08/12/2024
‘অন্যভূবন’ মিসির আলি সিরিজের চতুর্থ বই; এই উপন্যাসেও মিসির আলি বাস্তব-যুক্তিবাদী মানুষ, এবং সম্পুর্ণভাবে পরাবাস্তবতার জগতে ঢুকে যান। যতক্ষণ পড়েছিলাম, ততক্ষণ বেশ ভাল লাগলেও উপন্যাস শেষে এক রাশ জিজ্ঞাসা, মাথার ভিতর উঁকি দিয়ে গেছে। যার জবাব বইয়ে নেই, এবং আর কখনই আমাদের জানা হবে না।
নয় বছরের মেয়ে তিন্নি, যে অন্যভূবনের মানুষ; মূলত মানুষ নয়, গাছ। সঙ্গত কারণেই সে অন্য সাধারণ বাচ্চা থেকে ভিন্ন। তাকে চিকিৎসা করতে গিয়ে মিসির আলিকে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হয়। মিসির আলি মনোবিজ্ঞানের বই বাদ দিয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান পড়া শুরু করেন।
মিসির আলি সিরিজের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় উপন্যাসের মত, এই উপন্যাসেও মিসির আলি সমস্যা সমাধানের জন্য অনেক পরিশ্রম করেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর বিশ্বাস, তাঁর বাস্তব ও বৈজ্ঞানিক যুক্তিকে ব্যর্থ করে দেয় পরাবাস্তবতা। তিনি সিরিজের প্রথম চারটি উপন্যাসের একটিতেও রহস্যের মীমাংসা করতে পারেন নি। এই উপন্যাসেও—
১. ‘অন্যভূবনে’ যে রহস্যের অবতারণা করা হল তার কিনারা বা বৈজ্ঞানিক কোন ব্যাখ্যা মিসির আলি করতে পারেন নি। হুমায়ূন আহমেদ আর সব গল্পে যা করেন, এই গল্পেও কিছু অনুমান আর অধিকাংশ অন্ধকারে রেখেই শেষ করে ফেললেন কাহিনী।
২. এই উপন্যাসটিকে কল্পবিজ্ঞান বলা হয়ে থাকলেও, এটি কল্পবিজ্ঞান হয়ে ওঠেনি। এতে টেলিপ্যাথিকে এতে রীতিমত সমর্থন করা হয়েছে। টেলিপ্যাথি অবশ্যই একটি অপবিজ্ঞান; আর কোন কল্পবিজ্ঞানে অপবিজ্ঞানের কোন জায়গা থাকার কথাই না।
৩. এই উপন্যাসে মিসির আলি বিবাহিত; তাঁর স্ত্রী নীলা—আগের তিন উপন্যাসে নীলা একটি রহস্যময়ী চরিত্র, যদিও তার রহস্যের মীমাংসা করার চেষ্টা করেননি মিসির আলি। এই উপন্যাসেও নীলা চরিত্র সামান্য রহস্য রয়েছে, অবশ্য বেশি কিছু থাকা সম্ভবও ছিল না, কেননা, নীলার উপস্থিতিও অল্প সময়ের জন্য।
৪. মিসির আলি ও নীলার একটি পুত্র সন্তান আছে, এই পুত্রটির কী পরিণাম হয়েছিল লেখক আমাদের জানান নি, তবে অনুমান করা চলে, মিসির আলির পুত্রটির পরিণামও তিন্নির অনুরূপ হয়ে থাকবে।
৫. বইটিকে কল্পবিজ্ঞান নয়, একটি রহস্য উপন্যাস হিসেবেই পড়তে হবে। আর এভাবে পড়তে পারলে বেশ রোমাঞ্চকর কিছু সময় কাটবে, এটা নিশ্চিত।
৬. হুমায়ুন আহমেদের প্রয়াণে বাস্তবিকভাবেই মিসির আলিরও মৃত্যু ঘটিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের বেশির ভাগ গল্পেরই শেষ পরণিত নেই। পাঠককে তিনি একটি দোলাচালে রেখে গল্প শেষ করতেন। এই পদ্ধতি পাঠকের জন্য একটা ধাঁধাও বটে, পাঠক নিজের ইচ্ছেমত কল্পনা করে নিতে পারেন, এতে পাঠক গল্পে অভিভূত থাকতে হয় বাধ্য হয়েই। হুমায়ূন আহমেদ আরও বহুদিন আমাদের মাঝে জীবিত থাকলে, অনেক অনেক কাহিনী লিখলে হিমু-রুপার মিলন হতে পারত কি পারত না, এই প্রশ্নের তুলনায় ‘অন্যভূবনে’ উল্লেখিত মিসির আলির স্ত্রী নীলা ও তাঁদের পুত্রের কী পরিণাম হত, এই প্রশ্নই পাঠককে আলোড়িত করে বেশি।
‘অন্যভূবন’ মিসির আলি সিরিজের চতুর্থ বই; এই উপন্যাসেও মিসির আলি বাস্তব-যুক্তিবাদী মানুষ, এবং সম্পুর্ণভাবে পরাবাস....