12/03/2024
রোজা চলে এলো। বছর ঘুরে সে সময় এসে গেছে, যার প্রতীক্ষায় আমরা দিন গুণি। তবু এবার যেন খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করছিলাম। অসুস্থতার কারণে কোনো প্রস্তুতি নেয়া হয় নি। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে রমজান অন্যরকম। শ্বাস ফেলার ফুরসত নেই, বাড়তি ইবাদতের অবসর নেই, কীভাবে কী করব বুঝে ওঠার আগেই রোজা চলে এলো। রমজানের আগের দিন চার বাচ্চাকে নিয়ে ডেকোরেশন বানালাম। অল্পের ভেতর যতটুকু সম্ভব৷ বাচ্চারা রামাদান ল্যান্টার্ন বানিয়ে খুব খুশি। কাগজের বাতিগুলো দেয়ালে লাগানোর পর বাড়িটা ঝলমল করতে লাগল। ছোটদের চোখ থেকে রামাদান দেখার আনন্দই আলাদা। রোজা রাখবে বলে সবাই আবদার ধরল। আমরাও চাই ওরা রোজা রাখুক। সেহেরিতে উঠে হালকা খেল। ওদের পেট একটুতেই ভরে যায়। দিনে হিফজ ক্লাসে গেল দুই-এক ঘণ্টার জন্য। এরপর বাসায় ফিরেই ছোটগুলোর (পাঁচ বছর) মোচড়ামুচড়ি শুরু। এ সময় লাঞ্চ খেয়ে অভ্যস্ত। ক্ষুধায় কাবু ছোটো দুজন। বড় দুজন বেশ ভালোই খেলাধুলো চালিয়ে যাচ্ছে। কোনো কমপ্লেইন নাই। বিকাল হতে হতে উসমানের ধৈর্য্য শূন্যের কোঠায় পৌঁছাল। এক পর্যায়ে শুরু করল কান্না। ওদের বাবা বারবার বলছিল যেন ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিই। দশ মাসের আরেক পিচ্চিকে সামলে সেটাও করা যাচ্ছিল না। ভাবলাম খাইয়ে দিই। কিন্তু না, এত সোজা না৷ উসমান ক্ষুধায় কাঁদবে, তবু রোজা ভাঙবে না! ভাইবোনের সাথে ইফতার করবে! ইফতারির আগে কিছু খাবে না। খাবে না তো খাবেই না!
ওকে আলাদা আদর-যত্ন করে কোলে নিয়ে রাখলাম। আস্তে আস্তে শান্ত হল। হয়ত ক্ষুধার তেজ একটু কমেছে। পাশে বসে গল্প শোনাচ্ছি। গল্পের পাতায় মাছের ছবি দেখে বলে, মা, আমি আজকে মাছ খাব। আমি বলি, আচ্ছা বাবা। মনে মনে ভাবছি, হায়! খাবারের ছবিই সামনে পড়তে হল! চোখের সামনে থেকে সব খাবার সরিয়ে রেখেছি। দেখলেই খেতে চাচ্ছে। সাধতে গেলে আর খাবে না। ইফতারের সময় হয় নি যে!
এরপর আমার সাথে ইফতার বানাতে এলো। শরবতের চিনি গুলিয়ে বলে, একটু খাব? আমি হাসি। ও যদি মনের ভুলে খেয়ে নিত, তাহলে কিছু বলতাম না। ছোট বয়সে মনের ভুলে খেলে মনে করানোরও দরকার নেই, ওর এখন তেমন বয়স। কিন্তু তার চারপাশে ভাইবোন মনে করিয়ে দেয়, খেও না, খেও না, আমরা রোজা রেখেছি!
পিঁয়াজু ভাজি। একদিকে মরিচ ছাড়া, আরেকদিকে মরিচঅলা। বললাম, মরিচ ছাড়াগুলো তোমাদের জন্য। কখনো এসব খেতে চায় না, আজকে একটা হাতে নিয়ে আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে বলে, একটু টেইস্ট করে দেখি? আমি আবারও হাসি, মনে মনে বলি আহারে সোনা মানিক আমার, ইফতারের যে বেশি বাকি নেই! আমার হাসির অর্থ ও বুঝে নেয়। বলে, না, মা, এখন না! ইফতারে খাব। আজ বিস্কিট, ব্রেড, মাছ -- যা কিছুই দেখছে, সবই তাদের খেতে ইচ্ছা করছে। ইফতারের সময় এটা খেতে পারব, ওটা খেতে পারব? সবার সব ইচ্ছা শুনেই আমি 'ইয়েস' বলছি। জানি, ওরা ইফতারে তেমন কিছুই খেতে পারে না। তবে এখন ক্ষুধাপেটে মনে হচ্ছে অনেএএক খেতে পারব! পিঁয়াজু দেখিয়ে বললাম, ভালো লাগলে খেয়ো। আধো আধো বোলে বলে, ভালো লাগলে খাব, ভালো না লাগলেও খাব। আহারে!
আমাদের সন্তানেরা ইফতারে খেতে পারবে জেনেও মা হয়ে আমাদের খারাপ লাগে। ইশ, বাচ্চাটা ক্ষুধার কষ্টে কেমন করছে। যে বাচ্চাগুলো খেতে পাচ্ছে না, তাদের কেমন লাগছে? যে বাচ্চাটা খাবার না পেয়ে মারা যাচ্ছে, তার মা কীভাবে সহ্য করছে? যে বাচ্চাদের বাবা তাদের মুখের সামনে কিছুই এনে দিতে পারছে না, তার কেমন লাগছে? একজন মা হয়ে এই বাচ্চাদগুলির কষ্ট অনুভব করে কেঁপে উঠি বারবার। গা*জা আমাদেরকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। আমাদের নিয়ামত তাদের তুলনায় অফুরান। আর আমাদের তুলনায় তাদের সবর আর তাওয়াক্কুল আকাশসম। ওরা ওদের মজবুত ঈমানের গাঁথা লিখে চলেছে প্রতিদিন। এত বিপদ আপদ কষ্টের পরেও রামাদান এলে ওরা খুশি হয়। কেন? কারণ ওরা রামাদানের মহত্ত্ব জানে। ওরা ইসলামকে জীবনে ধারণ করেছে, বুকের রক্ত দিয়ে দ্বীনকে ভালোবেসেছে। তাই তো এই ভাঙা শহরেও খালি আকাশের নিচে অবুঝ বাচ্চাগুলো সাজিয়ে-গুজিয়ে রামাদানকে বরণ করে নিতে পারে।
রামাদান আমাদের জন্যেও এমন হোক। ইবাদতের মাস, দুয়া কবুলের মাস, আল্লাহর রহমত আর ক্ষমা পাবার মাস এই রামাদান। একসাথে এত নিয়ামত পেয়ে কোনো মুসলিম কীভাবে খুশি না হয়ে থাকতে পারে? আমরা যেন এই মাসের হক্ব আদায় করতে পারি। নিজেদের অফুরান ভোগ-উপভোগের ভেতর ডুবে থেকে মুসলিম উম্মতের কথা ভুলে না যাই। শুধু দুয়াতে না, কাজেকর্মে, কথায়-আলোচনায় ওদের কথা স্মরণ রাখি। আল্লাহ তা'আলা গা-জা-র ভাইবোনদের উপর রহম করুক। মুসলিম উম্মতকে বিজয় দান করুক। আর আমাদের দুর্বলতা-অক্ষমতা মাফ করে দিক। আমীন।
copyright Anika Tuba