17/03/2022
বুক রিভিউ
বইয়ের নামঃ হাটি হাটি পা পা
লেখকঃ ফিরোজা বহ্নি
প্রকাশনীঃ আদর্শ
প্রকাশকালঃ ৬ই এপ্রিল, ২০২১
মুদ্রিত মূল্যঃ ৩৮০/=
অনেকদিন পর এমন এক বই পড়লাম যেটার মোহ থেকে গত ৩দিন যাবত বেরোতেই পারছি না। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল মাত্র এক বছর আগে প্রকাশিত এত অসাধারণ একটা বইয়ের খোজ আমি এতদিনে পেলাম! টানা ৫ঘন্টা বইটা পড়ে এক বসাতেই শেষ করে ফেলেছিলাম। আর মনে হচ্ছিলো যেন গোগ্রাসে গিলছি বইটি। কিন্তু এরপর তো আর এই বইয়ের আবেশ থেকে বেরোনোই যাচ্ছে না।
একটা শিশুর ভালোভাবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের অবদান যে কতখানি সেটা হয়তো সবাই জানে। কিন্তু কজন সেটা উপলব্ধি করে বাচ্চাকে সে অনুযায়ী গড়ে তুলতে জানে। বইটির লেখিকা ফিরোজা বহ্নি ও চমক হাসান তাদের মেয়েকে এত সুন্দর ভাবে গড়ে তুলছেন তার আসলে তুলনা চলে না। একটা মেয়ের মা হয়ে উঠা থেকে শুরু করে পরের জার্নি গুলো পার করা, বাচ্চার ঘুম, খাওয়া, পটি ট্রেনিং, কথা বলা শেখানো, বর্ণমালা শিখানো এই সব কিছু লেখিকা তার মেয়েকে একদম ভিন্ন ভাবে করেছেন।
আপনি শুনলে অবাক হবেন, আমরা কি করি? বাচ্চা ঘুমালে আলো নিভিয়ে, চারপাশ নিঃশব্দ করে তারপর ঘুমানোর একটা পরিবেশ করি, তাই তো? কিন্তু লেখিকা তার মেয়েকে এসবের কিছুই করেন নি। বরং তার মেয়ে যেনো যেকোন পরিস্থিতি তে নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারে সেই ব্যবস্থা করেছেন, আলো জালিয়ে রেখে, টুকটাক শব্দ করে! কি অদ্ভুত তাদের ভাবনা গুলো তাই না? আমরা এভাবে ভাবি ই না।
আরেকটা ব্যাপার যেটা মুগ্ধ করার মতো ছিলো সেটা হলো, আমরা কি দেখতে পাই, একটা বাচ্চা, মায়ের কিছু একটা পেয়ে বাবার কাছে নালিশ করে। বাবা তখন মাকে বকুনি দিয়ে বাচ্চাকে খুশি করে। কিন্তু ফিরোজা বহ্নি আর চমক হাসান এই কাজটা কখনো করেননি। তাদের মেয়ে বর্ণমালা যদি মায়ের কাছে এসে বলতো দেখো বাবা এই ভুল করেছে। লেখিকা তখন তার মেয়েকে বুঝিয়ে বলতেন, তার বাবা ইচ্ছে করে এমনটা করেনি, ভুল করে করেছে। আর করবে না। আবার বর্ণমালা যদি তার বাবার কাছে এসে নালিশ করতো মা তার সাথে খেলছে না তখন বাবা বুঝাতো যে মা তো কাজে ভীষণ ব্যস্ত আছেন, ফ্রি হলেই খেলবে তোমার সাথে। চলো ততক্ষণে আমি তোমার সাথে খেলি। আমি অবাক হয়ে গেলাম তাদের পরস্পর পরস্পরের কি পরিমাণ শ্রদ্ধাবোধ আর ভালোবাসা এবং সেটা তারা তাদের মেয়ের ভিতরেও তৈরি করে দিচ্ছেন একটু একটু করে।
একটা মেয়ে যখন মা হবে তখন চারপাশ থেকে নানান গুঞ্জন শুরু হতে থাকে। এটা করো, ওটা করলে তোমার বাচ্চা ফর্সা হবে। এটা খুব ই ব্যাড প্র্যাক্টিস। লেখিকা বইতে দেখিয়েছেন, বাচ্চা সাদা-কালো হওয়ার আগে সুস্থ হওয়াটা খুব বেশি জরুরী। আমিও সেটাই মনে করি।
আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয় ছিলো যেটা তারা কখনো নিজেদের মেয়ের সামনে ঝগড়া করতেন না। মেয়ে ঘুমিয়ে থাকলে হয়তো হালকা কথা কাটাকাটি হতো। কিন্তু জেগে গেলে আবার তারা আগের মতো হাসি-খুশি। নিজেদের হ্যাপি ফেইস সবসময় মেয়েকে দেখিয়েছেন যা তাদের মেয়েকে প্রাণবন্ত হতে সহায়তা করেছে।
আমাদের সমাজের অন্যতম প্রধান যে সমস্যা, বাচ্চারা ডিজিটাল ডিভাইস কিংবা বোকা বাক্সে আসক্তি হয়ে যাওয়া৷ ফিরোজা বহ্নি কি সুন্দর ভাবে তার মেয়ে বর্ণমালাকে সেসব থেকে দূরে রেখেছেন সেটা পড়ে একদম মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি আমি! কোন গান, কবিতা কিংবা ছড়া, অথবা বর্ণমালা শেখানো সবকিছুতেই মেয়েকে গল্পের মাধ্যমে শিখিয়েছেন।
আপনি যদি নতুন বাবা-মা হয়ে থাকেন তাহলে তো আপনার জন্যে এটি অবশ্যপাঠ্য আর না হয়ে থাকলেও এটি পড়তে আপনার এতটুকু বোরিং লাগবে না। এখানে কোন উপদেশ নেই কিংবা নেই কোন কাটখোট্টা পরামর্শ বরং নিজেদের জীবন থেকে নেয়া কিছু কাহিনীর সমন্বয় যা আপনাকে গতানুগতিক নিয়ম থেকে বের হয়ে একটু অন্যভাবে ভাবতে শিখাবে, মুগ্ধ করবে আপনাকে....
রিভিউটি লিখেছেন সুমাইয়া আহমেদ নুসরাত।
শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, জবি।