাহাজ মালাক্কায় পৌঁছাত, যেগুলোতে ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার ক্রুজাডো মূল্যের পণ্য থাকত। [ক্রুজাডো ছিল পর্তুগালের সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের একটি পুরোনো মুদ্রা একক।]
জানা যায়, বাংলার ব্যবসায়ীরা তাদের সঙ্গে বিশ ধরনের সুতি কাপড়, ইস্পাত, বিভিন্ন রঙের সুন্দর কারুকাজ করা অত্যন্ত সমৃদ্ধ বিছানার চাঁদোয়া, ট্যাপেস্ট্রির মতো দেয়ালসজ্জা এবং নানা ধরনের ফল সংরক্ষিত খাবার নিয়ে যেতেন। এর মধ্যে ছিল হরিতকী, আদা, কমলা, শসা, গাজর, আঙুর, লেবু, কুইন্স, ডুমুর, কুমড়া, লাউ এবং আরও অনেক ধরনের ফল; কিছু ফল ভিনেগারে সংরক্ষণ করা হতো।

বাংলা থেকে রপ্তানি করা পণ্যের মধ্যে গাঢ় রঙের সুগন্ধযুক্ত মাটির পাত্রও ছিল, যা মালাক্কার অধিবাসীরা অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করত। তুমে পিরেস লক্ষ করেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে বাংলার কাপড়ের বিপুল চাহিদা ছিল এবং মালাক্কায় এগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি হতো। বার্মা, বোর্নিও, জাভা এবং লিউ কিউ দ্বীপপুঞ্জে এই কাপড়ের চাহিদা ছিল।
মালাক্কা থেকে বাংলায় আসত বোর্নিওর কর্পূর, গোলমরিচ, লবঙ্গ, জয়ত্রী, জায়ফল, চন্দনকাঠ, রেশম, বীজমুক্তা, চীনামাটির পাত্র, তামা, টিন, সিসা, পারদ, সাদা ও সবুজ ডামাস্ক কাপড়, চীনের এনরোলাদো, উজ্জ্বল লাল রঙের টুপি, কার্পেট এবং জাভার ক্রিস ও তলোয়ার। রপ্তানি ও আমদানির তালিকা থেকে দেখা যায়, বাংলায় আমদানি করা পণ্যগুলোর বেশির ভাগই ছিল বিলাসপণ্য। অন্যদিকে রপ্তানি করা পণ্যের মধ্যে খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীও ছিল, যদিও সেগুলোর কিছুতে বিলাসিতার উপাদান ছিল।

মালাক্কা ছাড়াও আরাকান, পেগু, শ্যাম, পাসাই ও উত্তর সুমাত্রার পেদির, বান্দা, পাপুয়া, আরু এবং লিউ কিউ দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। পশ্চিমে বাংলা বাণিজ্য করত সিংহল, খাম্বাত, মালদ্বীপ, হরমুজ ও এডেনের সঙ্গে।
ফেব্রুয়ারিতে বাংলা থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজ মালাক্কায় পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় নিত। আবার আগস্টের শুরুতে মালাক্কা থেকে রওনা দিলে একই সময়ের মধ্যে বাংলায় পৌঁছানো সম্ভব হতো।

বাংলা ও মালাক্কার মধ্যে বাণিজ্য ছিল অত্যন্ত লাভজনক। বাংলায় প্রায় ৩৬ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং মালাক্কায় ৬ শতাংশ রপ্তানি কর দেওয়ার পরও ব্যবসায়ীরা প্রতিটি পণ্যে ২৫০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত লাভ করতে পারতেন। মালাক্কা ও বাংলায় সোনা ও রুপার দামের পার্থক্য থেকেও ভালো লাভ করা সম্ভব ছিল। বাংলায় সোনার দাম মালাক্কার তুলনায় এক-ষষ্ঠাংশ বেশি এবং রুপার মূল্য এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ কম ছিল।
বাংলার ব্যবসায়ীরা মালাক্কায় নিজেদের মুদ্রা ব্যবহার করতেন এবং বিদেশি মুদ্রা নিয়ে দেশে ফিরতেন, যা থেকে তারা ভালো লাভ করতেন। বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত কড়ি আমদানি করেও তারা লাভ করতে পারতেন।

আমরা দেখেছি, বাংলার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে বিশ ধরনের সুতি কাপড় ছিল। এর মধ্যে চারটির নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করেছেন পিরেস—সিনাবাফোস, চৌতারেস, বিটিলহাস এবং বিয়েরামেস। অধ্যাপক ইরফান হাবিব এগুলোকে মসলিনের বিভিন্ন ধরনের কাপড় হিসেবে শনাক্ত করেছেন।

বাংলায় রেশম চাষ বা তুঁতগাছের পাতা খাওয়া রেশম পোকার লালন-পালন প্রচলিত ছিল। বারবোসা আমাদের জানান, গুজরাটের রেশমবয়ন শিল্প অনেকাংশে বাংলার সরবরাহ করা কাঁচা রেশমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। পিরেস বাংলার রপ্তানি পণ্যের তালিকায় রেশম কিংবা চাল—কোনোটিই অন্তর্ভুক্ত করেননি। তবে এডেনে আমদানি করা পণ্যের প্রসঙ্গে তিনি ঘটনাচক্রে চালের উল্লেখ করেছেন। বাংলার সঙ্গে দীর্ঘ দূরত্বের চিনির বাণিজ্যও ছিল, যার ব্যাপারে পিরেস নীরব। তাছাড়া কারুশিল্পের উৎপাদন দ্রুততর করার জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম সম্পর্কেও তিনি কিছু বলেননি।
স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা এবং কড়ির প্রচলন বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে একটি মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটিয়েছিল। নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল লেনদেনব্যবস্থা মোটামুটি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারত।

সুমা ওরিয়েন্টাল–এ মুদ্রা এবং ওজন মাপার দাঁড়িপাল্লা সম্পর্কে যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা এসব ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করে। পিরেস যে পদ্ধতিতে কড়ি গণনার কথা বলেছেন, তা থেকে বোঝা যায় বাংলার রৌপ্যমুদ্রা ও মালাক্কার কালাইম মুদ্রার সঙ্গে কড়ির কী হারে বিনিময় হতো।
বাংলার সমুদ্রবাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শহরগুলোর মধ্যে সুমা ওরিয়েন্টাল–এ বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘বেঙ্গল’ শহর এবং সাতগাঁওকে। প্রথমটি সম্ভবত গৌড়ের সঙ্গে অভিন্ন এবং গঙ্গার তীরে অবস্থিত ছিল। সেখানে রাজার বাসস্থান এবং ৪০ হাজার মানুষের বসতি ছিল। শহরটি “নদীর ওপরের দিকে দুই দিনের যাত্রাপথে” অবস্থিত ছিল।

সাতগাঁও ছিল একটি ভালো ও নাব্য বন্দর। সেখানে ১০ হাজার মানুষের বসবাস এবং বহু ব্যবসায়ী ছিল। পিরেস লিখেছেন, “এগুলো বাংলার প্রধান বাণিজ্যিক শহর। অভ্যন্তরভাগে আরও কিছু শহর আছে, কিন্তু সেগুলো শক্তিশালী দুর্গনগরী ও সেনানিবাস; [বাণিজ্যিকভাবে] গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং দেশের অভ্যন্তরে সবসময় যুদ্ধ চলতে থাকে।”

সম্ভবত পিরেস উত্তর ভারত ও মধ্য এশিয়ার শহর সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব ধারণা বাংলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছিলেন। ওই অঞ্চলের শহরগুলোতে দুর্গ থাকত এবং দুর্গগুলো পাশের গ্রামীণ জনপদ থেকে শহরকে স্পষ্টভাবে পৃথক করত। কিন্তু বাংলার অভ্যন্তরীণ শহরগুলোতে দুর্গ ছিল না। সেখানে টাকশাল ছিল এবং গভর্নর, শুল্ক ও রাজস্ব সংগ্রাহকদের বাসস্থানও ছিল। নদীপথে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শহরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ থাকার কারণে এসব শহর দেশের বাণিজ্যিক জীবনে অন্তত সহায়ক ভূমিকা পালন করত।

এভাবে ষোড়শ শতকের শুরুতে বাংলার সমুদ্রবাণিজ্য সম্পর্কে আমরা একটি অত্যন্ত বিস্তারিত এবং কিছুটা আলোকপ্রদ বিবরণ পাই। স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা এবং কড়ির প্রচলন বেশ কিছুদিন ধরেই দেশে একটি মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটিয়েছিল। নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল লেনদেনব্যবস্থা, যা সম্ভবত বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, মোটামুটি কার্যকরভাবে চলতে পারত।
এর কারণ ছিল বিভিন্ন বাজারজাত পণ্যের উপস্থিতির ফলে সৃষ্ট অনুকূল বাণিজ্য ভারসাম্য, যা মূল্যবান ধাতুর আমদানিকে সহজ করে তুলেছিল। সুমা ওরিয়েন্টাল থেকে জানা যায়, কীভাবে সোনা, রুপা ও কড়ি এই দেশে আসত। বাংলার চালের বিনিময়ে মালদ্বীপ থেকে কড়ি আসত। চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশ, যাদের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল, সেখান থেকেও সোনা ও রুপা আমদানি করা হতো। আরও জানা যায়, পেগুর মাধ্যমে শ্যাম থেকেও কিছু পরিমাণ রুপা বাংলায় আসত।

বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিনিময় সহজ করার কাজে ব্যবহৃত এ দেশের ধাতব মুদ্রাব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আসা মূল্যবান ধাতু ও কড়ির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এই মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিও বিদেশি বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং সেই বাণিজ্যকে সচল রাখত বিভিন্ন ধরনের রপ্তানি পণ্য, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নানা ধরনের সুতি বস্ত্র।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—সামুদ্রিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত পণ্য উৎপাদনের বিকাশ বাংলার আর্থসামাজিক জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পেরেছিল কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের তুলনায় বাঙালি ব্যবসায়ীদের অবস্থান কী ছিল, তা জানা জরুরি।
সুমা ওরিয়েন্টাল–এ এশীয় বাণিজ্যে বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। এ সময় ভারত মহাসাগরের পশ্চিমাংশের জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য আরব ও গুজরাটি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। গুজরাট ও মালাক্কার মধ্যকার সামুদ্রিক বাণিজ্য ছিল “প্রায় সম্পূর্ণরূপে গুজরাটিদের হাতে”।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুজরাটিদের গুরুত্বের কারণে মালাক্কার গুজরাটি ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম দেখাশোনার জন্য একজন শাহ-ই-বন্দর ছিলেন। এশীয় বাণিজ্যে তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে পিয়ারসন লিখেছেন, “এই সব ‘আন্তর্জাতিক’ বাণিজ্যপথে মাত্র দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীরা ছিলেন গুজরাটিরা।” তারা শুধু নিজেদের কাপড়, নীল ও আফিমই বহন করত না; অন্যদের পণ্যও বহন করত, বিশেষ করে মসলা।

পুঁজি, জাহাজ এবং বিভিন্ন ধরনের বস্ত্রসহ পণ্যের কথা বিবেচনা করলে এই বাণিজ্যব্যবস্থায় করোমণ্ডল উপকূলের ব্যবসায়ীদের অবস্থানও ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু গুজরাটি ও করোমণ্ডল উপকূলের ব্যবসায়ীদের তুলনায় বাঙালি ব্যবসায়ীদের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অনিশ্চিত ও দুর্বল।

তুমে পিরেস লিখেছেন, “বাঙালিরা বড় ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত স্বাধীনচেতা; বাণিজ্যের পরিবেশেই তাদের বেড়ে ওঠা। তারা গৃহস্থ প্রকৃতির। সব ব্যবসায়ীই মিথ্যাবাদী… কাউকে অপমান করতে চাইলে তাকে বাঙালি বলা হয়। তারা অত্যন্ত বিশ্বাসঘাতক এবং তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন।”
একই সূত্র থেকে জানা যায়, জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ পরিচালনা মূলত গুজরাটি ও করোমণ্ডল উপকূলের ব্যবসায়ীদের হাতে ছিল। ফলে বাংলার বন্দরগুলো এবং মালয়-ইন্দোনেশীয় দ্বীপপুঞ্জের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর নৌযাত্রা ও বাণিজ্যও সম্ভবত তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এসব উৎপাদন উপকরণের ওপর বাঙালি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণের কথা পিরেস একেবারেই উল্লেখ করেননি।

মালাক্কায় বাঙালিদের করোমণ্ডল, পেগু ও পাসাইয়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শাহ-ই-বন্দর–এর অধীনে একত্রিত করা হয়েছিল। তারা জেলে ও কারিগর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করত এবং “সম্ভবত মালাক্কায় আসা জাহাজগুলোর নাবিকদলের অংশ ছিল”। কিন্তু তারা “করোমণ্ডলের শক্তিশালী দক্ষিণ ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কোনোভাবেই তুলনীয় ছিল না”।
পাসাই, জাভা ও শ্যামেও কিছু বাঙালি ব্যবসায়ীর দেখা মিলত। কিন্তু এসব তথ্য ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের প্রমাণ দেয় না। বিদেশে বাঙালিদের দুর্বল ভাবমূর্তি, তাদের সংগঠনের অভাব, জাহাজ পরিচালনা ও নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি এবং পিরেসের বর্ণনায় প্রকাশিত নিম্নমানের ব্যবসায়িক নৈতিকতা—এসব কারণেই তারা গুজরাটি ও করোমণ্ডল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি বলে মনে হয়।
সম্ভবত তারা এসব ব্যবসায়ীর অধীনস্থ বা জুনিয়র অংশীদার হিসেবে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিত। এই পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে পুঁজি সঞ্চয় এবং তার ফলে বাংলায় একটি বাণিজ্যনির্ভর অভিজাত শ্রেণির বিকাশ সম্ভব ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য এবং সমকালীন বিদেশি বিবরণে বাংলার সমাজে বাণিজ্যভিত্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির অস্তিত্বের খুব কমই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বারবোসা যে ‘বেঙ্গলা’ শহরের সম্মানিত মুসলমানদের বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন, তারা সম্ভবত বাংলায় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত পশ্চিম ভারতীয়, আরব, পারসি ও তুর্কি ব্যবসায়ীদেরই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পিরেসের উল্লেখ করা “মিথ্যাবাদী” ব্যবসায়ীরা সম্ভবত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকাশের সঙ্গে গড়ে ওঠা একদল ফটকাবাজ ও ফেরিওয়ালা ছিলেন।

দেশীয় শিল্প, যা অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত ছিল, সম্ভবত বণিকপুঁজির নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং স্বাধীনভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে যে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের চিত্র পাওয়া যায়, সেখানে কারিগর ও শিল্পীদের পেশাজীবী শ্রেণিকে সমাজের অত্যন্ত নিচু স্তরে রাখা হয়েছিল। সমাজে তাদের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তারা ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহের পর্যায়ে জীবনযাপন করত।
বর্ণব্যবস্থার সীমার মধ্যে আবদ্ধ এবং জাতিগত বিধিনিষেধে নিয়ন্ত্রিত এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কারিগর গোষ্ঠী কেবল স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাতে পারত। ফলে তারা পেশাগত স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। অন্তত সমুদ্রবাণিজ্যের ওপর তাদের কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে—এমন প্রত্যাশা ছিল না।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং এর ফলে শাসকদের মধ্যে যে ভূমিনির্ভর অন্তর্মুখী মানসিকতা তৈরি হয়েছিল, সম্ভবত এই দুই বিষয়ই ব্যাখ্যা করতে পারে কেন তারা ভূমিব্যবস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে এতটা সতর্ক ছিলেন, অথচ সমুদ্রে কী ঘটছে সে বিষয়ে তুলনামূলকভাবে কম আগ্রহী ছিলেন।
কৃষি উদ্বৃত্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুঁজি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত একটি স্থিতিশীল বণিক শ্রেণির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছিল বলে মনে হয়। আমরা জানি, মধ্যযুগীয় ভারতীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইকতা বা জাগির ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বোচ্চ কেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হতো এবং শাসকদের সমাজের ওপর প্রায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া হতো। এর ফলে মুসলিম প্রশাসকরা কৃষি উদ্বৃত্তের একটি বড় অংশ নিজেদের দখলে নিতে পারতেন, আর এই উদ্বৃত্তের ওপরই শাসকগোষ্ঠীর কাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল।

যেহেতু রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামো ভূমির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত ছিল, তাই সমুদ্রবাণিজ্য ও ব্যবসা থেকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিশেষ প্রয়োজন তারা খুব একটা অনুভব করেনি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি এবং শাসকদের মধ্যে সৃষ্ট ভূমিনির্ভর অন্তর্মুখী মানসিকতাই সম্ভবত ব্যাখ্যা করে কেন তারা ভূমিব্যবস্থার প্রতি এতটা মনোযোগী ছিলেন, অথচ সমুদ্রের কর্মকাণ্ডের প্রতি তুলনামূলকভাবে উদাসীন ছিলেন।

দিল্লির সুলতান এবং তাঁদের উত্তরসূরি মহান মুঘলরা তাদের আইনব্যবস্থায় সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের কোনো ব্যবস্থা রাখেননি। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ডকে একইভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্যও তারা কোনো সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি গড়ে তুলতে পারেননি।
কৃষি উদ্বৃত্তের ওপর সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত মধ্যযুগীয় ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বণিক অর্থনীতির ভিন্নমুখী প্রবণতা থেকে যে দ্বৈততা তৈরি হয়েছিল, তা পুঁজি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল বলেই মনে হয়। বাংলার সুলতানদের ব্যবসায়ীদের প্রতি মনোভাবেও সম্ভবত এই দ্বৈততার প্রকাশ ঘটেছিল।

তুমে পিরেস জানতে পেরেছিলেন যে বাংলার ব্যবসায়ীরা বলেছিল, সুলতান হোসেন শাহ “ব্যবসায়ীদের প্রতি সদয় ছিলেন না”; ফলে তাদের অনেকে অন্য দেশে চলে যাচ্ছিল। কর ও শুল্ক আদায়ের প্রচলিত পদ্ধতিও সম্ভবত এই মনোভাবেরই প্রতিফলন ছিল।

তুমে পিরেস লিখেছেন, “তারা বলে, দশ বা বারোজন লোক শুল্ক আদায় করে, প্রত্যেকে নিজের নিজের শুল্ক। তারা এ কাজের কর্মকর্তা এবং পদমর্যাদা পাওয়ার পর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে ও প্রকাশ্যেই তাদের ওপর অত্যাচার চালায়।”
এই অত্যাচারমূলক কর আদায়ের পদ্ধতির পাশাপাশি আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের ওপর ৩৬ শতাংশেরও বেশি শুল্ক আরোপ করা হতো।

উপরের আলোচনা সংক্ষেপে বলা যায়, সমুদ্রবাণিজ্যে বাঙালি ব্যবসায়ীদের দুর্বল অবস্থান, বাণিজ্যিক সংগঠন ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের ওপর পশ্চিম এশীয়, গুজরাটি ও করোমণ্ডল ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ এবং তৎকালীন ভূমিনির্ভর মধ্যযুগীয় মুসলিম রাষ্ট্রব্যবস্থার বাণিজ্যবিরোধী মনোভাব—এই সবকিছুই পুঁজি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়ায় বাধা হিসেবে কাজ করেছিল।
মধ্যযুগীয় ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গড়ে ওঠা প্রধানত কৃষিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোই সম্ভবত বাংলার জীবনকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করে গিয়েছিল।

লেখা ও গবেষণা:মমতাজুর রহমান তারাফদার (১৯২৮–১৯৯৭)
মমতাজুর রহমান তারাফদার ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ।
১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘ভারতে বিদেশি পর্যটক’ শীর্ষক সম্মেলনে মমতাজুর রহমান তারাফদার এই প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে প্রবন্ধটি তাঁরTrade, Technology and Society in Medieval Bengal(ICBS: 1995) গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সম্পাদনা: অপু ইসলাম, ছবি: লেখকের সৌজন্যে

সাতক্ষীরার হাড়দ্দাহ গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শ্বেত পাথরের মসজিদ অথবা স্থানীয়ভাবে নাম হাড়দ্দাহ দক্ষিণপাড়া শাহী জামে মসজিদ।সাত...
11/09/2026

সাতক্ষীরার হাড়দ্দাহ গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শ্বেত পাথরের মসজিদ অথবা স্থানীয়ভাবে নাম হাড়দ্দাহ দক্ষিণপাড়া শাহী জামে মসজিদ।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভোমরা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী হাড়দ্দাহ গ্রামে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে চুন-সুরকি আর শ্বেত পাথরের এক অনন্য এই ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি।

এই প্রাচীন মসজিদটি আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগের এক রাজকীয় নির্মাণ ইতিহাসের সাক্ষী।
তৎকালীন জমিদার এবং এই মসজিদের প্রধান মতওয়াল্লি হাজি হারানউল্লা সদ্দার ( যিনি ছিলেন আমার দাদির পরদাদা ) সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তৎকালীন সময়ে প্রায় ২৬,০০০ রুপি বিপুল ব্যয়ে এই পুরো মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটির সুনিপুণ স্থাপত্যশৈলী ফুটিয়ে তুলতে ভারতের কলকাতার শান্তিনগর থেকে নামকরা রাজমিস্ত্রি ও কারিগরদের নিয়ে আসা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, মসজিদের মেঝে চমৎকার করার জন্য রাজকীয় শ্বেত পাথর (হোয়াইট মার্বেল) সরাসরি ভারতের রাজস্থান থেকে প্রথমে কলকাতায় আনা হয়; পরবর্তীতে সেই মূল্যবান পাথর বড় বড় নৌকায় করে নদীপথে হাড়দ্দাহ গ্রামে এনে মসজিদের মেঝেতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছিল।
১৯০৮ সালে এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৯১৪ সালে সমাপ্ত হয়।

এই মসজিদটিতে রয়েছে ৩টি ঐতিহ্যবাহী বড় গম্বুজ এবং ৪টি দৃষ্টিনন্দন উঁচু মিনার। এর বাইরের ও ভেতরের দেয়াল, জানালা এবং মেহরাবের প্রতিটি কোণায় শোভা পাচ্ছে চুন-সুরকির লাল, সবুজ ও হলুদ রঙের প্রাচীন লতা-পাতার চোখধাঁধানো রঙিন কারুকাজ।
মসজিদের ভেতরে থাকা মূল দুটি ঐতিহাসিক ফলক :
১. বাংলা ফলক (ভিত্তিপ্রস্তর): মসজিদের ভেতরে থাকা প্রথম একটি ফলক অনুযায়ী, বাংলা ১৭ই মাঘ ১৩১৪ সনে (আনুমানিক জানুয়ারি ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ) প্রধান মতওয়াল্লি হাজি হারানউল্লা সদ্দারের হাত ধরে এর কাজ শুরু হয়।
২. মেহরাবের ফলক (সমাপ্তি): দীর্ঘ ৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে মসজিদের কাজ সমাপ্তের পর ভেতরের মেহরাবের ওপর উর্দু ও আরবি লিপিতে খোদাই করা ফলকটিতে মোট ৪টি লাইনে আরবি এবং ফারসি ও উর্দু মিশ্রিত ক্যালিগ্রাফি বা হস্তশিল্প রয়েছে:১ম লাইন (আরবি): بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِঅনুবাদ: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে (শুরু করছি)।
২য় লাইন (আরবি): لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ অনুবাদ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল (কালিমা তায়্যিবা)।৩য় লাইন (ফারসি কাব্য): چراغ و مسجد و محراب و منبر ابوبکر و عمر و عثمان و حیدر উচ্চারণ: চেরাগ-ও মসজিদ-ও মেহরাব-ও মেম্বার, আবু বকর-ও ওমর-ও উসমান-ও হায়দার।অনুবাদ: (এটি ইসলামের সুফিবাদী ধারার একটি বিখ্যাত আলংকারিক কাব্য) "মসজিদ, তার মিহরাব, মিম্বর এবং এর ভেতরের প্রদীপ বা আলো হচ্ছে যথাক্রমে— আবু বকর, ওমর, উসমান এবং হায়দার (আলী)"। ইসলামের প্রথম চার খলিফাকে (খিলাফায়ে রাশেদীন) মসজিদের এই মূল চারটি উপাদানের সাথে রূপক অর্থে তুলনা করে এই কবিতাটি সাজানো হয়েছে।
৪র্থ লাইন (ফারসি/উর্দু): تاریخ ۲۷ ذی الحجہ ۱۳۳۲ ہجریঅনুবাদ: তারিখ: ২৭ জিলহজ, ১৩৩২ হিজরি।

তথ্য ও ছবি Taz Bin

10/09/2026

কাহেতুরায় এই স্মৃতি মন্দিরটি (মঠের) তবে কার স্মৃতিতে এটি নির্মাণ করা হয়েছে তা জানতে পারিনি।

লোকেশন- কাহেতুরা,কুন্ডা, নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
54RQ+5WJ Nasirnagar

বাংলায় হাবশি শাসন (১৪৮৭–৯৪)খুব কম মানুষই জানেন যে, একসময় বাংলায় হাবশি আফ্রিকান সুলতানরা শাসন করেছিলেন। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৪...
10/09/2026

বাংলায় হাবশি শাসন (১৪৮৭–৯৪)

খুব কম মানুষই জানেন যে, একসময় বাংলায় হাবশি আফ্রিকান সুলতানরা শাসন করেছিলেন। ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৪ সাল পর্যন্ত বাংলার সালতানাতের সিংহাসনে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত চারজন শাসক অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। যারা এই সময়কাল সম্পর্কে জানেন, তাদের অধিকাংশই সীমিতসংখ্যক শিক্ষাবিদ ও গবেষকের মধ্যে রয়েছেন; আর তাঁদের মধ্যেও এই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ খুব বেশি বলে মনে হয় না।

কিন্তু বাংলায় আফ্রিকানদের কোনো সামরিক আক্রমণ না থাকা সত্ত্বেও, কিংবা কোনো সময়েই এ দেশে আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এতটা বড় না হওয়া সত্ত্বেও, এমনটা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?
আমি যে প্রধান প্রাথমিক উৎসগুলো ব্যবহার করেছি, তার মধ্যে রয়েছে দুটি গ্রন্থ এবং চারজন সংশ্লিষ্ট সুলতানের জারি করা মুদ্রা। গ্রন্থ দুটি হলো—সপ্তদশ শতকের প্রথম দশকে মুহাম্মদ কাসিম হিন্দুশাহ (ফিরিশতা) রচিত তারিখ-ই ফিরিশতা; হাবশি শাসনের অবসানের একশ বছরেরও বেশি সময় পরে এটি লেখা হয়। আরেকটি হলো গোলাম হুসাইন সালিমের প্রায় ১৭৭৮ সালে রচিত রিয়াজ-উস-সালাতিন (বাংলার ইতিহাস), অর্থাৎ এই ঘটনার প্রায় তিনশ বছর পরে লেখা একটি গ্রন্থ।

১৪৮৭ থেকে ১৪৯৪ সাল পর্যন্ত একের পর এক আফ্রিকান শাসক বাংলার সালতানাত শাসন করেন। উত্তর ভারতে মুসলিম শাসনের শুরু থেকেই তুর্কি দাসদের পাশাপাশি ইথিওপীয় পুরুষদেরও আমদানি করা হতো। তারা মূলত দাস সৈনিক হিসেবে অভিজাত, সামরিক কমান্ডার এবং সুলতানদের অধীনে কাজ করত। তাদের কেউ কেউ পদমর্যাদার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে সামরিক কমান্ডার, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, অভিজাত, গভর্নর এমনকি শাসকের পদও লাভ করেন। বাংলার ক্ষেত্রে চারজন আফ্রিকান প্রায় সাত বছরের একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য সালতানাত শাসন করেছিলেন।
সে সময় বাংলার সালতানাতের রাজধানী ছিল গৌড়—যার আরেক নাম ছিল লাখনৌতি। তৎকালীন মানদণ্ডে এটি ছিল একটি বিশাল নগর। ষোড়শ শতকের প্রথম দশকে গৌড় সফরকারী ইতালীয় পর্যটক লুদোভিকো দি ভেরথামা বাংলার রাজধানীকে বসবাসের জন্য ‘পৃথিবীর সেরা স্থান’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই নগরের একটি ছোট অংশ বর্তমানে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে পড়েছে; বাকি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় অবস্থিত।

১৪৮৭ সালে হাবশি শাসন শুরু হওয়ার ঠিক আগে বাংলার শাসক ছিলেন সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ। তিনি ছিলেন বাংলার শেষ ইলিয়াস শাহী শাসক এবং ১৪৮১ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন।
ফিরিশতার বর্ণনা অনুযায়ী, একদিন খাওয়াজাসারা নামে এক হাবশি—‘প্রাসাদের একজন খোজা’—রাজাকে হত্যা করেন। এরপর তিনি নিজেকে বাংলার সালতানাতের নতুন শাসক হিসেবে ঘোষণা করে সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ নাম গ্রহণ করেন। এই খোজা সুলতান ক্ষমতা সুসংহত করার জন্য প্রাসাদের সব খোজা এবং ‘নিম্নপদস্থ ও হতভাগ্য ভাগ্যের অধিকারী’ লোকদের একত্র করতে শুরু করেন। কিন্তু ‘রাষ্ট্রের প্রধান কর্মকর্তা ও অভিজাতরা... একত্রে সিদ্ধান্ত নেন’ যে এই ক্ষমতা দখলকারীকে সিংহাসনচ্যুত করতে হবে।

সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ যে সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পেরেছিলেন, তার পেছনে অবশ্যই আগে থেকে ষড়যন্ত্র এবং দরবারের অসন্তুষ্ট অভিজাত ও কর্মকর্তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন ছিল। সুলতানকে হত্যা করা যদি আকস্মিক উত্তেজনার মুহূর্তে সংঘটিত কোনো ঘটনা না হয়ে থাকে, তাহলে যিনি সুলতানকে হত্যা করেছিলেন, সেই খোজা অবশ্যই দরবারের ভেতর থেকে উল্লেখযোগ্য সমর্থন না পেলে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পেতেন না।
সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ (১৪৮৭)
এরপর শুরু হয় সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ এবং হাবশি সেনাপতি মালিক আন্দিলের মধ্যে সংঘাত। মালিক আন্দিল ছিলেন নিহত সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের বিশ্বস্ত অনুচর। হত্যাকাণ্ডের সময় মালিক আন্দিল রাজধানীর বাইরে কোনো সীমান্ত অঞ্চলে ছিলেন। সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের হত্যার খবর জানতে পেরে তিনি ‘ক্ষমতা দখলকারী’কে শাস্তি দিতে এবং তাঁর প্রভুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চাইলেন।
মালিক আন্দিল তাঁর বিরুদ্ধে কী পরিকল্পনা করছেন, তা নিয়ে ভীত হয়ে সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ তাঁকে রাজধানীতে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। ফিরিশতার মতে, উদ্দেশ্য ছিল ‘তাঁকে গ্রেপ্তার করে হত্যা করা’। গোলাম হুসাইন সালিম কিছুটা ভিন্নভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, যদিও তাঁর বক্তব্য ফিরিশতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। তাঁর মতে, মালিক আন্দিলকে রাজধানীতে ডাকা হয়েছিল ‘ফাঁদ পেতে তাঁকে বন্দি করার জন্য’। উভয় সূত্রই জানায়, মালিক আন্দিল সুলতান শাহজাদা বরবক শাহের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাঁর পরিকল্পনা ব্যর্থ করার জন্য আগেই ব্যবস্থা নেন।

উৎসগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, মালিক আন্দিল বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রাজধানীতে প্রবেশ করেন। মালিক আন্দিলের শক্তি ও সমর্থন দেখে সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ তাঁকে আটক ও হত্যার পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকেন। বরং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে তিনি আন্দিল মালিককে প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। এরপর কোরআনের ওপর হাত রেখে তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিতে বলেন—এক বর্ণনা অনুযায়ী, যেন তিনি কখনো তাঁকে আঘাত না করেন; অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে, যেন তাঁকে হত্যা না করেন।

মালিক আন্দিল এর জবাবে বলেন, যতদিন সুলতান শাহজাদা বরবক শাহ সিংহাসনে থাকবেন, ততদিন তিনি তাঁর কোনো ক্ষতি করবেন না। ফিরিশতা ও গোলামের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মালিক আন্দিল কখনোই সুলতানকে হত্যা করবেন না—এমন প্রতিশ্রুতি দেননি। কারণ তিনি সুলতানকে বাংলার অবৈধ শাসক বলে মনে করতেন। তিনি কেবল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি সিংহাসনে থাকা অবস্থায় তাঁকে হত্যা করবেন না।

ফিরিশতা স্পষ্ট করে বলেছেন, মালিক আন্দিলের প্রতিশ্রুতিটি ছিল নির্দিষ্ট। তিনি সুলতান শাহজাদা বরবক শাহকে বলেছিলেন, তিনি সিংহাসনে আরোহণ করার পর যতক্ষণ পর্যন্ত ‘সেই আসন পূর্ণ করবেন’, অর্থাৎ সিংহাসনে বসে থাকবেন, ততক্ষণ তিনি তাঁর ওপর হাত তুলবেন না।
যদিও মালিক আন্দিল কোরআনের ওপর শপথ করে সুলতান শাহজাদা বরবক শাহের কোনো ক্ষতি করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবু তিনি তাঁর প্রাক্তন প্রভু সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা চালিয়ে যান। বলা হয়, তাঁর এই প্রচেষ্টা সুলতান শাহজাদা বরবক শাহের ব্যক্তিগত প্রহরীদের কয়েকজনের আস্থা ও সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছিল।

ফলে এক সন্ধ্যায় গোপনে মালিক আন্দিলকে প্রাসাদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। এরপর তিনি ‘খোজা সুলতানকে হত্যা করার জন্য হারেমে প্রবেশ করেন’।
গোলামের মতে, তিনি যখন দেখলেন সুলতান অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে সিংহাসনে ঘুমিয়ে আছেন, তখন কোরআন হাতে দেওয়া শপথের কথা মনে পড়ায় মালিক আন্দিল দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তিনি শপথ করেছিলেন যে, সিংহাসনে বসে থাকা অবস্থায় সুলতানের কোনো ক্ষতি করবেন না।

কিন্তু এক ঘটনা আরেক ঘটনার দিকে গড়াতে থাকে এবং সেই রাতেই অতি অল্প সময়ের মধ্যে আন্দিল মালিকের হাতে সুলতান শাহজাদা বরবক শাহের জীবনাবসান ঘটে। খোজা সুলতান মাত্র কয়েক মাস শাসন করেছিলেন।
প্রথমদিকে সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের বিধবা রানি—যিনি ছিলেন রাজমাতা—তাঁকে নতুন সুলতান হওয়ার অনুরোধ জানালে আন্দিল মালিক তা গ্রহণ করতে দ্বিধা করেন। পরে দরবারের অভিজাতদের সর্বসম্মত সভা তাঁকেই এই পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে সমর্থন করলে তিনি মত পরিবর্তন করেন।
তিনি সিংহাসনে সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ উপাধি গ্রহণ করেন।
সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ (১৪৮৭–৯০)
সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ প্রায় তিন বছর শাসন করেন। তিনি একই সঙ্গে প্রশংসিত ও ভীতিপ্রদ ছিলেন। তাঁকে একজন ভালো শাসক হিসেবে মনে করা হতো, যিনি সালতানাতে ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি বহু জনকল্যাণমূলক কাজ করেছিলেন এবং দরিদ্রদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
যদিও ফিরিশতা ও গোলাম কেউই তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেননি, তবে গোলাম উল্লেখ করেছেন যে, ‘গৌড় নগরে একটি মসজিদ, একটি মিনার এবং একটি জলাধার তিনি নির্মাণ করেছিলেন।’
বিশেষ করে দরিদ্রদের সহায়তায় সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহের বিপুল সরকারি ব্যয় দরবারের অনেক কর্মকর্তা ও অভিজাতকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। গোলাম এ বিষয়ে একটি উদাহরণ দিয়েছেন।

একবার সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ তাঁর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন দরিদ্রদের মধ্যে এক লাখ রুপি বিতরণ করতে। নতুন শাসকের ‘অপব্যয়িতা’ কর্মকর্তাদের অপছন্দ ছিল। তারা পরস্পর বলাবলি করত:
‘এই আবিসিনীয় ব্যক্তি তাঁর হাতে বিনা পরিশ্রমে এসে পড়া অর্থের মূল্য বোঝেন না। আমাদের এমন একটি উপায় বের করতে হবে, যাতে তাঁকে অর্থের মূল্য শেখানো যায় এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় ও বিলাসিতা থেকে তাঁর হাত বিরত রাখা যায়।’

তারা এক লাখ রুপি এমন একটি স্থানে সাজিয়ে রাখল, যাতে রাজা নিজ চোখে দেখতে পারেন এক লাখ রুপি দেখতে কেমন এবং অর্থের মূল্য উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু রাজা টাকা দেখে বললেন:
‘এত অল্প পরিমাণে কীভাবে হবে? এর সঙ্গে আরও এক লাখ যোগ করো।’
গোলামের মতে, তিন বছর শাসনের পর তিনি মারা যান। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিবরণ অনুযায়ী, প্রাসাদের পাইকরা তাঁকে হত্যা করেছিল। তবে সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহের শাসনামলের মুদ্রা ও শিলালিপি বিশ্লেষণ করে সৈয়দ এজাজ হুসাইন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তিনি ১৪৮৮ থেকে ১৪৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন বছর শাসন করেছিলেন।
ফিরুজ মিনার
গৌড়ের ফিরুজ মিনারকে সাধারণত গোলামের উল্লেখ করা ‘মিনার’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, দিল্লির কুতুব মিনারের মতো ফিরুজ মিনারও যুদ্ধজয়ের প্রতীক হিসেবে নির্মিত হয়েছিল।
কিন্তু সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহের কোনো যুদ্ধ বা বিজয়ের কথা ফিরিশতা, গোলাম কিংবা অন্য কোনো ঐতিহাসিক সূত্রে লিপিবদ্ধ নেই।
আরেকটি বিষয়ও লক্ষ করার মতো। কিছু সূত্রে বলা হয়েছে, ফিরুজ মিনারের নির্মাণকাজ ১৪৮৫ সালে শুরু হয়েছিল—অর্থাৎ এই সুলতান সিংহাসনে বসার প্রায় দুই বছর আগে।
যদি সত্যিই ফিরুজ মিনারের নির্মাণ ১৪৮৫ সালে শুরু হয়ে থাকে, তাহলে এর নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ।
সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৯০–৯১)
১৪৯০ সালে সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ নিহত হলে—অথবা স্বাভাবিক মৃত্যু হলে—একটি শিশু নতুন সুলতান হয়। তিনি সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহ নামে পরিচিত হন।
ফিরিশতার মতে, শেষ ইলিয়াস শাহী সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ ছিলেন তাঁর পিতা। অন্যদিকে গোলাম বলেছেন, ‘ফিরুজ শাহ যখন অস্তিত্বহীনতার গোপন গৃহে চলে গেলেন, তখন অভিজাত ও মন্ত্রীরা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মাহমুদকে সিংহাসনে বসান।’
তবে ‘সম্প্রতি আবিষ্কৃত মুদ্রা’ বিশ্লেষণ করে সৈয়দ এজাজ হুসাইন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহ ছিলেন সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহের পুত্র। তিনি তাঁর সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে মুদ্রায় ব্যবহৃত শব্দাবলি তুলে ধরেছেন। সেখানে সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহকে বলা হয়েছে:
‘কুতব-উদ-দুনিয়া ওয়াদ্দিন আবুল মুজাহিদ মাহমুদ শাহ আল-সুলতান ইবন ফিরুজ শাহ আল-সুলতান’—অর্থাৎ ‘পৃথিবী ও ধর্মের ধ্রুবতারা, বিজয়ী যোদ্ধার পিতা, রাজা মাহমুদ শাহ, রাজা ফিরুজ শাহের পুত্র।’

কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ তাঁর প্রভু সুলতান জালালউদ্দিন ফতেহ শাহের শিশুপুত্রকে নিজের সন্তানের মতো লালন করেছিলেন এবং এমনকি তাঁকে দত্তকও নিয়ে থাকতে পারেন। যদি তা হয়ে থাকে, তাহলে সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহকে সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহের পুত্র হিসেবে উল্লেখ করায় কোনো সমস্যা থাকে না।
সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহ যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন তিনি ছিলেন অতি অল্পবয়স্ক। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা ছিল না। প্রধানমন্ত্রী হাবশ খান তাঁর অভিভাবক বা রিজেন্ট এবং কার্যত সুলতান হিসেবে কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহের হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন।
সম্ভবত হাবশ খানই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, নতুন সুলতানের নামে জারি করা মুদ্রায় সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহকে মাহমুদ শাহের পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হবে।

নতুন সুলতান অল্পবয়স্ক হওয়ায় সালতানাতের প্রশাসন পরিচালনায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা ছিল না। বিশ্বের অন্যান্য অনেক স্থানের মতো, কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু উত্তরাধিকারসূত্রে সিংহাসনে বসলে সাধারণত একজন রিজেন্ট নির্বাচিত বা নিযুক্ত হতেন, যিনি শিশুটির প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত অভিজাত ও কর্মকর্তাদের একটি পরিষদের সহায়তায় সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।
সুলতান কুতুবউদ্দিন মাহমুদ শাহের পিতা জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ হোন কিংবা সাইফউদ্দিন ফিরুজ শাহ—সরকার পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত রিজেন্ট ছিলেন হাবশ খান।

হাবশ খানের ‘প্রভাব সরকারের সব কর্মকাণ্ডে এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, শুধু নামমাত্র উপাধি ছাড়া মাহমুদ শাহের হাতে সার্বভৌমত্বের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।’
কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই আরেক আবিসিনীয়, সিদি বদর দিওয়ানা, তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাকেও একজন দাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সিদি বদর তাঁকে হত্যা করেন। এরপর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি প্রাসাদের পাইকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুলতান মাহমুদ শাহকে হত্যা করেন এবং নিজেই সিংহাসনে বসে সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ নাম গ্রহণ করেন।
সৈয়দ এজাজ হুসাইনের সংশ্লিষ্ট মুদ্রার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সুলতান মাহমুদ শাহের শাসনকাল ছিল মাত্র কয়েক মাস।
সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ (১৪৯১–৯৪)
সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ—যাঁকে একজন দাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—ইতিহাসে অত্যন্ত নেতিবাচক ভাবমূর্তি রেখে গেছেন। তাঁকে রক্তপিপাসু, স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন, নিষ্ঠুর এবং অবিবেচক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
গোলাম বলেছেন, তিনি ‘নগরের বহু জ্ঞানী, ধর্মপ্রাণ ও অভিজাত ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন এবং বাংলার শাসকদের বিরোধিতা করা অবিশ্বাসী রাজাদেরও হত্যা করেছিলেন।’

তাঁর অন্যান্য অবিবেচক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ছিল সৈন্যদের বেতন কমিয়ে কোষাগারে অর্থ সঞ্চয় করা। এ অর্থ সংগ্রহের জন্য তিনি ‘রাজস্ব আদায়ে অত্যাচার’ও চালিয়েছিলেন।
ফিরিশতা আরও বলেন, সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ যাদের হত্যা করেছিলেন, তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন, ‘যাদের নীতিবোধ তাদের গোঁড়া ধর্মীয় বিশ্বাসের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে পরিচালিত করেছিল।’

ফিরিশতা আরও উল্লেখ করেন যে, সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহের প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ হুসাইন শরিফ সুলতানকে তাঁর স্থায়ী সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশ ভেঙে দিতে উৎসাহিত করেছিলেন। এর ফলে সক্রিয় সৈন্যসংখ্যা এতটাই কমে যায় যে সেনাবাহিনীর অনেক প্রধানই তাঁদের পদ ছেড়ে দেন।
ফিরিশতার মতে, সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহকে অজনপ্রিয় ও ঘৃণিত করে তোলার যে কর্মকাণ্ডগুলো ঘটেছিল, তার পেছনে প্রধানমন্ত্রীই কলকাঠি নেড়েছিলেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সুলতানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য এসব করেছিলেন।
সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহের জনপ্রিয়তা ক্রমশ কমতে থাকে। একই সময়ে কয়েকজন অভিজাত, সেনাপ্রধান ও কর্মকর্তা তাঁর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীও সুলতানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে হাত মেলানোর সিদ্ধান্ত নেন।

গৌড়ের প্রাসাদে বিদ্রোহী দলের আক্রমণ অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে বিজয় এনে দেয়নি। বলা হয়, সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ পাঁচ হাজার আবিসিনীয় এবং ত্রিশ হাজার আফগান ও বাঙালি সৈন্য নিয়ে প্রাসাদের ভেতরে নিজেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
উভয় পক্ষই হাতে-হাতে যুদ্ধ, তলোয়ার এবং তীর ব্যবহারের মাধ্যমে লড়াই করেছিল। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধ প্রায় চার দিন স্থায়ী হয়েছিল; অন্য একটি বিবরণে বলা হয়েছে, তা চার মাস ধরে চলেছিল। কয়েক মাস ধরে চলা এই তীব্র সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বহু মানুষ নিহত হয়।

অবশেষে বিদ্রোহীরা অবরুদ্ধ প্রাসাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আক্রমণ চালিয়ে বিজয়ী হয়। সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ এবং তাঁর বহু আত্মীয় নিহত হন।
ফিরিশতার মতে, যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী প্রাসাদের পাইকদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হন। তারা তাঁকে আরও এগারোজনের সঙ্গে প্রাসাদে প্রবেশ করতে দেয়। এরপর তাঁরা সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহকে হত্যা করেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ হুসাইন শরিফ সিংহাসনে বসেন এবং নতুন সুলতান হন।
গোলামের মতে, মুজাফফর শাহ নিহত হওয়ার পরপরই অভিজাতদের একটি পরিষদ আহ্বান করা হয়। সেখানে অভিজাতরা সৈয়দ হুসাইন শরিফের সুলতান হওয়ার ইচ্ছাকে সমর্থন করেন, কারণ তিনি তাঁদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিয়েছিলেন।
সৈয়দ হুসাইন শরিফকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
‘আমরা যদি আপনাকে রাজা নির্বাচিত করি, তাহলে আপনি আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন?’
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন:
‘আমি তোমাদের সব ইচ্ছা পূরণ করব। নগরের মাটির ওপরে যা কিছু পাওয়া যাবে, তা সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের মধ্যে বণ্টন করে দেব; আর মাটির নিচে যা কিছু আছে, তা আমি নিজের জন্য রাখব।’
এই বক্তব্য অভিজাত ও সৈন্যদের নগর লুট করার অনুমতি দেওয়ারই সমতুল্য হয়ে দাঁড়ায়। আর সেই নগর ছিল গৌড়—যাকে গোলাম সম্পদের দিক থেকে কায়রোকেও ছাড়িয়ে যাওয়া একটি নগর হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১৪৯৪ সালে সিংহাসনে বসা নতুন সুলতান সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ নামে পরিচিত হন। তবে সিংহাসনে আরোহণের কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নগর লুটের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার নির্দেশ দেন।
কেউ কেউ তাঁর আদেশ অমান্য করলে তিনি প্রায় বারো হাজার লুটেরাকে হত্যা করেন। এর ফলে নগর লুণ্ঠনের অবসান ঘটে।

সৈয়দ এজাজ হুসাইন সংশ্লিষ্ট মুদ্রা ও শিলালিপি—নতুন আবিষ্কৃত মুদ্রা ও শিলালিপিসহ—বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সুলতান শামসউদ্দিন মুজাফফর শাহ দুই বছর কয়েক মাস শাসন করেছিলেন।
নতুন সুলতানকে আরব বংশোদ্ভূত বলে মনে করা হয়। তিনি হুসাইন শাহী রাজবংশ নামে একটি নতুন শাসক পরিবার প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাজবংশ প্রায় চল্লিশ বছর বাংলা শাসন করে এবং চারজন সুলতান এই রাজবংশের অধীনে সিংহাসনে বসেন।
শেষ পর্যন্ত ১৫৩৮ সালে আফগান শাসক শের শাহ শেষ হুসাইন শাহী শাসক সুলতান মাহমুদ শাহকে পরাজিত করলে এই রাজবংশের অবসান ঘটে।

*গবেষনা ও তথ্য: মুহাম্মদ আহমেদুল্লাহ, একজন গবেষক। তিনি লন্ডনের Brick Lane Circle-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
সম্পাদনা: অপু ইসলাম
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

Address

Mintu Road
Kulaura
1000

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Vintage Bangladesh posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share