09/12/2025
পুরানো ঢাকা ও হারিয়ে যাওয়া ‘কাউয়া রুটি’ সংস্কৃতি
পুরানো ঢাকার অলিতে-গলিতে একসময় ভোরবেলার এক বিশেষ দৃশ্য ছিল—এক টুকরো রুটি ছুড়ে দিলে শত শত কাক ঝাঁপিয়ে পড়ত। ছোটবেলা, প্রায় ২০০৫ সাল পর্যন্ত, স্কুলে যেতে যেতে আমি নিয়মিত এই দৃশ্য দেখতাম। তখনো শহরের সকাল ছিল খুব সাধারণ, খুব জীবন্ত। মুদি দোকান, হোটেল, রাস্তার পাশের রুটি বা চিতই পিঠার দোকান—সবই খোলা হত ভোরে। বিলাসী জীবনের মতো সকাল ৯টায় দোকান খোলার নিয়ম তখনো ঢাকায় আসেনি।
দোকানের মালিক বা কর্মচারীরা দিনের শুরুটা করতেন এক অদ্ভুত, কিন্তু মানবিক এক অভ্যাস দিয়ে। কোনো মুদি দোকান হলে তারা প্রথমেই টোস্ট বিস্কুট, মুড়ি-বিস্কুট বা সামান্য খাবার দোকানের সামনে ছুড়ে দিতেন কাক-চড়ুইয়ের জন্য। হোটেলে বানানো প্রথম পরোটা কিংবা নানরুটি, আর রাস্তায় তৈরি প্রথম রুটি বা চিতই পিঠা—এসব প্রায়ই হাতে তুলে দেওয়া হতো কোনো ‘ল্যাংটা কথা বলতে পারে না’ এমন বাচ্চাকে, বা ছুড়ে দেওয়া হতো কুকুর-বিড়াল-পাখির খাবার হিসেবে।
ঢাকা শহরে তখন কাকের অভাব ছিল না। “কাউয়া রুটি” ছিল তাই এক পরিচিত শব্দ। এক টুকরো রুটি মানেই শত কাকের ভিড়। আর অনেক দোকানির তো নিয়মই ছিল—সকালের প্রথম বিক্রি শুরু করার আগে কোনো বাচ্চাকে একটি চকলেট বা ৫০ পয়সার বিস্কুট দিয়ে দেওয়া।
এই প্রথা কারো ধর্মীয় অনুষঙ্গ থেকে আসেনি, সামাজিক রীতিও ছিল না—তবুও এটি ছিল পুরানো ঢাকার মানবিকতা, উদারতা ও দৈনন্দিন অভ্যাসের এক অংশ। ব্যবসায়ী, দোকানি—ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এটি করতেন।
আজ সেই দৃশ্যগুলো প্রায় হারিয়ে গেছে। হাতে গোনা কিছু মানুষ এখনো এই অভ্যাসটিকে টিকিয়ে রেখেছেন, কিন্তু নিয়মিত নয়। শহরের জীবনে এখন অভাব শুধু সময়েই নয়—মানবিকতারও। আগে রাতের বেলায় গার্মেন্টস কলোনিতে নষ্ট ভাত ফেলে দিলে বিড়াল-কুকুর সেটা খেত; এখন সেসবও দেখি না। ফলে আজ কুকুর-বিড়ালদের দেখা যায় ময়লার ব্যাগ ছিঁড়তে বা ঘরে ঢুকে খাবার চুরি করতে—কারণ তারা ক্ষুধার্ত।
আসলে আমরা যদি নিজের জায়গা থেকে ছোট ছোট কিছু মানবিক অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে পারি, সমাজটাকেও আবার সুন্দর করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু মানসিকতার সামান্য পরিবর্তন। হয়তো সেই কথাই নজরুল তাঁর নিজের ভাষায় বলতে চেয়েছিলেন—
“মনের পশু কারো জবাই—
বাঁচুক পশু, বাঁচুক সবাই।
© ©️
Mahabub Hasan
#কাউয়ারুটি