চট্টগ্রাম শহরের অন্তর্গত কর্ণফুলী নদীর কূলঘেষা এলাকা ইতিহাসের অন্যতম স্থান ফিরিঙ্গি বাজার সম্পর্কে কিছু তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করার চেষ্টা মাত্র। ফিরিঙ্গি বাজার কোতোয়ালী থানার সিডান, ক্যাডেষ্টল ও রিভিশন জরিপ পরিমিত একটি মৌজা। চট্টগ্রামে ফিরিঙ্গি বণিকদের আড়ত বা বাজার যে স্থানে অবস্থিত ছিল তাদের নামানুসারে সে স্থানটি ফিরিঙ্গি বাজার নামে খ্যাত হয়। ইংরেজ আমলে তা মৌজা ফিরিঙ্গি বাজার নামে জরিপ পরিমিত হয়
। ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে জোড়ের সুলতান হোসেন শাহা শাসিত চট্টগ্রামে প্রথম পর্তুগিজ বণিকদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এদেশে তারা ফিরিঙ্গি নামে খ্যাত ছিল। তখন দস্যুতার জন্য তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হয়। কিন্তু সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহামুদ শাহের আক্রমনে ভীত হয়ে সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি ও গির্জা নির্মাণ এবং চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক আদায়ের অধিকার প্রদান করে। এই অধিকার বলে তারা দেয়াঙ্গ বাণিজ্যকুঠি ও গির্জা নির্মাণ করে এবং চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্ক সংগ্রহ কেন্দ্র ও পণ্য সামগ্রীর আড়ত স্থাপন করে। পরবর্তীকালে সে এলাকাটি ফিরিঙ্গি বাজার নামে খ্যাত হয়। তখন এখানে পর্তুগিজ নাবিকদের ঔরষে ও স্থানীয় নিবর্ণের হিন্দু বৌদ্ধ রমনীর গর্ভের একটি বর্ণশংকর গোত্রের উদ্ভব হয়। চট্টগ্রামবাসীরা তাদের মাইট্যা (মেটে) ফিরিঙ্গি নামে খ্যাত করেন। পর্তুগিজরা এদেশ ত্যাগ করার পরও মাইট্যা ফিরিঙ্গি বাজারে বসবাস করে। ব্রিটিশ সিভিলিয়ান এ.এল.কে ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে চট্ট্রগ্রামে কর্মরত ছিলেন। তার লিখিত লিডস ফ্রম এ ডায়েরী উন লোয়ার বেঙ্গল গ্রন্থে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গি সম্প্রদায় সম্পর্কে লিখেছেন। ইউরোপীয় ছাড়াও চট্টগ্রামে তখন ছিল কিছু আধাশ্বেতাঙ্গ পর্তুগিজদের বংশধর। তাদের গায়ের রং হালকা বাদামি থেকে আবলুস, কাঠসদৃশ। কিন্তু তাদের নামে আভিজাত্য আছে। যেমন গোমেজ, গেব্রিয়েলা। স্থানীয় লোকেরা তাদের কালা ফিরিঙ্গি নামে খ্যাত করে। তারা তাদের নিচ জাত হিসেবে গণ্য করে। কর্ণফুলী নদীর তীরে ছিল কালা ফিরিঙ্গিদের একটি গির্জা। ফিরিঙ্গি বাজারের কথা লিখতে গিয়ে ইতিহাস পর্যালোচনায় ফিরিঙ্গি বাজার সংলগ্ন এলাকা সমুহের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরছি। গঙ্গাবাড়ির জলিল গঞ্জ ফিরিঙ্গিবাজার মৌজার দক্ষিণ পার্শ্ববর্তী কর্ণফুলী নদীর তীরস্থ একটি জনবসতির নাম গঙ্গাবাড়ি। এটা স্থানীয় নাম। পূর্বে এই এলাকার পতিত জমির মালিক ছিলেন ফিরিঙ্গিবাজার নিবাসী দোভাষ পরিবারের পরলোকগত আবদুল হক দোভাষ। তাঁর ম্যানেজার ছিলেন চৌধুরী বাবু নামে এক হিন্দু ভদ্রলোক। দোভাষ সাহেব চৌধুরী বাবুকে অত্যন্ত øেহ করতেন এবং তাঁকে চৌধুরী বাবুর বিকৃতরূপ ‘চদু বউ’ (চদুবাবু) বলে ডাকতেন। চৌধুরী বাবু দোভাষ সাহেব থেকে বর্ণিত এলাকার বেশ কিছু জমি বিনা মুল্যে চেয়ে সেখানে নিজের জন্য বাড়ি ও একটি মন্দির নির্মাণ করেন। সে এলাকার তিনি ছিলেন প্রথম বাসিন্দা। তাঁর নির্মিত গঙ্গার কূলে মন্দির বাড়ি অথবা তার নির্মিত বসতবাড়ি থেকে সে এলাকাটি গঙ্গাবাড়ি নামে পরিচিত হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, ফিরিঙ্গি বাজারের আবদুল হক দোভাষ এই শতকের ষাট দশক অবধি চট্টগ্রামের একজন জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন বিরাট হৃদয়ের অধিকারি, দানশীল ও অত্যন্ত সরল এবং সাদাসিদে লোক। তিনি এমন বেখেয়ালি লোক ছিলেন যে, তাঁর কথাবার্তায় অনেক সময় নানারূপ হাস্যরসের অবতারণা হতো। তার সম্পর্কে বহু হাস্যরসাতœক কাহিনী প্রচলিত আছে।