29/04/2026
বাংলাদেশ পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করল। রূপপুর প্রকল্প কোনো এক সরকারের কৃতিত্ব না — এটা ৬৫ বছরের গল্প। শুরু হয়েছিল ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আমলে, যখন রূপপুরে জমি অধিগ্রহণ হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকার আবার উদ্যোগ নেয়। জিয়া-এরশাদ আমলে ফরাসি কোম্পানি দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। খালেদা জিয়া ১৯৯৫ সালে জাতীয় শক্তি নীতিতে এটা যোগ করেন, ২০০৫ সালে চীনের সাথে চুক্তি করেন। হাসিনার আমলে ২০১৫ সালে রাশিয়ার সাথে $১২.৬৫ বিলিয়নের মূল চুক্তি হয়, ২০১৭ সালে নির্মাণ শুরু। অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্প চালু রাখে। আর আজ তারেক রহমানের আমলে জ্বালানি লোড হলো। ১৯৬১-তে যদি জমি অধিগ্রহণ না হতো, ২০১৫-তে যদি চুক্তি না হতো, ২০২৬-এ আজ এই দিন আসত না। তাই কেউ যদি বলে "এটা আমাদের একার কৃতিত্ব" — সেটা মিথ্যা।
এখন আসি টাকার হিসাবে। প্রকল্পের মোট খরচ এখন প্রায় ১,৩৮,৬৮৬ কোটি টাকা। এর ১০% আমাদের ট্যাক্সের টাকা, বাকি ৯০% রাশিয়ার ঋণ — যা আগামী ২০ বছর ধরে আমাদের শোধ করতে হবে সুদসহ। মজার কথা, ভারতের একই Rosatom-এর তৈরি Kudankulam প্রকল্পে ইউনিট প্রতি খরচ ছিল $৩.২৫ বিলিয়ন। সেই হিসাবে রূপপুরের আসল খরচ হওয়ার কথা ছিল $৬-৮ বিলিয়ন। কিন্তু চুক্তি হয়েছে $১২.৬৫ বিলিয়নে। পার্থক্য $৫ বিলিয়ন — প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা। ACC, AFP, France 24, UK-র Rahman Ravelli-র তদন্ত বলছে এই টাকা শেখ হাসিনা, তাঁর ছেলে জয়, এবং বোনের মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক মিলে মালয়েশিয়ার অফশোর ব্যাংকের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ — যে কারণে টিউলিপকে UK-র Treasury Minister পদ থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এর সাথে ২০১৯-এর কুখ্যাত পিলো স্ক্যান্ডাল — বালিশ-চাদর-খাট সব inflated দামে কেনা। আর IPP কোম্পানিগুলোকে ২০০৯-২০২৩ পর্যন্ত capacity charge হিসেবে দেওয়া হয়েছে Tk ১,০৪,৯২৭ কোটি — বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও। এই সব টাকা কার ছিল? আপনার, আমার, এই দেশের প্রতিটি মানুষের।
এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। বর্তমান সরকার বলছে তারা ৫২,৩০০ কোটি টাকা বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধ করেছে। ভালো কথা। কিন্তু এই টাকা এসেছে কোথা থেকে? IMF থেকে নতুন ঋণ $১.৩ বিলিয়ন (১৫,৭৫০ কোটি টাকা), ADB থেকে $৫০০ মিলিয়ন (৬,০৫০ কোটি), আরো $৩ বিলিয়ন emergency loan-এর জন্য আবেদন চলছে World Bank ও AIIB-এর কাছে। শুধু মার্চ মাসেই Bangladesh Bank থেকে ২,০০,০০০ কোটি টাকা ছাপিয়ে নেওয়া হয়েছে। গত ৯ মাসে কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ধার নেওয়া হয়েছে ১,০৯,০০০ কোটি টাকা — যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ এখন $১১৩.৫১ বিলিয়ন, প্রায় ১৪ লক্ষ কোটি টাকা। প্রতিটি নাগরিকের মাথাপিছু ঋণ ৮২,০০০ টাকার বেশি। আপনার নবজাতক শিশুও এই ঋণের ভাগীদার, সে জন্মের সাথে সাথেই। সরকার বলছে এই টাকা "জনগণের কল্যাণে" — fuel subsidy, family card, cost-of-living relief। সত্যি কথা, এই কল্যাণের প্রতিটি টাকার বোঝা শেষ পর্যন্ত আমাদের ঘাড়েই পড়ছে। মুদ্রাস্ফীতি ৮.৭১% (দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ), মজুরির চেয়ে দাম বাড়ছে দ্রুত, খেলাপি ঋণ ৩৪.৬% (২৫ বছরে সর্বোচ্চ)। অর্থাৎ এক হাত দিয়ে বকেয়া শোধ, অন্য হাত দিয়ে কয়েক লক্ষ কোটি নতুন ঋণ। এটা কি কৃতিত্ব, নাকি এক ক্রেডিট কার্ডের বিল আরেক ক্রেডিট কার্ডে শোধ করা?
পরের বার যখন কেউ বলবে "এই সরকার এই করেছে, ওই সরকার ওটা করেছে" — শুধু একটা প্রশ্ন করুন: টাকাটা কার? শোধ করবে কে? উত্তর একটাই। টাকা জনগণের, কর জনগণের, ঋণ জনগণের, শোধও জনগণই করবে। রাজনীতিবিদরা আসে যায়, কৃতিত্বের নাটক চলে। কিন্তু ঋণ থেকে যায়, জনগণ থেকে যায়। আজ যারা ক্রেডিট নিচ্ছে, কাল তাদের সন্তানেরা বিদেশে নাগরিকত্ব নেবে। আমাদের সন্তানেরা এই দেশে থেকেই এই ঋণ শোধ করবে।
এটাই সত্য।