24/05/2026
কাজী নজরুল ইসলাম এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান.......!
বলা যেতে পারে দুজন দুই মেরুর মানুষ। শুধু কবির শেষ জন্মদিনে অর্থাৎ ১৯৭৬ সালের ২৪শে মে কবির বাড়িতে সামরিক প্রশাসক জেনারেল জিয়ার একটি সাক্ষাৎ দেওয়ার ছবিই সবার দৃশ্যপটে ভেসে উঠে। কবিকে জাতীয় কবির সম্মাননা জেনারেল জিয়াই দিয়েছিলেন, উনার প্রবর্তিত একুশে পদকের উদ্বোধনও করা হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে প্রদানের মাধ্যমে।
বিদ্রোহী কবির জন্ম মাসেই বিদায় নেন জেনারেল জিয়া। দুজনের মাঝে ব্যবধান ছিল কয়েক যুগের। এক সুতোয় গাঁথা খুবই মুশকিল। তারপরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে জিয়ার কর্মকান্ডে কবির একটা ছাপ পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয় কবির দেখা স্বপ্নগুলো পূরণের জন্যই এসেছিলেন বাংলার রাখাল রাজা।
পেশাগত জীবনে দুজনের সাদৃশ্য ছিল। যৌবনের শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মনে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে আগুন চাপা থাকলেও একজন খাঁটি সৈনিক হিসেবেই সেনাবাহিনীর সকল আইন কানুনের প্রতি সব সময়ই ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। সামান্য সৈনিক হতে কোয়ার্টার মাস্টার পেরিয়ে হাবিলদার পদে প্রমোশন পেতে তাই খুব বেশি সময় লাগেনি।
আর জেনারেল জিয়াউর রহমান তো আজীবনই উনার পোশাকের মর্যাদা এবং একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বকেই সর্বাগ্রে রেখেছেন।
যখন কবি যুদ্ধ শেষে ফিরে এলেন, তখন একদিন বন্ধুবর কমরেড মোজাফফর আহমেদ কথা প্রসঙ্গে কবির রাজনীতিতে আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন। কবির জবাবটা ছিল, 'যদি রাজনীতি নাই করি, তবে যুদ্ধে গেলাম কেন?'
ঠিকই তো, যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করে তারাই তো দেশ গড়ার ভূমিকায় অগ্রাধিকার রাখে।
কবি নজরুল ছিলেন একজন সফল রাজনীতিবিদ। ১৯২৬ এ কংগ্রেসের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে জামানত হারিয়েছিলেন এটা ঠিক, কিন্তু উনার কথা, কবিতা এবং গানগুলো দেশ, মাটি ও মানুষের মনকে ঠিকই ছুঁয়ে গিয়েছিল। বন্ধুর কাছে কম্যুনিজমের দীক্ষা নিলেও কংগ্রেসের মতাদর্শকেও বরণ করেছিলেন। হিন্দুদের জন্য গান লিখে হুজুরদের ফতোয়ায় কাফের উপাধি পেয়ে ভোটও বিসর্জন দিয়েছিলেন। কিন্তু ভোট না দিলেও উনার জনমানুষের জন্য চাওয়াগুলোর সাথে কেউ দ্বিমত করতে পারেনি। সব মিলিয়েই ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে এটাই ছিল সর্বোত্তম পন্থা। কবিতার মাধ্যমে দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশদের বন্দীশালাগুলোয়।
জেনারেল জিয়ার সামনেও ৭৫ এর নভেম্বরে এই প্রশ্নটি এসে দাঁড় হয়েছিল। "দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, তাহলে কি দেশের প্রয়োজনে রাজনীতি করবো না?" উনিও সেদিন কবির দেখানো পথেই হেঁটেছিলেন।
নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মানে। পূরণ করেছিলেন এমন কিছু স্বপ্ন যা কবি বহু যুগ আগে মানুষকে দেখিয়েছিলেন।
এতো গেল দর্শনের মিল, কিছু কাকতালীয় বৈপরীত্যও দেখা যায় দুজনের জীবন পথে। কবি যুদ্ধের জন্য করাচীর ক্যান্টনমেন্টে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন।,। মূলত সে সময়ই উনার সাহিত্য এবং দর্শনের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। যুদ্ধ শেষে কোলকাতায় ফিরে সাহিত্য এবং রাজনীতিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।
বিপরীতে জিয়াউর রহমান ছিলেন কোলকাতার হেয়ার স্কুলের ছাত্র, সেখানেই শৈশবটা বিকশিত হয়। পরে বাবার চাকুরীর জন্য পাড়ি জমান করাচীতে। সেখানেই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে।
দিনশেষে উনাদের ভিতরের ব্যক্তিত্ব এবং চাহিদাটা একই ছিল। তা হচ্ছে মানুষকে মুক্তির বার্তা, স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া। এজন্যই একজন কবিতায় মানুষকে স্বাধীন দেশের গল্প বলেছেন, আরেকজন রেডিও স্টেশনে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, 'আই মেজর জিয়া, ডু হেয়ারবাই ডিক্লেয়ার দ্যা ইন্ডিপেন্ডেন্স অব বাংলাদেশ'।
মানুষকে মুক্তির পথ দেখানো এই দুই মহান ব্যক্তিকে আল্লাহ পাক যেন জান্নাত নসীব করেন। আমিন