14/02/2026
জুলাই সনদের ভিত্তিতে সিনেট বা জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সফল হচ্ছে না- এই বিষয়টি ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সনদের এই ধারায় নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি জানিয়ে বিএনপি তখনই বলেছে, বর্তমান আর্থ সামাজিক বাস্তবতায় সংসদের উচ্চ কক্ষের কোন প্রয়োজনীয়তা নেই।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে প্রণীত বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চার মূলনীতি হলো- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। ড. ইউনূস ও আলী রিয়াজের ঐকমত্য কমিশন এই চার মূলনীতির মধ্যে শুধু গণতন্ত্র রেখে বাকি তিনটি মুছে দেয়ার প্রস্তাব করেছে। তারা দেশ পরিচালনার পাঁচটি মূলনীতি প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। সেগুলো হলো- সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ ও গণতন্ত্র। এই প্রসঙ্গেও বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। এছাড়া সংবিধান সংশোধন, একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদে না থাকা, কারো দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে না পারা, জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া, সনদ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে ন- এমন বেশ কিছু বিধান অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে বিএনপি।
এছাড়া ঐকমত্য কমিশনে বিএনপির সাবেক আলোচলা ছাড়াই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করেছেন ড. আলী রিয়াজ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই দফা শপথ অনুষ্ঠিত হবে। তার একটিতে সংসদের প্রতিনিধি হিসেবে এবং অন্যটিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। সংসদ প্রথম দিন থেকেই প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন, স্পিকার নির্বাচন, বাজেট প্রণয়নসহ নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করার পাশাপাশি সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে গণভোটের রায় অনুযায়ী কাজ করবে এই পরিষদ। পরবর্তী ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া শেষ করবেন তারা।
এ ব্যাপারেও আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে তাদের সাথে ঐকমত্য কমিশনের কোনো আলোচনাই হয়নি। হঠাৎ করে এই পরিষদ গঠনের যে প্রস্তাব দেওয়া হলো সেটা কারা দিল, কীভাবে দিল, সুপারিশে কীভাবে এলো- এই প্রশ্নও তোলেন বিএনপির এই কেন্দ্রীয় নেতা।
অন্যদিকে, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গণভোট কোনো সাংবিধানিক আইনসিদ্ধ ব্যাপার নয়। তাই গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতেই হবে এমন আইনি বাধ্যবাধকতা বিএনপির ওপর নেই।
আর নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পরে বিএনপি বলেছে, জুলাই সনদের বিষয়টি তারা জাতীয় সংসদের হাতে ছেড়ে দেবে।
এরই মধ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কমিশনের সহ সভাপতি মার্কিন নাগরিক ড. আলী রিয়াজ বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পুরনো পেশা শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন। হয়ত জুলাই সনদের ফাইলটির তিনি সাথে করে নিয়ে যাবেন। নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও। মাঝখান থেকে সংস্কার আর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খরচের নামে, আপ্যায়নের নামে আর এই সনদকে বৈধতা দেয়ার জন্য জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একটা অসাংবিধানিক এবং অপ্রয়োজনীয় গণভোটের লেজ জুড়ে দেয়ার নামে, হ্যাঁ ভোটের প্রচারণার নামে এই গরীব দেশের যে শত শত কোটি টাকা নষ্ট হলো, তার দায় কে নেবে?
বাহাত্তরের মুজিববাদী সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেয়া, নতুন সংবিধান প্রণয়ন, সংবিধান বাদ দিয়ে দেশের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, পুরনো সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মুছে ফেলা- গত দেড় বছরে বহু ষড়যন্ত্র আমরা দেখেছি এই সংবিধান নিয়ে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, সেই সংবিধান অনুসারেই শপথ নিয়েছিলেন ড. মুহম্মদ ইউনূস, সেই সংবিধান অনুসারেই অনুষ্ঠিত হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, সেই সংবিধান মেনেই বিএনপি বা তারেক রহমানের নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে ড. ইউনূস সরকারকে।
নতুন সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশা- একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সংবিধান থাকুক রাষ্ট্রের মাথার ওপরে, আইন হোক সবার জন্য সমান আর প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ- সংবিধানের এই ঘোষণাটি প্রতিফলিত হোক রাজনীতি, সংসদ, সরকার, বিচার ব্যবস্থা এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে।