26/03/2026
আজ ২৬ মার্চ ২০২৬ ; আজ থেকে ৫৫ বছর আগের ২৫শে মার্চের রাতের কথা। আমি তখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র, আহসাউল্লাহ হলে আবাস। ১লা মার্চ ইয়াহিয়া খানের পার্লামেন্ট অধিবেশন স্থগিত করার দিন থেকেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। অধিকাংশ ছাত্র হল ছেড়ে চলে যায়। আমরা যারা ছাত্র/ গন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম কেবল তারাই থেকে গেলাম হলগুলোতে। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু ডামি রাইফেল জোগাড় করে নিয়েছি। বেংগল রেজিমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা এক সৈনিক, সুবেদার দেলোয়ার হোসেনের কাছথেকে প্রতি রাত্রে আহসানউল্লাহ হলের প্রাংগনে আলোআঁধারিতে অস্রচালনা প্রশিক্ষন নিচ্ছিলাম। সেদিনও যথারীতি প্রশিক্ষন শেষে রাতের খাওয়া সেরে বসেছিলাম জিমনেসিয়াম আর শেরেবাংলা হলের মাঝের খোলা যায়গায়। এমন সময় হাসানুল হক ইনু (সাবেক তথ্য মন্ত্রী) হন্তদন্ত হয়ে বাইরে থেকে কেম্পাসে ফিরে এসে আমাদের বললেন আমরা কেউ যেন হলে ঘুমাতে না যাই। পাকিস্তানি সৈন্যরা কেন্টনমেন্ট থেকে শহরের দিকে এগিয়ে আসছে, যে কোন সময় বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলোতে হামলা চালাতে পারে।
আমরা আর কেউই আর ঘুমাতে গেলামনা। রাত ঠিক তখন কত ঠিক স্মরন নেই। আমরা যেখানে বসেছিলাম তার একেবারে কাছে পলাশীর মোড়ে একটা ফায়ারব্রিগেড ষ্টেশন ছিল। হঠাৎ দেখলাম কয়েকটা মিলিটারী লরী এসে ফায়ার ষ্টেশানের সামনে থামল আর সাথে সাথে পাকসেনারা নেমে এসে ফায়ার ষ্টেশানে যারা ছিল তাদের সবাইকে বের করে এনে লাইন ধরিয়ে দাঁড় করাল। তারপর ব্রাসফায়ার করে আমাদের চোখের সামনে সবাইকে মেরে ফেলল।
আমরা একটু অন্ধকার মত যায়গায় থাকায় ওরা আমাদের দেখতে পায়নি। আমরা কালবিলম্ব নাকরে জিমনেসিয়ামের পাশের বাউন্ডারী ওয়াল টপকে টিচার্স কোয়ার্টার গুলোতে আশ্রয় নিলাম। সারা রাত পাক বাহিনী হলগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালাল। ভোরের আলো ফোটার পর ৪র্থ শ্রেনী কর্মচারীদের আবাসিক ভবনের উপর থেকে দেখলাম পাকীরা গোলাগুলি থামিয়ে লিয়াকত হলের সামনে দাঁড়িয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিচ্ছে আর কাছেই একটা অস্থায়ী প্রাথমিক স্কুলঘর তাদের লাগিয়ে দেয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া উপভোগ করছে।
আমারা এই সুযোগে ক্যাম্পাস ছেড়ে বের হয়ে পুরান ঢাকার ভিতর দিয়ে এসে নদী পার হয়ে জিন্জিরায় এসে আবার সমবেত হলাম। নেতৃবৃন্দের পরবর্তী নির্দেশের জন্য ২৬শে মার্চ সন্ধ্যায় হাজির হলাম জিন্জিরায় জনাব মোস্তফা মহসীন মন্টুর গ্রামের বাড়ীতে। পরদিন নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে নির্দেশ নিয়ে আসলেন নোয়খালির মোস্তাফিজ ভাই। আমাদের যার যার নিজেদের এলাকায় গিয়ে জনগনকে সংগঠিত করে পাকী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা চারজন, নোয়াখালির মোস্তফিজ ভাই, কুমিল্লার নিখিল(পরবর্তীতে বুয়েটের শিক্ষক এবং বোমা বিষ্ফোরনে নিহত), চট্টগ্রামের রেজাউল হক চৌধুরী মোস্তাক এবং আমি একসাথে জিন্ডিরা থেকে রওয়ানা হলাম যার যার এলাকার উদ্দেশ্যে।