28/04/2026
Art of facist 🤍
রূপপুরের পরমাণু শিখা: শেখ হাসিনার অক্ষয় কীর্তি ও সার্বভৌমত্বের নবদিগন্ত
বাঙালি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু সন্ধিক্ষণ আসে যখন একজন দূরদর্শী নেতার অটল সংকল্প পুরো দেশের ভাগ্যরেখাকে আমূল বদলে দেয়। আজ ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই অনন্য দিন হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করল বিশ্বের অভিজাত পারমাণবিক ক্লাবে। মার্কিন ডিপ স্টেটের কালার রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তন ঘটিয়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রায় দুই বছর সময় হতে চললেও তাঁর সরকারের সুদূরপ্রসারী উন্নয়নের ভিত্তি যে কতটা শক্তিশালী ছিল তা আজ প্রমাণিত। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও জননেত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের যে বিশাল মহীরুহ রোপণ করেছিলেন তার সুমিষ্ট ফল আজ জাতি পরম কৃতজ্ঞতায় ভোগ করতে শুরু করেছে। এই অর্জন কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন নয় বরং এটি একটি তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘোচানো জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমাদের নির্মোহভাবে স্বীকার করতে হবে যে গত দেড় দশকে শেখ হাসিনা উন্নয়নের যে মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তা আগামী ৫০ বছরেও অন্য কারও পক্ষে ছোঁয়া সম্ভব কিনা তা নিয়ে আজ জনমনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। কাজ কথা বলে এবং সময় তার শ্রেষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে আজ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে নেতৃত্বের দৃঢ়তা থাকলে একটি ভূখণ্ডকে কীভাবে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যায়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই যাত্রা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর থেকেই দেশি বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিছানো হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি থেকে শুরু করে একদল সুশীল সমাজ ও স্বঘোষিত পরিবেশবাদীরা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছিল। তারা পারমাণবিক ঝুঁকির ধুয়া তুলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু শেখ হাসিনা ছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। তিনি জানতেন যে একটি আধুনিক ও শিল্পোন্নত বাংলাদেশ গড়তে হলে জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। ২০১২ সালে পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন পাস এবং ২০১৩ সালে রাশিয়ার সাথে ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে দেশের স্বার্থে তিনি কতটা আপসহীন হতে পারেন। তাঁর সেই সময়ে নেওয়া যুগান্তকারী সিদ্ধান্তগুলো আজ আমাদের বিদ্যুৎ আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে রপ্তানি সক্ষমতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে যখন দুটি ইউনিট পূর্ণ মাত্রায় চালু হবে তখন জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যা আমাদের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। মূলত এই কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হলে তা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে আসবে।
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায় এক ভয়াবহ বৈপরীত্য। ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন রেজিমের মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যে কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে তা আজ আমাদের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে ক্ষমতার শেষ মুহূর্তে আমেরিকার সাথে ইউনূস যে গোপনীয় বাণিজ্য চুক্তি বা গোলামির চুক্তি সম্পাদন করেছেন তার খেসারত দিতে হবে আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশকে। এই চুক্তির ফলে আজ আমাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। বর্তমান তারেক রহমানের সরকারও সেই অদৃশ্য শিকল বা গোলামির চুক্তির জালে এমনভাবে বন্দি যে তাদের সাহস হচ্ছে না সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করার। আজ বাংলাদেশ এমনই এক করুণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেখানে সামান্য জ্বালানি তেল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্যও বিদেশের অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়। শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তিনি পরাশক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে চোখে চোখ রেখে কথা বলতেন। ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটময় সময়েও তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে প্রয়োজনে রাশিয়ার মুদ্রা রুবেলে তেল কেনা হবে। এটিই ছিল একজন সফল ও সাহসী রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় যা আজ বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে পুরোপুরি অনুপস্থিত।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি সক্ষমতা কিংবা আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে যারা আজ কূটতর্কে লিপ্ত তারা মূলত বাংলাদেশের অস্তিত্বের শত্রু। একদল জ্ঞানপাপী সুকৌশলে ভারতের কুডানকুলাম প্রকল্পের সাথে রূপপুরের একটি ভিত্তিহীন ও হাস্যকর তুলনা টেনে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টায় মত্ত। অথচ ন্যূনতম পড়াশোনা থাকা মানুষের জানা উচিত যে কুডানকুলামে ব্যবহৃত হয়েছিল সত্তরের দশকের সেকেলে প্রযুক্তির ভিভিইআর ১০০০ রিয়েক্টর; পক্ষান্তরে রূপপুরে স্থাপিত হয়েছে রাশিয়ার বাইরে বিশ্বের সর্বাধুনিক জেনারেশন থ্রি প্লাস প্রযুক্তির ভিভিইআর ১২০০ রিয়েক্টর। এই অনন্য প্রযুক্তিতে যুক্ত করা হয়েছে প্যাসিভ হিট রিমুভাল সিস্টেম এবং কোর ক্যাচারের মতো নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় যা একে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ পারমাণবিক দুর্গে পরিণত করেছে। এমনকি তুরস্কের বিশাল বাজেটের আক্কুয়ু পারমাণবিক প্রকল্পের সাথে তুলনা করলেও দেখা যায় বাংলাদেশ তুরস্কের আগেই এই সক্ষমতা অর্জনে সফল হয়েছে। তুরস্ক যেখানে চারটি ইউনিটের জন্য প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে সেখানে বাংলাদেশ দুটি ইউনিটের জন্য মাত্র ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করছে যা গাণিতিকভাবে অত্যন্ত সরল স্বচ্ছ ও যৌক্তিক। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দুর্নীতির প্রতিটি ছিদ্র বন্ধ করে দিয়ে জনগণের আমানত রক্ষা করেছিলেন বলেই আজ আমরা এই ঐতিহাসিক অর্জনের সুফল ভোগ করতে পারছি।
উন্নয়ন কোনো অলীক কল্পনা নয় বরং এক প্রদীপ্ত বাস্তবতা যা অস্বীকার করার ধৃষ্টতা কারও নেই। শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে মুজিব শতবর্ষেই ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার যে অনন্য রেকর্ড বাংলাদেশ গড়েছে তা বিশ্ববাসীর নিকট এক বিস্ময়কর উপাখ্যান। মেট্রোরেল পদ্মা সেতু কিংবা কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য কেবল কাড়ি কাড়ি টাকার প্রয়োজন হয় না বরং প্রয়োজন হয় হিমালয়সম ইচ্ছাশক্তি আর শেখ হাসিনার মতো ইস্পাতকঠিন নেতৃত্বের। তাঁর ব্যক্তিত্বে ছিল সেই পাহাড়সম দৃঢ়তা যার ফলেই বিশ্বব্যাংকের রক্তচক্ষু ও সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের জাল ছিঁড়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। আজ যখন সাধারণ মানুষকে মাত্র কয়েক লিটার জ্বালানি তেলের জন্য মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইনে অন্তহীন প্রতীক্ষা ও অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা সইতে হয় তখন তারা মর্মে মরমে উপলব্ধি করছেন যে টাকা থাকলেই সবকিছু হয় না। আজ আপনার পকেটে টাকা থাকার পরেও আপনি তেল পাচ্ছেন না কারণ যোগ্য নেতৃত্বের অভাব। টাকা আগেও জনগণের ছিল মানুষ আগেও ট্যাক্স দিত কিন্তু যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে দেশ ছিল স্থবির। শেখ হাসিনার সেই কালজয়ী ও সাহসী পদক্ষেপগুলো না থাকলে আজ আমাদেরও হয়তো উগান্ডার মতো মানবেতর জীবন কাটাতে হতো অথবা ফ্যামিলি কার্ড আর জান্নাতের টিকিট পাওয়ার মতো সস্তা ও হাস্যকর প্রলোভনের আশায় ধুঁকতে হতো।
বাংলাদেশের অকৃত্রিম ও ঐতিহাসিক বন্ধু রাশিয়ার সাথে সম্পর্কের যে নতুন দিগন্ত শেখ হাসিনা উন্মোচন করেছিলেন তা মূলত তাঁর এক অনন্য ও কালজয়ী কূটনৈতিক বিচক্ষণতার স্মারক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার সেই অবিস্মরণীয় অবদানের ঋণকে সম্মান জানিয়েই তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো এক সাহসী ও যুগান্তকারী প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন যা দুই দেশের বন্ধুত্বকে এক হিমালয়সম উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের দিশাহীন ও মেরুদণ্ডহীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে সেই সুদৃঢ় বন্ধন আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়েছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই যে রাশিয়ার কারিগরি ও কৌশলগত সহায়তা ছাড়া এই পারমাণবিক কেন্দ্র পরিচালনা কিংবা ইউরেনিয়াম জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অবাস্তব কল্পনা মাত্র। তারেক রহমানের সরকারের রাজনৈতিক ভীরুতা এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আজ যখন ন্যূনতম জ্বালানি তেল ক্রয়ের জন্যও বিদেশের দ্বারে দ্বারে অনুমতি প্রার্থনা করতে হয় তখন এই পারমাণবিক অর্জনের ভবিষ্যৎ বর্তমান নেতৃত্বের অযোগ্যতায় ধূলিসাৎ হতে পারে বলে দেশপ্রেমিক জনগণ মনেপ্রাণে শঙ্কা বোধ করছে। শেখ হাসিনা বিশ্বকে দেখিয়েছিলেন যে পরাশক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর নামই প্রকৃত স্বাধীনতা; আর আজ আমরা দেখছি কেবল বিদেশি শক্তির অনুকম্পা পাওয়ার এক করুণ ও লাঞ্ছিত প্রতিযোগিতা।
পরিশেষে বলা যায় যে মার্কিন ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্রে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিটি ইট পাথর আজ সগৌরবে কথা বলছে। রূপপুর কেবল একটি স্থাপনা নয় এটি বদলে যাওয়া বাংলাদেশের এক অবিনাশী প্রতিচ্ছবি যা আমাদের পারমাণবিক শক্তির এক নতুন ও অনন্য যুগে অভিষিক্ত করেছে। অবকাঠামো নির্মাণ ও জটিল কারিগরি সক্ষমতা অর্জনের পর আজ মঙ্গলবার প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ললাটে যে দীপ্যমান জয়তিলক আঁকা হলো তা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান থাকবে। উন্নয়নকে অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই কারণ সত্য সবসময় সূর্যের মতো প্রদীপ্ত। শেখ হাসিনা দেশের জন্য যা করেছেন তা আজ জাতির অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বর্তমান নেতৃত্বের কার্পণ্য থাকতে পারে কিন্তু সময় তার অমোঘ বিচার নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশপ্রেমিক আপামর জনগণের আজ একটাই সুতীব্র প্রত্যাশা কোনো গোপন সন্ধি কিংবা দাসত্বের চুক্তির বিনিময়ে যেন আমাদের এই রক্তে কেনা সার্বভৌমত্বকে ন্যূনতম বিকিয়ে দেওয়া না হয়। জয়তু শেখ হাসিনা অবিনাশী হোক আমাদের স্বপ্নের পারমাণবিক বাংলাদেশ। কর্মই প্রকৃত পরিচয় এবং সময়ের নিষ্ঠুর সত্যই আজ প্রমাণ করে দিচ্ছে যে কে ছিলেন এ দেশের মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম ত্রাণকর্তা আর কারা ছিলেন ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ী মোহে আচ্ছন্ন ষড়যন্ত্রকারী। রূপপুরের এই ঐতিহাসিক বিজয় আমাদের প্রতিটি জাতীয় সংকটে বুক চিতিয়ে লড়াই করার এবং যাবতীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে মাথা উঁচু করে সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ার এক অবিনাশী প্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক ::ইমন ইবনে সামরাজ
সাবেক ছাত্রনেতা,